শনিবার, মার্চ ৬
শীর্ষ সংবাদ

ব্যক্তি নয়, আঙুল তুলুন ব্যবস্থার দিকে

এখানে শেয়ার বোতাম

রা‌শিব রহমান ::

মহান শিক্ষা দিবসের মাসে এবার দেশের ছাত্র রাজনীতিতে এক বিশাল তোলপাড় ঘটে গেল। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম ছাত্র সংগঠনটির দুই শীর্ষনেতা তাঁদের সৌরলোক সদৃশ জৌলুস, হিমালয়োর্ধ্ব জনপ্রিয়তা ও গগনচুম্বি পরাক্রমসমেত ধুলিস্যাৎ হলেন। যে ঘটনা বা যেসব ঘটনা তাঁদের পতনকে ত্বরাণ্বিত করেছে তা কোন আকস্মিক ঘটনা নয়। এসব ঘটনা বা এরবহুগুণ রোমহর্ষক ঘটনাপ্রবাহের পৌনঃপুনিকতা আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোর সহনশীলতা বাড়িয়েছে বহুগুণ। আজকের ভূপাতিত নেতৃত্ব কোন পূনর্বাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবার সমহিমায় উদ্ভাসিত হবেন কি না আমরা জানি না। তবে যায় ঘটুক বিস্ময়সূচক চিহ্ন হয়ত আমাদের নাগাল পাবে না। এথেকেও গর্হিত অপরাধের অপরাধীরা অনেকেই সাময়িক পশ্চাদপসরণের পরও বিপুল বিক্রমে নতুন কোন সিংহাসন অলঙ্কৃত করেছেন। আবার বিলীনও হতে পারেন। কারণ, যাঁর বা যাঁদের ভাব ও মূর্তি উভয় রক্ষায় তাঁদের ভূপাতিত হওয়া তাঁদের ইজ্জতের তুলনায় দুই ছাত্রনেতা দূরে থাক জগতের কিছুই তূল্যমূল্য নয়। যাক সে কথা। তাঁদের ভবিষ্যৎ তাঁরা বুঝুক, ওটি আমার বিবেচ্য নয়। কিন’ যাঁরা আজ তাঁদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে বিপুল শিকারানন্দে উদ্বেল হচ্ছেন তাঁরা তো ব্যক্তির দিকে আঙুল তুললেন, পদ্ধতির দিকে নয়।

আমাদের দেশের শাসকশ্রেণি যে পদ্ধতিতে রাষ্ট্র ও সংগঠন পরিচালনা করেন তাতে ছাত্রনেতৃত্বের পরিবর্তন কী বিশেষ কোন তাৎপর্য্য বহন করে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের বুঝতে হয় প্রগতি আর প্রতিক্রিয়ার দ্বন্দ্ব।

সমাজের দুই গতি- সম্মুখগতির নাম প্রগতি আর পশ্চাদগতির নাম প্রতিক্রিয়া। রাষ্ট্রের অধিপতি শ্রেণি রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে তার শ্রেণি আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন ঘটায়। যেহেতু শ্রেণিবিভক্ত সমাজে পরস্পরবিরোধী শ্রেণির অস্তিত্ব থাকে তাই বিরোধী শ্রেণি বা শ্রেণিসমূহের আকাঙ্খা বিপর্যস্ত হয়। অধিপতি শ্রেণি যদি সংখ্যাল্প লোকের স্বার্থের প্রতিনিধি হয় তাহলে বঞ্চিত ও বিপর্যস্ত মানুষের সংখ্যা হয়ে পড়ে বিশাল। প্রচলিত ব্যবস্থা যাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে সংগত কারণেই তারা ব্যবস্থার বদল চায় না। আর পরিবর্তনশীল বিশ্বে কোন কিছুকে অপরিবর্তনীয় রাখতে চাওয়াটা পশ্চাদগতিকেই সূচিত করে। আর পাল্টানোর সংগ্রাম প্রগতিনির্দেশক।

