শুক্রবার, নভেম্বর ২৭

ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন কিছু প্রাসঙ্গিক আলাপ

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 60
    Shares

আবু নাসের অনীক::

গত কয়েকদিনের ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন মানুষের মনে আশার আলো সঞ্চার করেছে। রাজনীতিতে যখন একটা বন্ধ্যা সময় পার হচ্ছে সেই মুহুর্তে এই আন্দোলন আশা জাগাবে সেটাই স্বাভাবিক। জনগণ তার ক্ষোভও প্রকাশ করছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। যারা আন্দোলনটি সংগঠিত করছেন তাদের দায়িত্ব জনগণের সামনে মূল সংকটের স্বরুপ উন্মোচন করা। নারীর প্রতি সহিংসতা তাকে শারীরিক বা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করছে শুধুমাত্র তাই নয়, এর একটি অর্থনৈতিক ক্ষতিও তৈরি হয়। ২০১৮ সালের এক গবেষণায় কেয়ার দেখিয়েছে, নারীর প্রতি সহিংসতার কারণে বাংলাদেশে আর্থিক ক্ষতির পরিমান ২৩০ কোটি ডলার বা প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। যা মোট জিডিপির ২.১%।

গতকাল রাজু ভাস্কর্যে ছাত্রলীগের সমাবেশ থেকে ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনকারীদের প্রতি হুমকী দিয়ে বলেছেন,‘এরপরে কোন ধৃষ্টতা দেখালে এই শাহবাগে আপনাদের পাড়াইয়া পিষিয়ে ফেলব। কোন ধরনের প্রশাসন, কোন ধরনের মিডিয়াকে আমরা ভয় পাইনা’। জ্বী জনাব, ভয় পান না বলেই তো এমসি কলেজে গণধর্ষণ করেন, ভয় পেলে তো এসব কাজ থেকে বিরত থাকতেন। ক্ষমতাসীন দলের অনুগত ছাত্র সংগঠনের একজন গুরুত্বপূর্ন নেতা যখন এ ধরনের হুমকি প্রদান করে তখন দুটি বিষয় কিন্তু জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়।

ছাত্রলীগের নামে কেনো ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে এবং ধর্ষণের মত অপরাধ করার পরেও তারা নির্বিকারভাবে ঘুরে বেড়ায়। এরপরেও যারা এই সমস্ত অপরাধকে নিছক সামাজিক অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন তারা মূল ঘটনাকে আড়াল করছেন। ঢাবি ছাত্রলীগ সভাপতির এই বক্তব্য আর প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকনের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ধর্ষক মানিককে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করে কলাম লেখা একই সুত্রে গাথা।

‘ধর্ষণ ও নির্যাতন বিরোধী বাংলাদেশ’ ব্যানারের পক্ষ থেকে ধর্ষণ প্রতিরোধে ৯ দফা দাবি তুলে ধরেছেন ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনকারী সংগঠনগুলি। ভালো কথা। কিন্তু এই ৯ দফা দাবির মধ্যে বর্তমান এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে দাবিটি যুক্ত হওয়ার প্রয়োজন ছিলো সেই দাবিটিই আপনারা যুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। যে দাবি উত্থাপন করেছেন এর সবকটি পূরণ হলেও বাংলাদেশ থেকে ধর্ষণ বন্ধ হওয়া অথবা বিচারহীনতার অবসান হবেনা যতোক্ষণ না পর্যন্ত বিদ্যমান গুন্ডাতন্ত্রকে আপনি চ্যালেঞ্জ না জানাচ্ছেন, যতোক্ষন না পর্যন্ত এই ধর্ষক-বান্ধব রাষ্ট্র ব্যবস্থা- ক্ষমতাকাঠামো উচ্ছেদের দাবি না তুলছেন। আপনারা যখন এই ৯ দফা দাবি উত্থাপন করছিলেন আপনাদের ঠিক পাশেই রাজু ভাস্কর্যে ছাত্রলীগের সমাবেশ থেকে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে, শাহবাগে আপনাদের পাড়ায়ে পিষিয়ে ফেলবে যদি ধৃষ্টতা দেখান ধর্ষণের বিচার দাবি করে। অথচ আপনাদের দাবির মধ্যে এই গুন্ডাতন্ত্র উচ্ছেদের দাবি যুক্ত করতে আপনারা ব্যর্থ হলেন।

ধর্ষণ, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্টের দুটি রায়ে ১৮ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন। যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর সুরক্ষা, নিরাপত্তা, তদন্ত ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট আইন না হওয়া পর্যন্ত ওই ১৮ টি নির্দেশনাকে ‘নীতিমালা’ হিসাবে গণ্য করে তা অনুসরণ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। আপনারা যে ৯ দফা দাবি করেছেন তার প্রত্যেকটি দাবি এই ১৮ দফা নির্দেশনায় গত ২ বছর আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এই ১৮ দফা নির্দেশনা ছাড়াও ধর্ষণ মামলা সম্পর্কিত হাইকোর্ট আরো ৬ দফা নির্দেশনা দিয়েছে। হাইকোট যে নির্দেশনা ২ বছর আগে দিয়েছে আমরা ২ বছর পর সেই দাবি উপস্থাপন করছি!

