শনিবার, জানুয়ারি ২৩

বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন, উত্তপ্ত পৃথিবী, বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের মহাকম্পন

এখানে শেয়ার বোতাম

জিবি চাকমা::

আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গ যুবক ফ্লয়েডের হত্যাকে কেন্দ্র করে আমেরিকায় গড়ে ওঠা বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন এখন পৃথিবীর বুকে নতুন রূপে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ,পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লবী সংগ্রামের এক স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করেছে। যা পৃথিবী ব্যাপি নিপীড়িত শ্রেণী ও জনগণের সাম্রাজবাদী, পুঁজিবাদী সকল শোষণ ব্যবস্থার বিরোধী সংগ্রামে প্রবল দিশা হয়ে উঠছে।সাম্রজ্যবাদী,পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে বিশ্ব ব্যাপী এই আন্দোলন শক্তিশালী জন জাগড়ন তৈরি করছে।দূনিয়া ব্যাপী সৃষ্ট নতুন এই জন জাগড়ন সাম্রাজ্যবাদী,পুঁজিবাদী শোষণ ব্যবস্থার নগ্ন চেহারা আজ স্পষ্টই উন্মোচন করে দিয়েছে ও দিচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ কতৃক শ্রেণি শোষণ অব্যাহত ও জারি রেখে বিশ্বের মানব সমাজে স্থায়ী কোন সমাধান যে নেই,তা বরাবরই বর্ণবাদ বিরোধী এই নতুন জন জাগড়ন আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।এবং তার স্পষ্টই প্রমাণ, প্রমাণিত হচ্ছে যে, সাম্রাজবাদী বিশ্ব ব্যবস্থা বিশ্বের করোনা ভাইরাসের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আজ সম্পূর্ণ ব্যর্থ হতে চলেছে।

পৃথিবী ব্যাপি এক দিকে করোনা মহামারি অনিয়ন্ত্রিত ভাবে চলছে,অন্যদিকে আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গ যুবক ফ্লয়েডকে আমেরিকার পুলিশ বাহিনী নির্মম ভাবে হত্যা করেছে।সেই হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন ইতিমধ্যে প্রায়ই পৃথিবী ব্যাপি ছড়িয়ে পড়েছে।বর্ণবাদ বিরোধী এই আন্দোলন এখন সাম্রাজ্যবাদ,পুঁজিবাদের মহাকম্পন সৃষ্টি করে দিয়েছে। শুরুতেই থেকে আমেরিকায় মাওবাদী কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা নানাভাবে নেতৃত্ত্ব দিয়ে আসছে। ইউরোপের দেশ কানাডার মন্ট্রিলে কমিউনিস্ট বিপ্লবী ছাত্রদের সাত ঘন্টা ব্যাপি মিছিল সপ্তাহান্ত সরগরম রয়েছিল।এক সপ্তাহ আগে যখন বিশাল একটি মিছিল হয়েছিল তখন জন সমাগম তেমন দেখা না গেলেও এক সপ্তাহের মধ্যে মিছিলকারীদের সংখ্যা১০ হাজার ছাড়িয়েছিল।মিছিলের মূল উদ্যেক্তা ছিল ‘রেভলিউশনারি স্টুডেন্ট মুভমেন্ট, কনকর্ডিয়া। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল একটি ফরাসি যুব সংগঠনের মন্ট্রিল শাখার সদস্যরা।সাত ঘন্টা ধরে চলতে থাকা মিছিল শেষ পর্যন্ত পুলিশ হেড কোয়াটারের সামনে গিয়ে স্লোগান দিতে থাকে।সে সময় শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ কার্দানে গ্যাস ছুঁড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।শুধু মন্ট্রিল নয়,সপ্তাহান্ত জুড়ে কামাডার ছোট ও বড় সকল শহরে মিছিল হয়।সেই দেশে জাতি বিদ্বেষী পুলিশি নিপীড়ণের দীর্ঘ ইতিহাস থাকার কারণে মূলত সেখানে মিছিল গর্জে উঠেছিল।বোস্টনে শিরচ্ছেদ করা হয়েছে দখলদার এবং আদিবাসী গণহত্যাকারী দাস ব্যবসায়ী ক্রিস্টোফার কলম্বাসকে।বোস্টন,মিয়ামি ও ভার্জেনিয়ায় ক্রিস্টোফার কলম্বাসের ভাস্কর্য ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।মিনেসোটা রাজ্যের রাজধানী সেইন্ট পলে ১০ ফুট উচ্চতার ব্রোঞ্জের ভাস্কর্যটি দরি দিয়ে টেনে এর গ্রানাইটের ভিত্তি থেকে স্থানীয় আদিবাসী আন্দোলন ও বিক্ষোভকারীরা ফেলে দেয়।বোস্টনে কলম্বাসের আরেকটি ভাস্কর্যের মাথা খুলে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।কলম্বাস ছাড়াও রিচমন্ডে ঔপনিবেশিক প্রেসিডেন্ট জেফাসন ডেভিসের একটি মুর্তি আন্দোলনকারীরা ভেঙ্গে ফেলেছে।ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি মার্কিন কংগ্রেস ভবন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধকালীন কনফেডারেট নেতা ও সৈন্যদের ১১টি ভাস্কর্য সরিয়ে নেওয়ার জন্য কংগ্রেসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়,ব্ল্যাক লাইভস মটার, আন্দোলনের পথ ধরে ঔপনিবেশিক আমলের নিপীড়কদের প্রত্যাখান করার এই ঢেউ ইউরোপেও লেগেছে।ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল শহরে সপ্তদশ শতকের দাস ব্যবসায়ী এডওয়ার্ড ফোলস্টোনের স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙ্গে বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন ও বিক্ষোভকারীরা সাগরে ফেলে দেয়।লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস থেকে ও ব্রিটিশ দাস ব্যবসায়ী রবার্ট মিলিগানের ভাস্কর্য সরানো হয়।বেলজিয়ামের সাবেক রাজা দ্বিতীয় লিওফোল্ডের ভাস্কর্যের রঙ লাগিয়ে বিক্ষোভকারীরা আগুন দেয়।

