মঙ্গলবার, মে ১১
শীর্ষ সংবাদ

ফ্রাই ডে ফর ফিউচার এবং কিছু কথা

এখানে শেয়ার বোতাম

সৌরভ দাস ::

কাসেলে আসার পর এখানকার স্থানীয় জার্মান কয়েকজন পরিবেশবাদীদের সাথে কথা হয়। পরিবেশ সম্পর্কে তাদের যে সিরিয়াসনেস তা আমাকে অনেক অবাক করে। এরকম সিরিয়াসনেস আমি বাংলাদেশে অনেক কম দেখেছি। বলতে গেলে দেখিই নি। আসলে আমাদের পরিবেশ যে দিন কে দিন কত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তা আমরা যতটুকু না কল্পনা করি তার থেকেও অনেক অনেক বেশি। কিন্তু পরিবেশের চিন্তা আমাদের ভাবায় না। কারণ আমাদের চারপাশে এমন একটা জীবন বিরাজ করছে যেখানে আমাদের অস্তিত্বের জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে। পরিবেশ সেখানে মুখ্য বিষয় নয়।

সেদিন একজন পরিবেশ নিয়ে আমাদের দেশের কর্মকান্ড নিয়ে জানতে চাইলো। তাকে আমি সোজাসাপ্টা বললাম, “দেখো পরিবেশ রক্ষার থেকেও একটা মানবিক জীবন যাপনের যে সংগ্রাম সেটা আমাদের মত দেশগুলোর মানুষজন এখনো শেষ করতে পারে নি। এখনো জাস্ট তিনবেলার খাবারের জন্য আমাদের মত দেশগুলোর মানুষকে অনেক কষ্ট করতে হয়। ফলে পরিবেশ নিয়ে ভাবাটা তাদের জন্য অনেক জৌলুসের ব্যাপার। আমাদের গুটিকতক সংগঠন ছাড়া সাধারণ জনগণের মধ্যে পরিবেশ নিয়ে তেমন কথা নেই।”

আমার কথা শুনে সে খুব অবাক হলো না। আমাদের মতো দেশগুলো সম্পর্কে সে বেশ ভালোই ধারণা রাখে বলে মনে হলো। সে জাস্ট হেসে বললো, “আমি বিষয়টা আঁচ করতে পারি। এটি আমাকে আরো চিন্তায় ফেলে দেয়।”

যাই হোক, গেল মাসে তার একটা ইমেইল পেলাম। ইমেইলটা ছিল “ফ্রাই ডে ফর ফিউচার” নামক একটা দিবস পালন নিয়ে। এটি ইউরোপজুড়ে বেশ গুরুত্ব সহকারে পালন করা হয়। আন্দোলনটি শুরু হয় এক সুইডিশ নাগরিক গ্রেটা থুনবার্গ এর হাত ধরে। এই গেল বছরের আগস্টেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত। যদিও প্রথমে এটি গ্রেটা থুনবার্গের একান্ত ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুরু হয় কিন্তু এখন তাতে প্রায় সব বয়সের সব শ্রেণী পেশার মানুষের অংশগ্রহণ দেখা যায়। গত বছর যখন আন্দোলন শুরু হয় তখন গ্রেটার বয়স ছিল মাত্র পনেরো বছর। এই ছোট্ট মেয়েটি সেদিন একাই রাজপথে দাড়িয়েছিল পরিবেশ রক্ষার আহ্বান জানিয়ে। এই ছোট্ট মেয়েটির পরিবেশ রক্ষার আকুতি পুরো বিশ্ব জুড়ে হৈ চৈ ফেলে দেয়। এখন ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া সর্বত্রই ফ্রাই ডে ফর ফিউচার পালন করা হয়।

