শুক্রবার, ডিসেম্বর ৪

নারী কথনের দুই পৃষ্ঠ

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 35
    Shares

মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন:: আমরা যখন নারীর ধর্ষণের বিরুদ্ধে লড়ছি তখন পৃথিবীতে চার প্রতিভাধর নারী বিজ্ঞান ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য পেয়েছেন নোবেল পুরষ্কার।

আমাদের মতো পশ্চাৎপদ আড়ষ্ট চরম পিতৃতান্ত্রিক দেশে যখন নারীর উপর আক্রমণ চলছে, প্রতিনিয়ত যখন ঘরে বাহিরে নারী নিগৃহীত হচ্ছে, তখন পৃথিবী নামক গ্রহে চার প্রতিভাধর নারী বিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক, বিজ্ঞান এবং সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য পেয়েছেন নোবেল পুরষ্কার । তাঁদের মধ্যে রসায়ন বিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন দুইজন

ফরাসি ও মার্কিন যুগলবন্দি। শারপন্টিয়ের ফরাসি বিজ্ঞানী এবং ডাউডনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৷এই দুই মহৎ নারী বিজ্ঞানী জিনোম এডিটিং-এর পদ্ধতি আবিষ্কার করার জন্য এই দুই নারী বিজ্ঞানী নোবেল পেয়েছেন।

নোবেল কমিটির মতে,তাঁরা ‘জেনেটিক সিজার্স’ আবিষ্কার করেছেন৷ এই আবিষ্কার জীববিজ্ঞানকে অনন্য নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে৷কারণ মানব দেহের বিবর্তন এবং জেনেটিক ফরমেশন গুলে আরো নিখুঁতভাবে শনাক্ত সম্ভব। এর জন্যই তাঁরা সোনার মেডেল ও নয় লাখ ৫০ হাজার ইউরো পুরস্কার পাবেন বলেও নোবেল কমিটি জানিয়েছেন।

এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকরা প্রাণী জগতের এবং উদ্ভিদ জগতের অর্থাৎ মাইক্রোঅর্গানিজম বা উদ্ভিজ্জাণুর ডিএনএ-তে পরিবর্তন ঘটাতে পারছেন৷যা চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং উদ্ভিদ বিজ্ঞান সমৃদ্ধ হয়েছে। এই প্রযুক্তি জীববিজ্ঞানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাবে বলে বিজ্ঞানীরা আশা পোষণ করেছেন ৷ জীব বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব পরিবর্তনের সূত্র বা আবিষ্কার ক্যানসার চিকিৎসাতেও মৌলিক ভূমিকা রাখবে৷মানব দেহে যে সব রোগ উত্তরাধিকার সূত্রে আসে,এবং যা মানুষ ভোগান্তির শিকার হয় প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাও নিরাময় করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে৷

কোষের মধ্যে জিন পরিবর্তনের অভূতপূর্ব আবিষ্কার এই দুই নারী গবেষক করেছেন তা কঠিন ও সময়সাপেক্ষ তো বটেই, একসময় অসম্ভব বলে মনে করা হতো৷ তাঁরা সিআরআইএসপিআর/ক্যাস৯ জেনেটিক সিজার্স ব্যবহার করে সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন৷যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন সংযোজন।

এই দুই নারী বিজ্ঞানী ২০১২ সালে তাঁরা এই আবিষ্কার করেন৷ তাঁদের কাজের উপর ভিত্তি করে ইতিমধ্যে একাধিকবার অনেক কিছুই পরে আবিষ্কার হয়েছে৷ জীববিজ্ঞানী এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানী এবং গবেষকরা এই আবিষ্কারের ফলশ্রুতিতে নতুন নতুন দিকের সন্ধান পাচ্ছেন৷ এর ফলে নানাভাবে মানব জাতির কল্যাব হচ্ছে।

সাহিত্যে নোবেল জিতলেন আ্যামেরিকান কবি অধ্যাপিকা লুইস গ্ল্যুক৷ মার্কিন সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

