বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ২৮

বাজেট, করোনা ও ব্যাংক খাত

এখানে শেয়ার বোতাম

রাজেকুজ্জামান রতন ::


করোনার আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে সব হিসেব নিকেশ এরকম কথা এখন বলছেন অনেকেই। কিন্তু করোনাতেও থামছে না ক্ষমতাবানদের দুর্নীতি, লুণ্ঠন আর ব্যাংক ডাকাতি। করোনা এবং আম্পান দুর্যোগকে ছাপিয়ে অর্থনীতির ক্ষেত্রে যে ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় বারেবারে আঘাত হেনে যাচ্ছে তার সর্বশেষ আঘাতের খবর এসেছে পত্রিকায়। ৫০০ কোটি টাকা ঋণ চেয়ে না পাওয়ায় ব্যাঙ্কের এম ডি ও অতিরিক্ত এম ডি কে অস্ত্রের মুখে ধরে আনা, গুলি করে জন্মের মত খোঁড়া করে দেয়ার হুমকি, মারধর, বিদেশী নিরাপত্তা কর্মী দিয়ে টর্চার সেলে নির্যাতনের ভয় দেখানো, সামান্য কিছু মারধরের ঘটনাও ঘটেছে এসবের আগে এবং এরপর সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেয়ার ঘটনা প্রায় ২০ দিন পরে প্রকাশিত হয়েছে। সম্ভবত মিটমাট করার সমস্ত রকম চেষ্টা করা হয়েছিল কারণ দুটোই বড় অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। এমনি এমনি তাঁরা বড় হয় নি। অনেক কালো দাগ আছে তাদের কর্মকাণ্ডে এবং তাদের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারও ছোট নয়। ব্যাংক মামলা করতে বাধ্য হয়েছে আর দেশবাসী জানতে পেরেছে কি হয় বড়দের(!) মধ্যে। কিভাবে সাধারণ মানুষের টাকা এই সব তথাকথিত শিল্পপতিদের পকেটে চলে যায় তার দৃষ্টান্ত এটা।

১৯৭২ সালের ১৯ জুন প্রকাশ্য দিবালোকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ জনতা ব্যাংক শাখায় ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল। সেটাই ছিল বাংলাদেশের প্রথম ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা। ডাকাতি বন্ধ হয় নাই, পদ্ধতি পালটে গেছে মাত্র। গত ২০১৮ সালের ৯ জুন সংবাদ সম্মেলন করে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) তৎকালীন সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপিদের ব্যাংক ডাকাত বলে অভিহিত করে শাস্তি চেয়েছিলেন। সেই সূত্র ধরে বলা যায়, বাংলাদেশের ডাকাতির পরিমাণ জানা গিয়েছিল সরকারি হিসাবেই ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা।

ব্যাংকের মালিকরাই এখন বড় ঋণ গ্রহীতা। দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১২ লাখ কোটি টাকা তার প্রায় ১৫ শতাংশই রয়েছে বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালকদের হাতে। টাকার অঙ্কে এ ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৭৩ হাজার ২৩১ কোটি। ব্যাংকের পরিচালকেরা তাঁদের নিজ ব্যাংকের পাশাপাশি অন্যান্য ব্যাংক থেকে এসব ঋণ নিয়েছেন। এর মধ্যে দেশের ২৫টি ব্যাংকের পরিচালকেরা তাঁদের নিজেদের ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। আর অন্যান্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৭১ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা।সংসদে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উপস্থাপিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব তথ্য জানিয়েছিলেন।

অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বলে আসছেন, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ আর বাড়বে না। কয়েকবারই এ কথা বলেছেন তিনি। কিন্তু বাস্তবে ঘটছে উল্টোটা। যেমন ২০১৮ সাল শেষে যেখানে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা, সেখানে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৯ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২২ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা। যদিও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও অনেক বেশি। বিশ্বব্যাংকের ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে জানা গিয়েছে, ২০১৯ সালের প্রাক্কলিত হিসাব অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশেই খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১১ দশমিক ৪ শতাংশ।

