শনিবার, নভেম্বর ২৮

প্রণব মুখার্জি : বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে অকৃত্রিম বন্ধু

এখানে শেয়ার বোতাম

অধিকার ডেস্ক:: বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই অকৃত্রিম বন্ধু প্রণব মুখার্জি। ওই সময়ে রাজ্যসভার তরুণ সদস্য হিসেবে ভারত সরকারের কাছ থেকে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের স্বীকৃতি আদায়ে সরব হয়ে ওঠেন তিনি। আর সে কারণেই তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। নিজের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘দ্য ড্রামাটিক ডিকেড: দ্য ইন্দিরা গান্ধী ইয়ারস’-এর একটি অধ্যায়ে এ কথা নিজেই জানিয়েছেন তিনি। লিখেছেন, এরপরই তাকে একের পর এক দায়িত্ব দিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে বিভিন্ন দেশ সফরে পাঠান ইন্দিরা। আর এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে অকৃত্রিম বাঁধনে জড়িয়ে পড়েন তিনি।

অবশ্য ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি বিয়ে করেছিলেন বাংলাদেশেরই এক মেয়েকে। দশ বছর বয়সে নড়াইলের ভদ্রবিলা থেকে পরিবারের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে স্থায়ী হওয়া শুভ্রা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ১৯৫৭ সালের ১৩ জুলাই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সফরে এসে প্রথমবারের মতো ভদ্রবিলায় শ্বশুরবাড়ি ঘুরেও গেছেন তিনি। সেখানে তাকে ‘উলু ধ্বনি’ ও ‘মঙ্গল আরতি’র মতো প্রথাগত উপায়ে স্বাগত জানানো হয়। ওই সময়ে অসুস্থতা সত্ত্বেও হুইল চেয়ারে চড়ে নিজের জন্মভিটায় ঘুরে যান শুভ্রা মুখোপাধ্যায়। স্বামীর সঙ্গে সেটাই ছিল তার শেষ বিদেশ সফর। এর দুই বছরের মাথায় ২০১৫ সালের ১৮ আগস্ট ৭৪ বছর বয়সে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গভীর অনুরক্ত শুভ্রা। তার হাত ধরেই ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রবেশ করেছিল সন্দেশের মতো বাঙালি মিষ্টি খাবার।

প্রণব-শুভ্রা দম্পত্তির দুই ছেলে ইন্দ্রজিৎ মুখোপাধ্যায় ও অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় ছাড়াও একমাত্র মেয়ে শর্মিষ্ঠা মুখার্জি নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। বড় ছেলে অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের জাঙ্গিপুর আসন থেকে দুইবার কংগ্রেসের মনোনয়নে পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া শর্মিষ্ঠা মুখার্জি একজন কত্থক নৃত্যশিল্পী। কংগ্রেসের রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন তিনিও।

বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা প্রণব মুখার্জির জন্ম ১৯৩৫ সালের ১১ ডিসেম্বর ভারতের বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মিরাটিতে। তার বাবা কামদা কিঙ্কর মুখার্জি ছিলেন দেশটির ন্যাশনাল কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত কামদা কিঙ্কর ১৯৫২ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন। প্রণবের মায়ের নাম রাজলক্ষ্মী মুখোপাধ্যায়।

রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেওয়া প্রণব মুখোপাধ্যায় সুরি বিদ্যাসাগর কলেজে শিক্ষালাভ করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আইন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৩ সালে কলকাতার কাছে ছোট একটি কলেজে শিক্ষকতা শুরুর মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। ওই সময়ে তিনি বাংলা ভাষায় একটি মাসিক সাময়িকী সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেন।

রাজনীতিতে প্রণব মুখার্জির যাত্রা শুরু কিন্তু ভারতের ন্যাশনাল কংগ্রেসের হাত ধরে নয়। ১৯৬৯ সালে প্রথমবার তিনি রাজ্যসভার (ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ) সদস্য নির্বাচিত হন আলাদা দল বাংলা কংগ্রেস থেকে। পরে অবশ্য দলটি কংগ্রেসের সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়। পরে আরও চার মেয়াদে রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০০৪ সালে তা ছেড়ে দেন। ওই বছরই তিনি লোকসভা (পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ) নির্বাচনে জয় পান। টানা নির্বাচিত হয়ে ২০১২ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগে তিনি পদত্যাগ করেন। পরে তিনি দেশটির ১৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধসহ নানা ইস্যুতে ভূমিকা রেখে ইন্দিরা গান্ধীর অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগীতে পরিণত হয়েছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। ১৯৭৩ সালে তিনি প্রথমবারের মতো ইন্দিরার মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। প্রণবকে প্রায়শই ‘সব কাজের কাজী’ হিসেবে অভিহিত করতেন ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের সময় প্রণব মুখোপাধ্যায় ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে মনমোহন সিংকে নিযুক্ত করেন।

তবে ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ডের পর তার ছেলে রাজিব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তার মতবিরোধ ঘটে। বিশ্লেষকদের ধারণা, রাজিব কংগ্রেসে নিজের বলয় তৈরি করে দেশ শাসন করতে চাইলে ১৯৮৬ সালে প্রণব কংগ্রেস ছেড়ে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে নিজেই রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস নামে একটি আঞ্চলিক দল গড়ে তোলেন। ১৯৮৯ সালে রাজিবের সঙ্গে মিটমাট হয়ে গেলে নিজের দল নিয়ে আবারও কংগ্রেসে ফেরেন তিনি।

