বুধবার, ডিসেম্বর ২

ধর্ষণঃ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের উপজাত

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 55
    Shares

আবু নাসের অনীক::

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হবার পর সারাদেশে ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠেছে। এসব কর্মসূচিতে অনেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করছেন। আওয়াজ উঠেছে ধর্ষকের বিচারের। কিন্তু আড়াল হয়ে যাচ্ছে ধর্ষণতন্ত্র উচ্ছেদের দাবি। শুধুমাত্র ব্যক্তির বিচারের আওয়াজ তোলা মানে ধর্ষণ বান্ধব এই রাষ্ট্র-সমাজ ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করা।

গত কয়েকদিন পূর্বে সিলেটে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে স্বামীকে আটকে রেখে গণধর্ষণ, খাগড়াছড়িতে পাহাড়ী প্রতিবন্ধি মেয়ের গণধর্ষণ, সাভারের আশুলিয়াতে গণধর্ষণ এবং তার ভিডিও ভাইরাল হওয়াসহ সারাদেশে প্রতিদিন এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটছে। বেগমগঞ্জের যে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সারা দেশ উত্তাল হয়েছে সেই ঘটনার ভিডিও ভাইরাল না হলে দেশের মানুষ যেমন ঘুমিয়ে ছিলো তেমনি ঘুমিয়েই থাকতো। দেশের মানুষের ঘুম ভাঙার কারণে সরকার এবং তার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাময়িক সময়ের জন্য হলেও ঘুম ভাঙতে বাধ্য করেছে। এতে একটা ম্যাসেজ কিন্তু পরিষ্কার, জনগণ যদি আওয়াজ তোলে তবে কিছু সময়ের জন্যে হলেও সরকারের নির্বিকতাকে আঘাত করা যায়।

পরিসংখ্যান বলে, দেশে বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৪ টি করে এবং এ বছর গত ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯৪৮ টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ধর্ষণের অভিযোগে যে সমস্ত মামলা হয় তার মধ্যে মাত্র ৩% মামলায় অভিযুক্ত সাজাপ্রাপ্ত হয়। দেশে ধর্ষণের মোট ঘটনার আনুমানিক মাত্র ৫% মামলা হিসাবে নথিভুক্ত হয়। গত এক দশকে ধর্ষণ মামলার সুরাহার হার ৩.৪৫%, শাস্তির হার ০.৪৫% (আসক)। এই পরিসংখ্যান সংগ্রহ করা হয়েছে সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদ, থানার মামলার ফাইল আর কোর্টের রায়ের ফাইল এর উপর ভিত্তি করে। দেশে ঘটে যাওয়া ঘটনা উল্লেখিত পরিসংখ্যানের চাইতে অনেক বেশি।

বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় ভিকটিম অধিকাংশ সময়েই ঘটনা প্রকাশ করে না। কারণ সবসময় দেখা যায় ধর্ষক বা ধর্ষকগোষ্ঠী ভিকটিমের চাইতে রাজনৈতিক-সামাজিকভাবে অধিক শক্তিশালী। ভিকটিমের লোক-লজ্জার ভয়, পরিবার ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অসহযোগীতা, ধর্ষণ আইনের দূর্বলতা, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, ভবিষ্যৎ জীবনের চিন্তা, আত্মগ্লানিতে ভোগা (যার কারণে ভিকটিম আত্মহত্যা করে) এ ধরনের আরো অনেক কারণেই ঘটনাগুলো প্রকাশিত হয়না।

দেশে বর্তমানে যে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে (বিভিন্নভাবে প্রকাশিত) তাতে দেখা যাচ্ছে শতকরা ৯০ শতাংশ ঘটনায় ছাত্রলীগ অথবা সরকারী দলের সাথে সম্পৃক্ত স্থানীয় সন্ত্রাসীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। যে পরিস্থিতিটা তৈরি হয়েছে এটা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। একটি সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটের কারণেই এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। আর সেই প্রেক্ষাপট হচ্ছে ‘এবসুলুট পাওয়ার’।

যখন কোন শাষকগোষ্ঠী দেশের জনগণের উপর আস্থা না রেখে কোন বিশেষ শক্তি ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন বাহিনীর উপর নির্ভর করে দেশ পরিচালনা করে সেখানে সুশাসন পুরোটাই অনুপস্থিত হয়ে যায়। দেশ শৃঙ্খলাবিহীন একটি দেশে পরিণত হয়। এ ধরণের দেশের সরকারকে তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য যারা সমাজের শৃঙ্খলা নষ্ট করে সেই অপশক্তির সাথে কম্প্রমাইজ করে চলতে হয়। কারণ সরকার তার ‘এবসুলুট পাওয়ার’ নিশ্চিত করার জন্য এই অপশক্তিকে নানা ধরণের কাজে লাগায়। এতে এদের কনফিডেন্স লেভেল এতোটা হাই হয়ে যায় যে, তখন সে আর কোন কিছুকেই ধর্তব্যের মধ্যে রাখেনা। আর সরকার জানে এদের ছাড়া পাওয়ার এবসুলুট করা যাবেনা। এ ধরনের সরকারের তত্বাবধানে যে রাষ্ট্র পরিচালিত হয় তার অধিকাংশ অর্গান ঠিকমতো কাজ করতে ব্যার্থ হয়। যেমন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, আইন-আদালত সবকিছু।