অর্থমন্ত্রী সংসদে উত্থাপিত এক প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছিলেন, ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণ ছিল ৩১ হাজার ২৮ কোটি টাকা, এর মধ্যে খেলাপি ছিল ৯ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা। ২০০৮ সাল শেষে ঋণ বেড়ে হয় ২ লাখ ৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা, এর মধ্যে খেলাপি ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে সেপ্টেম্বরে ঋণ বেড়ে হয় ৯ লাখ ৬৯ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা। আর খেলাপি ঋণ বেড়ে হয় ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। এই হিসাব অনুযায়ী ২০০৮ সাল থেকে ২০১৯, খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫ গুণের বেশি।

সংসদে অর্থমন্ত্রী ঋণ খেলাপিদের একটি তালিকা দিয়েছিলেন। সে তালিকা অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ ঋণখেলাপি গ্রাহক অ্যাননটেক্স, এরপরই ক্রিসেন্ট গ্রুপ। এ প্রতিষ্ঠান দুটি রাষ্ট্রমালিকানাধীন জনতা ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছেন। দুটো প্রতিষ্ঠানই ঋণের টাকা বিদেশে পাচার করেছে, কিন্তু ব্যাংকের ঋণ শোধ করেনি। অ্যাননটেক্সের মালিক ইউনুছ বাদল বর্তমানে দেশে নেই, আর ক্রিসেন্টের মালিক এম এ কাদের কারাগারে। তবে ক্রিসেন্টের আরেক মালিক চলচ্চিত্র প্রযোজক আবদুল আজিজ রয়েছেন বহাল তবিয়তে।

এ ছাড়া খেলাপির শীর্ষ তালিকায় আরও রয়েছে বিল্ডট্রেড গ্রুপ ও চ্যানেল নাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনায়েতুর রহমান। তাঁর কাছে ব্যাংকগুলোর পাওনা প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। স্বাস্থ্য খাতের আলোচিত ব্যবসায়ী মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ, নর্থ বেঙ্গল পোলট্রিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। এ দুই গ্রাহকই নামে বেনামে বেসরকারি খাতের এবি ব্যাংক থেকে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছেন। আইএমএফ তাদের রিপোর্টে যেমনটা বলেছে, ‘বাংলাদেশে প্রভাবশালী, ওপর মহলে ভালো যোগাযোগ আছে এবং ধনী—এমন কিছু ব্যবসায়ী ঋণ ফেরত দেওয়ার কোনো তাগিদই অনুভব করেন না। এমনকি আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও এখন নিচ্ছেন প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান এসব ঋণগ্রাহক।’ এ কথার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অনাবশ্যক।
প্রশ্ন আসতে পারে এত বড় বড় ব্যবসায়ীরা কেন খেলাপি হচ্ছেন? গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে এত বড় বড় ব্যবসায়ীর উত্থান ঘটেছে যা রীতিমত বিশ্বের বিস্ময়। দ্রুত ধনী হওয়ার জন্য বাংলাদেশ নাকি এখন স্বর্গের মত। এমন দেশ কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। দ্রুত গতির ধনীর পাশাপাশি দরিদ্রতম মানুষগুলোকেও খুঁজে পাওয়া যাবে এখানে। যাই হোক এসব কথায় কাজ নেই। আমরা প্রসঙ্গে আসি, ব্যবসায় উত্থান পতন থাকেই ফলে কেউ কেউ অনিচ্ছাকৃতভাবে(!) খেলাপি হচ্ছেন, আর বেশির ভাগই স্বভাবের কারণে খেলাপি হচ্ছেন। এই স্বভাব যখন অভ্যাসে পরিণত হয় তখন তা বিপজ্জনক। কিন্তু এই বদ অভ্যাস বদলানোর জন্য সরকারের তরফ থেকে কোনো আইনি উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। বরং ২ শতাংশ এককালীন কিস্তি দিয়ে খেলাপি ঋণ পরিশোধ করার যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তাতে ফল উল্টো হয়েছে, অভ্যাস প্রশ্রয় পেয়েছে। এরা খুশি হয়ে ভাবছে — আরে ! পথ তো আছে। নিয়মিতভাবে এ ধরনের সুযোগ পাওয়া যাবে। যদি তাদের নতুন ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠিন শর্ত থাকত, তাহলে হয়তো কিছুটা কাজ হতো। কিন্তু কঠিন শর্ত তো দুরের কথা, এ ধরনের খেলাপিদের অনেকেই আবার নতুন ঋণ পেয়েছেন। ফলে ঋণখেলাপিদের আচরণগত পরিবর্তনের উদ্যোগ বা অগ্রগতি চোখে পড়ছে না। খেলাপি ঋণ কমাতে হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের সংস্কার লাগবে। কে করবে সেটা? প্রশ্রয় দিয়ে হৃদয় পরিবর্তন আশা করা কল্পনায় সম্ভব হলে হতেও পারে কিন্তু টাকা পয়সার বেলায় যে তা হয় না, এতদিনে না বুঝলে আর কবে সে বুঝ আসবে?