কিন্তু বাস্তবতা কী? হাইকোর্ট বলছেন,‘ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে বেশ কিছু নির্দেশনা রয়েছে। এসব নির্দেশনা কেউ প্রতিপালন করে না। বরং আদেশ দিলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মাইন্ড (মন খারাপ) করেন’। গত লেখাতেই এটা উল্লেখ করেছিলাম, আইন বাস্তবায়নের কর্তৃপক্ষ যে (সরকার) সে যদি ধর্ষক-বান্ধব হয় তবে সেই আইন যতোই কঠোর হোকনা কেন তা দিয়ে অপরাধ দমন বা প্রতিরোধ কোনটিই সম্ভব নয়। একটা লুটেরা-ধনীক শ্রেনীর পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হতে পারেনা এটা প্রমানীত একটি বিষয়। অথচ সমাজ প্রগতির রাজনীতির ধারক-বাহক হিসাবে আপনারা আপনাদের দাবির মধ্যে গুন্ডাতন্ত্র উচ্ছেদের দাবি স্পষ্ট করতে ব্যর্থ হন। ব্যর্থ হন বলেই জনগণ পথ হারায়!

সরকার, মিডিয়া থেকে শুরু করে সবখানেই বর্তমান ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনকে ‘সামাজিক আন্দোলন’ বলে আখ্যায়িত করতে ব্যস্ত। কারণ তাহলে এর থেকে সরকারের দায়কে আড়াল করে ফেলা অত্যন্ত সহজ একটি কাজ।

১৯৭১ সালে লক্ষ-লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে যে রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে সেই রাষ্ট্রে যখন একই ঘটনা সংঘটিত হতে থাকে এবং সেই ঘটনাকে সামাজিক সমস্যা বলে আড়াল করা হয় তখন কিন্তু যে বিষয়টি প্রশ্ন হয়ে ওঠে তাহল এই স্বাধীনতা কার?? ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পশ্চিম পাকিস্তানি লুটেরা বুর্জোয়া শাষকগোষ্ঠীর কাছ থেকে ক্ষমতা হাতবদল ঘটে কুক্ষিগত হয় এ দেশীয় লুটেরা বুর্জোয়া শাষকগোষ্ঠীর হাতে (এই হাত বদলের লড়াইয়ে লক্ষ-লক্ষ মানুষ শহীদ হন)। যার কারণে পাক বাহিনী ধর্ষণকে যেভাবে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসাবে বেছে নিয়েছিলো একইরকমভাবে স্বাধীন বাংলাদেশে লুটেরা-ধণীক শ্রেণীর শাষকগোষ্ঠী নির্বাচনে পরাজিত হলে অথবা বিপক্ষে ভোট দিলে, রাজনৈতিক-সামাজিক আধিপত্য বিস্তারে, পুরুষতান্ত্রিকতা প্রতিষ্ঠা সব ক্ষেত্রেই ধর্ষণকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে।

এতো কিছুর পরেও বলা হচ্ছে সামাজিক!! পারিবারিক মূল্যবোধকে, শিক্ষাকে দায়ী করা হচ্ছে। এখন বলেন, পারিবারিক মূল্যবোধ বা শিক্ষা এসব কী রাজনীতির বাইরে?? একটি দেশের রাজনীতিকে কেন্দ্র করেই পারিবারিক-সামাজিক-শিক্ষা ব্যবস্থা এগুলো গড়ে ওঠে। সমাজে ধর্ষক তৈরি হয় রাজনৈতিক কারণেই। ভাবুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র, সরকারী দলের ছাত্র সংগঠনের নেতা পাড়ার গুন্ডা যে ভাষায় কথা বলে সেই ভাষায় বলছে,‘পাড়াইয়া পিষিয়ে ফেলব’। এখন বলেন, তার পরিবার কী তাকে এই ভাষায় কথা বলতে শিখিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী কী এভাবে কথা বলতে বলেছে? নিশ্চয়ই না। তার মুখে এ ধরণের ভাষা যুগিয়েছে সে যে গুন্ডাতন্ত্রের-ক্ষমতাতন্ত্রের রাজনীতি করে সেই রাজনীতি। রাজনীতিই নির্ধারণ করে দেয় আপনি কোন ভাষায় কথা বলবেন।

পারিবারিক মুল্যবোধ ক্ষমতাতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্রের কাছে পরাজিত হয়। বুয়েট ছাত্র আবরার হত্যায় যারা যুক্ত তারা প্রত্যেকেই ছিলো মেধাবী শিক্ষার্থী। তাদের কারো পরিবারই ভাবেনি এরা খুনী হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ক্ষমতাতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্র তাদের খুনী বানিয়েছে। তাদের পারিবারিক মূল্যবোধ পরাজিত হয়েছে। যে সমাজে-রাষ্ট্রে এ ধরনের লুটেরা রাজনীতি বিরাজমান থাকে সেখানে পারিবারিক মুল্যবোধ সবসময় বিজয় অর্জন করতে পারেনা। এটাই ট্রাজেডি। যে লড়াই শুরু হয়েছে তাকে যৌক্তিক পরিনতিতে নিতে হলে সুস্পষ্টভাবে, দৃড়ভাবে এই লুটেরা-গুন্ডাতন্ত্র-ক্ষমতাতন্ত্র টিকিয়ে রাখে যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাকে উচ্ছেদের ডাক দিতে হবে।

‘যে-মৃত্যু রাত্রির শীতের জ্বলন্ত বুদ্বুদ্ হয়ে উঠে যায় সেই দিন সেই যুদ্ধ সেই মৃত্যু আনো সেভেন্থ ফিল্টকে রুখে দিক সপ্তডিঙ্গা মধুকর শিঙ্গা ও শঙ্খে যুদ্ধারম্ভ ঘোষিত হয়ে যাক রক্তের গন্ধ নিয়ে বাতাস যখন মাতাল জ্বলে উঠুক কবিতা বিস্ফোরক বারুদের মাটি–’

লেখক: সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 60
    Shares