মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৩
শীর্ষ সংবাদ

বুক রিভিয়্যু : ফাটল নদীর রক্ত

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 13
    Shares

বিপ্লব নন্দী::

মানুষের জীবন একটা গল্প। মানুষ যেদিন থেকে কথা বলতে শুরু করেছে সেদিন থেকেই গল্প বলা শুরু। আদিম গল্পগুলো ছিলো প্রকৃতি ও হিংস্র পশু’র বিপক্ষে মানুষের লড়াইয়ের গল্প। আর আধুনিক গল্পগুলো সবল নির্মম অত্যাচারী শোষক শাসক মানুষ কিংবা মানুষের তৈরি বিভিন্ন তন্ত্র-মতবাদ-প্রতিষ্ঠানের বিপক্ষে অত্যাচারিত নিগৃহীত শোষিত নিষ্পেষিত সর্বহারা মানুষের লড়াইয়ের গল্প। ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ-হাসি-কান্না-বিরহ-বিচ্ছেদ এই গল্পের বাইরে নয়। এখানে উভয় গল্পের মধ্যে মিল হল দুটোই কিন্তু জীবনের গল্প। এদুটোর মাঝখানে মানুষ কিছুদিন অলীক কল্পনার রাজ্যে বিচরণ করে রোমান্সধর্মী গল্পও বলেছে। কিন্তু বর্তমানে গল্প মানেই মানুষের গল্প। গল্প শুনতে মানুষ ভালোবাসে। এটি মানুষের চিরকালীন একটি আকাঙ্ক্ষা। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। আমিও গল্প পড়তে ও শুনতে ভালোবাসি।

সম্প্রতি পড়ে শেষ করলাম তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল গল্পকার সোহাগ পারভেজ এর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘ফাটল নদীর রক্ত’। মোট সাতটি গল্প আছে এ গল্পগ্রন্থে। গল্পের শিরোনামগুলো যথাক্রমে—কুকুর হইতে সাবধান, তেমন গৌরী হও, ফাটল নদীর রক্ত, মন পবনের নাও, সাফদারপুর জংশন, সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্র, বিজন সন্ধ্যাবেলা।

তার গল্পগুলো পড়ার পরে আমার যে ব্যক্তিগত অনুভূতি হয়েছে সে কথা বলার আগে আরেকটি বিষয় এখানে অবতারণা করতে চাই। সেটি হল, এই গল্প বলার উদ্দেশ্য কী? শিল্পের জন্য শিল্প (আর্ট ফর আর্টস সেইক) এবং জীবনের জন্য শিল্প (আর্ট ফর গুডস সেইক) এর মধ্যে কোনটি লেখকের অবলম্বন হওয়া উচিৎ? প্রথমত হচ্ছে লেখার জন্য লেখা। দ্বিতীয়ত হচ্ছে মহৎ জীবনবোধ, জীবনদর্শন, ও মানবসমাজের জন্য হিতকরী লেখা। দ্বিতীয়টিই আমাদের প্রয়োজন।

হাসান আজিজুল হক এর মতে, ‘সামাজিক দায়িত্ব সম্বন্ধে সচেতন হওয়া শিল্পীর ইচ্ছা অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না, শিল্পকর্মে নিয়োজিত হওয়ার এটি একটি প্রধান শর্ত’।

আমি মনে করি গল্প লেখক আছেন দু’প্রকারের। সচেতন এবং অসচেতন। সচেতন লেখক সমাজ বিনির্মাণে ও সামাজিক দায়বদ্ধতায় যুক্ত হন। এছাড়াও সচেতন লেখক সমাজ বিবর্তনের ধারা ও সূত্রগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণাসম্পন্ন এবং উদার-নির্মোহ-সচেতন-ইতিবাচক-বৈজ্ঞানিক-যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গী সম্পন্ন হন।