এমনিতে অনেক দিন ধরেই দেশের ব্যাংকিং খাত ভঙ্গুর, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি দুর্বল, খেলাপি ঋণ বিপজ্জনক মাত্রায়। সুতরাং একদিকে খেলাপি ঋণ কমানোর হুঙ্কার, অন্যদিকে ঋণখেলাপিদের ক্রমাগত সুবিধা দিয়ে যাওয়ার নীতি অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে ক্রমাগত জটিল করে তুলছে।
ঋণ করলে আত্মার স্বাধীনতা নষ্ট হয় এই ধরণের নীতি কথা আমরা পড়েছি। এটা হয়তো সাধারণ মানুষের জন্য প্রযোজ্য। সমাজে কিন্তু যত বড় ঋণ গ্রহীতা তত বেশি দাপট। ঋণ সরকারও নেয়। গত অর্থ বছরে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেবার কথা ছিল ৪৭ হাজার কোটি টাকা কিন্তু সরকার তা নিয়ে নিয়েছিল প্রথম ৫ মাসেই। এরপর এলো করোনার আঘাত। এ অজুহাতে ঋণ আরও বেড়েছে। বড় ঋণ খেলাপিরা জনগণের টাকা নিজের টাকা মনে করে শোধ দেয়ার তাগিদ তো অনুভব করেই না বরং পাচার করে বলে দৃষ্টান্ত আছে। আবার সরকার ব্যাংক থেকে যে ঋণ নেয় তা নিয়ে কি করে তার জবাবদিহিতা নেই।

এই পরিস্থিতির মধ্যে বাজেট আসছে। প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ কোটি টাকার বাজেট হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাজস্ব আয় সাড়ে তিন লক্ষ কোটি টাকার মত হবে। এই টাকার প্রায় পুরোটাই আসবে সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা থেকে। বাংলাদেশের বড় শিল্পপতি বলে যারা পরিচিত তাঁরা কিন্তু কেউ বৃহৎ করদাতা নন। তবে তাঁরা বৃহৎ ঋণ খেলাপি বটে। অর্থনৈতিক অবস্থার দোহাই দিয়ে সরকারের আয় বাড়ানোর জন্য ট্যাক্সের আওতা বাড়ানো হবে। রাজস্ব আয় বাড়ানো হবে আবার খেলাপি ঋণও বাড়বে। ফলে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গবেষণা, শ্রমজীবীদের রেশন, আবাসন, শিশুদের বিকাশ আর বৃদ্ধদের সুরক্ষার জন্য বরাদ্দে টান পড়বে। ভ্যাটের নামে সকল মানুষ ট্যাক্সের জালে আবদ্ধ হবেন আর বড় রুই কাতলা যেমন জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে যায় তেমনি বড় ব্যবসায়ীরাও বেরিয়ে যাবেন। আর আমরা শুনতে থাকবো, টাকা কই যে বরাদ্দ করবো? ছোট বেলায় শেখা সেই পাটিগণিতের অংক কি আজীবন করতে হবে? একটি চৌবাচ্চার একমুখ দিয়ে মিনিটে ১০ গ্যালন পানি প্রবেশ করালে এবং অন্য মুখ দিয়ে মিনিটে ১০ গ্যালন পানি বের করে দিলে চৌবাচ্চাটি কতক্ষনে পূর্ণ হবে? চৌবাচ্চা যত বড় করে বানানো হোক না কেন, এই নিয়মে পানি আসা যাওয়া করলে অংক করা চলতেই থাকবে কিন্তু চৌবাচ্চায় পানি পাওয়া যাবে না।

লেখক : বাসদের কেন্দ্রীয় নেতা ও সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সভাপতি


এখানে শেয়ার বোতাম