বুধবার ‚ ২৮শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ ‚ ১২ই আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ ‚ সকাল ৭:১৪

Home মতামত প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নঃ জনগণের উত্তর

প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নঃ জনগণের উত্তর

মাসকাওয়াথ আহসান ::


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রশ্ন করেছেন, করোনাভাইরাস মহামারীর সময়ে অনেকে সরকারের সমালোচনা আর খুঁত ধরায় ব্যস্ত থাকলেও তাদের কতজন সাধারণ মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে?

এ প্রশ্নের উত্তর খুব সহজ, যারা সৎ উপার্জনের অন্নগ্রহণের মানুষ; তারা বাংলাদেশে আবহমান কাল ধরে; একা না বেঁচে; সবাইকে নিয়ে বাঁচে। এই করোনাকালে বেশিরভাগ মানুষই তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। এটাই নিয়ম; যারা গৃহকর্মে নিয়োজিত থাকেন; তাদের দায়িত্ব গৃহের অভিভাবকেরা নেন। শুধু কর্মকালেই নয়; পরেও আত্মীয়ের মতো একটা সম্পর্ক রয়ে যায়; বিয়ে-শাদী, অসুখ-বিসুখে তাদের পাশে দাঁড়ান সৎ উপার্জনের মানুষেরাই।

এই সৎ উপার্জনের মানুষ যখন দেখে; প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা প্যাকেজ পাওয়া গার্মেন্টস মালিকেরা; যারা দেশের মন্ত্রী-এমপিও; তারা গরীব শ্রমিকগুলো নিয়ে রাজপথে ফুটবল খেলছে; দর্জি সংঘ শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে বলছে; করোনার ভয়ে গ্রামে চলে যাওয়া শ্রমিকরা শহরে ফেরার পথে পুলিশ তাদের লাঠিচার্জ করছে; এইভাবে অব্যবস্থাপনা আর সিদ্ধান্তহীনতার ঝালমুড়ি মাখানোর মাধ্যমে পুরো দেশ করোনাভাইরাসের বোমায় পরিণত হলে; সাধারণ মানুষ কেন তার সমালোচনা করতে পারবে না।

আর খুঁত ধরা মানে! পুরো করোনা-ব্যবস্থাপনাটাই তো খুঁতের শতছিদ্র চাদরের মতো। হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরে সাধারণ নাগরিক যখন খোলামাঠে-ভ্যানগাড়িতে-রাস্তায় ঢলে পড়ে মরে থাকছে; তখন সরকারের ভি আই পিদের জন্য মেডিকেল বোর্ড বসানো; সিএমএইচ সুবিধা দেয়া, প্রয়োজনে এয়ার এম্বুলেন্সে বিদেশে পাঠানো; এসব খুঁত তো সমালোচনার অযোগ্য। এরকম সামন্ত মানসিকতার ভি আই পি রুলিং এলিট বিশ্বের কোন দেশে দেখা যায়নি।

করোনাকালে শুধু করোনা-ব্যবস্থাপনা ছাড়া অন্য কোন নতুন/রুটিন নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন অবাস্তব একটা সিদ্ধান্ত। করোনাকালে সরকারি পাটকল বন্ধ করে দেয়া কোন ধরণের মানবদরদী সিদ্ধান্ত; জনগণ তা জানতে চায়।

সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী গোটা দেশের নেতা; সেইখানে সমালোচকেরা মানুষের পাশে দাঁড়ায়নি; আর আওয়ামী লীগ জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে; এটা অত্যন্ত বিভাজনমূলক বক্তব্য। একজন এতো অভিজ্ঞ নেতা জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা কীভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে; তার ডিটেইল বর্ণনা; আর কেবল অনুমানের ভিত্তিতে; যারা সমালোচনা করে তারা মানুষের পাশে দাঁড়ায় না; এমন সংশয় ও কটাক্ষঘন বিবৃতি; গণতন্ত্রের ইনক্লুসিভ স্পিরিটকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এখানে “সহমত হলে তুমি আমার সঙ্গে; সমালোচনা করলে তুমি আমার সঙ্গে নও”-এরকম বিভাজনমূলক বক্তব্য প্রদানের মধ্যে অভিভাবক হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর নৈর্ব্যক্তিকতা ও নিরপেক্ষতা খুঁজে পাওয়া যায়নি।

