মঙ্গলবার, মে ১১
শীর্ষ সংবাদ

নষ্ট ছেলেদের কান্ড!!!

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 30
    Shares

নাজিকুল ইসলাম রানা::


হ্যাঁ, সমাজের একটা বড় অংশের মানুষের কাছে এরা এক ধরণের উচ্ছন্নে যাওয়া নষ্ট ছেলেমেয়ে। এরা নাচ-গান করে, নাটক-ফাটক করে জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করে। দেশের প্রতিটি ক্রান্তিকালে এরা জীবন বাজি রেখে বুক টান করে জনতার জন্যে দাড়ায়। নিজের ছোট্ট সম্বল নিয়েই অনেক বড় কর্ম সমাধা করতে দিনরাত একাকার করে ফেলে। এদের নির্মোহ কর্মযজ্ঞ দেখে নিন্দুকেরাও মাঝে মাঝে আহা-ওহু করে। নিজের কথা না ভেবে নিজের পরিবারের কথা না ভেবে এরা ছুটে চলে লক্ষ্য ঠিক রেখে আপন মহিমায়। কোন বাধনই যেন এদের জন্যে বাঁধা হয়ে দাড়াতে পারে না। হ্যা, বলছিলাম সিলেটের সাংস্কৃতিকর্মীদের কথা।

সারা পৃথিবীর ন্যায় আমাদের প্রিয় বাংলাদেশও আজ করোনার জন্যে বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়েছে। সংক্রমণের ঝুকি এড়াতে সরকার ইতিমধ্যেই সারাদেশে শারিরীক দূরত্ব বজায় রাখার স্বার্থে লকডাউন সহ বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ, বিশেষ করে যারা দিন আনে দিন খায় তারা প্রথমেই পরেছে সবচেয়ে বিপাকে। তাদের সহায়তায় সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ এগিয়ে এসেছেন। তারা সকলেই সাধুবাদ প্রাপ্য।

এবার আসি মূল প্রসঙ্গে, গত ৮মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হওয়ার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো সিলেটে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড একে একে নিজেরাই বন্ধ করে দিয়েছে এই কাজের সাথে যুক্ত সাংস্কৃতিকর্মীরা। ১৭মার্চের পর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। সাংস্কৃতিকর্মীরা অন্য বেশিরভাগ মানুষের মতোই নিজের নিরাপত্তার জন্যে ঘরে ফিরে যাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু না, বাস্তবে তা হয়নি। তারা ভাবলেন ভিন্ন আরেক পন্থা, যা সাধারণ মানুষ ভাবে না। সাংস্কৃতিকর্মীরা প্রগতিশীল চিন্তা চেতনার অধিকারী হওয়ায় তারা বুঝতে পারেন সবাই ঘরে বসে থাকলে সমাজকে ভাইরাসমুক্ত করা সম্ভব নয়। সমাজের একটা বড় অংশ যেখানে অসচেতন সেখানে সচেতনা কার্যক্রম যদি পরিচালনা করা না যায় তাহলে ঘরে থেকেও নিজেকে সংক্রমণ থেকে মুক্ত রাখা সম্ভব হবে না। যেই ভাবা সেই কাজ, শুরু হয় কর্মপরিকল্পনা…. সিনিয়রদের দিকনির্দেশনা আর জুনিয়রদের অক্লান্ত কর্মোদ্যম এক অভাবনীয় ঘটনা সংঘটিত হতে শুরু হয়। পরিচিতজনদের কাছ থেকে শুরু হয় আর্থিক সহযোগিতা নেয়া, সীমিত হলেও সাধ্যের সর্বোচ্চ দিয়ে শুরু হল পথচলা…… প্রথমে শুরু করলেন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের মাঝে হ্যান্ড সেনিটাইজার, সাবান ও মাস্ক বিতরণ। এভাবে এসব সামগ্রী কয়েকদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বিতরণ করলেন সাংস্কৃতিকর্মীরা।

