বুধবার, জানুয়ারি ২০

বেগম রোকেয়া: জীবন সংগ্রাম ও শিক্ষা

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 149
    Shares

রনেন সরকার রনি::

“ভারতবর্ষে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট জীব কাহারা, জানেন? সে জীব ভারতনারী। এই জীবগুলির জন্য কখনও কাহারও প্রাণ কাঁদে নাই। মহাত্মা গান্ধী অস্পৃশ্য জাতির দুঃখে বিচলিত হইয়াছিলেন; স্বয়ং থার্ডক্লাস গাড়ীতে ভ্রমন করিয়া দরিদ্র রেল-পথিকদের কষ্ট হৃদয়ঙ্গম করিয়াছেন। পশুর জন্য চিন্তা করিবারও লোক আছে। পথে কুকুরটা মোটর চাপা পড়িলে, তাহার জন্য এংলো-ইন্ডিয়ান পত্রিকাগুলিতে ক্রন্দনের রোল দেখিতে পাই। কিন্তু আমাদের ন্যায় অবরোধ-বন্দিনী নারী জাতির জন্য কাঁদিবার একটি লোকও এ ভূ-ভারতে নাই।” ১৯২৭ সালে ‘বঙ্গীয় নারী শিক্ষা সমিতি’র এক সভায় সভানেত্রীর ভাষন দিচ্ছিলেন তিনি। তিনি বলেছিলেন, ‘ভাগিনীগণ! চক্ষু রগড়াইয়া জাগিয়া উঠুন- অগ্রসর হউন। বুক ঠুকিয়া বল মা! আমরা পশু নই’ বল ভাগিনী! আমরা আসবাব নই; বল কণ্যে! আমরা জড়াউ অলঙ্কার রূপে লোহার সিন্ধুকে আবদ্ধ থাকিবার বস্তু নই; সকলে সমস্বরে বল আমরা মানুষ।’ পরাধীন দেশের কুসংস্কার-কূপমন্ডুকতা, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা আর ধর্মীয় গোঁড়ামীতে আচ্ছন্ন সমাজে, অশিক্ষার অভিশাপে নিমজ্জিত স্ত্রীজাতিকে যিনি ‘চক্ষু রগড়াইয়া জাগিয়া’ উঠার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি রোকেয়া। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।

১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে অতুল ঐশ্বর্যের মধ্যে জন্ম রোকেয়ার। মস্ত প্রাসাদে বাস, বাগানের গাছ গাছালি থেকে সারাদিন ধরে কত কত পাখির ডাক, বাগানের মধ্যে আবার মস্ত এক পুকুর, পরিচর্যার জন্য রয়েছে কত পরিচারিকার দল। রোকেয়াকে সবাই আদর করে ডাকত রুকু বলে। কিন্তু এত ঐশ্বর্য আর ¯েœহ-ভালোবাসার মাঝেও রোকেয়া বড় হয়ে উঠেছেন পর্দা প্রথার কঠিন নিয়ম মেনেই। অবাক হয়ে তিনি দেখেছেন, এদেশের মেয়েরা কত সহজভাবে মেনে নেয় এই অর্থহীন অবরোধ। একে তো এই অর্থহীন পর্দাপ্রথার দাপট, তার থেকেও কষ্টকর লেখাপড়া শেখার উপর নিষেধাজ্ঞা। রোকেয়ার পরিবারে মেয়েদের আরবি শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল ঠিকই, কিন্তু বাংলা বা ইংরেজী পড়তে চাইলেই বিপদ! পরিবারের নিষেধ অমান্য করে গোপনে রোকেয়াকে বাংলা শিখিয়েছিলেন বোন করিমুন্নেসা। তিনি নিজেও লুকিয়ে মাটিতে দাগ কেটে কেটে বর্ণমালা শিখেছিলেন। আর রোকেয়ার ইংরেজী শিক্ষাদান করেছিলেন বড় ভাই ইব্রাহীম সাবের। রোকেরয়ার
বয়স যখন মাত্র ষোল বছর, আটত্রিশ বছর বয়স্ক বিপত্মীক সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। এমন অসম বয়সের বর-কনে হওয়া সত্ত্বেও এ বিয়ে রোকেয়ার জীবনে আশীর্বাদ হয়েই দেখা দিয়েছিল। পায়রাবন্দের উঁচু পাঁচিল-ঘেরা বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়ালেন তিনি। বাইরের খোলা পৃথিবীর হাওয়া লাগল গায়ে। কত জায়গায় ঘুরলেন তিনি স্বামীর সঙ্গে, জীবনের কত বিচিত্র রূপ দেখা হল। সাখাওয়াতের সাহচর্যে ইংরেজি পড়া আর লেখা- দুইই খুব ভালোভাবে রপ্ত হল রোকেয়ার। বড় ভাই ইব্রাহীম সাবেরের কাছে যে শিক্ষা লাভ করেছিলেন তিনি, স্বামীর সহযোগিতা পেয়ে তার পূর্ন বিকাশ লাভ করল।