দুভার্গ্যবশত আমি সেদিন ঐ প্রোগ্রামটি যেতে পারি নি। সম্ভবত আমার কোনো একটি পরীক্ষা ছিল তখন। কিন্তু ঐ প্রোগ্রামটির গুরুত্ব আমি খুব ভালো ভাবে অনুধাবন করতে পারছিলাম। ইউরোপের সাধারণ জনগণ পরিবেশ নিয়ে মারাত্মক উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন। তাই এই প্রোগ্রামটিতে তাদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো।
সত্যিই তো, আমরা এতকিছু নিয়ে ভাবি কিন্তু আমাদের এই পরিবেশটা নিয়ে সত্যিই কি ভাবি? আমরা তো সবাই প্রতিনিয়ত মেশিনের মত ছুটছি। কিন্তু যদি পরিবেশটাই না থাকে তাহলে মানুষ হিসেবে যে আমাদের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না এটা কি আমরা বুঝি না? অবশ্য এর দায় কখনোই সাধারণ মানুষের নয়। এ দায় পার্লামেন্টগুলোর। সম্ভবত এ বোধোদয় থেকেই গ্রেটা সেদিন একাই প্ল্যাকার্ড হাতে সুইডিশ পার্লামেন্টের সামনে দাঁড়িয়েছিল।

মূলত শিল্প বিপ্লব পরবর্তী সময়ে বিশ্বের জলবায়ু বেশ উদ্বেগজনক হারে পরিবর্তিত হওয়া শুরু করে। বিগত বেশ কিছু গবেষণা থেকে জানা যায় বৈশ্বিক এভারেজ সী লেভেল ১৮৭০ থেকে ২০০৪ এই সময়ের মধ্যে বেড়েছে ১৯৫ মিলিমিটার। আর কেবল ২০০৪ থেকে ২০১৭ এই অল্প সময়ের মধ্যেই তা বেড়েছে আরো ৪৩ মিলিমিটার। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন এই হার সামনের বছরগুলোতে আরো বাড়বে।

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি প্রমাণ হলো বৈশ্বিক উষ্ঞতা বৃদ্ধি। পৃথিবীর তাপমাত্রা দিনকে দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এর পেছনে অন্যতম প্রধান একটি কারণ গ্রীণ হাইজ ইফেক্ট। বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায়, শুধু যদি এই গ্রীণ হাউজ ইফেক্টটি না থাকতো তাহলেও আমরা পৃথিবীর তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রীর মতো ধরে রাখতে পারতাম।

শিল্প বিপ্লবের আগ পর্যন্ত পৃথিবীকে তাপমাত্রা বৃদ্ধি সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে চিন্তা করতে হয় নি। কিন্তু শিল্প বিপ্লবের পর পরই এক দিকে যেমন বেশ দ্রুততার সাথে পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়তে থাকে অন্যদিকে বাড়তে থাকে বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদনশীলতা। আল্টিমেটলি তখন থেকেই পৃথিবীর উপর মানুষের যে বিরুপ প্রভাব সেটা শুরু হয়। মানুষ তখন পরিবেশকে তোয়াক্কা না করে কেবল মুনাফার দিকে তাকিয়ে যেমন পারে তেমন করে শিল্প বানানো শুরু করে। ফলে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে এখন পর্যন্ত পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ১.১ ডিগ্রী সেলসিয়াস। ধারণা করা হচ্ছে এই দশকের শেকের দিকে তা গিয়ে দাড়াবে ২.৭ ডিগ্রী সেলসিয়াসে। এভাবে যদি ক্রমাগত এবং ব্যাপক হারে এই তাপমাত্রা বাড়তে থাকে তাহলে এই পৃথিবী আর কতদিন বসবাসযোগ্য থাকবে? তাছাড়া শিল্প বিপ্লবের পর থেকে এখন পর্যন্ত কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়েছে ৪০ শতাংশ। এই হার যদি আরো বাড়তে থাকে তাহলে আমরা আর কত বছর এই পৃথিবীতে নিশ্বাস নিতে পারবো? এগুলো একেকটা বিরাট প্রশ্ন আকারেই থেকে যায়।