ব্যক্তিগত সম্পর্কের খাতিরে আমি জানি সোহাগ পারভেজ একজন সচেতন লেখক। একইসাথে তিনি পড়ুয়া এবং অনুসন্ধ্যানী লেখক। লিখতে বসার আগে নিজেকে তৈরি করার জন্য যতটুকু পড়াশুনা এবং বিষয়ভিত্তিক সুনির্দিষ্ট গবেষণা করা দরকার, তিনি তা করেন। পেশায় তিনি একজন সিভিল এঞ্জিনিয়ার কিন্তু একইসাথে তিনি গল্পেরও এঞ্জিনিয়ার। গল্পের কারিকুরি-মেরামতির কাজে হাত মকশো করার জন্য তিনি নিয়মিতই তার সমসাময়িক বন্ধু গল্পকারদের লেখালেখি সম্পাদনার কাজটি মনের আনন্দে করে যাচ্ছেন অনেকদিন ধরেই। একাজে তার জানাশুনা বিস্তর। এই যে জেনেশুনে প্রস্তুতি নিয়ে লেখার চেষ্টা, এই ব্যাপারটিকে আমি সাধুবাদ জানাই।

তার গল্পের প্লট ও চরিত্ররা আমাদের অতি কাছের, পরিচিত দেশ-কালের সীমানায় অবস্থিত। কিন্তু তার আবেদন সর্বজনীন। উপস্থাপন কৌশলে তার গল্পগুলো নিজস্বতা ও স্বকীয়তায় অনন্য। গভীর জীবনবোধ, অন্তর্দৃষ্টি, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী, যুক্তিবাদিতা, নিরপেক্ষতা ও নৈর্ব্যক্তিকতায় তার গল্পের বুনন অত্যন্ত সুগঠিত। তিনি তার সৃষ্ট চরিত্রগুলোর উপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেন না; বরং তার গল্পগুলো পড়তে পড়তে মনে হয় হ্যাঁ, বাস্তব জীবনে এমনটাই ত ঘটে, এটাই বাস্তব, এটাই সত্য। যেন জীবন থেকে নেয়া। ব্যক্তিগত ‘সুখদুঃখবিরহমিলনপূর্ণ মানবসংসারের’ অনুপুঙ্খ বিবরণ তার গল্পে ছায়াছবির মত এত ডিটেইলে চোখের সামনে ভেসে উঠে যে মাঝে মাঝে গল্প পড়ছি না ছবি দেখছি এ নিয়ে ভ্রম হয়। গল্পসূত্র এখানে আর বললাম না পাছে পাঠকেরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তবে ‘বিজন সন্ধ্যাবেলা’ গল্পটির কথা আলাদা করে বলতে হয়। অ্যালান টিউরিং এর সূত্র ধরে এলজিবিটিকিউ আন্দোলন সংক্রান্ত যে প্রসঙ্গটির অবতারণা করেছেন তাতে তার সমাজ সচেতনতা ও বিজ্ঞানমনস্কতার পরিচয় ফুটে উঠেছে। তাছাড়া ‘মন পবনের নাও’ গল্পটিও একটু অন্যরকম, খানিকটা আত্মজৈবনিক দিনলিপি গোছের। তার লেখার মূল শক্তি তার নান্দনিক বোধ, সামজিক মূল্যবোধ, মানবিকতা, সারল্য, ইতিবাচকতা, পরাবাস্তবতা, জাদুবাস্তবতা, ফ্রয়েডিজম, সমাজ সচেতনতা, ও উদার দৃষ্টিভঙ্গী।