আওয়ামী লীগের নেতার হাসপাতালের ভুয়া করোনা টেস্ট সার্টিফিকেট বিক্রির ঘটনায়; সমাজ যখন আহত; বিদেশে যখন দেশের সুনাম ক্ষুণ্ণ; ইউরোপের দরোজা বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড়; ক্ষমতাসীন দলের ওপর নির্ভর করার সামান্য পাটাতনটুকু যখন; সরে সরে যায়; তখন প্রধানমন্ত্রীকে সেসব অভিভাবকের মতো মনে হয়; যিনি নিজের দলীয় সন্তানের কোন অপরাধ দেখতে পাননা; আর বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অনাথ নাগরিকের উপায়হীন সমালোচনাতেই সব দোষ খুঁজে পান।

চোখের সামনে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপি চার্টার্ড প্লেনে করে সেকেন্ড হোমে গেলে-চক্ষু চিকিতসায় গেলে; আওয়ামী লীগের রুলিং এলিটের গত দশবছরে তৈরি হওয়া ধন-সম্পদ, বড় লোক হয়ে যাবার কালটিতে; ক্ষমতার বাইরের মানুষদের প্রান্তিকতর হয়ে ওঠা; এইভাবে সৃষ্ট বিকট শ্রেণী বৈষম্য করোনা-বাস্তবতায় স্পষ্টভাবে ধরা দেয়।

প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রব্যবস্থাপনার সমুদয় ব্যর্থ হবার জাস্টিফিকেশান হিসেবে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের ট্র্যাজেডিকে বার বার সামনে নিয়ে আসেন। বঙ্গবন্ধু যে “চোরের খনি’-তে ঐসময়ের ক্ষমতাসীন দলের “চাটার দল” সব সম্পদ চেটেপুটে খেয়ে নেবার কষ্টে আকাশ বিদীর্ণ করেছেন আক্ষেপে; সেখানে কোন রূপকথার গল্প শুনে আমরা ধরে নেবো; আমরা জামবাটিতে ধোয়া ওঠা দুধ খেতাম পচাত্তরের আগে!

বঙ্গবন্ধু জাতির জনক; তিনি আমাদের সবার; তাকে আওয়ামী লীগের বর্তমান বিশৃংখল-ব্যবস্থাপনা ঢাকতে জাস্টিফিকেশানের পবিত্র চাদর হিসেবে ব্যবহার অপ্রয়োজনীয়। অন্তত জাতির জনক, মানচিত্র, পতাকা গৌরবটুকু; যেটা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের অনন্য উপহার; সম্ভবত এই জাতির জীবনের একমাত্র জয়চিহ্ন; সেটাকে দলের সীমাবদ্ধ স্বার্থের সীমিত জলের ক্ষমতার সোনার হাঁস হিসেবে ছিনিয়ে নেয়া ৩০ লক্ষ শহীদ আর ২ লাখের অধিক নির্যাতিত মা বোন, কোটি শরণার্থী; দেশের অভ্যন্তরে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে জীবন-মৃত্যুর ভয়ালকালে বেঁচে থাকা মানুষ; আর জাতির বীর সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের গভীর ও নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের প্রতি হৃদয়হীনতা আর অবিচার।

আমাদের সবই তো লুট হয়ে গেছে; শিক্ষা-সংস্কৃতি-স্বাস্থ্য-কথা বলার অধিকার; প্রবাসী শ্রমিক আর গার্মেন্টস শ্রমিকের রক্ত পানি করা জিডিপির সোনার হাঁসটিকে জবাই করে লোভের পাপ-পাপলু-পাপিয়ারা সেকেন্ড হোম আর সুইস ব্যাংকে জড়ো করেছে। গত দশ বছরে দেশের যে সম্পদ লুন্ঠিত হয়েছে; তা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়া যেতো।

অপরাধীদের বিমানে করে উড়ে যেতে দিয়ে তার বিলাসী গাড়ি জব্দ করা; গরু ছেড়ে দিয়ে দড়ি জব্দের ন্যায়বিচারের মাঝে গ্লানি আছে; গর্ব নেই। “আমরা তো তবু অপরাধীকে ধরি”; এই যে গর্বের শেষ খড়কুটো আঁকড়ে ধরে ব্যবস্থাপনা-অক্ষমতার অস্বীকার; উলটো শুধু সাধারণ মানুষ আর সমালোচকের দিকে রাগের চোখে তাকানো; এই রুলিং এলিট মনোজগত তো পাকিস্তানি আর ব্রিটিশ রুলিং এলিটের মতোই উপনিবেশের দাস-প্রজার দিকে করুণার চোখে তাকানোর নির্মমতা।