রোকেয়ার স্বপ্ন সাখাওয়াতের স্বপ্ন হয়ে এগিয়ে যেতে থাকল সমান তালে, সমান গতিতে। পশ্চিম ভাগলপুরের ‘বাঁকা’ নামক সাবডিভিশনে থাকতেন
তাঁরা। একবার সাখাওয়াত সাহেব বাইরে গিয়েছিলেন অফিসের কাছে। রোকেয়া বাসায় একা, সময় কাটাবার জন্য ইংরেজীতে একটা মনগড়া কাহিনী লিখতে বসলেন তিনি। দু’দিন পর স্বামী ফিরে আসলে তাঁর হাতে তুলে দিলেন ঝঁষঃধহধ’ং উৎবধস । পুরুষদের নিয়ে কত ঠাট্টা করা হল সে লেখায়। সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন সে লেখা পড়ে মন্তব্য করেছিলেন, অ ঞবৎৎরনষব জবাবহমব (একনিদারুন প্রতিশোধ)! তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সুলতানার স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে রোকেয়ার নারীমুুক্তির স্বপ্নই বাস্তবে প্রতিফলিত হয়েছে। রোকেয়ার সেই স্বপ্ন অতঃপর প্রতিফলিত হতে থাকে তার কর্মে-সাহিত্যে।

জীবনে দুইবার মা হয়েছিলেন রোকেয়া। কিন্তু প্রথম মেয়েটি পাঁচমাস বয়সে আর দ্বিতীয় মেয়েটির চার মাস বয়সে মৃত্যু হয়। সন্তানহীন সেই
সম্পতি দুজন দুজনের ভাবনা-চিন্তার ভাগ নিয়েই সময় কাটাতেন। রোকেয়া ছিলেন তাঁর স্বামীর গর্বের বিষয়। কিন্তু মাত্র ২৯ বছর বয়সে রোকেয়ার বৈবাহিক জীবনের অবসান ঘটে। চৌদ্দ বছরের দাম্পত্য জীবনে রোকেয়া অক্লান্ত সাধনা আর স্বামীর সহযোগীতায় তিনি কীভাবে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন তার প্রমান রোকেয়ার সাহিত্য সৃষ্টি। স্বামীর মৃত্যুর পর নানা দিক থেকে বাধা আসতে থাকে রোকেয়ার জীবনে। বাবা, স্বামী এবং পুত্রের আশ্রয় ছাড়া যে নারীর কোন নিরাপদ আশ্রয় এদেশে নেই, রোকেয়া তা নতুন ভাবে অনুভব করেন।

তাঁর নারী স্বাধীনতার ধারনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নারী শিক্ষা। শিক্ষা থাকা আর না থাকার তফাৎ তিনি উপলব্দি করেছিলেন গভীর ভাবে। মেয়েদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা সে সময় শুধু রোকেয়া নয়, আরও অনেকেই বলছিলেন। বিদ্যাসাগর মেয়েদের জন্য বেশকিছু স্কুল করেছিলেন গ্রামে-গঞ্জে। কিন্তু মুসলমান ঘরের মেয়েরা সে সব স্কুলে পড়তে পারতনা পর্দা প্রথার জন্য। সেই অবরোধবাসিনীদের শিক্ষার সংস্পর্শে নিয়ে আসার সংগ্রামে সংকল্পবদ্ধ ছিলেন রোকেয়া। সেজন্য স্কুল প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। স্বামীর মৃত্যুর মাত্র পাঁচ মাস পর ভাগলপুরেই শুরু হয়েছিল স্কুলের কাজ। মাত্র ৫ জন ছাত্রী নিয়ে। নিজের তো স্কুলে পা রাখার সৌভাগ্য হয়নি, স্কুল সম্পর্কেও কোন ধারনা ছিলনা তাঁর। স্বামী হারানোর শোক তখনও তাকে অভিভূত করে রেখেছে। শোকে দিশেহারা মন নিয়েও সাহস করে শুরু করে দিয়েছিলেন স্কুল। সাখাওয়াত মোমোরিয়াল গার্লস স্কুল।

