শনিবার, নভেম্বর ২৮

ধর্ষণ-গণধর্ষণ : এ দায় কার?

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 102
    Shares

সুতপা বেদজ্ঞ ::

বাংলাদেশে এখন প্রতিটি নারী ও কন্যা শিশু প্রতি মুহূর্তে যৌন সহিংসতার আতংকে ভুগছে। বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় যে সকল সামাজিক অপরাধ ক্রমেই নারীকে অনিরাপদ করে চলেছে তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধ হচ্ছে ধর্ষণ-গণধর্ষণ। নারী নির্যাতনের সবচেয়ে বর্বর রূপ হচ্ছে এই ধর্ষণ-গণধর্ষণ। নারী আজ বাংলাদেশের কোথাও নিরাপদ নয়। গ্রাম থেকে নগর, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস, আদালত, থানা, গণপরিবহন, লঞ্চঘাট, বাস-ট্রেন স্টেশন, খেলার মাঠ, এমনকি গৃহ অভ্যন্তরেও নারী নিরাপদ নয়। রাষ্ট্রের কাছেও নারী নিরাপদ বোধ করতে পারছে না। দু-তিন বছরের শিশু থেকে শুরু করে আশি বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত প্রত্যেকেই ধর্ষণের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ধর্ষণ-গণধর্ষণ বাংলাদেশে এখন চরম সন্ত্রাসী রূপ ধারণ করে প্রকৃত অর্থেই মহামারী আকার ধারণ করেছে।

ধর্ষণসহ নারীর ওপর অন্যান্য যৌন সহিংসতা আসলে নারীর অধস্তনতারই বহিঃপ্রকাশ। পুঁজিবাদ-পুরুষতান্ত্রিকতা ও ধর্মীয় মৌলবাদ নানাভাবে এই সহিংসতাকে অনুমোদন ও বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করে। ‘পাঁচহাজার বছরের শ্রেণিবিভক্ত সমাজ পুরুষ প্রাধান্যের যে অর্থনীতি-রাজনীতি-সংস্কৃতি নির্মাণ করেছে এবং সেই ভিত্তিতে নারীর শ্রমের মূল্যায়ন না করে নারী-পুরুষের যে অসম-সামাজিক ওফবহঃরঃু প্রচলিত আছে- সেটা নারীকে শুধু শোষিত-বঞ্চিতই করে না, তার ওপর যৌন সহিংস আচরণের ভিত্তিও তৈরি করে দেয়।’ তাই কোনো নারীর ওপর এই যৌন সহিংসতাকে শুধুমাত্র একক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে নয়, তাকে দেখতে হবে সমাজ ও রাষ্ট্রের চরিত্রের মধ্যে, তার সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তির মধ্যে। প্রত্যেকটি নারী নির্যাতনকে তার সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে যেমন দেখতে হবে, তেমনি তার সাধারণ ভিত্তি খুঁজতে হবে বাংলাদেশের বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রের লুটেরা অর্থনীতি, দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি এবং পশ্চাৎপদ সংস্কৃতির মধ্যে। বাংলাদেশের বর্তমান লুটেরা পুঁজিবাদী এবং পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্বপরায়ণ রাষ্ট্র ও সমাজ নারীকে সহজে ঘায়েল করার কৌশল হিসেবে সমাজের মধ্যে এক ধরনের এসেন্স ছড়িয়ে দেয়। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হওয়া কিছু বিষয়কে কারণে-অকারণে সামনে এনে নারীকে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রবণতা কিছুতেই যেন কমছে না।

পুরুষ ও ক্ষমতাবানদের মনস্তত্তে এমন হিংসাত্মক মনোভাব প্রথিত হয়েছে যে, সংখ্যালঘু দমন, জমি দখল, নারীদের পথে-ঘাটে চলাচল বন্ধ, আদিবাসীদের আবাস থেকে উৎখাত, প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, বখাটেপনা সকল ক্ষেত্রেই নারীকে ধর্ষণ ও নির্যাতনের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এমনকি নারীর প্রতি সহিংসতা এমনভাবে বাংলাদেশের লুটেরা পুঁজিবাদী সংস্কৃতি ও রাজনীতির অংশ হয়ে উঠেছে, যা প্রতিটি স্তরে নারী নির্যাতনকে বৈধতা প্রদান করছে। অনেকেই নারীর পোশাককে যৌন সহিংসতার একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। বাস্তবতার সাথে এর কোনো মিল নেই। যখন একজন মাদ্রাসার ছাত্রী, কন্যা শিশু ও প্রতিবন্ধী নারী ধর্ষিত হয় তখন পোশাকের যুক্তি তার ভিত্তি হারিয়ে ফেলে। এদেশে শাসন ব্যবস্থায় যারাই এসেছে তাদেরই আশ্রয়-প্রশ্রয় ও আনুক‚ল্যে অপরাধীরা, ধর্ষকেরা সমাজে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারাই এ অবস্থার জন্য দায়ী। আমাদের দেশের নারীরা এখন শিক্ষাকে যে মাত্রায় গুরুত্ব দেয় চাকরি বা আয়-রোজগার করাকে সে মাত্রায় গুরুত্ব দেয় না। যে সব নারীরা আয়-উপার্জন করে অনেক ক্ষেত্রে নিজের উপার্জনেও তাদের অধিকার থাকে না। সমাজে নারীদের প্রতি রয়েছে পক্ষপাতমূলক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।

