বুধবার, জানুয়ারি ২০

নির্বাচন রাজনীতি হলেও রাজনীতি মানেই নির্বাচন নয়

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 85
    Shares

শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার ::

গণিতের এক অতি সাধারণ ছাত্র ও একজন অসফল প্রাক্তন শিক্ষক হয়েও এটা আমি জানি, সংখ্যা ও গণিত এক নয়। গণিত বিদ্যার সকল নিয়ম সংখ্যা ব্যবস্থায় সত্য হলেও, সংখ্যা ব্যবস্থার একান্ত নিয়মগুলি গণিতের বৃহত্তর ভুবনে সত্য না হতে পারে।

এই স্বল্প জ্ঞান থেকে এটা বুঝি রাজনীতি আর নির্বাচন একই জিনিসের ভিন্ন নাম নয়। নির্বাচন রাজনীতি হলেও রাজনীতি মানেই নির্বাচন নয়। অনেকের ধারণা নির্বাচন পাটীগণিতের নিয়মের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এটা যে কতটা ভ্রান্ত তা বারবার প্রমাণিত হলেও রাজনীতি সচেতন বলে পরিচিত মানুষেরা বারবার গণিতের ভ্রমে পড়েন, ঠগেন, তারপর আবারো পড়েন। দিল্লি বিধানসভার যে নির্বাচনে আপের স্বপক্ষে ঢল নেমেছিল, সেবারে আমি ওরকম একটি পূর্বাভাস করেছিলাম। যদিও যতটা হল অতটা আমার ধারণাতেও ছিল না। কিন্তু ফেসবুকে সে কথা লিখতেই বহু লোক ব্যঙ্গ করেছিলেন। এমনকী আমার স্বদলীয় একজন নেতা যিনি দিল্লির প্রচারেও অংশ নিয়েছিলেন, তিনি আমাকে বলেছিলেন, তুমি ভুল বুঝছো। এরা কংগ্রেসের ভোট কেটে বিজেপির জয় সহজ করে দেবে। পরবর্তী ঘটনা সকলের জানা। এবারের বিহার নির্বাচন নিয়েও আমার সন্দেহ প্রকাশ করে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। তখনও কিছু বন্ধু আমার আশঙ্কাকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

এখন পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন নিয়েও নানা মুনি পাটীগণিতের ছকে পূর্বাভাস করছেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতির গভীর অনুধাবন না করেই তাঁদের মনোযোগ শুধু গাণিতিক যোগ বিয়োগে। এই মানুষদের সিংহভাগের সততা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। এরা আন্তরিকভাবেই চান এই রাজ্যের ক্ষমতায় যাতে বিজেপি না আসে। এদের মধ্যে একটা ক্ষুদ্র অংশ নানা যুক্তির আবরণে যেনতেন প্রকারেন বামপন্থী সমর্থকদের ভোট তৃণমূলের দিকে চালনা করে তৃণমূলকে রাজ্যে রেখে দিতে চান। এদের মূল আগ্রহ বিজেপিকে রোখায় নয়, তৃণমূলকে রক্ষা করায়। বামপন্থী সমর্থকদের লক্ষ্যবস্তু শুধু এরা করেন নি, করেছে বিজেপির ছদ্ম ও প্রকাশ্য কর্মীরাও। এই ছদ্মকর্মীদের তত্ত্বই ‘২১শে রাম, ২৬-বাম’। মুশকিল হচ্ছে, ওই সৎ বিজেপি বিরোধী নাগরিক সমাজের অনেকের ধারণা (যা ওই তৃণমূলরক্ষা পন্থীরা চালু করেছেন) যে ‘২১-এ রাম, ২৬-এ বাম’ তত্ত্বটি দলীয় স্তরে সিপিআইএম সিদ্ধান্ত আকারে গ্রহণ করেছে। এটা তাঁদের বদ্ধমূল করে দেওয়ায় ভূমিকা পালন করছে মূলধারার মুদ্রণ ও বৈদ্যুতিন সংবাদ মাধ্যমগুলি যারা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকে দ্বিমেরুর কলহ ও গালিগালাজ হিসেবে তুলে ধরছে প্রতিদিন। আজ যিনি কংগ্রেস বা সুশীল বুদ্ধিজীবী কাল তিনি তৃণমূল বা বিজেপি হয়ে এই সান্ধ্য শোরগোলে দৃশ্যমান হচ্ছেন। এদের নীতিহীন জার্সি বদল বিন্দুমাত্র প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে না এই আসর গুলিতে।