আমার কথাগুলো অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। কিন্তু দেখুন- অর্থনৈতিক লুটপাট, বিচার ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ক্রসফায়ার, ধর্ষণের আসামী দেলোয়ারের সাথে পুলিশ সদস্যদের হাস্যোজ্বল সেলফিতে বুঝতে কষ্ট হওয়া কোনটা আসামী আর কোনটা পুলিশ, আর এই সবকিছু মিলিয়েই ছাত্রলীগ অথবা সরকারী দলের সাথে সম্পৃক্ত সদস্যদের নির্মম ধর্ষণ কান্ড। সবকিছুই এক সুতোয় বাধা। এ যেনো রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের বিনিসুতোর মালা!

ধর্ষণের এ ধরণের ঘটনাকে নানাজনে নানাভাবে অভিহিত করছে। একপক্ষ বলছে এটা সামাজিক অপরাধ, সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এ সকল ঘটনার সাথে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা খুঁজে পাচ্ছেনা। আবার এটাও বলছে রাজনীতি যুক্ত করে ধর্ষককে আড়াল করা হচ্ছে। ধর্ষণকে ব্যক্তিক অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করে আইন সংশোধনের আওয়াজ তুলে এর সমাধান খুঁজছে।

যারা পাহাড়ের, এমসি কলেজের অথবা বেগমগঞ্জের ঘটনাকে শুধুমাত্র সামাজিক অবক্ষয় হিসাবে দেখানোর চেষ্টা করছেন তারা প্রকারন্তরে এই দায় থেকে ক্ষমতাসীনদের আড়াল করার চেষ্টা করছেন। তাদের এই ভুমিকা ধর্ষণতন্ত্র তথা গুন্ডাতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন,‘প্রতিবাদের প্রয়োজন নেই, সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে’। মাননীয়গণ, আপনারা এমন একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করতে পারবেন যেটি কোন ধরণের গণমাধ্যম অথবা সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পূর্বেই ব্যবস্থা নিয়েছেন, আপনারা এমন একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করতে পারবেন যেটি বিনা প্রতিবাদে আপনারা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন?

গত ১০ বছরে এ ধরনের একটি ঘটনারও উল্লেখ করা আপনাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আপনারা এমন একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করতে পারবেন না যে, আপনাদের সংগঠনের কোন কর্মীর বিরুদ্ধে সাংগাঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন কোন ধরনের জনদাবির চাপ ব্যতীত! বেগমগঞ্জের ঘটনা ঘটেছে ৩২ দিন আগে, ঐ এলাকার আপনার দলের নেতা-কর্মীরা ঘটনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলোনা এটা যদি বলেন সেটা হবে নির্জলা মিথ্যাচার।
সবাই ঘটনা সম্পর্কে জানতো। কিন্তু আপনার দল অথবা পুলিশ কেউই ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। কারণ যারা ঘটনা ঘটিয়েছিলো তারা সরকারী দলের সাথে যুক্ত। আজ দেশব্যাপী প্রতিবাদ হয়েছে বলেই ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছেন। এতো ঘটনার পরেও পুলিশ আসামীর সাথে সেলফি তোলে, সেটা আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করার সাহসও দেখায়! ধর্ষণ বিরোধী প্রতিবাদ মিছিলে ছাত্রলীগ হামলাও করে! মাননীয়, এরপর তো আপনাদের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা না কেন এই সকল ঘটনার সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক যুক্ত। এরপরেও যদি বলেন, এটা সামাজিক ব্যাপার, তাহলে বলবো সমাজকে কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তি। নিশ্চয় কোন রাজনৈতিক দল তার কর্মী বাহিনীকে বলেনা ধর্ষণ করতে, কিন্তু কর্মী যখন সেই ঘটনা ঘটায় এবং সকলে জানার পরেও কোন প্রতিবাদ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোন আইনী এবং সাংগাঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনা এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দমনে পেশিশক্তি প্রয়োগ করে তখন তার দায় ঐ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের উপরেই বর্তায়!