সে যুগে স্বামীর রেখে যাওয়া দশ হাজার টাকা স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য নেহাতই কম ছিল না। কিন্তু সাখাওয়াত সাহেবের প্রথম স্ত্রীর কন্যা-জামাতা রোকেয়াকে ভাগলপুরে টিকতেই দিলেন না। তাদের সাথে বিবাদ চালিয়ে যাওয়ার প্রবৃত্তি হয়নি রোকেয়ার। তাই নিজের হাতে সাজানো ঘর-
বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিলেন কলকাতায়। ১৩ নম্বর ওয়ালিউল্লাহ লেনে বাড়ি ভাড়া নিলেন রোকেয়া। মাত্র তিরিশ বছর বয়সের একাকিনী মেয়ে কলকাতায় বাস করা তখন সহজ কাজ ছিল না। সে জন্য মাকে তিনি নিজের কাছে এনেছিলেন। দুটি বেঞ্চ আর আট জন ছাত্রী নিয়ে দ্বিতীয় দফায় শুরু হল রোকেয়ার স্কুল। তৈরি হল স্কুল কমিটিও। স্কুল শুরু হবার খবর ছাপা হল ‘দি মুসলমান’ পত্রিকায়, অভিভাবকদের আহবান করা হল মেয়ে পাঠানোর জন্য। নতুনভাবে স্কুল শুরু করার এক বছরের মধ্যেই মারা গেলেন মা।

মায়ের মৃত্যুতে রোকেয়ার জীবনে আবারও দুর্যোগ নেমে আসে। দুর্যোগ এল স্কুলের জীবনেও। স্কুল শুরু হওয়ার মাত্র আট মাস পর বার্মা ব্যাংক ফেল করে। স্কুলের টাকা গচ্ছিত ছিল ঐ ব্যাংকেই। এদিকে তার আত্মীয়রা তার প্রাপ্য অর্থ থেকে সম্পূর্ন ভাবে বঞ্চিত করে তার দৈনিক মুখের গ্রাসটুকুও কেড়ে নিতে চাইছে। তাঁর সম্বন্ধে এমন অপপ্রচারও ছিল যে, ‘যুবতী বিধবা স্কুল স্থাপন করিয়া নিজের রূপ যৌবনের বিজ্ঞাপন প্রচার করিতেছে।’ ঐ সময়ের বিখ্যাত ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত নারী লেখকদের ছবি দেখে সিলেটের এক জমিদার চা-বাগান মালিক রোকেয়াকে চিঠি লিখে দুজন নারী লেখকের নাম উল্লেখ করে তাদের বিয়ের ঘটকালী করার জন্য অনুরোধ জানান। দুই লেখকের একজন আবার সওগাত পত্রিকার সম্পাদক নাসিরউদ্দীনের স্ত্রী। মর্মাহত রোকেয়া আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘যে দেশের একজন লোক এরূপ ধরনের চিঠি প্রকাশ্যে লিখিতে পারে, সে দেশে পুরুষ সমাজ কত নি¤œ স্তরের এবং মেয়েদের প্রতি তাহাদের ব্যবহার কত অশিষ্ট তা সহজেই ধারনা করা যায়।’ এতসব সত্ত্বেও রোকেয়ার স্বপ্নের স্কুল ধীরে ধীরে একটু একটু করে বড় হতে থাকে।