নোবেল সুইডিশ একাডেমি বলছে, সরল ও সৌন্দর্যময় সুস্পষ্ট কাব্যিক কণ্ঠস্বরের জন্য এ বছর সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে লুইস গ্লুককে। তার কাব্যিক ঢং স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে সার্বজনীন করে তোলে।মার্কিন কবি লুইস গ্লুক। এই কবি তাঁর কবিতার সাবলীল আর ব্যতিক্রমী ভাষাশৈলী দিয়ে নিজেকে এমনভাবে প্রকাশ করেন, যা একাধারে হয়ে ওঠে স্থানিক ও বৈশ্বিক।

সাহিত্যের নোবেলজয়ী এই মার্কিন কবির সর্বাধিক প্রশংসিত কাব্যগ্রন্থের নাম ‘দ্য উইল্ড আইরিস।’ ১৯৯২ সালে লেখা এই কাব্যগ্রন্থের ‘স্নোড্রপস’ নামের এক কবিতায় শীতের শেষে জীবনের কল্পনা শক্তিকে প্রত্যাবর্তনের বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। তার এই কবিতা ব্যাপক সাড়া জাগানো হিসেবে সাহিত্য অঙ্গনে সমাদৃত।

অন্যদিকে জ্যোর্তিবিজ্ঞানে গ্যালাক্সীর কৃষ্ণ গহ্বর নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন যক্তরাষ্ট্রের ‘আন্দ্রেয়া ঘেজ’ বলে জানিয়েছে সুইডিশ অ্যাকেডেমি৷

পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলোর মধ্যে জ্যোর্তিবিজ্ঞান একটি কোর্পানিকাস,জিওনাদ্রো ব্রুনো,জন কেপলার, গ্যালিলিন গ্যালিলিও, আইজাক নিউটন, আইনস্টাইন, স্টিফেন হকিংয়ের মত বাঘা বাঘা বিজ্ঞানী জ্যোতিবিজ্ঞানে কাজ করে পৃথিবীর ইতিহাসে দর্শনের বিগত ইতিহাস থেকে বর্তমান ইতিহাস আলাদা করে ফেলেছে, ফলে এই শাখা নিয়ে জনসাধারণের কৌতূহলের শেষ নেই। ইতিমধ্যে আবার গত পাঁচ ছয় বছর ধরেই জ্যোতির্বিজ্ঞানের জয়জয়কার চলছে। নাসার মঙ্গলের বুকে পানির সন্ধান, নিউ হরাইজন্সে প্লুটোর প্রথম স্পষ্ট ছবি ধারণ, ভয়েজারের সৌরজগৎ পেরোনো, লাইগোর (LIGO) প্রথমবার মহাকর্ষীয় তরঙ্গের অস্তিত্ব আবিষ্কার, প্রথম ব্ল্যাক হোলের (কৃষ্ণবিবরের) ছবি ধারণ করতে সক্ষম হওয়া, গোল্ডিলক জোনে আরো অনেক গ্রহের (Exoplanets-বাহ্যগ্রহ) আবিষ্কার ইত্যাদি নানা বড় বড় বিষয়ের জন্য জ্যোতির্বিদরা গার্ডিয়ান পত্রিকার প্রথম শিরোনাম হয়েছেন প্রতিনিয়তই।

২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত নোবেল পুরষ্কারেও জ্যোতির্বিদদের, কিংবা মোটাদাগে তাত্ত্বিক পদার্থবিদদেরই জয়জয়কার। গেল পাঁচ বছরের তিনবারই নোবেল গেছে জ্যোতির্বিজ্ঞানের নানা শাখায়। ২০২০ সালে নোবেল পেয়েছেন ডক্টর রজার পেনরোজ, ডক্টর রেইনহার্ড গেঞ্জেল ও ডক্টর আন্দ্রেয়া ঘেজ।( তথ্য সূত্র DW)