এসবের থেকেও বড় আশঙ্কার বিষয়, এই সঙ্কট নিয়ে সত্যিকার অর্থে খুব কম মানুষ ভাবছে। আমরা হয়তো মনে করছি ইউরোপের ক্ষমতাসীন সরকারগুলো এই ব্যাপারটা নিয়ে খুব সিরিয়াসলি কাজ করছে। বিষয়টা কিন্তু তা নয়। ইউরোপের জনগণ খুব সচেতন এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সরকারগুলো পরিবেশের সেই বিষয়গুলোকেই গুরুত্ব দিচ্ছে যেগুলো তাদের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ সোলার এনার্জির কথা বলা যায়। ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে এই সৌর শক্তি ব্যবহার করে এখন বিদ্যুত উতপাদন করা হচ্ছে। এটি একদিকে যেমন অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী অন্যদিকে পরিবেশ বান্ধব। কিন্তু যখনই অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী নয়, কিন্তু পরিবেশের জন্য খুবই দরকারী এরকম কোনো উদ্যোগের প্রসঙ্গ আসে তখন উন্নত দেশগুলো বরাবরই পিছু হটে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে পৃথিবীর তাপমাত্রা যদি আরো কিছু বাড়ে তাহলে তা বিভিন্ন পশ্চিমা দেশের জন্য তা অনেক অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির দরুণ বিভিন্ন মেরু অঞ্চলে যে মেল্টিং ঘটবে তা কাজে লাগিয়ে পশ্চিমের উন্নত দেশগুলো অনেক নতুন নতুন সম্পদ আহরণের সুযোগ পাবে। তাই অনেকে আবার এই তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে একটা লাভজনক বিষয় হিসেবেও দেখছেন। এই লাভের সমীকরণে তাদের সকলেই কম বেশি আচ্ছন্ন।

এদিকে অনেকে ইউরোপীয় তাত্ত্বিক এর মুখে এই জলবায়ু সমস্যা মোকাবেলা সম্পর্কে কিছু উদ্ভট উদ্ভট ব্যাখ্যাও শোনা যায়। তারা বলেন, এটা নিয়ে খুব একটা ভাবতে হবে না। বিজ্ঞান যে গতিতে অগ্রসর হচ্ছে তাতে সময়ের পরিক্রমায় বিজ্ঞান নিজেই এর একটা সমাধান বের করে ফেলবে। গেয়ার্ড গেন্টেফর নামক এক তাত্ত্বিক আজকাল এ ধরনের পজিটিভিজম প্রচার করে চলছেন। আর ইউরোপের সরকার মহলে তার সমর্থক সংখ্যাও বেশ ভালো। কিন্তু বিজ্ঞান যে বার বার ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিচ্ছে এই সমস্যাটা এই ভাবে সমাধান না করলে ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে যাবে- এই বাক্যটিতে তারা খুব একটা মাথা ঘামান না। ভবিষ্যতে বিজ্ঞান নিশ্চয়ই কিছু একটা আবিষ্কার করবে এই তত্ত্বটিকেই তারা বিশ্বাস করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এরকম আরো একজন দার্শনিক আছেন তার নাম আর্নে ন্যাশ। মানুষ যে সৃষ্টির সেরা জীব এই কথাটিকেই তিনি অস্বীকার করেন। মানুষকে তিনি অন্য সব প্রাণীর কাতারে ফেলে ব্যাখ্যা করেন। তিনি পৃথিবী এবং মানুষ এই দুটোকে পরস্পরের বিপরীতমুখী দুটি সত্ত্বা হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন মানুষ থেকে এই পৃথিবীকে রক্ষা করতে হবে। কারণ মানুষ এই পৃথিবীকে ক্রমাগত ধ্বংস করছে। কিন্তু মানুষ ছাড়া এই পৃথিবীটাকে রক্ষা করবে কে?

এভাবে এসব ভাববাদী এবং পজিটিভিজম চিন্তা এই সমস্যাটিকে আরো জটিল করে তুলছে।

সর্বোপরি আমাদের পরিবেশের বিপর্যয় অব্যাহত রয়েছে। এটা কোনো ভাবেই একটা সমাধানের দিকে যাচ্ছে না। আমরা মনে করছি ইউরোপ আমেরিকা এটা নিয়ে খুব সিরিয়াসলি কাজ করছে। আসলে সেখানে কার্যকরী কিছুই হচ্ছে না। তারা বার বার মুনাফার জালে আটকা পড়ে যাচ্ছে। তাই বিশ্বকে রক্ষা করতে বিশ্বের প্রতিটি মানুষকে একটা বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করতে হবে। যেটার সূচনা অবশ্যই হবে রাজপথে, পার্লামেন্টে নয়।

সৌরভ দাস
ইউনিভার্সিটি অব কাসেল
জার্মানি।


এখানে শেয়ার বোতাম