মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৩
শীর্ষ সংবাদ

‘বেশি খুশিই কাল হয়েছে’: আমরা কিন্তু খুশি হতে পেরেছিলাম না!

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 35
    Shares

আবু নাসের অনীক::

করোনা সংক্রমণের যেমন উল্লম্ফন ঘটেছে, একই সাথে মৃত্যুরও। গ্রাফ খাড়াখাড়িভাবে উপরের দিকে উঠছে। প্রতিদিন সংক্রমণ ও মৃত্যুর নতুন রেকর্ড হচ্ছে, গতকাল ছিলো রেকর্ড সংখ্যক সংক্রমণ ৬ হাজার ৪৫৯, আজ সেটিকে অতিক্রম করে নতুন রেকর্ড হয়েছে ৬ হাজার ৮৩১। গত বছরে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি আমাদের হতে হয়নি। পূর্ণাঙ্গ লকডাউন করতে না পারলেও সাধারণ ছুটি সংক্রমণ বিস্তারে বাধা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলো।

পরিতাপের বিষয় দেশে সংক্রমণ শুরুর পূর্ব থেকেই সরকার করোনার পিছনে পিছনে থেকেছে, তার কারণ বরাবরই জনস্বাস্থ্যবিদদের পরামর্শ ইগনোর করেছে। বর্তমানের এই নাজুক পরিস্থিতিতে একই আচরণ করছে। বোঝায় যাচ্ছে, সংক্রমণ পরিস্থিতি ক্রমশই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। শুধুই দোষারোপ করে চলেছি, জনগণ স্বাস্থ্যবিধি মানছেনা, সেটা বুঝেও তার বিকল্প কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করছিনা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রস্তাবনাকে পাশ কাটিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে ১৮ দফা নির্দেশনা প্রদান করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। প্রজ্ঞাপনে যে সমস্ত নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে বাস্তবে তার প্রয়োগের ক্ষেত্রে বোঝায় যাচ্ছে, কোন প্রকার অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে কিছু একটা করতে হয় তাই করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন সম্পর্কে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা: বে-নজির আহমেদ বলেন,‘সংক্রমণ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার পর নির্দেশনা এলো। ১৮ দফা নির্দেশনা অনেকটা উইশ লিস্ট বা ইচ্ছা তালিকার মতো। বাধ্যতামূলক কিছু না করলে এই প্রজ্ঞাপন সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কোন কাজে আসবেনা’।
নির্দেশনায় গণপরিবহনে মোট সিটের ৫০% যাত্রী বহনের কথা বলা হয়েছে, এজন্য ভাড়া ৬০% বৃদ্ধি করা হয়েছে। পূর্বের অভিজ্ঞার মতো এবারও এটা নিয়ে এক চরম অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সকল অফিস-কারখানা খোলা কিন্তু গণপরিবহনে বলা হলো ৫০% যাত্রী উঠতে পারবে, তাহলে পরিবহন যদি বাড়ানো সম্ভব না হয় তবে বাকি ৫০% যাত্রী কীভাবে তাদের কর্মস্থলে বা গন্তব্যে সময় মতো পৌঁছাবে? বাস মালিকেরা ঠিকই বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। সকালে সবাই তাদের কর্মস্থলে যাবার জন্য গণপরিবহনের অপেক্ষায় থাকেন, সেখানে আগে উঠার জন্য যাত্রীদের মধ্যেও হুড়াহুড়ি সৃষ্টি হচ্ছে, স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ হচ্ছে না, কর্মস্থলেও ঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারছেনা, এই সুযোগে বিকল্প পরিবহনও বাড়তি ভাড়া আদায় করছে।

ফলশ্রুতিতে যে উদ্দেশ্যে নির্দেশনা দেওয়া হলো সেটিই প্রতিপালন হচ্ছে না। মাঝখান থেকে জনভোগান্তি সৃষ্টি, বাড়তি ভাড়া মেটানোর দায়। নির্দেশনাটি পুরোটাই বাস্তব বিবর্জিত। রাইড শেয়ারিং বন্ধ করা হয়েছে, কিন্তু ভাবা হয়নি এর সাথে যারা যুক্ত তারা কী করবে! অর্থাৎ সবকিছুই খন্ডিতভাবে চিন্তা করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রস্তাবনায় গণপরিবহনে ৫০% যাত্রী বহনের কথা বলা হয়েছিলো, সাথে এটাও বলেছিলো সকল অফিস-কারখানা বন্ধ রাখতে হবে। একটা সামঞ্জসতা ছিলো। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর গণপরিবহনের সিদ্ধান্তটি রেখে অন্যটি খারিজ করলো, এটা বিবেচনা করলোনা দুটি সিদ্ধান্ত একটি অন্যটির সাথে সম্পর্কযুক্ত। খন্ডিতভাবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা যায়না।

