সোমবার, মার্চ ৮
শীর্ষ সংবাদ

বুয়েটে সনি হত্যাকাণ্ডের পরেও ছাত্র রাজনীতি বন্ধের আলাপ এসেছিলো

এখানে শেয়ার বোতাম

অনুপম সৈকত শান্ত ::

২০০২ সালে বুয়েটে সনি হত্যাকাণ্ডের পরে যে আন্দোলন- সেখানেও ছাত্র রাজনীতি বন্ধের আলাপ এসেছিলো। সনির ব্যাচমেটদের অনেকেই ছাত্রদলের দুই গ্রুপের বন্দুকযুদ্ধকে ছাত্র রাজনীতির ফল হিসেবেই দেখেছিলো! সনি হত্যাকাণ্ডের পরদিন যে মিছিল, প্রেসক্লাবের রাস্তায় অবস্থান, তাৎক্ষনিক প্রেস কনফারেন্স- সেসবের কোনটাতেই রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর নেতাদের কেউ সামনে ছিলো না … সনির ব্যাচমেটদের অনেকের মাঝে ছাত্র রাজনীতি বিরোধী অবস্থানটা প্রকট ছিল! আমরা ছাত্র ফ্রন্টের পক্ষ থেকে- ওদের সাথে খুব বেশি আর্গুও করতে যাইনি- তাদের আবেগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই সমস্তভাবেই সমর্থন দিয়ে গিয়েছিলাম। একদম পাশে থাকার চেষ্টা করছিলাম- তাতেই অনেকের সাথে সম্পর্কও তৈরি হচ্ছিলো … ! ছাত্রলীগের নেতাদের সামনে পেলে- ছাত্রলীগ-আওয়ামীলীগের কালার দিয়ে এই আন্দোলনকে ধ্বসে দেয়ার চেষ্টা করতে পারে- এই বিবেচনাতে আমরাও সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ব্যানারে সেই আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে চাচ্ছিলাম! তো, এই ছাত্র রাজনীতি বন্ধের যে দাবি- সেটার উপরে প্রথম আঘাতটা আসে- সেই ৯ জুন তারিখেই, যখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে- ক্যাম্পাস বন্ধ করে দেয়, হল ভ্যাকান্ট করে দেয়, যাতে এই যে হত্যার বিচার চেয়ে ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় রাস্তায় বৃষ্টিতে ভিজে মিছিল করছে- সেটা যাতে করতে না পারে! ফলে, ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করতে চাওয়া আন্দোলনকারীদের অনেকেই প্রথম ধাক্কাটা খায়, কেননা- তারা ছাত্র রাজনীতি বন্ধ চেয়েছে, মিছিল মিটিং আন্দোলন বন্ধ চায়নি …

তো, বুয়েট বন্ধের মধ্যেই- আমরা আন্দোলন কিভাবে এগিয়ে নেয়া যায়- সেই চেষ্টা করেছিলাম, সনির ব্যাচমেটদের (৯৯ ব্যাচ) অনেককেই পেলাম, আমাদের ব্যাচটাও (৯৮ ব্যাচ) ছিল খুব একটিভ। সেই বুয়েট বন্ধের মধ্যেও ছাত্র শিক্ষক অভিভাবক সংহতি সমাবেশ, প্রেসক্লাবে-শহীদ মিনারে মিছিল এরকম কিছু কর্মসূচিও নেয়া হয়েছিলো- আন্দোলনকে জিইয়ে রাখার জন্যে! এর মধ্যে- বুয়েটের তদন্ত কমিটি তৈরি হলো, ঐচ্ছিক সাক্ষীদের সাক্ষ্য দিতে যেমন বলা হলো- তেমনি আন্দোলনকারীদের অনেককেই ধরে ধরে চিঠি দিয়ে ডাকা হলো। আমরা গিয়ে বুঝলাম- একই তদন্ত কমিটির দুই লক্ষ- সনি হত্যাকাণ্ড আর ৮ জুন রাতে হলে যে বিশাল মিছিল হয়েছিল- সেই মিছিল থেকে খুনীদের রুম ভাঙ্গচুর। সনি হত্যাকাণ্ডে তিতুমির হলে যারা মুকি গ্রুপকে দেখেছে বলে সাক্ষ্য দিতে গিয়েছিলো- তাদেরকে নানানভাবে হুমকি ধামকি দেয়া, উদ্ভট প্রশ্ন করে দমিয়ে দেয়া- এসব যখন শুনছিলাম- তখনই আমরা বুঝতে পারছিলাম, বুয়েট কর্তৃপক্ষ কি করতে যাচ্ছে … । মুকি গ্রুপের কয়েকজনকে নামকাওয়াস্তে সাজা – নানা মেয়াদে বহিস্কার, স্থগিত বহিস্কার- মুকি বাদে কাউকেই আজীবন বহিস্কার না করা (মুকির অলরেডি পড়াশুনা শেষ) – এগুলার সাথে সাথেই আন্দোলনকারীদের অনেককে বিভিন্ন টার্মে বহিস্কার, স্থগিত বহিস্কার এবং ওয়ার্নিং দেয়া হলো আন্দোলন মিছিলে অংশ নেয়ার দায়ে (তাদের ভাষায় শৃংখলা ভঙ্গের দায়ে)! আন্দোলনকারীদের এই সাজাটার বড় অংশ এসে পড়েছিলো সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের উপরে। এরপরে ছিল- আমাদের ব্যাচে কয়েকটা ছাত্রদল করা পোলা ছিল- যারা ছিল এন্টি মুকি গ্রুপের এবং যারা ৮ জুন রাতের মিছিলে সক্রিয়ভাবে থেকে ছাত্রদলের খুনীদের বিরুদ্ধে শক্ত ভূমিকা নিয়েছিলো। আর, পরদিন অর্থাৎ ৯ জুন তারিখে প্রেসক্লাবে যে মিছিল- প্রেসকনফারেন্স- সেখানে অংশ নেয়াদের অনেককে দিয়েছিলো সতর্কতা। অনেকের বাপ-মাকে ডেকে নিয়ে শাসিয়েওছিল! এর ফলে, আন্দোলনকারী কয়েকজনকে অনেকটা সময়ে আমরা পাইনি ঠিকই, কিন্তু এতসবকিছুর পরে যেকটি ছেলেমেয়ে খুব ডিটারমিনড হয়ে আন্দোলনটা চালিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো- তাদের মধ্যে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবি নিয়ে কোনরকম কনফিউশন তো থাকেই নি- বরং ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করার আলাপটা যে আন্দোলন বন্ধেরই পায়তারা ভিন্ন কিছু না- সে ব্যাপারে একমত হতে পেরেছিলো।

