সোমবার, নভেম্বর ৩০

বিশ্বের প্রথম নারী ভাষাশহীদ ‘কমলা ভট্টাচার্য’

এখানে শেয়ার বোতাম

অধিকার ডেস্ক:: পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম নারী ভাষাশহীদ হচ্ছেন কমলা ভট্টাচার্য। বাংলাকে আসাম রাজ্যের সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে ১৯৬১ সালের ১৯শে মে আসামের শিলচরে শহীদ হন কমলা ভট্টাচার্য। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। শহীদ কমলা ভট্টাচার্য বাংলা ভাষার জন্য প্রাণদাতা একমাত্র নারী।

১৯শে মে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত দিন। আমাদের মহান একুশে ফেব্রুয়ারির মতো বরাক উপত্যকার বাংলাভাষাভাষীদেরও একটি মহান দিন ‘ঊনিশে মে’। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে যেভাবে ১৯৫২ সালের ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ ঢাকার রাজপথ ‘রক্তে-রঞ্জিত’ হয়েছিল; তেমনিভাবে বাংলাকে আসাম রাজ্যের অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দান এবং বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে ১৯৬১ সালের ‘ঊনিশে মে’ আসামের বরাক উপত্যকার শিলচর শহরে ‘রক্ত-গঙ্গা’ প্রবাহিত হয়েছিল। সেদিন শুধু কমলাই নন, আরো ১০জন শহীদ হন আসাম রাইফেল্‌সের গুলিতে। তাঁদের আত্মদান বৃথা যায়নি। কমলাসহ সেই ১১ জন শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাকে আসামের সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় আসাম সরকার। সেদিনের ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

কমলা ভট্টাচার্যের জন্ম ১৯৪৫ সালে, বর্তমান সিলেট (তৎকালীন শ্রীহট্ট) জেলায়। তাঁর পিতার নাম রামরমণ ভট্টাচার্য এবং মাতার নাম সুপ্রবাসিনী দেবী। সাত ভাই-বোনের মধ্যে কমলা ছিলেন পঞ্চম। আর চার বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। শৈশবেই তাঁর পিতৃবিয়োগ হয়। যে কারণে আর্থিক অনটনের মধ্য দিয়ে দিন কাটতে থাকে কমলার পরিবারের।

অবিভক্ত ভারতবর্ষে ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ সরকার ব্রম্মপুত্র উপত্যকা ও পার্বত্য এলাকার কিছু অঞ্চল নিয়ে পৃথক একটি প্রদেশ- ‘আসাম’ প্রদেশ গঠন করে। শ্রীহট্র বা সিলেট ও কাছাড় জেলাকে নবগঠিত আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আসাম প্রদেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে সিলেট ও কাছাড় জেলার ভাষাসহ সাংস্কৃতিক নানা ভিন্নতা ও স্বাতন্ত্র্য রয়েছে। বর্তমান সিলেট বিভাগ সুরমা উপত্যকা আর আসাম প্রদেশের বর্তমান করিমগঞ্জ, কাছাড় ও হালিয়াকান্দি জেলা নিয়ে যে ভূ-ভাগ গঠিত, সেটাই বরাক উপত্যকা নামে পরিচিত। দেশবিভাগের সময় ১৯৪৭ সালের ৭ জুলাই বৃহত্তর সিলেটে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত এক গণভোটের মাধ্যমে সুরমা উপত্যকা পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হয়। কিন্তু বরাক উপত্যকা থেকে যায় আসামে। কমলারা পাকিস্তানেই থেকে যান। কিন্তু ১৯৫০ সালে পাকিস্তানজুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে তার রেশ সিলেটেও এসে পড়ে। কমলার পরিবার তখন আসামে চলে যেতে বাধ্য হন। তারা কাছাড় জেলার শিলচরে এসে আশ্রয় নেন। মাত্র ৫ বছর বয়সে উদ্বাস্তু হয়ে শিলচরে পা রেখেছিলেন কমলা। সেখানে কমলারা থাকতেন শিলচর পাবলিক স্কুল রোডের একটি ভাড়া বাড়ীতে। কমলার বড়দিদি বেণু নার্সের চাকরি পেয়ে শিমূলগুড়ি চলে যান প্রশিক্ষণ নিতে। কমলার মেজদিদি প্রতিভা ছিলেন শিক্ষক। কমলার পরিবার তখন তাঁর মেজদিদির আয়ের উপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল ছিল।