রাস্তায় ঘুরে ঘুরে উপলব্ধি করলো খেটে খাওয়া মানুষের মূল কষ্ট আসলে ক্ষুদা। যার জন্যে তারা বাধ্য হচ্ছে ঘর থেকে বের হতে…. তাহলে উপায় কি??? সরকারি সাহায্য তো সকলে পাবে না, তাছাড়া সরকারি সাহায্য প্রক্রিয়া এদের দোড়গোড়ায় পৌছাতে একটু সময়ের প্রয়োজন। তাই কী করা যায়?? নতুন সংকটের সূত্রপাত, নতুনভাবে আবার পরিকল্পনা। সীমিত সাধ্যে কতটুকুই বা করতে পারবে এরা?? তার মধ্যে রয়েছে সংক্রমণের মারাত্মক ঝুকি। কিভাবে কী করা যায়?? বসে থাকাটাও একধরণের দায়হীনতা। সাংস্কৃতিকর্মীরা এই দায়ের জায়গাতেই বড্ড আবেগী এবং অসহায়। তাই জাতির সকল ক্রান্তিলগ্নে এরা সকলের মাঝে থেকে সকলকে নিয়ে সংকট মোকাবেলা করতে উৎসাহিত করেছে। দেখিয়েছে সীমিত সাধ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার ও প্রয়োগ। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। শুরু হলো নতুনভাবে কর্মোদ্যোগ। কর্মহীন অসহায় মানুষের মাঝে বিনামূল্যে খাদ্য সামগ্রী পৌছে দেবার অত্যন্ত সাহসী ও ব্যয়সাপেক্ষ উদ্যোগ। প্রথমে নিজেদের দেয়া অর্থ দিয়েই এরা শুরু করে এই কর্মসূচী। এদের আন্তরিকতা দেখে সমাজের অনেক বিবেকবান ও সাংস্কৃতিক শুভানুধ্যায়ী এগিয়ে এলেন। সকলের এই সম্মিলিত প্রয়াস কখনোই স্বাভাবিক থাকতো না যদি কর্মের কোথাও অসততা বিদ্যমান থাকতো। আমি ব্যক্তিগতভাবে এদের প্রায় সকলকেই চিনি, এদের আন্তরিকতা নিয়ে, কমিটমেন্ট নিয়ে, সমাজের প্রতি মানুষের প্রতি দায় নিয়ে এরা প্রত্যেকেই আপন মহিমায় উজ্জ্বল।

প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা কাজ করে চলেছে বিরামহীনভাবে…. এখানে একেকজনের একেকরকম দায়িত্ব পালন করছে। কেউ বাজার থেকে খাদ্য নিয়ে আসছে, কেউ গাড়ি থেকে তা নামিয়ে আনছে, কেউ প্যাকেট তৈরি করছে, কেউ হিসেব রাখছে, কেউ তথ্য সংগ্রহ করছে, কেউ অর্থ বা খাদ্য সামগ্রী দিতে চাইলে তা সংগ্রহের কাজ করছে কেউ কেউ, কেউ আবার নিজেদের বাহন দিয়ে সহযোগিতা করছে, কেউ এদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করছেন, কেউ দিনশেষে এদের আপন গৃহে পৌছে দেয়ার ব্যবস্থা করছে, কয়েকজন প্রতিদিনের কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে নতুন আইডিয়া বের করতে চেষ্টা করছেন, তালিকানুযায়ী সুনির্দিষ্ট জায়গায় পৌছে দেয়ার কাজে শহরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ছুটে যাচ্ছেন কেউ কেউ। এভাবেই একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ সাধনে সচেষ্ট আছেন সমাজের সবচেয়ে সচেতন এই কর্মীদল। এই গোটা বিষয়টি সুনিপুণভাবে কীভাবে করা সম্ভব???নিজেদের মধ্যে কোন ঝামেলা ছাড়া এতোগুলো কর্মীকে দিনরাত পরিচালনা করা কী করে সম্ভব?? যেখানে বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলো কাজ করতে গিয়ে অনেকক্ষেত্রেই চেইন অব কমান্ড মেইনটেইন করতে ব্যর্থ হয় হরহামেশাই। সেখানে দিনের পর দিন এইভাবে নিরলসভাবে কর্ম সম্পাদন করা অত্যন্ত কঠিন। আর কঠিন কাজটি সম্ভব হয়েছে কয়েকটি কারণে, সেগুলো হলো সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায় ও দেশপ্রেম, গুরুজনদের প্রতি আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ, কোন কাজকে ছোট মনে না করা, দায়িত্বের প্রতি একাগ্রতাই এই গোটা আয়োজনটি এখন পর্যন্ত নিপুনভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে।