ঔপনিবেশিক আমলে জাতীয় স্বাধীনতার লড়াই ছিল আপেক্ষিক অর্থে প্রগতিমুখী যাত্রা। শ্রমিক-কৃষক-পেশাজীবি-ছাত্র-তরুণ সবাই ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী রাষ্ট্র কাঠামোর বিরুদ্ধে লড়ছিল। তাই পূর্ব বাংলার জাতীয় স্বাধীনতার লড়াইয়ে যে ঐকতান তৈরি হয়েছিল তাতে বাঙালী উঠতি ধনিক শ্রেণিও গলা মিলিয়েছিল। সময়ের বাস্তবতায় তা তখন খুব একটা বেসুরো শোনায় নি। কিন্তু স্বাধীনতার পর যেই না উঠতি ধনিক শ্রেণি রাষ্ট্রক্ষমতা করায়ত্ব করেছে আর তার শ্রেণি আকাঙ্ক্ষায় শোষণমুলক রাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠিত করেছে যা বাস্তবে পাকিস্তানী রাষ্ট্রেরই প্রতিরূপ, সেই তার চেহারা গেল বদলে। একটা অবস্থিত বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ করতে গিয়ে সংগ্রামের শিক্ষায় যে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক মান তাকে অর্জন করতে হয়েছিল এবার সেই পুরোনো বাস্তবতা ফিরিয়ে আনতে গেলে সে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক মানকে ধ্বংস না করলে চলবে কেন? তাই ১৯৭২ সাল থেকেই দেখা গেল শাসকদলের সাথে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ব্যাংক ডাকাতি, রিলিফ চুরি, খুন, ধর্ষণ, মাদক ব্যবসা, চোরাচালানী, কমিটি বাণিজ্য এগুলোতে জড়িয়ে পড়ল। অধিকাংশ শ্রমজীবি জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে প্রয়োজন হয়ে পড়ল আতঙ্ক সৃষ্টির। এজন্য তাদের প্রয়োজন হয় ‘মনস্টার’ তৈরির। নামে লীগ-দল-শিবির ভেদাভেদ থাকলেও চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যে এদের তেমন পার্থক্য করা দায়।

এদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন নেই। তাই এদের সংগঠন পরিচালনা পদ্ধতিও সন্ত্রাসনির্ভর। রাজনৈতিক কর্মীর নামে বাস্তবে ভাড়া খাটা কর্মী দিয়ে কর্মসূচি পালন করতে হয়। ঠিকাদারি কাজের কমিশন, নিয়োগ বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, সিট বাণিজ্য না চললে এধরণের সংগঠন চলা অসম্ভব। রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে থাকলে এগুলো চলে নির্বিঘ্নে, কারণ রাষ্ট্র তাদের পাহারাদার। তখন মিছিলে লোকের বন্যা, অথচ রাস্ট্র ক্ষমতায় না থাকলে দৃশ্যমান থাকাও প্রায় অসম্ভব। অভিভাবকতূল্য যে নেতৃত্ব তাদের শাসন করলেন বিষয়টি তাদের অজানা এমন ভাবলে ভুল হবে। নেতাদের বিলাসী জীবনও তাদের সংগঠন পরিচালনার অত্যাবশ্যকীয় অনুসঙ্গ। সুতরাং সদ্য ঘটা ‘নেতা অপসারণ’ ঘটনাকে যারা ‘ব্যক্তির নৈতিক স্থলন’ অথবা অপর কোন ব্যক্তির ‘নীতিনিষ্ঠতা’ ভাবছেন তারা বোকার স্বর্গের সুশীতল ছায়া উপভোগ করছেন। ব্যবস্থা বা পদ্ধতির বদল ছাড়া এযে শুধুই পুরাতন ‘মনস্টার’ এর বদলে নতুন‘মনস্টার’ তৈরি করা।

আর ব্যবস্থা বদলের লড়াই বা প্রগতির লড়াই যারা করে তাদেরকে প্রচল কাঠামোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে গণআকাঙ্ক্ষাকে নিজেদের কর্মসূচির মধ্যে প্রতিফলিত করে সংগঠন পরিচালনা করতে হয়। সে লড়াই এবং সংগঠনশীলতার মধ্যেই রয়েছে মুক্তির সম্ভাবনা।

লেখক:  সাংগঠ‌নিক সম্পাদক, সমাজতা‌ন্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট।


এখানে শেয়ার বোতাম