নারী সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচারণা অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে। একজন নারী ধর্ষিত হলে আগে জানতে চাওয়া হয় তার পোশাক কেমন ছিল। এরপর সে কোন সম্প্রদায়ের- হিন্দু-মুসলিম না অদিবাসী। ধর্ষণ পরবর্তী সামাজিক ও আইনি হয়রানি আরও ভয়ংকর। যিনি ধর্ষণের শিকার হন ঘটনার বিবরণ দিতে তাকে কয়েকবার মানসিক ধর্ষণের শিকার হতে হয়। সামাজিক হেনস্থা চলে সারাজীবন। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (ইনএনএফপি) অর্থায়নে আইসিসিডিআরবি ২০১১ সালে একটি জরিপ চালায়। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৪০ শতাংশ পুরুষ বলেছেন, তাদের বয়স ১৯ বছর হওয়ার আগে তারা নারী ধর্ষণ করেছেন। ৫৭-৬৭ শতাংশ পুরুষ বলেছেন, শুধু মজা করার জন্যই নারীদের যৌন হয়রানি করেছেন। ৪৩ থেকে ৫১ শতাংশ পুরুষ জানিয়েছেন, নারীদের যৌন হয়রানি করার পর তাদের কোন ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়নি। এ চিত্র গত নয় বছরে একটুও পাল্টায়নি, বরং আরও বিপজ্জনক আকার ধারণ করেছে। সারাবিশ্বসহ আমাদের দেশে যখন কোভিডের ভয়াবহ আতংক চলছে অর্থাৎ এপ্রিল থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ৩০৭টি নারী-শিশু ধর্ষনের ঘটনা ঘটেছে। নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৭৮৮টি। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৫ জনকে, ধর্ষণ চেষ্টার পর হত্যা ২ জন, ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে ৩০ জন শিশু। এদের বয়স ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। সমাজের মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা কোন পর্যায়ে গেলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয় তা সহজেই অনুমেয়। সেপ্টেম্বর মাসে একের পর এক লোমহর্ষক ভয়াবহ ঘটনায় কোন বিবেকবান মানুষ উদ্বিগ্ন না হয়ে পারে না।

ঘটনা-১. প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় ২১ সেপ্টেম্বর খুন করা হয়েছে সাভারের কিশোরী নীলা রায়কে। হঠাৎ শ্বাসকষ্ট অনুভ‚ত হওয়ায় রাত আটটায় ভাইয়ের সাথে রিকশাযোগে হাসপাতালে যাচ্ছিল নীলা। তাকে ঐ অসুস্থ অবস্থায় রিকশা থেকে টেনে নামিয়ে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে হত্যা করে সন্ত্রাসী মিজান।

ঘটনা-২. নীলা হত্যাকাণ্ডের দু’দিন না পেরোতেই আদিবাসী প্রতিবন্ধী কিশোরী মা-বাবার সামনে গণধর্ষণের শিকার হলো।

ঘটনা-৩. আদিবাসী কিশোরীর কান্না থামতে না থামতেই ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেটের এমসি কলেজ হোস্টেলে ঘটল আরেক পৈশাচিক বর্বর ঘটনা। নববধূ নিজেদের গাড়িযোগে স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে শিকার হলো গণধর্ষণের।

ঘটনা-৪. গির্জার মধ্যে তিনদিন ধরে আটকে রেখে ফাদার কর্তৃক আদিবাসী কিশোরী ধর্ষণ।

সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া এ সকল ঘটনা আমাদের কী বার্তা দেয়! এ সকল ঘটনার পরিণতি কী! নারী ও কন্যাশিশুরা কোথায় নিরাপদ! নারীর প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাসমূহ যে বার্তাই দিক না কেন, তার চেয়েও অধিক আতংকিত হবার বিষয় হলো- এ সকল অন্যায়-অমানবিক-মধ্যযুগীয়-বর্বরোচিত অধিকাংশ ঘটনারই সঠিক তদন্ত ও বিচার তো হয়ই না, বরং অপরাধীরা সদর্পে দাপিয়ে বেড়ায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায়। কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে আনতে নানা বিধি নিষেধ আরোপ করায় সহিংসতা থেকে মুক্তির সেবাসমূহ সংকুচিত হয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে অপরাধীরা। বিচার ব্যবস্থা ও অন্যান্য সামাজিক কাঠামো সক্রিয় না থাকায় অবস্থা আরও নাজুক হয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক হানাদারবাহিনী এ দেশের মেয়েদের ওপর নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