যাইহোক, ভোটের পরিমাণের গাণিতিক যোগবিয়োগটাই রাজনীতি নয় একমাত্র। বরং রাজনীতির আরও অনেক গভীরতর ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা অনেক সময়ই গাণিতিক যোগবিয়োগকে পুরো পাল্টে দেয়। সেবার দিল্লিতে তাই হয়েছিল, এবার বিহারেও তাই হয়েছে। শুধু গাণিতিক যোগবিয়োগে আটকে থাকলে এগুলোর ব্যাখ্যা কেউ খুঁজে পাবেন না।

পশ্চিমবঙ্গে সব ধারার বামেদের কাছেই প্রধান শত্রু বিজেপি। এটা বারবার করেই প্রতিটি দল বলেছে। তবে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তৃণমূলের প্রতি কী আচরণ হবে এই নিয়ে লিবারেশন ও অন্য কিছু নকশালপন্থী দলগুলির সাথে সিপিআইএম এর অবস্থানের তফাৎ রয়েছে। এই তফাৎ এর অর্থ এটা নয় যে লিবারেশন তৃণমূলের সাথে জোট করার প্রস্তাব দিয়েছে, যেমনটা কিছু অস্তিত্বহীন নকশালপন্থী ও নাগরিক সমাজের কিছু মানুষ বলছেন। আবার সিপিআইএম এটা কখনোই বলে নি যে প্রয়োজনে বিজেপির পক্ষে নিজেদের ভোট ঘুরিয়ে হলেও তৃণমূলকে হারাতে হবে। এগুলো ছদ্মবেশী তৃণমূল ও বিজেপির সুপরিকল্পিত প্রচারণা।

