শুক্রবার, ডিসেম্বর ৪

পরিবহন সংকট নিরসনে চাই স্মার্ট পরিকল্পনা

এখানে শেয়ার বোতাম

সিয়াম আহমেদ ::


বাংলাদেশে পরিবহন ব্যবস্থার সংকট কয়েক দশকের। পরিবহন ব্যাবস্থার এই অরাজকতা ও ড্রাইভারদের বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চলানোর দরুন এপর্যন্ত সড়াক দূর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে লাখাধিক মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান-সংগঠন, শিক্ষার্থী ও জনগনের একাধিক আন্দোলন ও প্রচেষ্টার ফলাফল সরূপ সরকার এ খাতে শৃঙ্খলা আনয়নে নজর দিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গত বছরের সেপ্টেম্বর ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ পাশ হয়। পাশকৃত আইনটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে সরকার তেরো মাস সময় নেয়। অবশেষে এবছর নভেম্বরে কার্যকর করা হয় নতুন আইন। আইন কার্যকরের কয়েক সপ্তাহ না যেতেই বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চালক সংঘঠন থেকে সারা দেশে পরিবহণ ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়। যার ফলে বাংলাদেশের সরক পরিপবহন সংকটের জল আরো ঘোলা হয় ওঠে। ফলে পরিবহন খাতে সুষ্ঠ ব্যাবস্থাপনা ফিরিয়ে আনান সরকারের নিকট এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নব্য পরিবহন আইনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে কাভার্ড ভ্যান। সত্যি বলতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তালিকায় কাভার্ড ভ্যান নামের কোন যানবাহন নেই। এটি একটি রুপান্তরিত যান। যা আইনত নিষিদ্ধ। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২২ হাজারের বেশি কাভার্ড ভ্যান রয়েছে। যেগুলো গত এক যুগে ধীরে ধীরে রাস্তায় নেমেছে। এখন প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, সরকার কেন শুরু থেকেই এধরণের অননুমোদিত যানবাহনের বিস্তার রোধে পদক্ষেপ নেয়নি? এখন হঠাৎ করে নিষিদ্ধ করতে গেলে চালক সমতির ক্ষোভ দেখা দিবে এটাই স্বাভাবিক। আইনের সঠিক ও জোড়ালো প্রয়োগ অত্যাবশ্যক। তবে এক্ষেত্রে বিষয়টি ধাপে ধাপে হওয়া জরুরী। ষোলো কোটি মানুষকে রাতারাতি নতুন কোন আইনে অভস্থ করে ফেলা সম্ভব নয়। একাজে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো গত পনের বছেরও আমরা সিটিং বাস ব্যাবস্থা বাস্তবায়ন করতে পারিনি। অসাধু পরিবহন মালিক আর কিছু স্বার্থান্বেষী দুর্নীতিবাজ আমলাদের চক্রান্তের ফলে সরকারের পুরো প্রচেষ্টাটিই ব্যার্থ হয়েছে।
অল্প আয়তনে অধিক সংখ্যক জনবসতির হিসেবে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষের দিকে। আর স্বভাবতই ঢাকা শহর হলো বিশ্বের অন্যতম জনবহুল নগরী। এখানে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর চলালের জন্য বিপুল সংখ্যক যানবাহনের প্রয়োজন। বাংলাদেশ উর্বান ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্ক ডেভলপমেন্ট স্টাডিজের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ঢাকায় বসবাসকারী ২ কোটি মানুষের মধ্যে ৬০ শতাংশ মানুষই যাতায়াতের জন্য লোকাল বাস ও অন্যান্য গণপরিবহন ব্যবহার করে। এই বিশাল সংখ্যক গ্রাহকদের ঢল সামলাতে পরিবহন কোম্পানিগুলো অপরিকল্পিত ভাবে একের পর এক গাড়ি রাস্তায় নামিয়ে চলেছে। এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের আর্থসামাজিক খাতের উন্নতি ঘটায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্বি পেয়েছে। ফলে রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব করণে সময়ের সাথে সাথে গাড়ির সংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি রাস্তাঘাটের পরিমাণ। পর্যাপ্ত বাস ও ট্রাক টার্মিনাল না থাকায় গাড়িগুলোকে রাস্তাতেই পার্ক করে রাখা হচ্ছে। এতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পরিবহন খাতের আধুনিকায়ন, স্মার্ট ও দীর্ঘ মেয়াদি টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ ও সময়োপযোগী আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগের মাধ্যমেই এই পরিবহন সংকট থেকে পরিত্রাণ সম্ভব।