কেউ কেউ দাবি তুলছেন ধর্ষণের সর্বচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করতে হবে, আওয়াজ তুলছেন ক্রসফায়ারে দিতে হবে, কেউ কেউ বলছেন বিশেষ অঙ্গ কেটে শাস্তি দিতে হবে! আপনাদের এ সকল দাবী ধর্ষণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতেই শুধু সহযোগীতা করবে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল যে ‘এবসুলুট পাওয়ার’ এর কারণে এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে আপনারা সেটিই অনুসরণ করতে চাইছেন এই সমস্ত দাবীর মাধ্যমে।

ভাবুন, আইন সংশোধন করে মৃত্যুদন্ড করা হলো। কিন্তু ভিকটিম তো থানা পর্যন্তই পৌছাতে পারেনা গুন্ডাতন্ত্রের কারণে। ধরে নিলাম এমন গণদাবির প্রেক্ষিতে আসামী গ্রেফতার হলো, ভিকটিম মামলা দায়ের করলো, অতঃপর সূবর্ণচরের ধর্ষণ মামলার আসামীর মতো এক বছরের জামিনে বেরিয়ে এলো, মামলার ভবিষ্যৎ তো ওখানেই শেষ। যার কারণে মামলা সুরাহার হার ৩.৪৫%। যে আইন প্রয়োগ করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সে যদি আসামীর রক্ষক হয় তবে ঐ আইন কখনো প্রয়োগ হয়না। অর্থাৎ গুন্ডাতন্ত্র জিইয়ে রেখে আইন সংশোধন করে কোন লাভ নেই, বরং গুন্ডাতন্ত্র উচ্ছেদের আওয়াজের পাশাপাশি আইন সংশোধনের দাবি তলুন।

বলছেন, ক্রসফায়ারে দিতে হবে। এর পূর্বে যতো ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে দাড়িয়েছেন সেই সকল ঘটনার বৈধতা দেওয়া হয় এই দাবি তুলে। বিচার ব্যবস্থাকে আরো বেশি অকার্যকর করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়, সরকারের সহিংস আচরণ ন্যায্যতা পায়। সরকার দেশকে যে জংলি পদ্ধতিতে পরিচালনা করছে তার বৈধতা দেওয়া হয় আপনার এই দাবি তোলার বিনিময়ে! সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী এতো সন্ত্রাসী আর মাদক ব্যবসায়ী ক্রসে নিহত হলো, তার কোন ধরনের পজেটিভ ইমপেক্ট কী আছে সমাজে? না নেই! বরং অনেক নেগেটিভ ইম্প্যাক্ট আছে। নয়নবন্ড কে ক্রসফায়ারে দিয়ে কাদের আশির্বাদে নয়ন বন্ড হিসাবে আবির্ভূত হলো সেই রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা আড়ালে থেকে যেয়ে পরবর্তী বন্ড তৈরির কাজটিকে এগিয়ে নিলো!

এটা মনে রাখবেন ধর্ষণ শুধুমাত্র যৌনসুখের বিকৃত প্রকাশ নয়। বরং রাজনৈতিক প্রতিশোধের, ক্ষমতা চর্চ্চার, ভীতি প্রদর্শনের এবং ভিন্নমত দমনের কাজেই বেশি ব্যবহার হয়। সুতরাং বিশেষ অঙ্গ কেটে শাস্তির দাবি তুলে এটা দমন করা যাবে না। বরং আপনাদের এসব আলাপ ধর্ষণ বান্ধব রাষ্ট্র-সমাজ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতেই সহযোগিতা করবে। আপনাদের দাবির অন্তর্নিহিত আবেগের প্রতি সম্মান জানিয়ে বলবো বর্তমান গুন্ডাতন্ত্র-ধর্ষণতন্ত্র যে ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে সহযোগিতা করে সেই ব্যবস্থা উচ্ছেদের দাবিতে সংগঠিত হন, বিক্ষোভের দাবানল দিকে দিকে ছড়িয়ে দিন! গণমানুষের রাজ কায়েম ব্যতীত মুক্তি অর্জন অসম্ভব।

‘হে জীবন, হে যুগ-সন্ধিকালের চেতনা- আজকে শক্তি দাও, যুগ যুগ বাঞ্ছিত দুর্দমনীয় শক্তি, প্রাণে আর মনে দাও শীতের শেষের তুষার-গলানো উত্তাপ। টুকরো টুকরো ক’রে ছেঁড়ো তোমার অন্যায় আর ভীরুতার কলঙ্কিত কাহিনী। শোষক আর শাসকের নিষ্ঠুর একতার বিরুদ্ধে একত্রিত হোক আমাদের সংহতি।’

লেখক: সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 55
    Shares