বুধবার, মে ১২
শীর্ষ সংবাদ

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও তেভাগা আন্দোলনের নেতা কমরেড মণিকৃষ্ণ সেনের আজ প্রয়াণ দিবস

এখানে শেয়ার বোতাম

অধিকার ডেস্ক :: ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সংগঠক, ঐতিহ্যবাহী তেভাগা আন্দোলনের নেতা, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, রংপুরে কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মণিকৃষ্ণ সেন এর আজ প্রয়াণ দিবস। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্নিযুগে অবিভক্ত বাংলায় যে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে, সে আন্দোলন বাংলার বিভিন্ন জেলায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। রংপুরেও সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের ঘাটি গড়ে উঠেছিল।

রংপুরে যেমন অনেক বিপ্লবীর জন্ম হয়েছে, তেমনি অসংখ্য কর্মিও সেখানে তৈরী হয়েছে। বিপ্লবী কমিউনিস্ট নেতা মণিকৃষ্ণ সেন এই রংপুরের সন্তান। ভারতের স্বাধীনতা অর্জন ও মানবমুক্তির জন্য তিনি যুক্ত হয়েছিলেন রাজনীতিতে। সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ ছিল তাঁর রাজনৈতিক দর্শন। শোষণমুক্তির লড়াই-সংগ্রামের সাথে ছিলেন অবিচ্ছেদ্দ্য। এজন্যে জীবনের অধিকাংশ সময় তাঁকে জেলে অথবা আত্মগোপনে কাটাতে হয়েছে। কমরেড মণিকৃষ্ণ সেন তাঁর ৮৮ বছরের জীবনে ১৯ বছর ৬ মাস জেল খেটেছেন। নিজগৃহে অন্তরীণ থেকেছেন প্রায় ৩ বছর। আত্মগোপনে ছিলেন ৭ বছর।

বিশং শতাব্দীর শুরুতে যে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে, সেই যুগ সন্ধিক্ষণে ১৯০৩ সালের ১ নভেম্বর কমরেড মণিকৃষ্ণ সেন এর জন্ম হয় রাজবাড়ী জেলার বেরাদী গ্রামে। তাঁর বাবার নাম বেনীমাধব সেন এবং মা্যের নাম প্রমোদা সুন্দরী সেন। মণিকৃষ্ণ সেনের পৈত্রিক বাড়ী ছিল রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার কাবিলপুর গ্রামে। কাবিলপুরেই তাঁর শৈশব কেটেছে। কারমাইকেল কলেজ থেকে ১৯২৫ সালে বিএ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৯ সালে এমএ পাশ করেন। পড়ালেখা শেষে রংপুরে ফিরে এসে আইন পেশায় যোগ দেন। তবে এই পেশার প্রতি তাঁর তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না। মাঝে-মধ্যে কোর্টে যেতেন।

স্কুলে পড়ার সময়েই বিপ্লবী রাজনীতিতে মণিকৃষ্ণ সেনের হাতেখড়ি। ১৯২০ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সেই ভারত ছাড় আন্দোলনে যুক্ত হয়ে শপথ নেন দেশমাতৃকাকে মুক্ত করার। হন যুব ভলান্টিয়ারদের প্রধান। সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের কর্মি মণিকৃষ্ণ সেন জোর করে বসানো বিয়ের পিঁড়ি থেকে উঠে আসেন বিপ্লবের প্রয়োজনে। আর বিয়ে করা তাঁর হয়নি কোনদিন। যুগান্তর দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কংগ্রেসে যুক্ত হয়ে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন তিনি।

১৯৩৮ সালে মণিকৃষ্ণ সেন সশস্ত্র পথ পরিহার করে যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টিতে এবং ১৯৩৯ সালে পার্টির সদস্যপদ অর্জন করেন। ১৯৪১ সালের ১ ডিসেম্বর বৃহত্তর রংপুর জেলা কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সম্মেলনে মণি কৃষ্ণ সেনসহ সাত জনকে নিয়ে রংপুর জেলা কিমিটি গঠিত হয়। পার্টির নির্দেশে ১৯৩৯-৪৫ সাল পর্যন্ত তিনি রংপুর জেলা কংগ্রেসের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পঞ্চাশের মন্বন্তরের (১৯৪৩ সাল) সময় দেখা দেয়া দুর্ভিক্ষ ও মহামারীতে আক্রান্তদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনে তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও সেবা রংপুর অঞ্চলে কমিউনিস্ট পার্টির ব্যাপক গণভিত্তি সৃষ্টিতে সহায়ক হয়েছিল।

১৯৪৩ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম কংগ্রেসে ডেলিগেট হিসেবে কমরেড মণিকৃষ্ণ সেন যোগ দেন। সামন্তবাদী শোষণের বিরুদ্ধে গড়ে উঠা কৃষকদের ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। ১৯৪৮ সালের ২২-২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কলকাতার মোহাম্মদ আলী পার্কে অনুষ্ঠিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসেও ডেলিগেট হিসেবে কমরেড মণিকৃষ্ণ সেন যোগ দেন। ১৯৫১ সালে তিনি রংপুর জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক নির্বাচিত হন। অংশগ্রহণ করেন মহান ভাষা আন্দোলনে। বিপুল রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অধিকারী কমরেড মণিকৃষ্ণ সেন ১৯৫৫ সালে পার্টির প্রাদেশিক কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৬৮ সালের অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম কংগ্রেসে, ১৯৭৩ সালের ৪-৮ ডিসেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে এবং ১৯৮০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির তৃতীয় কংগ্রেসে তিনি পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও তাঁর ভূমিকা ছিল অসাধারণ। ১৯৮৭ সালের ৭-১১ এপ্রিল তারিখে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির চতুর্থ কংগ্রেসে তিনি পার্টির কন্ট্রোল কমিশনের সদস্য নির্বাচিত হন।

বিপ্লবী কমিউনিস্ট নেতা কমরেড মণিকৃষ্ণ সেন ১৯৯১ সালের ২৮ অক্টোবর তাঁর সংগ্রামমূখর জীবনের সমাপন ঘটিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান।

(তথ্য সংগ্রহ : মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম )
সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)


এখানে শেয়ার বোতাম