আদিবাসীরা সহ বিশ্বের নিপীড়িত শ্রেণীর জনগণ ঐক্যতার এক মেলবন্ধন ভিত্তিক বর্ণবাদ বিরোধী এই আন্দোলনে আজ সামিল হয়েছে ও হচ্ছে। সারা দূনিয়ায় শোষক আর শোষিতের মধ্যেকার বৈষম্য যত স্পষ্টই হবে ততই সমাজতান্ত্রিক সমাজ বিপ্লবের ন্যায্যতার সংগ্রাম অধিকতর শক্তিশালী রূপে দৃশ্যমান হবে।এবং সেই সংগ্রামের জোয়াড়ে পুঁজিবাদ,সাম্রাজ্যবাদকে স্বমূলে উৎখাত করে আস্তাকূড়ে নিক্ষিপ্ত করবে।পুঁজিবাদ,সাম্রাজ্যবাদকে ধ্বংস করে তার পরিবর্তে পুঁজিবাদী,সাম্রাজ্যবাদী সমষ্ট শোষণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিনাশ ঘটিয়ে পৃথিবীর বুকে মানব জাতির মুক্তির সত্যিকার নিদর্শন সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়ে মানব জাতির প্রতিটি মানুষ তার নিজ নিজ অধিকার নিয়ে মুক্ত স্বাধীন পরিবেশে বেঁচে থাকবে। বাংলাদেশেও সাম্রাজ্যবাদের পুতুল শ্রমিক সহ নিপীড়িত জনগণ শোষণকারী পুঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থা উচ্ছেদ করার লক্ষে দেশের নিপীড়িত জনগণ সংগঠিত হয়ে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হবে।এবং এই বিপ্লবী সংগ্রামের প্রতি সংহতি রেখে সংখ্যালঘু জনগণ সহ পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে শাসক শ্রেণীর সমষ্ট শাসনের অপতৎপরতা ও চক্রান্ত উৎখাত করে পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড় মুক্ত হয়ে পাহাড়ী জাতি ও জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠা করবে এমনটি প্রত্যাশা থাকবে।

লেখক : সংগঠক, আদিবাসী মুক্তিমোর্চা, বৃহত্তর চট্রগ্রাম অঞ্চল শাখা।


এখানে শেয়ার বোতাম