শৈশবে কমলা ভর্তি হন শিলচরের ছোটেলাল শেঠ ইন্সস্টিটিউটে। কিন্তু স্কুলের পাঠ্যপুস্তক কেনার ক্ষমতা ছিল না কমলার। তিনি তাঁর সহপাঠীদের কাছ থেকে পাঠ্যপুস্তক ধার করে তার বিষয়বস্তু খাতায় টুকে নিতেন। ১৯৬১ সালে কমলা ম্যাট্রিক পরিক্ষায় অংশ নেন। তার পূর্বে কমলা ভট্টাচার্য যখন দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত, সেই সময়ে (১৯৬০ সালের ২৪ অক্টোবর) শুধু অসমীয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব আসামের বিধানসভায় গৃহীত হলে ক্ষোভ দানা বাঁধে বাংলাভাষীদের মধ্যে। অথচ এর পূর্বে আসামে অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলাভাষার প্রচলন ছিল। ১৯৬০ সালের ১০ অক্টোবর শুধু অসমীয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বিমলা প্রসাদ চালিহা রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রী হিসেবে আসাম বিধানসভায় নতুন আইন ‘রাজ্য ভাষা বিল’ উত্থাপন করেন। আসাম সরকারের এমন সিদ্ধান্তে আসামের বরাক উপত্যকায় গণআন্দোলন শুরু হয়। সংখ্যালঘু মানুষদের উপর জোর করে অসমীয়া ভাষা চাপিয়ে দেবার প্রতিবাদে গর্জে উঠেন বাংলাভাষীরা। প্রথমে তা রূপ নেয় অহিংস আন্দোলনে, পরে সহিংস। অসমীয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন ক্রমেই তীব্র আকার ধারন করতে থাকে।

কমলার ম্যাট্রিক পরীক্ষা শেষ হয় ১৮ মে। ভাষা আন্দোলনের চুড়ান্ত পর্বে ১৯৬১ সালের ১৯ মে বরাক উপত্যকায় সকাল-সন্ধ্যা সর্বাত্মক ধর্মঘট পালন করার ডাক দেওয়া হয়। সেদিন ভোর থেকেই হাজার হাজার ছাত্র-জনতা বেরিয়ে আসে রাস্তায়। দোকানপাট যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। শিলচর রেল স্টেশনেও বাংলাভাষার দাবিতে পিকেটিং চলছিল। অভাব-অনটনে বড় হওয়া কমলাও তখন ভীষণ লড়াকু। সরকারের ভাষানীতির বিরুদ্ধে তিনিও সোচ্চার হয়ে উঠেন। এমনিতেই দেশ ছেড়ে পরবাসে তারা উদ্বাস্তু, এখন মায়ের ভাষা বাংলাভাষাটাও জোর করে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে- এই আকুতি গভীরভাবে নাড়া দেয় কমলাকে। এ অনুভূতি থেকেই ১৯ মে সকালে পিকেটিং-এ যাওয়ার জন্য কমলা প্রস্তুতি নেন। সকালে স্নান সেরে মেজদিদি প্রতিভার স্কুলে যাওয়ার জন্য রাখা শাড়ীটা পরে নেন কমলা। মেজদিদি পিকেটিং-এ যেতে বারণ করলেও শোনেননি কমলা। এমন সময় ২০-২৫ জনের মেয়েদের একটি দল কমলাদের বাড়ীতে আসে কমলাকে নেওয়ার জন্য। কমলার মা উদ্বেগ প্রকাশ করলে তারা কমলার মাকে বুঝিয়ে রাজী করান। কমলার মা কমলাকে এক টুকরো কাপড় দেন কাঁদানে গ্যাস থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য। যাবার আগে কিছু খেয়ে যেতে চেয়েছি্লেন কমলা, কিন্তু ঘরে কোনো খাবার না থাকায় খালি পেটেই বের হন কমলা। কমলার সাথে বেরিয়ে পড়ে কমলার ১১ বছর বয়সী ছোট বোন মঙ্গলা, ছোট ভাই বকুল ও বড় দিদির ছেলে বাপ্পা। দুপুরবেলা কমলার মা দুশ্চিন্তা করতে করতে নিজেই গিয়ে উপস্থিত হন রেল স্টেশনে। মাকে দেখতে পেয়েই কমলা ছুটে আসেন। মায়ের সমস্ত দুশ্চিন্তা নিবারণ করে মাকে বাড়ী পাঠিয়ে দেন কমলা।