কিন্তু এর পরও কথা থেকে যায়। মনুষ্যসমাজ নিয়ত দ্বন্দ্বমুখর। দ্বন্দ্ব ছাড়া বিকাশ হয় না। সমাজ বিকাশের ইতিহাসের ধারায় প্রাচীন দাস সমাজের নর্ম এবং মূল্যবোধ অনুযায়ী লিখিত ঐসময়কালের সকল লেখকের সাহিত্য চিরায়ত বা কালজয়ী হয়নি, দু’একজন ছাড়া। একই কথা খাটে পরবর্তী সমাজগুলোর বেলায়ও। উদাহরণ স্বরূপ মধ্যযুগীয় সামন্তসমাজের কথা বলা যায়। ঐ সমাজের নর্ম ও মূল্যবোধ অনুযায়ী লিখিত সব লেখা কিন্তু চিরায়ত বা কালজয়ী হয়নি সঙ্গতভাবেই। কারণ পূর্ববর্তী সমাজের মূল্যবোধ তার পরবর্তী সমাজের জন্য পশ্চাদপদ ও অনুপযোগী হয়ে পড়ে। প্রাচীন দাসসমাজের উপযুক্ততা নিয়ে যদি এখন কোন সাহিত্য রচিত হয় সেটা হবে বেমানান এবং অগ্রহণযোগ্য। অথচ ঐ যুগের বিখ্যাত দার্শনিকগণ একে নির্দ্বিধায় অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে গেছেন, যা ঐ সমাজের জন্য স্বাভাবিক ছিল। এখন আমরা বাস করছি ঔপনিবেশিক উত্তর রাষ্ট্রব্যবস্থায়। যেখানে সামন্তবাদের অবশেষও খানিকটা রয়ে গেছে আবার ধীরে ধীরে পুঁজিতন্ত্রেরও বিকাশ ঘটছে। রাষ্ট্রীয়ভাবেও বিদেশী পুঁজিকে স্বাগত জানানো হচ্ছে। এমতাবস্থায় এই সমাজের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য। এই বিষয়টিকে হাইলাইট করে এখন বিস্তর লেখালেখি হচ্ছে। হোক, এতে কোন সমস্যা নেই। কেননা এর মাধ্যমে এই সমাজের বাস্তব বর্তমান চিত্রটি ফুটে উঠছে এবং সামাজিক দলিল হিসেবে এর মূল্য অপরিসীম। ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে আমরা দেখতে পাব যে বর্তমান সমাজের নর্ম ও মূল্যবোধগুলো চিরকালীন নয়। সভ্যতাকে পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। দ্বান্দ্বিক নিয়মে আমরা আমাদের চেয়ে উন্নত সমাজতান্ত্রিক সমাজের দিকেই যাত্রা করেছি। ‘সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদের চেয়ে অগ্রসর ও স্বাচ্ছন্দ্য ব্যবস্থাপনা। অতএব ভবিষ্যত পুঁজিবাদের নয়, সমাজতন্ত্রেরই।’ দূরদৃষ্টি সম্পন্ন সমাজ সচেতন সাহিত্য সাধকগণ সেই সাহিত্যই রচনা করবেন যা চিরায়ত এবং কালজয়ী হবে।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বলেন—‘সাহিত্য হতে গেলে যেমন সংকেত ও রূপকের আশ্রয় নিতে হয় তেমনি প্রয়োজন পড়ে এর হিতবাদী ভূমিকার প্রতি দায়বদ্ধতা। মানুষের জন্য যা অকল্যাণকর, রসগ্রাহী হলেও তা সাহিত্য নয়। ক্ষতিকারক রচনা যারা লেখেন তারা সাহিত্যিক নন, সমাজবিরোধী দুর্বৃত্তমাত্র। প্রশ্ন উঠতে পারে সাহিত্যে হিতকরী কী? হিতকরী শুধু তা-ই যা প্রগতির সহায়ক, সমাজকে যা এগিয়ে নিয়ে যায়। লেখকের কাজ হলো তিনি যে সমাজের মানুষ সেই সমাজকে তার পরবর্তী ধাপে নিয়ে যেতে কলম চালনা করা। একাজ করতে গিয়ে তিনি বিদ্যমান সমাজের সকল অসঙ্গতি পাঠকের কাছে তুলে ধরবেন এবং অসঙ্গতি নিরসনের সম্ভাব্য উপায়গুলিও নির্দেশ করবেন। একাজ যিনি পারেন এবং সজ্ঞানে করেন তিনি হলেন সাহিত্যসাধক।’

আমরা সেই সাহিত্য সাধক চাই। সোহাগ পারভেজ এর লেখায় সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, ইনক্লুসিভ, ও সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গী যুক্ত হলে চিরায়ত সাহিত্য সৃষ্টির পথ উন্মুক্ত হবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

‘ফাটল নদীর রক্ত’ গল্পগ্রন্থে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু মুদ্রণপ্রমাদ এবং বানান ও বাক্যগঠনগত কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। পরবর্তী সংস্করণে সেদিকে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। গল্পকার সোহাগ পারভেজ এর জন্য হার্দিক শুভকামনা।

লেখক: সোহাগ পারভেজ
জানরা: ছোটগল্প
প্রকাশক: চৈতন্য
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২১

 


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 13
    Shares