আরেকটি মজার বিষয় হচ্ছে এই খাদ্য সহায়তা যাদের কাছে পৌছে দেয়া হচ্ছে তাদের নাম ধাম বা ছবি কোথাও দিচ্ছেন না। কারণ হিসেবে তারা বলছেন যাদের দেয়া হচ্ছে তারা যেন সামাজিকভাবে হেয় না হন সেটাই উদ্দেশ্য। কি অদ্ভূত!! অথচ এর বিপরীতে প্রতিদিন অনেককেই দেখি ঢাক-ঢোল পিটিয়ে নামকাওয়াস্তে ত্রাণ দিতে গিয়ে কার আগে কে ছবি তুলবে সেই প্রতিযোগিতা।

অথচ এদেরকেই সমাজে উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলেমেয়ে বলে মনে করে একদল মানুষ। তাদের নাচ-গান-নাটক-চিত্রকলায় সমাজের অসামঞ্জস্যতা বিভেদ অন্যায্যতা তোলে আনায় অনেকের বিরাগভাজন হতে হয় এদের। নষ্টামি বলে হরহামেশাই এদের সগৌরবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে যায় সমাজের অনেকেই নানা জায়গায়। নষ্ট মেয়েছেলে বলে অনেকেই পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ হতে চান না, আরোও কতশত অস্বাভাবিক বিরূপ ধারণা এদের সম্পর্কে সমাজে নানাভাবে নানা কৌশলে আমাদের মগজে ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয় এবং হচ্ছে। কিন্তু কেন??? কারা করছে এসব??? কী উদ্দেশ্যে করছে এমন অপপ্রচার??? এই দূর্যোগে সেইসব অপপ্রচারকারীদের তো চোখে দেখতে পাই না। অতীতেও কেউ দেখেছে বলে কোন ইতিহাস খুজে পাই না। তাদের এই অপপ্রচারে সমাজের সাধারণ মানুষদের অনেকেই বিভ্রান্ত হোন। যে কারণে সাধারণ ঘরের ছেলেমেয়েরা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে এক ধরণের দ্বিধায় ভোগেন। যদিও সাংস্কৃতিক কর্মের সংস্পর্শে এলে অনেকের প্রচলিত ধারণা পাল্টে যায়। নিজেদের ভূল বুঝতে পেরে পরিবার-পরিজন নিয়ে নির্মল বিনোদনে অংশগ্রহণ করেন অনেকেই।

স্বাভাবিকভাবেই তাহলে প্রশ্ন জাগে সমাজের জন্যে কাদের প্রয়োজন??? আমার কাছে সমাজের জন্যে এইসব নষ্ট ছেলেমেয়েদের প্রয়োজন খুব বেশী। কারণ এরা নষ্ট বলেই নিজের জীবন ঝুকিতে ফেলেও সমাজের জন্যে কাজ করে যায় নিবিরভাবে। এইসকল নির্মোহ মানবদরদীদের জন্যেই পৃথিবীর উৎকর্ষতা আজ এতোদূর। ভয় কে জয় করেই মানুষ এগিয়েছে।আমরাও এগিয়ে যাবো। সুদিন আসবেই….
জয় হোক মানবতার, জয় হোক মানুষের।

লেখক : আহবায়ক, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সিলেট


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 30
    Shares