লিবারেশন ও সিপিআইএম এর অবস্থানের তফাৎ কোথায়? তৃণমূল ও বিজেপির তুলনামূলক চরিত্র বিচারেও সিপিআইএম ও লিবারেশনের অবস্থানের তফাৎ নেই। তফাৎ বিজেপির সমর্থক ভোটভিত্তির চরিত্র বিচারে। লিবারেশন ভাবছে, পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন নির্বাচনটি বিজেপির বিরুদ্ধ ও স্বপক্ষের লড়াই হিসেবেই দেখছে মানুষ। ভুলটা এখানেই। বিহারের মত ভুল। বিহারের নির্বাচন যেমন মানুষের কাছে ছিল নীতিশ কুমার বিরোধী ও স্বপক্ষের লড়াই, তেমনি পশ্চিমবঙ্গেও মানুষের কাছে নির্বাচনটি তৃণমূলের বিরুদ্ধ ও স্বপক্ষের লড়াই। বিহারে বামপন্থীরা যতই বিজেপির বিরুদ্ধে আক্রমণ কেন্দ্রীভূত করেছেন, মানুষের কাছে নির্বাচনটি আবর্তিত হয়েছে নীতিশকুমারে। ফলে বিজেপি নিজেদের শক্তি অটুট রাখতে সমর্থ হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এখন বিজেপির যা বাড়বাড়ন্ত তার সবটাই তৃণমূলের প্রতি মানুষের বীতশ্রদ্ধতা থেকে। এখানে বিজেপির প্রতি তৃণমূল-নিরপেক্ষ ইতিবাচক সমর্থন একেবারে সামান্যই। তৃণমূলের প্রতি এই যে সর্বস্তরে বিপুল ক্ষোভ তাকেই ব্যবহার করেছে বিজেপি ২০১৯ সালে। ২০২১-এ ও তাদের লক্ষ্যবস্তু তৃণমূলের প্রতি বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠা মানুষই। তৃণমূলের বিরুদ্ধে ক্ষোভের মাত্রা এতটাই প্রবল যে গ্রামাঞ্চলে কিছু কিছু একশো শতাংশ মুসলিম গ্রামেও বিজেপি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি শান্তিনিকেতনে গিয়ে একজন বামপন্থী মুসলিম তরুণের মুখেই এই খবর শুনলাম। এই সর্বব্যাপী তৃণমূল বিরোধী ক্ষোভ হওয়ার কারণ তো তৃণমূল নিজেই। ২০০৯ সাল থেকে এই রাজ্যে বিজেপির ভোট প্রাপ্তির পরিমাণ কেমন ছিল? ২০০৯- ৬.১৪%, ২০১১-৬.৫২%, ২০১৪-১৭.০২%, ২০১৬-১০.১৬%, ২০১৯-৪০.২৫%। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ২০১৪ থেকে ২০১৬ এর মধ্যে বিজেপির ভোট কমল কেন? ২০১৯ এ এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধিই বা হল কেন? এই প্রায় অলৌকিক ঘটনাটিকে অনেকে রাজনৈতিক ঘটনাবলী বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ভোটের পাটীগণিত দিয়ে বিচার করতে চাইছেন। এবং ছদ্মবেশী তৃণমূল ও বিজেপি সমর্থকরা বলছেন, সিপিআইএম দলীয় স্তরে সিদ্ধান্ত নিয়ে ভোটবদল করেছে। এগুলো সিপিআইএম এর প্রতি হীনমন্যতায় ভোগা ক্ষুদ্র বামপন্থীরাও বলে। ২০১৯ সালে গুণিতক হারে বিজেপির ভোট বৃদ্ধি আসলে তৃণমূলের বিরুদ্ধে গুণিতক হারে ক্ষোভ বৃদ্ধির ফল। কেন এমন হল? কী এমন ঘটলো ২০১৬ থেকে ২০১৯ এর মাঝে? তৃণমূলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ যা বাড়ছিল ধীরে সমান্তর প্রগতিতে, তা হঠাৎ ২০১৬ থেকে ২০১৯ এর মধ্যে এই ক্ষিপ্রগতি গুণিতক হারে বাড়ল কেন? তার জন্য দায়ী ২০১৭ এর পৌর নির্বাচন ও ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে অভূতপূর্ব হিংসাত্মক ঘটনা। সল্টলেকের মত জায়গায় ৮০ উর্ধ সাধারণ ভোটারকে মেরে রক্তাক্ত করা থেকে গ্রামে গ্রামে শ্মশানের পরিবেশ তৈরি করা। বাম আমলেও হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এই হারে সর্বত্র হত না। বাম আমলে কংগ্রেস বা তৃণমূল দিনের পর দিন নানা পুরসভা, জেলা পরিষদ বা পঞ্চায়েতে জয়ী হয়েছে। সরকারের কাছ থেকে সম দৃষ্টি পেয়েই কাজ করেছে। ২০১৭ বা ২০১৮ সালে যে বাস্তবতা ছিল তাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ জায়গায় তৃণমূলই জিতত। তবে কেন এত হিংসাত্মক ঘটনা ঘটল। এক, বিরোধীদের সামান্যতম জায়গা ছাড়তে অনাগ্রহ। এবং দ্বিতীয়ত ও প্রধানত, নিজেদের দলের সরকারি প্রার্থীর বিরুদ্ধে গোঁজ প্রার্থীগুলি যেন জয়ী হতে না পারে। ২০১৯ সালে বিজেপির ভোটে সাধারণ মানুষের তৃণমূল বিরোধী ক্ষোভেরই প্রতিফলন ঘটেছে। এটা সত্যি, বামপন্থী কর্মী সমর্থক পরিবারের এক বিপুল অংশও বিজেপির বাক্সে ভোট দিয়েছে। আমার দফতরের এক বামপন্থী কর্মীই অসহায়ভাবে বলেছেন, স্যার, বাড়িতে বাবা মা ভাই স্ত্রী কাউকে আটকাতে পারলাম না। সবাই বলছে, এদের অত্যাচার চরমে উঠেছে। আর পারছি না।