বর্তমানে পরিবহন খাতে সৃষ্ট এই সংকট সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিকল্প নেই। সেলক্ষ্য এককেন্দ্রিক পরিবহন ব্যাবস্থা থেকে সরে আসতে হবে সরকারকে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৪২ লাখের উপর যানবাহন রয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক যানবাহনের নিবন্ধন, ফিটনেস পরীক্ষা ও তদাররকি ইত্যাদি কার্যক্রম সরকারের একার পক্ষে সুষ্ঠ ভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এসমস্যা সমাধানে পরিবহন ব্যাবস্থার বিকেন্দ্রীকরণের কোন বিকল্প নেই। পরিবহনগুলোকে বিভিন্ন বেসরকারী অপারেটরের (কোম্পানির) আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি অপারেটরগুলোর জবাবদিহিতা ও তদারকি নিশ্চিত করার জন্য রেগুলেটরি কমিশন গঠন করতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের টেলিকম ও বেসরকারি বিমান পরিবহন খাতকে উদাহরণ হিসেবে নেয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশের পরিবহন সংকটের মূলে রয়েছে পরিকল্পনা প্রণয়নের অদক্ষতা। যারা গণপরিবহনগুলোর রুট পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন তারা একই রুটে ১০-১২ টি কোম্পানির বাস অনুমোদন করে থাকেন। এর ফলে চালকদের মাঝে একধরণের অসুস্থ প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়। ঘটে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। এরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাধারণ রুট বিন্যাস পদ্ধতির পরিবর্তে ফ্রেঞ্চাইজ ভিত্তিক স্মার্ট রুট বিন্যাস করা প্রয়োজন। এতে একটি রুটে কেবল একটি অপারেটর বা কোম্পানির বাসই সেবা দিবে। এতে করে যেমন অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে তেমনি সাধারণ মানুষ সুশৃঙ্খল ও স্বনিয়ন্ত্রিত হতে শিখবে। ফলে অরাজকতা অনেকাংশেই কমে যাবে।
অপরদিকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ঢাকা শহরের মতো ছোট শহরে কয়েক কোটি মানুষের বাসস্থানের ব্যাবস্থা করতে পারলেও পর্যাপ্ত রাস্তাঘাট এবং টার্মিনাল করতে সক্ষম হয় নি। এটি নগরপরিকল্পনাবিধদের অপেশাদারিত্বেরই পরিচয় প্রকাশ করে। আর তাই পূর্বাচলসহ নতুন যতগুলো আবাসন প্রকল্প হচ্ছে সেগুলোর ক্ষেত্রে রাজউকে অবশ্যই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে।
এছাড়া পরিবহন খাত ও তদসংশ্লিষ্ট তদারকি প্রতিষ্ঠান ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলতেও রয়েছে পর্যাপ্ত জনবলের অভাব। সরকারকে আইনপ্রণয়নের পাশাপাশি এসব বিষয়েও মনোযোগ দিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, পরিবহন খাতের এ সংকট বহুদিনের। রাতারাতি এর সমাধান সম্ভব নয়। এই সংকট সৃষ্টি হতে যেমন অনেকদিন লেগেছে তেমনি সমাধান করতেও সময়ের প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকারকে সল্প মেয়াদী পরিকল্পনার পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সেজন্য বর্তমান সময়ে উদ্ভূত সংকট মোকাবিলা ও ভবিষ্যতের টেকসই সমাধানের দিকে নজর দিতে হবে। আজ থেকে ৫০ বা ১০০ বছর পর ঢাকা শহর সর্বোপরি দেশ কেমন হবে, এখানে কী পরিমাণ মানুষ বসবাস করবে এবং তাদের সেবা প্রদানে পরিবহন ব্যাবস্থা কিরূপ হবে ইত্যাদি বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে টেকসই উন্নয়নের লক্ষে বিবিধ বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

লেখক :: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]


এখানে শেয়ার বোতাম