‘মেয়েদের মঙ্গল কামনা যা সমাজের মঙ্গল কামনারই আরেক নাম’- এর জন্য তিল তিল করে নিজেকে ক্ষয় করেছেন রোকেয়া। অবরোধবাসিনী মেয়েদের দুর্দশায় যেমন তাঁর মন কেঁদেছে, তেমনই চাষির দুঃখও তিনি অনুভব করেছেন অন্তদৃষ্টি দিয়ে। আর এখানেই তিনি তাঁর সময়ের আর সকলের থেকে আলাদা। উড়িষ্যার কনিকা স্টেটে উঁচু পদে চাকরি করতেন তার স্বামী, স্বামীর সঙ্গে রোকেয়াও ছিলেন সেখানে। তিনি লক্ষ্য করেছেন সেখানকার গরীব চাষিদের অবস্থা। পান্তা ভাতের সাথে নুন ছাড়া কিছুই জুটতনা তাদের। রংপুরে রোকেয়া দেখেছেন চাষিরা এত গরিব যে প্রতিদিন ভাতটুকুও জোগাতে পারে না। চাষির দুঃখ গভীর ভাবে বুঝেছিলেন বলেই তিনি কলকাতা শহরের চকঝমককেই দেশের উন্নতি বলে ভুল করেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘দেশে কলকারখানা হয়েছে, চটকলের কর্মচারীরা পাঁচশো-সাতশো টাকা বেতন পায়- তাকেই কি বলব দেশের উন্নতি? চটকলের
কাঁচামাল পাট উৎপাদন করে যারা, কই, তাদের অবস্থার তো বিন্দুমাত্র উন্নতি হয়নি। আল্লাহতালা এত অবিচার কিরূপে সহ্য করিতেছেন?’ গভীর আক্ষেপে প্রশ্ন করেছেন রোকেয়া।

মানুষকে যিনি ভালোবাসেন, দেশকে যে তিনি ভালোবাসেন এতো স্বাভাবিক কথা। মানুষ নিয়েই তো দেশ। রোকেয়ার যৌবনকালে দেশের উপর আছড়ে পড়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের জোয়ার। রোকেয়ার পক্ষে সম্ভব ছিল না এসব আন্দোলন সম্পর্কে উদাসীন থাকা। তিনি ‘সুগৃহিনী’তে আহবান জানালেন, স্মরন রাখিতে হইবে, আমরা শুধু হিন্দু বা মুসলমান কিংবা পারসী বা খ্রিস্টিয়ান অথবা বাঙ্গালী, মাদ্রাজী, মাড়ওয়ারী বা পাঞ্জাবী নহি। আমরা ভারতবাসী।’

‘ছেলেদের সাথে সমানভাবে মেয়েরাও যতদিন না যোগ দিচ্ছে স্বাধীনতা আন্দোলনে, ততদিন সে সংগ্রাম সফল হবার নয়- এই ছিল রোকেয়ার বিশ্বাস। আর সেই ভাবনা থেকেই তিনি প্রকাশ করছেন দুটি রূপকথার গল্প। যার একটির নাম ‘মুক্তিফল’ অন্যটি ‘জ্ঞানফল’। কংগ্রেসের মধ্যে চরমপন্থী আর নরমপন্থীর বিরোধ রোকেয়াকে মর্মাহত করেছে। রোকেয়ার সঙ্গে গান্ধীজির আন্দোলনের কিংবা কোন রকম রাজনৈতিক আন্দোলনেরই প্রত্যক্ষ কোন সংযোগ ছিল না। কিন্তু গান্ধীবাদী আন্দোলনের দ্বারা তিনি প্রভাবিত ছিলেন। যদিও বিপ্লববাদী ধারার প্রতি তিনি সমর্থনও জানিয়েছিলেন। বিপ্লবী কানাইলালের ফাঁসির আদেশ শোনার পর রোকেয়া রচনা করেছিলেন ‘নিরূপম বীর’ নামক কবিতাটি।

সমাজ ও শ্রেনী সচেতন এই মহীয়সী নারী ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর নিজের জন্ম দিনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মাত্র ৫২ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে লোভ-লালসা, মোহ, খ্যাতি ইত্যাদি সকল কিছু থেকে মুক্ত থেকে শুধুই দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের উপর দাঁড়িয়ে কাজ করে গেছেন। অপার মানসিক বল ও চেতনার ইস্পাতদৃঢ় শক্তিতে আধারের কালো মেঘ কেটে কেটে প্রভাতের সূর্যকে আনতে চেয়েছেন। একটা শূন্য উদ্যান দাঁড়িয়ে একাকিনী রোকেয়া লড়াই করেছেন নারী মুক্তির স্বপ্নকে সত্যে পরিনত করার দৃপ্ত শপথে।

লেখক : সদস্য, বাসদ (মার্কসবাদী) পাঠচক্র ফোরাম, সিলেট


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 149
    Shares