বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২৫
শীর্ষ সংবাদ

নারী-শিশু ধর্ষণ-নির্যাতন-হত্যার প্রতিবাদে মহিলা ফোরামের মশাল মিছিল

এখানে শেয়ার বোতাম

নিজস্ব প্রতিবেদক:: আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম এর উদ্যোগে সারাদেশে নারী-শিশু ধর্ষণ-নির্যাতন-হত্যার প্রতিবাদে ঢাকায় মশাল মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত।

আজ রবিবার (৮ মার্চ) বিকাল ৪.৩০টায় শাহবাগে অবস্থিত জাতীয় জাদুঘরের সামনে সমাবেশ ও মশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মশাল মিছিল শাহবাগ মোড় থেকে টিএসসি মোড় প্রদক্ষিণ করে রাজু ভাষ্কর্যে শেষ হয়।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম এর কেন্দ্রীয় সভাপতি রওশন আরা রুশো এবং পরিচালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শম্পা বসু ।

সভায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ ঢাকা নগর শাখার সদস্য সচিব জুলফিকার আলী, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম এর ঢাকা নগর সদস্য প্রীতিলতা, নারায়ণগঞ্জ জেলা সংগঠক জেসমিন আক্তার, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আল কাদেরী জয়, সদস্য সুস্মিতা মরিয়ম।

বক্তাগণ নারী দিবসের ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্কের সুঁই কারখানার নারী শ্রমিকেরা ১২/১৬ ঘণ্টা শ্রম, অমানবিক কাজের পরিবেশ, মজুরি বৈষম্য, অভিবাসী ও কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে এবং ভোটাধিকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। হাজার হাজার নারীর এ মিছিলে পুলিশ নৃশংস হামলা চালায়। এতে আহত ও গ্রেফতার হন অসংখ্য নারী শ্রমিক। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। ইউরোপের দেশে দেশে কারখানার নারী শ্রমিকেরা এ ঘটনার প্রতিবাদে আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে ৮ ঘণ্টা শ্রম সময়ের দাবিতে গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক মে দিবসের রক্তাক্ত শ্রমিক অভ্যুত্থান।

১৮৮৯ সালে সর্বহারা শ্রেণির মহান নেতা ফেড্রারিখ এঙ্গেলসের উদ্যোগে প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলন। এ সম্মেলনে জার্মান কমিউনিস্ট নেত্রী ক্লারা জেটকিন সর্বক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমানাধিকারের দাবি জানান। এ দাবি শ্রমজীবী ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত নারীদেরকে অনুপ্রাণিত করে। নারী আন্দোলনকে সংগঠিত করার লক্ষ্যে ১৯০৭ সালে জার্মানির স্টুটগার্ডে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে ক্লারা জেটকিন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯০৮ সালে ভোটাধিকারের দাবিতে নিউইয়র্কের নারী দর্জি শ্রমিকরা ঐতিহাসিক আন্দোলন শুরু করেন এবং ১৯০৯ সালে নারী শ্রমিকদের সভায় নারীর ভোটাধিকারের দাবি প্রস্তাব হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে দ্বিতীয় আর্ন্তজাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলনে ক্লারা জেটকিন বহু সংগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ৮ মার্চকে নারী দিবস ঘোষণার প্রস্তাব করেন। রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের রূপকার মহামতি লেনিনের উদ্যোগে এ প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহিত হয়। তখন থেকে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে দুনিয়ার দেশে দেশে পালিত হয়ে আসছে।

বক্তারা বাংলাদেশে নারী সমাজের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে বলেন, নারী দিবস ঘোষণার ১০৯ বছর পরেও আমাদের দেশের নারীরা রাষ্ট্রীয়ভাবেই আইনী বৈষম্যের শিকার হয়ে সমান অধিকার থেকে বঞ্চিত। এখনও সম্পত্তির উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়নি। ‘সমকাজে সমমজুরি’ আইনে থাকলেও, প্রায় সকল অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তার বাস্তবায়ন নেই। পোশাক কারখানায় ৮০% নারী শ্রমিক যৌন নিপীড়নের শিকার হন। তাদের মজুরীও পৃথিবীর মধ্যে সর্বনিম্ন। চা বাগানের অধিকাংশ শ্রমিক নারী। তারা দিনে ২৩ কেজি চা পাতা তুললে ১০২ টাকা মজুরী পান। অমানবিক নিম্ন মজুরি ও নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশের মধ্যে নারী শ্রমিকদের জীবন কাটে।

নারীরা সারাদিন গৃহস্থালির কাজ করেন, তারপরও তাদের শ্রমের স্বীকৃতি মেলে না। অন্যদিকে সারাদেশে নারী-শিশু নির্যাতন-ধর্ষণ-হত্যা বেড়েই চলেছে। প্রতিদিন পত্রিকা খুললেই খুন-ধর্ষণ-অপহরণ-নির্যাতনের ঘটনা। একটি নির্যাতনের ঘটনা বিভৎসতায়, বর্বরতায় আগেরটিকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, সারাদেশে নারী-শিশু ধর্ষণ ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে দুইগুণ বেড়েছে। পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৯ সালে নারী-শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে ৭ হাজার ৯০০টি এর মধ্যে ধর্ষণ মামলা ৫ হাজার ৪০০টি। শিশু আধিকার ফোরাম তাদের ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে যে প্রতি মাসে গড়ে ৮৪ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এমন ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে নারী ও শিশুরা বসবাস করছে। বিবাহিত নারীদের ৮৬ শতাংশ ঘরেই নির্যাতনের শিকার হন, ৯৪ শতাংশ নারী গণ-পরিবহনে নানা প্রকার যৌন নিপীড়নের শিকার হন, বাল্যবিবাহ ৫২ শতাংশ এটাই স্বাধীন দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীর জীবন চিত্র!!

বক্তারা আরও বলেন, পুঁজিবাদ টিকে থাকে মুনাফার উপর। পুঁজিবাদী সমাজে নারীর শ্রম সস্তা আর তার দেহ বাজারের পণ্য; দুই-ই মনুফার উৎস। নারীকে তারা অধস্থন করে রাখতে চায়, তারা চায় না নারী তার অধিকার আদায়ে সরব হোক, যেন তাদের মুনাফার সা¤্রাজ্য ধ্বসে না পড়ে। সেজন্য পুঁজিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো, বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি এবং তাদের দোসর বুর্জোয়া মালিক শ্রেণি নারী দিবসের সংগ্রামী চেতনাকে ভুলিয়ে দিতে চাই। তারা নারী দিবসকে কেবলমাত্র আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবশিত করতে চায়।

নারী দিবসের সংগ্রামী চেতনাকে উর্দ্ধে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, মুনাফাভিত্তিক ভোগবাদী সমাজব্যবস্থা নারীকে অধিকার দেয় না, মর্যাদা দেয় না; পুরুষতন্ত্রকে জিইয়ে রাখে। বক্তাগণ এক নতুন মানবিক সমাজ-রাষ্ট্র গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যেখানে প্রত্যেক মানুষ পাবে তার মানবিক অধিকার ও মর্যাদা; প্রতিষ্ঠিত হবে আইনের শাসন তথা সামাজিক সুবিচার; যা ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা ও অঙ্গিকার। আন্তর্জাতিক নারীদিবসের চেতনার মূলেও ছিল শোষণ-বৈষম্যহীন সাম্য সমাজ গড়ার আহ্বান।


এখানে শেয়ার বোতাম