সিপিআইএম এর স্পষ্ট অভিমত, বিজেপির প্রতি সাধারণ ভোটারের সমর্থনের মূল ভিত্তি হচ্ছে সর্বব্যাপী তৃণমূল বিরোধী ক্ষোভ। এখন বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করতে হলে এই তৃণমূল বিরোধী ভোটে থাবা বসাতেই হবে। তৃণমূলের প্রতি নরম হলেই এই ভোট এককাট্টা বিজেপির দিকে যাবে। এ কথা তৃণমূলও জানে। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কখনোই বামেদের সাথে সমঝোতার কথা বলছেন না। তাঁর হিসেব, তৃণমূল বিরোধী ভোট বিজেপি ও বাম-কংগ্রেসে ভাগাভাগি হয়ে তাদের আসন সুরক্ষিত রাখুক। দিলীপ ঘোষও চায় বিজেপি বিরোধী ভোটটা তৃণমূল ও বাম-কংগ্রেসে ভাগ হয়ে থাক। দীপঙ্কর ভট্টাচার্য শুধু দিলীপ ঘোষের হিসেবটা দেখতে পাচ্ছেন, মমতারটা নয়। সিপিআইএম জানে এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রতি সমর্থনের চেয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে ক্ষোভটিই প্রধান হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতাকে ভুলে তৃণমূলের প্রতি নরম হলে বিজেপির ভোট ৫০ শতাংশ পেরিয়ে যাবে।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রাথমিক শক্তিটি একটি ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো মিডিয়া নির্মিত সত্য। অমিত শাহের বোলপুরের রোড শো এর পথ ছিল এক কিলোমিটারের কম। তাতে এক একটি লাইনে দশটি করে লোক থাকলেও পনেরো হাজারের চেয়ে বেশি হিসেবে আসে না। মিডিয়া তাকেই লক্ষ লক্ষ মানুষ বলেছে। এই সেদিন অফিস যাওয়ার পথে বর্ধমানে হঠাৎ শুনি মাইকে বলছে, অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের মহামিছিল স্টেশন থেকে কার্জন গেটের দিকে এগিয়ে আসছে। ভয় পেয়ে গেলাম, যেতে পারব তো? বর্ধমানের মানুষ বুঝবেন হিসেবটা, একটু এগোতেই বিএসএনএল অফিসের মুখে পেলাম মিছিলের মুখ। সামনে এক লাইনে দশটি করে মানুষ। ছবি তুললে, লক্ষ লক্ষ বলে খবর হবে। পোস্ট অফিসের পাশ দিয়ে গাড়ি নিয়ে এগোতেই দেখি বাদামতলার মোড়ে মিছিলের শেষ মাথা। কতটা দৈর্ঘ্য পথের? ২৫০ মিটার। কত লোক হতে পারে? মিডিয়া বলবে হাজার হাজার। আপনি বলুন?

তবে একটি কথা বলার। এখনও অবধি নির্বাচনটি বিরোধিতার নেতিবাচক প্রচারে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। বাম-কংগ্রেস জোটকে বলতে হবে আমরা ৩৪ বছরের এই ইতিবাচক কাজগুলোকে ফিরিয়ে আনবো। নেতিবাচক এই এই দিকগুলি আত্মসমালোচনা ও পর্যালোচনার পর আমরা পরিহারের সিদ্ধান্ত নিলাম। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন আরো এই এই কাজ করব। আত্মসমালোচনা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে ইতিবাচক প্রচারে নামতে হবে। দিল্লির সেবারের নির্বাচনে আপের চমকপ্রদ জয়ের নেপথ্যে ছিল অকপট আত্মসমালোচনা ও সুনির্দিষ্ট আগামীর কর্মসূচি (যদিও কেজরিওয়ালের পরবর্তীতে অধঃপতন ঘটেছে অনেকের মতই)। সৎ বিজেপি বিরোধী মানুষদের বুঝতে হবে, অঙ্কের চালাকি দিয়ে বিজেপিকে ঠেকানো যাবে না। যাবে রাজনৈতিক লড়াই দিয়েই। সংখ্যার নিয়মে ‘ক’ ও ‘খ’ দু’টি সংখ্যা হলে ক আর খ যুক্ত হলেই ক+খ হবে এবং ক+খ হলেই খ+ক হবে। সংখ্যার বিনিময় নিয়মের যোগের হিসেবে গোটা গণিত যেমন নিয়ন্ত্রিত হয় না, তেমনি রাজনীতিতেও ক আর খ যুক্ত হলেই ক+খ হয় না। আবার ক+খ হলেই খ+ক হয় না। রাজনীতিতে জোট হয় ঐক্য ও সংগ্রামের কঠিন পথ দিয়ে। তখনই ক আর খ যুক্ত হলে ক+খ হয় এবং খ+ক’ও হয়।

লেখক : প্রখ্যাত সুরকার ও শিল্পী এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 85
    Shares