মঙ্গলবার, জানুয়ারি ১৯

ধর্ষণ ও বিচারহীনতার প্রতিবাদে রাজধানীতে নারী গণসমাবেশ ও মিছিল

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 128
    Shares

নিজস্ব প্রতিবেদক:: সারাদেশে অব্যাহত ধর্ষণ, নারী-শিশু নিপীড়ন ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ জোরদার করাসহ নারীর প্রতি সকল বৈষম্য প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়েছে দেশের প্রগতিশীল নারী সংগঠনসমূহ।

ঢাকার শাহবাগস্থ জাতীয় জাদুঘরের সামনে আজ (২৭ নভেম্বর) শুক্রবার বিকাল ৩টায় প্রগতিশীল নারী সংগঠনসমূহ এর ব্যানারে নারী গণসমাবেশে
বক্তরা এই আহ্বান জানান।

নারী গণসমাবেশ আয়োজককারী সংগঠনসমূহের মধ্যে ছিল সিপিবি নারী সেল, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম, শ্রমজীবী নারী মৈত্রী, নারী সংহতি, বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্র, বিপ্লবী নারী ফোরামসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল নারী সংগঠন।

নারী গণসমাবেশে উদীচী, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে একটি মিছিল শাহবাগ থেকে শুরু হয়ে বাটা মোড়, গাওছিয়া, নিউমার্কেট, কাঁটাবন হয়ে শাহবাগে এসে বিকাল ৪.৩০টায় সমাবেশ করে।

ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বানে সারাদেশ থেকে নারী প্রতিনিধিরা এই নারী গণসমাবেশে শামিল হয়েছিলেন বলে নেতৃবৃন্দ জানান।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সিপিবি নারী সেলের আহ্বায়ক লক্ষ্মী চক্রবর্তী এবং পরিচালনা করেন সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের সাধারণ সম্পাদক শম্পা বসু।

সমাবেশে বক্তব্য প্রদান করেন শ্রমজীবী নারী মৈত্রীর সভাপতি বহ্নিশিখা জামালী, বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত, নারী সংহতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তাসলিমা আখতার এবং বিপ্লবী নারী ফোরামের সহ-সাধারণ সম্পাদক আমেনা আক্তার।

সভাপতির বক্তব্যে লক্ষ্মী চক্রবর্তী বলেন, সারাদেশে ধর্ষণ, নারী-শিশু নির্যাতন এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কল-কারখানাসহ দেশের কোন একটি জায়গা নেই যেখানে নারীরা নির্যাতনের শিকার হন না। একের পর এক ধর্ষণ-নিপীড়ন ঘটে চলেছে আর একটি ঘটনা বর্বরতায়, বিভৎসতায় আগেরটিকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। এসব ধর্ষণ, নারী নিপীড়নের ভয়াবহতা আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে হানাদারবাহিনী দ্বারা সংঘটিত নারী নির্যাতনকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। আর অন্যদিকে দেশে চলছে বিচারহীনতার প্রবনতা। নারী-শিশু ধর্ষণ-নির্যাতনের ১০০টি মামলার ৯৭টির-ই কোন বিচার হয় না। কেবল মাত্র ৩টি মামলার বিচার হয়। ক্ষমতাসীনদের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে ও অর্থের দাপটে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। তার ফলে ধর্ষকেরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ক্ষমতাকেন্দ্রিক লুটপাটের দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি এবং গণতন্ত্রহীনতাই বিচারহীনতার জন্ম দিয়েছে।

বক্তাগণ বলেন, কোন মানুষ ধর্ষক হয়ে জন্মগ্রহণ করে না; সমাজের নানা অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণবিধির মধ্যেই সে ধর্ষক হয়ে ওঠে। ধর্ষণের অন্যতম কারণ সমাজে নারী-পুরুষের অধিকারের সীমাহীন অসমতা, সমাজে নারীকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা না দেওয়া, অধস্তন হিসেবে দেখা, বলপ্রয়োগের অপরাজনীতি, বিচারহীনতা, মৌলবাদ, প্রতিক্রিয়াশীল কূপম-ুক দৃষ্টিভঙ্গী, নারীকে ভোগ্য পন্য হিসেবে উপস্থাপন, মাদক, পর্নোগ্রাফি সর্বপরি ভোগবাদী পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।

সমাবেশে বক্তাগণ ধর্ষণ, নারী-শিশু নিপীড়ন ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে গণ প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমাজের সকল গণতান্ত্রিক চেতনা সম্পন্ন বিবেকবান মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়।

সমাবেশে নিম্ন লিখিত ১১ দফা দাবি উপস্থাপন করা হয় এবং এ দাবিতে মাসব্যাপী জেলায় জেলায় বিক্ষোভ সমাবেশ এর কর্মসূচি সফল করার ঘোষণা দেয়া হয়।

১১ দাবি:
১। সারাদেশে অব্যাহতভাবে ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতার সাথে যুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ২. পাহাড়-সমতলে আদিবাসী নারীদের ওপর সামরিক-বেসামরিক সকল প্রকার যৌন ও সামাজিক নিপীড়ন বন্ধ করতে হবে। ৩. হাইকোর্টের নির্দেশানুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি, বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানে নারী নির্যাতনবিরোধী সেল কার্যকর করতে হবে। ৪. সম্পত্তির উত্তরাধিকারে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ইউনিফর্ম সিভিল কোড চালু করতে হবে। বাংলাদেশকে সিডো সনদের ২ এবং ১৬-১ (গ) ধারা স্বাক্ষর করে সিডো সনদের পূর্ণ অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক সকল আইন ও প্রথা বিলোপ করতে হবে। ৫. ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য  ন-১৮৭২-১৫৫ (৪) ধারাকে বিলোপ করতে হবে এবং মামলার ডিএনএ আইনকে সাক্ষ্য প্রমাণের ক্ষেত্রে কার্যকর করতে হবে। ৬. অপরাধ বিজ্ঞান ও জেন্ডার বিশেষজ্ঞদের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন মামলা দ্রুত নিষ্পন্ন করতে হবে। ৭. তদন্তকালীন সময়ে ভিকটিমকে মানসিক নিপীড়ন-হয়রানি বন্ধ করতে হবে। ভিকটিমের আইনগত ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ৮. ধর্মীয়সহ সকল ধরনের সভা-সমাবেশে নারী বিদ্বেষী  বিধানবিরোধী বক্তব্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে। সাহিত্য, নাটক, সিনেমা, বিজ্ঞাপনে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা বন্ধ করতে হবে। পর্ণগ্রাফি নিয়োন্ত্রনে বিটিসিএল এর কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। সুস্থধারার সাংস্কৃতিক চর্চা সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। ৯. সারাদেশে মাদক বন্ধে সরকারিভাবে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। ১০. পাঠ্যপুস্তকে বিদ্যমান নারীর প্রতি অবমাননা ও বৈষম্যমূলক যে কোনো প্রবন্ধ, নিবন্ধ, পরিচ্ছদ, ছবি, নির্দেশনা ও শব্দ চয়ন পরিহার করতে হবে। ১১. গ্রামীণ সালিশের মাধ্যমে ধর্ষনের অভিযোগ ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 128
    Shares