এর মধ্যে- বুয়েট খোলার ঘোষণা এলো। খুনীদের বিরুদ্ধে নামকাওয়াস্তে শাস্তি- একই সাথে ছাত্র রাজনীতির নামে বিশৃংখলা সৃষ্টির দায়ে আন্দোলনকারীদেরও নানা মেয়াদে সাজা এবং একই সাথে- হলে, ক্যাম্পাসে অনির্দিষ্টকালের জন্যে মিছিল- মিটিং ধর্মঘট- এইসব নিষিদ্ধের ঘোষণা এলো! সেই শুরুর দিনে যে ছেলে বা মেয়েটি ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবি তুলেছিলো- সেও আসলে বুঝলো- ছাত্র রাজনীতি বন্ধ মানে- ছাত্রদল বন্ধ নয়, এর মধ্য দিয়ে হত্যার রাজনীতির বিরুদ্ধে যে বিপুল ক্ষোভ- তা যাতে দানা না বাধে সেই লক্ষেই ছাত্র আন্দোলন বন্ধ করে দেয়া! ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে দেয়া মানে- মুকি টগরদের রাজনীতিকে বন্ধ করে দেয়া না, বরং তাদেরকেই আবার বুয়েটে প্রবেশ করতে, মাথা তুলে দাঁড়ানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দেয়া!

জুলাই মাসের মাঝামাঝি দিকে এসে বুয়েটের একাডেমিক কাউন্সিল বুয়েটের ৬১ এর অধ্যাদেশ এর অযুহাত দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়- (১) ক্যাম্পাসে কোনরকম মিছিল মিটিং সভা সমাবেশ করা যাবে না, দেয়ালে চিকা মারা, পোস্টার সাটা কিছুই করা যাবে না। (২) কোন ছাত্রই ছাত্র সংসদ ও হল সংসদ বাদে কোন প্রকার রাজনৈতিক দলের বা তাদের ফ্রন্ট সংগঠনের সদস্য হতে পারবে না, তাদের কোনরকম কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারবে না, (৩) উদ্ভুত পরিস্থতিতে ছাত্র সংসদ ও হল সংসদ ভেঙ্গে দেয়া হলো, তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হলো এবং (৪) সকল ছাত্রকে সার্বক্ষণিক আইডি পরিধান করতে হবে ! মজার ব্যাপার হচ্ছে- এই পর্বে এসে আন্দোলনটা পুরো পালটে যায়! গঠিত হয়, সন্ত্রাসবিরোধী বুয়েট ছাত্র ঐক্য এবং এই ছাত্র ঐক্যের দাবিনামাতেই ছাত্র রাজনীতি বন্ধের বিরুদ্ধে পরিস্কার অবস্থান ব্যক্ত করা হয়! দাবিনামার ২ কি ৩ নাম্বারেই দাবি জানানো হয়- আন্দোলনকারীদের উপর অন্যায় শাস্তি সম্পূর্ণ তুলে নিতে হবে- অর্থাৎ আন্দোলন করার অপরাধে কাউকে সাজা দেয়া যাবে না; আর সম্ভবত ৬ নাম্বার দাবিতে যুক্ত হয়- অগণতান্ত্রিক অধ্যাদেশ বাতিল করতে হবে; অর্থাৎ যে অধ্যাদেশ বলে আন্দোলনকারীদের সাজা দেয়া হয়, যে অধ্যাদেশ বলে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের নামে ছাত্রদের প্রতিবাদের ভাষা কেড়ে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়- সেই অধ্যাদেশকেই ছুড়ে ফেলার ঘোষণা দিয়ে নতুন পর্বের আন্দোলন শুরু হয়! মনে আছে- সেই সময়ে প্রথম আলো সহ অনেক বুদ্ধিজীবী ছাত্র রাজনীতি বন্ধের তরিকা সামনে আনার চেষ্টা করেছিলো। জুনের শেষদিকে প্রথম আলোর আরিফুর বিশাল এক ফিচার করেঃ বুয়েটের শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই – খোদ সনির বাবামা’ ছাত্র রাজনীতি বন্ধ চায়, অন্তত বুয়েটের মত মেধাবীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, অন্তত সাময়িকভাবে হলেও- ছাত্র রাজনীতির রাহু গ্রাস থেকে মুক্তি চায় ইত্যাদি জানিয়ে- সমাধানও দেখিয়ে দেয়- বুয়েটে পাকিস্তান আমলে করা ৬১ এর অধ্যাদেশ! যদ্দুর মনে পড়ে- এইসব রিপোর্টের জন্যেই- সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্র ঐক্যের দাবিনামায় ৬১ এর অধ্যাদেশ বাতিলের দাবিটি বেশ শক্তভাবে জায়গা পেয়ে যায় …

