সোমবার, মার্চ ৮
শীর্ষ সংবাদ

বহির্বিশ্বে যে ইমেজ তার সাথে গৃহকর্মী পাঠানো বেমানান

এখানে শেয়ার বোতাম

রাশেদা রওনক খান ::

মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে এই মুহূর্তে বহির্বিশ্বে আমাদের দেশের যে ইমেজ, তার সাথে বাংলাদেশী নারীদের গৃহকর্মী বা দাসী হিসেবে সৌদি আরব গমনের বিষয়টি খুবই বেমানান ও একইসাথে অসম্মানের।

আমাদের বিউটি, নাজমা জেসমিন, সুমি- তাদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে আমাদের দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরছে, অথচ আমরা জেনেও না জানার ভান করে আছি যে, এই অর্থ উপার্জন করতে তাদের কতটা নির্যাতন, অবহেলা ও নিপীড়নের শিকার হতে হয়? এই নির্যাতন নিপীড়নের সাথে না আছে দেশের সম্মান জড়িত না আছে ব্যক্তি মানুষের মান ইজ্জত! তবে কেন এই পথে যাওয়া? এর কোন সহজ সরল উত্তর নেই| আমাদের যা আছে , যতটুকু আছে সেই দিয়ে যদি আমরা আমাদের দেশেই চেষ্টা করি আত্মকর্মসংস্থানের, তাহলে কি অনেক বড় চাওয়া হয়ে যাবে? আমাদের গ্রামগুলোতে এমনকি শহরে মানুষ কেবল বিদেশ পাড়ি দিতে চায় শ্রমিক হিসেবে, আমরা এমন এক জাতি যে প্লেনের চাকায় করেও বিদেশ পাড়ি দিতে চাই কেবল সংসারের অন্য সদস্যদের মুখে হাসি ফুটাতে….কিন্তু এই অমানবিক শ্রম, অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করে যে টাকা উপার্জন করা যায়, তার চেয়ে অনেক কম কষ্ট করেও কিন্তু আমরা আমাদের দেশে থেকে, নিজের গ্রামে থেকে, নিজের পরিবারের সাথে থেকে উপার্জন করতে পারি, দরকার কিছু উদ্ভাবনী চিন্তা, কাজ করার সুযোগ ও পুঁজি। এই তিনটা যদি আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ আমাদের দিতে পারে অনেকটাই এই সমস্যা সমাধান হবে। সমাজের এগিয়ে থাকা মানুষগুলো যদি পিছিয়ে থাকাদের একটু সাহায্য করে, তাহলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে পারে, অন্তত বিদেশ পাড়ি দিয়ে এতোটা অমানবিক নির্যাতন ও কষ্ট সহ্য করতে হবেনা আমাদের মেয়েদের|

তার মানে আমি বলছি না, মেয়েরা চাইলে কাজ করতে বিদেশ যাবেনা, অবশ্যই বিদেশে যাবে। কিন্তু গৃহকর্মী হিসেবে নয়, বরং দক্ষ শ্রমিক হয়ে যেমন নার্স, কেয়ারগিভার, পোষাকশ্রমিক বা অন্য যে কোন পেশায়। এই জন্য রাষ্ট্রকে বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ শ্রমিক হিসেবে গড়ে তোলা এবং পাঠানো’র ব্যাপারে দায়িত্বশীল ও সতর্ক হতে হবে।

আরেকটি বিষয়, আমাদের দেশ যেখানে মধ্য আয়ের দেশ হতে যাচ্ছে সেই দেশ থেকে আমরা কেন আমাদের মেয়েদের গৃহকর্মী বা দাসী হিসেবে পাঠাবো??? সেটা আমাদের জন্য সম্মান জনক নয়, আমাদের দেশের এখন বহির্বিশ্বে যে ইমেজ তার সাথে গৃহকর্মী বা দাসী পাঠানোর বিষয়টি খুবই বেমানান। আমাদের অর্থনীতির ভাগ্যলক্ষীরা যেভাবে প্রতিনিয়ত মধ্যপ্রাচ্যে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তার জন্য এখন রাষ্ট্রকেও নতুন করে ভাবতে হবে। বহির্বিশ্বে আমাদের সম্মান ও মর্যাদাও জড়িত। বুঝলাম, অনেকেই বলবেন যারা যাচ্ছেন নারী শ্রমিক, তার মাঝে কম হলেও ৯০ শতাংশ ফেরত আসছেনা (যদিও ৯৯ শতাংশ ফিরছেন না বলে দাবী অনেকের), কিন্তু ১০ শতাংশের দায় আমাদের নিতে হবেনা? আমরা আমাদের এক শতাংশকেও কেন নির্যাতনের শিকার হতে দেব? আমরা অর্থনীতিতে অগ্রসর হচ্ছি কিন্তু এর জন্য যদি অনেক বেশি আমাদের আত্মত্যাগ করতে হয়, আত্মসম্মান ভুলুন্ঠিত হয়, সেটাও আমাদের কাম্য হওয়া উচিত নয়।

লেখক : শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)


এখানে শেয়ার বোতাম