বুধবার ‚ ২৮শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ ‚ ১২ই আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ ‚ সকাল ৬:১৪

Home মতামত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রঃ 'হাস্যকর' না যৌক্তিক?

বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রঃ ‘হাস্যকর’ না যৌক্তিক?

মাসুদ রানা ::

অনেকেই – এমনকি সমাজতন্ত্রবাদীদের কেউ কেউও – নিজের অজ্ঞতার কারণে ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ নিয়ে মূর্খ মন্তব্য করেন। তারা মনে করেন, কথাটা বুঝি জাসদের ‘হাস্যকর’ আবিষ্কার। কিন্তু এটি কেনো ঠিক নয়, তা লিখতে নীচে প্রবৃত্ত হই।

কার্ল মার্ক্সের জন্মের আগে থেকে সমাজতন্ত্রের যে-বিভিন্ন ধারণা ও তত্ত্ব ইউরোপে বিকশিত ও চর্চিত হয়েছিলো, তাদেরকে বলা হয় ইউটোপীয়ান সমাজতন্ত্র। কারণ, সেগুলোর সূত্রায়ন ও বাস্তবায়নের কোনো বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও ভিত্তি ছিলো না।

বিপরীতে, কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের সূত্রায়িত সমাজতন্ত্র ছিলো শ্রেণী সংগ্রাম নির্ভর মানবেতিহাসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী ব্যাখ্যার ভিত্তিতে সূত্রায়িত ও সমাজ বিকাশের অবশ্যম্ভাবী স্তর রূপে নির্দশিত।

ইউটোপিয়ান সমাজতন্ত্রের সাথে দ্বন্দ্বমূলক ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ভিত্তিক সমাজতন্ত্রের পার্থক্য নির্দশার্থে ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস ‘Scientific Socialism’ বা ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ কথাটির প্রবর্তন করেন। সুতরাং, এটি জাসদের আবিষ্কার নয়।

জার্মান ভাষায় লিখিত এঙ্গেলসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ “Herr Eugen Duhrings Umwalzung der Wissenchaft” থেকে তিনটি অধ্যায় ফরাসী ভাষায় ১৮৮০ সালের মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে ‘Revue Socialiste’ পত্রিকায় “Socialisme utopique et Socialisme scientifique” শিরোনামে প্রকাশিত হয়। ১৮৯৬ সালে এ্রর ইংরেজিতে অনুবাদ প্রকাশ কয়া হয় ‘Socialsim: Eutopian and Scientific’ (সমাজতন্ত্রঃ কাল্পনিক ও বৈজ্ঞানিক) শিরোনামে।

এঙ্গেলসের এই বইটি যে তিন অধ্যায় নিয়ে গঠিত, তাদের প্রথমটি হচ্ছে, “Eutopian Socialism” (কাল্পনিক সমাজতন্ত্র); দ্বিতীয়টি ‘Dialectics’ (দ্বন্দ্ববাদ) এবং তৃতীয়টি ‘Historical Materialism’ (ঐতিহাসিক বস্তুবাদ)।

এঙ্গেলসের এই গ্রন্থটি সে-সময়ে মার্ক্সের ‘ডাস ক্যাপিট্যাল’ এবং মার্ক্স-এঙ্গেলসের ‘দ্যা কমিউনিষ্ট ম্যানিফেস্টোর’ চেয়েও অধিক সংখ্যক ভাষায় অনূদিত ও প্রকাশিত হয়। শুধু জার্মান ভাষাতেই এই গ্রন্থের চারটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়।

আমি মনে করি, যারা মার্ক্সবাদী সমাজতন্ত্র তথা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র সম্পর্কে জানতে চান এবং জেনে ধারণ বা বর্জন যা-ই করতে চান, তাদের জন্যে এঙ্গেলসের এই গ্রন্থটি অবশ্যপাঠ্য।

জাসদ তথা ছাত্রলীগের কৃতিত্ব এই যে, তারাই প্রথম বাংলাভাষাভাষী মানুষের মধ্যে ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ কথাটিকে পরিচিত ও জনপ্রিয় করে। শুধু তাই নয়, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মূলমন্ত্রটি তারা বাংলাভাষায় অতি চমৎকারভাবে এক বাক্যে প্রকাশ করেঃ

“আমরা লড়ছি, শ্রেণী সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে, সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যে”।