১৯৯১ সালে রাজিব গান্ধী হত্যাকাণ্ডের পর নরসীমা রাও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলে কংগ্রেসের রাজনীতির মূল স্রোতে দ্রুত উত্থান ঘটতে থাকে প্রণবের। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা নরসীমা মন্ত্রিসভার বেশিরভাগ গুরুদায়িত্ব পালন করেন তিনি ও মনমোহন সিং।

বিভিন্ন সময়ে একাধিক দফায় প্রণব সামলেছেন ভারতের বাণিজ্য, পররাষ্ট্র, ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব। ২০০৪-০৬ পর্যন্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিবিড় সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলেন তিনি। উইকিলিকস-এর ফাঁস হওয়া বার্তা উল্লেখ করে টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সময়ে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীগুলোর ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্বের প্রশংসায় মুখর ছিল ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও ভারতের প্রতিরক্ষা সহযোগীদের মধ্যে রাশিয়াকেও তিনি রেখেছিলেন শীর্ষ স্থানে।

১৯৯৫ সালে প্রথমবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত হয়ে প্রণব মুখোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও প্রবর্তিত ভারতের পূর্বমুখী পররাষ্ট্র নীতির সফল প্রয়োগ ঘটান। ওই সময়ে আসিয়ানের ‘পূর্ণাঙ্গ আলোচনা সহযোগী’ হয় ভারত। ২০০৬ সালে আবারও এই মন্ত্রণালয়ে ফিরে প্রণব বেসামরিক পারমাণবিক বাণিজ্যে ভারতকে যুক্ত করতে সক্ষম হন। ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনেও ব্যাপক ভূমিকা রাখেন তিনি।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিন মেয়াদে ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলেছেন এই বর্ষীয়ান নেতা। ১৯৯০’র দশকে নিজের তৃতীয় মেয়াদে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) প্রতিষ্ঠার আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৮২ সালে প্রথমবারের মতো ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন তিনি। প্রথম মেয়াদেই সরকারি অর্থায়নে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) ভারতের ঋণের সর্বশেষ কিস্তি পরিশোধ করেন তিনি। ইন্ডিয়া টুডে একসময় লিখেছিল, ‘১৯৮০’র দশকে প্রণব মুখার্জি ও তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী চরঞ্জিত চানার প্রবর্তন করা উদারীকরণ প্রক্রিয়া নরসীমা রাও-এর অধীনে এসে পূর্ণতা পায়।’ অনেকেই মনে করেন ভারতীয় অর্থনীতির মূল সংস্কারক এই নেতা।

এছাড়া তিনি রাজ্যসভাতেও নানা গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮০ থেকে ৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি রাজ্যসভার নেতা, আবার ১৯৯৬ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন পার্লামেন্টের ওই কক্ষে কংগ্রেস দলীয় হুইপ। এছাড়া ২০০৪ থেকে ২০১২ পর্যন্ত তিনি ছিলেন লোকসভা নেতা। ভারত সরকারের নানা পর্যায়ের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাতেও কাজ করেছেন তিনি। আফ্রিকান উন্নয়ন ব্যাংক, এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকেরও বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন প্রণব।

রাজিব গান্ধীর সঙ্গে মতবিরোধ হলেও ভারতের অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই মনে করেন, তার স্ত্রী সোনিয়া গান্ধীকে কংগ্রেসের রাজনীতিতে টেনে আনার নেপথ্যে বড় ভূমিকা ছিল প্রণব মুখোপাধ্যায়ের। ১৯৯৮-৯৯ সালে সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে সাধারণ সম্পাদক হন প্রণব।

২০১২ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কংগ্রেস প্রণব মুখোপাধ্যায়কে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নিলে নিয়মানুযায়ী লোকসভা থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। ছেড়ে দিতে হয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও। ওই বছরের ১৯ জুলাইয়ের নির্বাচনে সহজ জয় পান তিনি। এর ছয় দিনের মাথায় ভারতের ১৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন তিনি। ভারতের রাষ্ট্রপতি পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক হলেও পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টদের থেকে শাসন কাজের সঙ্গে বেশি সক্রিয় হতে পেরেছিলেন প্রণব। ২০১৭ সালে তার মেয়াদ শেষ হলে বয়সজনিত স্বাস্থ্য জটিলতার কথা উল্লেখ করে পুনর্নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে বিরত থাকেন। ঘোষণা দেন রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার। এরপরে ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন রামনাথ কোবিন্দ।

বিভিন্ন সময়ে নানা পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন প্রণব। ২০০৮ সালে ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্ম বিভূষণ ছাড়াও ২০১৯ সালে পেয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ভারত রত্ন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য ভূমিকার জন্য ২০১৩ সালের মার্চে তাকে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা দেওয়া হয়। এছাড়া আইভোরি কোস্ট ও সাইপ্রাস থেকেও সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।

দেশ-বিদেশের নানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিগ্রি পাওয়ার পাশাপাশি প্রণব মুখোপাধ্যায় ভারতীয় অর্থনীতি ও দেশ গঠন ইস্যুতে বেশ কয়েকটি বইও লিখেছেন।


এখানে শেয়ার বোতাম