বিজ্ঞান সাহিত্যে নারীর এমনতর জয়জয়কার অবদান দেখলে আমাদের আশার জাগরণ ভারী হতাশায় নিমজ্জিত হয়। কারন আমরা পিছিয়ে আছি মধ্যযুগীয় অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে।

আমাদের দেশের নারীদের করুন চিত্র দেখে একবার নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া বলেছিলেন,,
“আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগন ধর্মগ্রন্থ গুলোকে ঈশ্বরের আদেশ পত্র বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন”

আমাদের দেশের মতো পৃথিবীর কোথাও এমন সংগঠিত ভন্ড নেই যারা প্রকাশ্যে দিবালোকে নারীর মর্যাদার উপর আক্রমণ করে। নারীর আত্মসম্মানবোধের উপর আক্রমণ করে।এমন মধ্য যুগীয় চিন্তা এবং পুঁজিবাদী, ভোগবাদী, আত্মসর্বস্ব মানসিকতা কতোটা ভয়ংকর হলে আজকের আধুনিক জগতে বসবাস করেও নারীকে মানুষ হিসেবেই স্বীকৃতি দিতেেই তারা অস্বীকৃতি জানায়।

অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বৈষম্যের ভিতর দিয়ে নারীকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা বাকী আছে।অর্থনৈতিক বৈষম্যের আঘাতে নারী আজ সংকোচিত অবদমিত নিগৃহীত।

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মাদক, জুয়া, মদ, ইয়াবা, পর্নোগ্রাফির ব্যাপক বিস্তার উপর থেকে নিচ পর্যন্ত।নাটক, সিনেমায়, গানে এবং পণ্য দ্রব্য বিজ্ঞাপন উপস্থাপনায় সাংস্কৃতিক উপাদান হিসেবে নারীকে ভোগ্য পণ্য হিসেবে উপস্থাপন নারীর আত্মসম্মানবোধকে করেছে ভুলণ্ঠিত।

রাষ্ট্রের একচেটিয়া রাজনৈতিক শক্তিকে পেশি শক্তির উপর নির্ভর করতে গিয়ে একঝাঁক তরুণ, যুবক, সন্ত্রাস বাহিনী হিসেবে তৈরি করেছে। যারা মূলত অর্থের বিনিময়ে পেশিশক্তি বিক্রি করে। অন্যায্য রাষ্ট্র তাদের হিংস্র শক্তিকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিতে গিয়ে রাষ্ট্র নিজেই সীমাহীন বিপদে পড়েছে।খুন ধর্ষণ রাহাজানি সন্ত্রাসের মতো ভয়াবহ সামাজিক অনাচার সৃষ্টি করেছে যার ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ এবং নারী।

আমাদের দেশের মানুষের বিশেষ করে পুরুষ মানুষের দৃষ্টি ভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে বেগম রোকেয়া যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশী লক্ষ করেছেন তা হচ্ছে, হৃদয়হীন পুরুষের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। শিক্ষা সংস্কৃতি এবং সভ্যতার ছোঁয়া না লাগার দরুন এ দেশে বিশাল একটা প্রজন্ম তৈরি হয়েছে যাদের নাই সংবেদনশীলতা নাই স্পর্শকাতরতা।গণ্ডারের চামড়া পরিবেষ্টিত একটা নকল জাতি গড়ে উঠেছে।যাদের মস্তিষ্ক আসল জিনিস বলতে কিছু নাই।নাই সুস্থ চিন্তার উপাদান।

তাই…বেগম রোকেয়া অর্ধাঙ্গি প্রবন্ধে বলেছেন, ‘স্বামী যখন পৃথিবী হইতে সূর্য ও নক্ষত্রের দূরত্ব মাপেন, স্ত্রী তখন একটা বালিশের ওয়াড়ের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ মাপেন। স্বামী যখন কল্পনার সাহায্যে সুদূর আকাশে গ্রহ-নক্ষত্রমালা বেষ্টিত সৌরজগতে বিচরণ করেন এবং সূর্য মণ্ডলের ঘনফল তুলাদণ্ডে ওজন করেন এবং ধূমকেতুর গতি নির্ণয় করেন, স্ত্রী তখন রন্দনশালায় বিচরণ করেন, চাউল-ডাল ওজন করেন এবং রাঁধুনির গতি নির্ণয় করেন।’