প্রত্যেকটা সিদ্ধান্তে দারুনভাবে স্ববিরোধিতা। আজ সারা দেশে ১ লাখ ২২ হাজার শিক্ষার্থীর মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করা হলো। এর সাথে যুক্ত হলো নুন্যতম আরো ১ লাখ ২২ হাজার অভিভাবক, একসাথে মোট ২ লাখ ৪৪ হাজার মানুষের মুভমেন্ট হলো। এটা কী কোনভাবেই সরকারের ১৮ দফা নির্দেশনার সাথে সঙ্গতিপূর্ন?? না পরীক্ষা কেন্দ্রের ভেতরে, না বাইরে কোথাও স্বাস্থবিধি মানা হয়নি। ধরে নিলাম, কেন্দ্রের বাইরে যারা স্বাস্থ্যবিধি মানেনি এর জন্য তারা দায়ী, কিন্তু পরীক্ষা কক্ষে এক বেঞ্চে ৩ জন বসিয়ে পরীক্ষা নেওয়া, সামনে পেছনে ৩ ফিট দুরত্ব নিশ্চিত না করা এর দায় কার? খোদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আজকে এই পরীক্ষা গ্রহণ করে করোনা সংক্রমণকে আরো বেশী তীব্র করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করলো। এরপরেও সংক্রমণ বিস্তারে সকল দায় চাপানো হবে জনগণের উপর।

সরকার বর্তমান পরিস্থিতিতে যে ১৮ দফা নির্দেশনার প্রজ্ঞাপন দিয়েছে এটা দেওয়ার প্রয়োজন ছিলো আরো এক মাস আগে। বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রস্তাবনা গ্রহণের বিকল্প কিছু নেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, স্বাস্থ্যখাতে জরুরি অবস্থা চলছে। দেশের সর্বোচ্চ চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান এই মূল্যায়ন করার পরেও সরকার ১৮ দফার একটি অতি দূর্বল নির্দেশনা দিয়ে বসে আছে।

নতুন রোগী শনাক্তের ক্ষেত্রে প্রতিদিন নতুন রেকর্ড হচ্ছে। ইতিমধ্যে দিনে প্রায় ৭ হাজার রোগী শনাক্তের রেকর্ড হয়েছে। এই রোগীদের মধ্যে একটি অংশকে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, ৪০% রোগীর লক্ষণ মৃদু, ৪০% এর লক্ষণ মাঝারি, ১৫ % এর তীব্র, বাকি ৫% এর পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। এ ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন পড়ে ৬০% রোগীর, এর মধ্যে একটি অংশের অক্সিজেন এবং আইসিইউ এর প্রয়োজন হয়।

দেশে এই মুহুর্তে সংক্রমণের যে পরিস্থিতি আগামী এক সপ্তাহ পর এ ধরনের রোগীদের জন্য শয্যা পাওয়া যাবে কিনা সেটি বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন,‘আমরা এখন সংক্রমণ দমাতে না পারলে, নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে আর পারবোনা। আমরা হাসপাতালের বেড না হয় বাড়ালাম কিন্তু রোগী আরো বাড়লে লাভ হবে না। প্রতিদিন ৫০০০ লোক আক্রান্ত হলে এবং সবাই হাসপাতালে আসলে, সারা দেশকে হাসপাতালে রুপান্তর করলেও রোগীর জায়গা দিতে পারবোনা’। ইতিমধ্যে আক্রান্ত রোগীর ঘর ৫ হাজার ছড়িয়ে ৭ হাজারের ঘর ছুঁই ছুঁই করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কৌশলপত্র অনুসারে ৬০% রোগীকে যদি হাসপাতালে নিতে হয় তাহলেও জায়গার সংকুলান যেমন হবে না, তাদের সেবা দেবার মতো চিকিৎসক ও নার্সও পাওয়া যাবে না। দেশের মধ্যে সবচেয়ে সংক্রমিত এলাকা ঢাকা শহরে কোভিড ডেডিকেটেড সরকারী হাসপাতালে সাধারণ শয্যা আছে ২ হাজার ৫১১ টি। বর্তমানে এখানে রোগী ভর্তি আছে ২ হাজার ২৪৬ জন। অর্থাৎ ৯০% শয্যা ইতিমধ্যে পূরণ হয়ে আছে। ঢাকায় করেনারা জন্য নির্ধারিত ১০ টি হাসপাতালের ১০৮ টি আইসিইউ বেডে রোগী আছে ১০৪ জন্য। খালি আছে মাত্র ৪ টি। একটি আইসিইউ সিটের জন্য ১৫-২০ জন রোগী অপেক্ষায় থাকছেন। বেসরকারি ৯ টি হাসপাতালে ৩৭৬ টির মধ্যে খালি আছে ৪৭ টি।