স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঝাঁঝরা করে দেয়া রাজনৈতিক নেতাদের সমালোচনা করে; যারা কারাগারে; তাদের করোনাকালে মারা যেতে যেতে তার মৃত্যুর জন্য দায়ী খলনায়কের সমালোচনা করার শেষ মানবাধিকারটুকু কেড়ে নেয়া হয়েছে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এরকম ঘটনা নজিরবিহীন।

করোনাকাল কোন জেদাজেদির সময় নয়; মানুষ বাঁচাতে আর দেশ বাঁচাতে ১৬ কোটি মানুষের ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। যে অব্যবস্থাপনার সমালোচনা করে; সে ব্যবস্থাপনায় উন্নতির পথে সহযোগিতা করছে। আর যে সারাক্ষণ সহমত ভাই; সে “চোরের খনি” আর “চাটার দল”; বঙ্গবন্ধুর খুনীদের প্রেতায়িত আত্মা; দেশের জনককে খুন করে তাদের রক্তপিপাসা মেটেনি; তারা এবার দেশটাকে খুন করতে চায়।

আশা করি সম্মানিত প্রধানমন্ত্রী; “আমরা বনাম ওরা”; “সহমত বনাম সমালোচক” এসব বিভাজন রেখা টেনে; এই মৃত্যু উপত্যকায় বেঁচে থাকার শেষ স্বপ্নটুকুকে এতোটা বেদনাহত করবেন না। সুখে আছে যারা সুখে থাকুক; আমরা কেবল প্রাণটুকু নিয়ে বেঁচে থাকলেই কৃতার্থ হবো। প্রধানমন্ত্রীর সার্বিক মঙ্গল প্রার্থনা করি।

লেখক : সাংবাদিক, সাংবাদিকতা শিক্ষক

1 COMMENT

  1. আমি সম্পূর্ণ পড়ি নাই। শুধু প্রশ্নটুকু পড়েছি। আর নামতে নামতে উত্তরের কিছুটা চোখে বেধেছে। প্রধাণ মন্ত্রীর উত্তরে আমিও বলতে চাই, আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের পাশে দাড়িয়েছি। প্রশ্ন হল আপনি আপনার ভ্রষ্ট মন্ত্রী, চেয়ারম্যান, নেতা, পাতিনেতা, কর্মীর বিরুদ্ধে কি একশন নিয়েছেন? জানেন তো ঝুড়ির ভাল আমও একটা পচা আমে নষ্ট হয় আর আপনারতো ঝুড়ি ভর্তি পচা আম। তার মাঝে যেকটা ভাল আছে টিকায়ে রাখতে হবেতো?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ

শেষ পর্যন্ত কে হচ্ছেন আইসিসি চেয়ারম্যান?

অধিকার ডেস্ক:: ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক অভিভাবক সংস্থা আইসিসি এখন পুরোপুরি অভিভাবকহীন। চেয়ারম্যান শশাঙ্ক মনোহর পদত্যাগ করেছেন আরও বেশ কিছুদিন আগে। কিন্তু এরমধ্যে এখনও পর্যন্ত...

থানায় নিয়ে যুবলীগ নেতাকে মারধর, ওসি প্রত্যাহার

অধিকার ডেস্ক:: থানায় নিয়ে এক যুবলীগ নেতাকে বেধড়ক মারধরের ঘটনায় নেত্রকোনার দুর্গাপুর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত (ওসি) মিজানুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। মঙ্গলবার...

সিলেটে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান, জঙ্গি আটক, বোমা উদ্ধার

অধিকার ডেস্ক:: জঙ্গি আস্তানার খোঁজে সিলেটের টিলাগড়ের শাপলাবাগ ও জালালাবাদ আবাসিক এলাকার পৃথক দুটি বাসায় অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দুটি বাসায় অভিযান...

রাশিয়ার কাছে ভ্যাকসিন চেয়েছে ২০ দেশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের অনুমোদন দিয়েছে রাশিয়া। ১৯৫৭ সালে বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়েছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। সেটির নামের...
Shares