পুরুষ নারীকে সমকক্ষে দেখতে চায় না।নারীকে অশিক্ষিত রেখে স্বপীজের রেডিমেট পুতুল এবং রন্ধন শালায় পাঠিয়ে নারীর আত্মসম্মানবোধ, জ্ঞান অর্জন কৌতূহলী মনন,বিশ্ব জগৎ সম্পর্কিত জিজ্ঞাসা,এবং মানবিক সমাজিক জ্ঞান অর্জনের সমস্ত দরজা বন্ধ করে দিয়ে তাতে নারীর জাতির ক্ষতি হলেও আখেরে ক্ষতি হয়েছে গোটা মানব জাতির।

কি দুর্দশাগ্রস্থ জাতি একজন নারী বিজ্ঞানী নাই,সাহিত্যিক নাই,চিত্রশিল্পী নাই,দার্শনিক নাই,গবেষক নাই,যাঁরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্ব মানবতায় অবদান রাখতে পারে?
যার দরুন গোটা জাতির বুকে চাপা পড়েছে অন্ধকারাচ্ছন্ন এক পাশবিক জগদ্দল পাথর।

এই পাশবিক জগদ্দল পাথর সরানোর কাজে প্রয়োজন দেশের সমস্ত জনগোষ্ঠীর একটা জাগরণ।

রবীন্দ্র, নজরুল, শরৎ, সুকান্তরা এসেছিলেন বিদ্রোহ করার জন্য। রাষ্ট্র সমাজ সংসারের বদ্ধমূল সংস্কার, সংস্কৃতি, প্রথা, রীতিনীতি এবং ফতোয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে গিয়ে কিছুটা মানুষ হয়েছেন।কাপন দিয়েছেন জগদ্দল পাথরটাকে। কিন্তু সরাতে পারেন নি।না পারার প্রধান কারন রাষ্ট্র।কারণ রাষ্ট্রের দানবীয় চরিত্রটিকে পাল্টানো যায় নি।তাঁদের পরবর্তী কোন প্রজন্ম মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে নি। দেশটা সাহারা মরুভূমি হওয়ার উপক্রম।যা মানুষ চাষের অনুপযোগী।

ইতিহাস সচেতন বিদ্যাসাগর বুঝতে পেরেছিলেন।
তাই ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর এই বাঙালি জাতিকেই উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “এ দেশ উদ্ধার হইতে বহু বিলম্ব আছে,পুরাতন প্রকৃতি ও প্রবৃত্তি বিশিষ্ট মানুষের চাষ উঠাইয়া দিয়া সাত পুরু মাটি তুলিয়া ফেলিয়া নতুন মানুষের চাষ করিতে পারিলে, তবে এ দেশের ভালো হয়।”

এই পুরাতন মানুষ, পুরাতন চিন্তা, পুরাতন দর্শন, পুরাতন অভিজ্ঞতা, পুরাতন বৃত্তি প্রবৃত্তি রীতিনীতি,গ্রন্থ,কিতাব,পুরাতন কৃষ্টি সংস্কৃতি, পুরাতন কর্ম প্রক্রিয়া পদ্ধতি, পুরাতন আচার-ব্যবহার ধুয়েমুছে নতুন সংযোজন করে, নতুন উপলব্ধি, নতুন আবিষ্কার, নতুন চিন্তা চেতনা, নতুন মানুষ সৃষ্টি না হলে নোবেল পুরষ্কার কেন, কোন পুরষ্কারই আমাদের ভাগ্যে জুটবে না।

লেখক: কলামিস্ট


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 35
    Shares