সেদিন সকালের দিকে পিকেটিং কর্মসূচি চলছিল শান্তিপূর্ণভাবেই। শিলচর রেল স্টেশনেও শান্তিপূর্ণভাবে পিকেটিং চলছিল। দুপুরের দিকে আন্দোলনের ব্যাপকতায় দিশেহারা হয়ে পড়ে রাজ্য সরকার। তখন নিরাপত্তারক্ষায় নিয়োজিত আসাম রাইফেল্‌সের একটি ব্যাটালিয়ন ধীরে ধীরে রেল স্টেশন এলাকা ঘিরে ফেলতে থাকে। বেলা আড়াইটার দিকে বিনা প্ররোচনায় তারা আন্দোলনকারীদের নির্মমভাবে লাঠি ও বন্দুকের কুঁদো দিয়ে পেটাতে শুরু করে। এলোপাথাড়ি লাঠিচার্জে অবস্থানকারী জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। কমলার ছোটবোন মঙ্গলা পুলিশের লাঠির আঘাতে মাটিতে পড়ে গিয়ে সাহায্যের জন্য কমলার উদ্দেশ্যে চিত্কার করতে থাকেন। ইতোমধ্যে আসাম রাইফেল্‌সবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া জনতার উপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। মঙ্গলাকে বাঁচাতে কমলা ছুটে গেলে একটি গুলি চোখ ভেদ করে তাঁর মাথা ফুঁড়ে বেরিয়ে যায়। কমলা ভট্টাচার্য শহীদের মৃত্যু বরণ করে নেন। ষোল বছর বয়সী কমলা ছাড়া আরও দশ জন ভাষাবিপ্লবী ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। সেদিন পুলিশের গুলিতে শহীদ হন- কমলা ভট্টাচার্য, হিতেশ বিশ্বাস, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, তরণী দেবনাথ, সত্যেন্দ্র দেব, সুনীল সরকার, কানাইলাল নিয়োগী, সুকোমল পুরকায়স্থ, বীরেন্দ্র সূত্রধর, কুমুদরঞ্জন দাস ও শচীন্দ্র পাল। আহত হন অর্ধশতাধিক। মঙ্গলাকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এক মাস পরে তার জ্ঞান ফিরলেও তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে বাকি জীবনটা কাটান। রাজ্য সরকার শেষ পর্যন্ত পূর্বসিদ্ধান্ত বাতিল করে বাংলাকে আসামের ২য় রাজ্যভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। এছাড়াও গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পাঠ্যক্রম চালু হয়। জনগণের দ্রোহ ও দাবিকে রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো না কোনো একসময় স্বীকার করে নিতেই হয়— এটাই ইতিহাস।

কমলা ভট্টাচার্যের স্বপ্ন ছিল স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পড়ালেখা করে একটা চাকরি নিয়ে মায়ের দুঃখ ঘুচাবেন। চাকরি যদিও করা হয়নি কমলার; কিন্তু ম্যাট্রিক পরীক্ষায় তিনি ঠিকই উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।

ভাষা আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০১১ সালে ছোটেলাল শেঠ ইন্সস্টিটিউট প্রাঙ্গণে শহীদ কমলা ভট্টাচার্যের একটি আবক্ষ ব্রোঞ্জের মূর্তি স্থাপন করা হয়। শিলচরের পাবলিক স্কুলের গা ঘেষে চলে যাওয়া সড়কটির নামকরণ করা হয়েছে ‘কমলা ভট্টাচার্য সড়ক’। এই সড়কের পাশেই ভাড়া থাকতেন উদ্বাস্তু কমলার পরিবার। এছাড়াও শিলচর রেল স্টেশনে কমলাসহ ১১ জন শহীদের আবক্ষ মূর্তিসহ ব্রোঞ্জ এর একটি ‘ভাষা শহীদ স্মৃতিসৌধ’ স্থাপন করা হয়েছে। শিলচর রেল স্টেশনকেও ‘ভাষা শহীদ স্টেশন’ হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে। ]

(কমলা ভট্টাচার্য: ১৯৪৫ — ১৯ মে ১৯৬১)


এখানে শেয়ার বোতাম