দুই মাস ক্যাম্পাস বন্ধের পরে- ছাত্র রাজনীতি তথা সমস্ত আন্দোলন নিষিদ্ধ ঘোষণা দিয়ে বুয়েট খুললো! সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্র ঐক্য প্রথমদিন থেকেই- সেই বহিস্কারাদেশ, ছাত্রত্ব বাতিল- এইসব কিছুর হুমকি ধামকি উপেক্ষা করে প্রচণ্ড ভয়ের পরিবেশের মধ্যেই আন্দোলন চালিয়ে গেছে! হ্যাঁ- একদম শুরুর কয়দিনে- প্রচণ্ড ভয়ের কারণে- আন্দোলনকারীর সংখ্যা ছিল খুব কম! ১৫-২০ টা ছেলেমেয়ে মিছিল করেছে, ধর্মঘট ডেকে গেটে দাঁড়িয়েছে- গেটের সামনে শুয়ে পড়ে ক্লাস বন্ধ করার চেষ্টা করেছে- প্রশাসন, শিক্ষকরা এসে আন্দোলনকারীদের নামধাম লিখে নিয়ে গেছে- ভয় দেখিয়ে ছাত্রদের ক্লাসে নিয়ে গিয়েছে! এর মধ্য দিয়ে আন্দোলন চলেছে- দিনে দিনে অন্যরাও ভয়ের দেয়াল টপকে আন্দোলনে শামিল হয়েছে! ছাত্র রাজনীতি বন্ধ মানে যে- বোন হত্যার বিচার চাওয়া বন্ধ- সেইটা কেউই মানতে পারেনি বলেই- একসময় সেই ১৫-২০ জনের ছাত্র ঐক্য আবার হাজার হাজার ছাত্রের আন্দোলনে পরিণত হয়েছে … মিছিল-সমাবেশ, ধর্মঘট, সংহতি সমাবেশ, প্রতীক অনশন- আমরণ অনশন … বিভিন্ন ফেইজে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের সেই ঘোষণাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েই বুয়েটের ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলনকে টেনে নেয়ে গিয়েছে। একসময়- ছাত্রদল-শিবির আর পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে অনশনকারী-আন্দোলনকারীদের ক্যাম্পাস থেকে বের করে দিয়েছে, শহীদ মিনার, টিএসসি, শাহবাগ, মৎস্য ভবন পর্যন্ত তাড়িয়ে বেরিয়েছে- কোথাও বসতে দেয়নি, বুয়েট আবার অনির্দিষ্টকালের জন্যে বন্ধ করে দিয়ে- আন্দোলন থামাতে চেয়েছে!

শেষাবধি কিছুটা অর্থে আন্দোলন থামাতে পেরেওছিলো! কিন্তু, বুয়েট প্রশাসন- রাষ্ট্রযন্ত্র একটা মেসেজ খুব ভালোভাবেই পেয়েছিলো- এইভাবে এই আন্দোলনকে দমানো সম্ভব না! ফলে, শেষ পর্যন্ত মুকি- টগর সহ তিনজনের ফাঁসির রায় হয়েছিলো – যেই রায় বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম (এবং একমাত্র) রায়- যাতে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাকাণ্ডের বিচারকার্য সমাধা হয়ে সর্বোচ্চ রায় এসেছে (মৃত্যদণ্ডের রায় মাথায় নিয়া মুকি দেশান্তরি)! সনি হত্যাকাণ্ডের আগ পর্যন্ত বুয়েটে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা- মুকি গ্রুপের সেই খুনিরা – সায়হাম, শরীফ, ইকবাল … সহ কেউই কোনদিন বুয়েটে দিনের আলোতে ঢুকতে পারেনি …

লেখক পরিচিতি : সনি হত্যাকাণ্ডের পর আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র ফ্রন্ট নেতা।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)


এখানে শেয়ার বোতাম