দশ মাস আগে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, সব জেলায় আইসিইউ স্থাপন করা হবে। দশ মাস পর এখনকার চিত্র ঝুঁকিপূর্ণ ৩১ টি জেলার মধ্যে ১৫ টি তেই আইসিইউ নেই। পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাবে ৫ হাসপাতাল ঘুরে আজ এ্যাম্বুলেন্সের মধ্যেই মারা গেলেন এক নারী, শুরু হয়ে গেছে! গত বছর এই চিত্র আমরা দেখেছি, এক বছর পরে এসেও সেই একই চিত্র দেখতে হচ্ছে, এটাই ট্রাজেডি!!

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন,‘আমরা কোভিড মোকাবিলায় সক্ষম হয়েছিলাম। জাতিসংঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আমাদের প্রশংসা করেছে। আমরা খুশি হয়েছিলাম। আমরা যে বেশি খুশি হলাম, সেটাই আমাদের জন্য কাল হয়ে গিয়েছে’। জ্বী জনাব, এই সত্যটা বোঝার জন্য ধন্যবাদ।

আপনাদেরকে বারংবার এরকম খুশি না হওয়ার জন্য বলা হয়েছে, বলা হয়েছে আপনাদের এ ধরনের আচরণ জনগণের মধ্যে ভুল ম্যাসেজ দিচ্ছে। কোনভাবেই আপনাদের উৎফুল্ল মার্কা বাণী দেওয়া থেকে নিবৃত্ত করা যায়নি। দেশে করোনা কখনোই নিয়ন্ত্রণ হয়নি। আপনারা সংক্রমণের, মৃত্যুর, সুস্থতার আর্টিফিসিয়াল গ্রাফ তৈরি করে জাতিসংঘ বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে কনভিন্স করার চেষ্টা করেছেন, রাজনৈতিকভাবে সাফল্য নিতে চেয়েছেন। আমরা সবসময় বলেছি, এই আর্টিফিসিয়াল গ্রাফ দিয়ে সংক্রমণের চিত্র সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ হয়েছে এমন দেখালেও চুড়ান্তভাবে তা ভয়ানক ক্ষতি ডেকে আনেবে। কারণ আর্টিফিসিয়াল গ্রাফের কারণে প্রকৃত চিত্র আড়াল হয়েছে, তার কারণে করণীয়ও ভুল নির্ধারণ হয়েছে, যার মাশুল এখন দিতে হচ্ছে।

আমরা যুক্তরাজ্য থেকে ঢোকা বন্ধ করতে পারলাম না কিন্তু যুক্তরাজ্য ঠিকই আমাদের ঢোকা সেখানে বন্ধ করে দিলো। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রস্তাবনা অনুসারে ঢাকাসহ ৩১ টি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এই মুহুর্তে লকডাউন করার কোন বিকল্প নেই। সরকারকে পরিপূর্ণ দায়িত্ব নিয়েই এটা করতে হবে। কোন বিকল্পতেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না পাবলিক মুভমেন্ট বন্ধ না করতে পারলে।

আপনারা বহু উন্নয়নের, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, টেকসই অর্থনীতির অনেক গল্প শুনিয়েছেন, সেটা বাস্তবে প্রমাণ করুন!! নইলে জনগণের সামনে হাত জোড় করে বলুন, যা বলেছি তা করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের আর্টিফিসিয়াল গ্রাফের মতোই। জনগণকে প্রকাশ্যে বলুন, আপনারা লকডাউন করার সামর্থ রাখেন না। আর যে পন্ডিতবর্গ বলছেন, লকডাউন করলে অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে, অর্থনৈতিকভাবে আমরা সমর্থ নই, অনুগ্রহপূর্বক আপনারা এরপর থেকে সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্যের বয়ান দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন। এক মুখে দুই কথা বলা যায় না। মনে রাখবেন, সবকিছুর উর্দ্ধে মানুষের জীবন।

লেখক : সাবেক সভাপতি বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় যুব পরিষদ


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 35
    Shares