সে সব ঘটনার মর্মস্পর্শী বিবরণ পাঠে এখনও শিউরে উঠতে হয়। আমরা তাদের ধিক্কার জানাই। ইতিহাস তাদের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করেছে। এখন স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে এসে দেশে নারীদের ওপর যা ঘটছে তা যদি ইতিহাসে লেখা থাকে তাহলে কী হবে তার উত্তর। আমরা কি কোনোভাবে এর দায় এড়াতে পারব? প্রতিবছর নারী ধর্ষণ-নির্যাতন-হত্যা-আত্মহত্যার পরিসংখ্যান দীর্ঘ হচ্ছে। এ লজ্জা আমরা কোথায় রাখব। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে এসেও দেখি, আমাদের সমাজ সর্বাংশে লুটেরা দুর্বৃত্তপরায়ণ পুঁজিবাদ ও পুরুষতন্ত্রে ঠাসা, তারা হাত ধরাধরি করে চলে। এই লুটেরা দুর্বৃত্তপরায়ণ পুঁজিবাদ ও পুরুষতন্ত্র ধর্ষণকে বৈধতা দেয়ার জন্য নানা ফন্দি-ফিকির বের করে। পুরুষতন্ত্রের প্রচারে নারীর দেহ ও যৌনতাই প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। একজন মানুষ হিসেবে নারীর সৃষ্টিশীলতা-বিবেক-বিবেচনাবোধ পুরুষতন্ত্রের কাছে অর্থহীন। ধর্ষকেরা-নারীর ওপর সহিংস অপরাধীরা আমাদেরই কারো সন্তান-পিতা-ভাই-স্বামী। এ সমাজের মানুষ তারা। এখন সময় এসেছে প্রত্যেক পরিবারের বাবা-স্বামী-সন্তান-ভাইয়ের মনস্তাত্তি¡ক অবস্থার নির্মোহ মূল্যায়ন করার। অবস্থার পরিবর্তন এত সহজ নয়। আশার দিক হলো, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। বর্তমানে সমাজের বিবেকসম্পন্ন মানুষ ও সংগঠন ক্রমেই উপলব্ধি করছে যে, নারী নির্যাতনের প্রভাব কেবল নির্যাতিতার ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে না, সামগ্রিকভাবে তার সামাজিক-রাজনৈতিক কুফলও মারাত্মক। বহু মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করেছে ধর্ষণ প্রতিরোধ ছাড়া কোনো পরিবারই এ থেকে রেহাই পাবে না। নারীমুক্তিসহ মানুষকে সবধরনের শোষণ-বৈষম্য-বঞ্চনা-নির্যাতন থেকে মুক্তির লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণ আমাদের মূল কর্তব্য হলেও, যৌন সহিংসতার বর্তমান প্রেক্ষাপটে অর্জনযোগ্য আমাদের কিছু আশু দাবি ও কর্তব্য রয়েছে। সমাজে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে যে সচেতনতা ও প্রতিরোধ গড়ে উঠছে তাকে আরও সংগঠিত ও প্রসারিত করে নারী-পুরুষের সম্মিলিত আন্দোলনের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমাদের এখনই বাস্তবায়নের জন্য কিছু জরুরি দাবি তুলতে হবে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সকল ধর্ষণ মামলা দ্রæত বিচারের আওতায় এনে নিষ্পত্তি করতে হবে। সকল প্রতিষ্ঠানে যৌন নির্যাতন বন্ধে হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হবে। রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে গণতন্ত্র আনতে হবে, রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে গণতন্ত্রায়নের লক্ষ্যে সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর কার্যকর ক্ষমতায়ন করতে হবে।

সময়ের বাঁকে বাঁকে ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। ইতিহাসের নানা অর্জনে যে ইতিহাস রচিত হয়েছে তা পুরুষের গল্পে ঠাসা। পৃথিবীতে এখনো পর্যন্ত নারীদের যে ইতিহাস লেখা হয়েছে তা গৌণ, অক্রিয়; ইতিবাচক অর্থে ধরলে নারীকে দেখানো হয়েছে সর্বংসহা আশ্রয়দাত্রী হিসেবে। নারীর বিরুদ্ধে যতই প্রচার প্রচারণা থাকুক না কেন, এ কথাও ঠিক বাস্তবের অনেক অনুষঙ্গই নারীকে পুরুষতন্ত্র ও পুঁজিবাদের যুগল চাপ থেকে মুক্তির প্রেরণা জোগাচ্ছে। তাই বাংলাদেশে ধর্ষণসহ নারী নিপীড়নের যে ক্রমবর্ধমান ভয়াবহতা, তার কাছে প্রতিরোধহীন অসহায় আত্মসমর্পণ নয়। সময়টাকে এখন সাহসের সঙ্গে দৃঢ়তার সাথে কাজে লাগাতে হবে। লাখ লাখ নারীকে ঘরের বাইরে এসে প্রগতিশীল পুরুষের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে, নারী মুক্তির সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে। নারীকে নিজের ইতিহাস রচনায় নিজেকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। নারীর ইতিহাস সেদিন সত্যভাষণে প্রকাশিত হবে, দাসত্বের ইতিহাস নয়, বরং এ ইতিহাস হবে সংগ্রাম করে শৃঙ্খল মুক্তির ইতিহাস।

লেখক: নারী মুক্তি আন্দোলনের নেত্রী


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 102
    Shares