আমি জানি না, বাংলা ভিন্ন বিশ্বের অন্য কোনো ভাষায় বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মূলমন্ত্রটি এতো চমৎকারভাবে একটিমাত্র বাক্যে এসেছে কি-না। বস্তুতঃ এটি ছিলো চীনপন্থা ও রুশপন্থার বিপরীতে সম্পূর্ণ নতুন ও স্বতন্ত্রভাবে বাঙালী জাতীয়তাবাদী ধারা থেকে বিকশিত সমাজতন্ত্রবাদীদের স্বাতন্ত্র্যের পরিচায়ক মন্ত্র।

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ জাসদের মূলমন্ত্রটি চমৎকার হলেও, এর ব্যাখ্যার প্রয়াস ও প্রকাশ সীমিত হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, অনেক সমাজতন্ত্রী পর্যন্ত ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ কথাটির অর্থ বুঝেননি। অনেক ক্ষেত্রে অনেকেই না বুঝে কুতর্ক করেছেন এবং এখনও করেন।

আমার মনে পড়ে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠকালে আমাকে এক ‘শুধু সমাজতন্ত্রী’ বন্ধু চ্যালিঞ্জ করেছিলেন মধুর কেণ্টিনে অনেকের সামনে এই বলেঃ “সায়িণ্টিফিক কেমিস্ট্রি যেমন হাস্যকর নাম, সায়িণ্টিফিক সোশ্যালিজমও তেমনি হাস্যকর। কারণ, যেহেতু সংজ্ঞানুসারে কেমিষ্ট্রি ও সোশিওলিজম উভয়ই সায়িণ্টিফিক, তাই এদের নামের আগে সায়িণ্টিফিক শব্দ যোগ করা অর্থহীন।”

আমি সেই বন্ধুর কাছে ১০ মিনিট সময় চেয়ে নিয়ে, এঙ্গেলসের দোহাই দিয়ে, ব্যাখ্যা করে বুঝিয়েছিলাম ইউটোপীয়ান সমাজতন্ত্র, ডায়ালেক্টিস ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ এবং তার আলোকে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কাকে বলে। তখন থেকেই ইংরেজী ভাষার প্রতি আগ্রহ থাকার কারণে, মৌলিক গ্রন্থগুলো খুঁটে-খুঁটে পড়ে বুঝার চেষ্টা করে পলেমিক্সে ব্যবহার করতাম।

যাহোক, আমার ‘শুধু সমাজতন্ত্রী’ বন্ধুটি আন্তরিক ও সৎ ছিলো বলে মনোযোগ দিয়ে শুনে বলেছিলো, “সরি, আমি না জেনে এতোদিন মূর্খের মতো বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র নিয়ে ঠাট্টা করেছি। তোমাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।”

সেদিন আমার সেই বন্ধূটির ওপর আমার শ্রদ্ধাই বেড়ে গিয়েছিলো এই দেখে যে, সে তার দলের ও আমার দলের অনেক জুনিয়র কমরেডের সামনে অপকটে তার দীর্ঘ লালিত ভুল ধারণা ও নতুন লব্ধ জ্ঞান স্বীকার করেছিলো।

কিন্তু আজ দুঃখ হয় এই কারণে যে, তখন থেকে এখন – এই তিন দশকে – অজ্ঞতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, আর তার সাথে হ্রাস পেয়েছে সততা।

লেখক : সাবেক ছাত্র নেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ

শেষ পর্যন্ত কে হচ্ছেন আইসিসি চেয়ারম্যান?

অধিকার ডেস্ক:: ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক অভিভাবক সংস্থা আইসিসি এখন পুরোপুরি অভিভাবকহীন। চেয়ারম্যান শশাঙ্ক মনোহর পদত্যাগ করেছেন আরও বেশ কিছুদিন আগে। কিন্তু এরমধ্যে এখনও পর্যন্ত...

থানায় নিয়ে যুবলীগ নেতাকে মারধর, ওসি প্রত্যাহার

অধিকার ডেস্ক:: থানায় নিয়ে এক যুবলীগ নেতাকে বেধড়ক মারধরের ঘটনায় নেত্রকোনার দুর্গাপুর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত (ওসি) মিজানুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। মঙ্গলবার...

সিলেটে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান, জঙ্গি আটক, বোমা উদ্ধার

অধিকার ডেস্ক:: জঙ্গি আস্তানার খোঁজে সিলেটের টিলাগড়ের শাপলাবাগ ও জালালাবাদ আবাসিক এলাকার পৃথক দুটি বাসায় অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দুটি বাসায় অভিযান...

রাশিয়ার কাছে ভ্যাকসিন চেয়েছে ২০ দেশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের অনুমোদন দিয়েছে রাশিয়া। ১৯৫৭ সালে বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়েছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। সেটির নামের...
Shares