মঙ্গলবার, জানুয়ারি ১৯

দেশ বাঁচাতে বাম সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে: মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

এখানে শেয়ার বোতাম

নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট :: দেশ বাঁচাতে বর্তমান সরকারকে অপসারণ করে বাম সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে মন্তব্য করে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র পার্টির সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, ভাত ও ভোটের নিশ্চয়তার জন্য ‘গদি বদলের’ সাথে সাথে ‘ব্যবস্থা বদলের’ লড়াইকেও জোরদার করতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা একটি শোষণহীন সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু বুর্জোয়া শাসকগোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের সেই স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে। যার ফলে দেশ আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। সারাদেশে ক্যাসিনোর জোয়ার তৈরি করা হয়েছে। লুটপাটের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। সমাজের ভেতর বৈষম্য চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। দেশের টাকা লুট করা হচ্ছে।

দেশব্যাপী কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ রোববার (২৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৩ টায় সিপিবি সিলেট বিভাগীয় সমন্বয় কমিটির আয়োজনে আজ নগরের কিনব্রিজ এলাকায় অনুষ্ঠিত বিভাগীয় জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য তিনি এই কথা বলেন।

সমাবেশে কমরেড সেলিম বলেন, দুর্বৃত্তরা সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। পুলিশ প্রশাসন দেশ চালাচ্ছে। দেশের মানুষ শান্তিতে নেই। অর্থনীতিতে অশান্তি। নারী নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, বিনা বিচারে হত্যাকাণ্ড সব এখন নিয়মিত ঘটনা। তাই প্রত্যেক মানুষকে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে হবে।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘জমি বর্গা দেওয়া যায়, স্বার্থ বর্গা দেওয়া যায় না। ধনিকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তাই সবাইকে একত্র হয়ে লড়াইয়ে শামিল হতে হবে। তবেই বিজয় আসবে। দেশ এখন বিপন্ন। তাই জনদরদি সরকার দরকার। তবে এক আপদ (আওয়ামী লীগ) বিদায় দিয়ে আরেক বিপদ (বিএনপি-জামায়াত) আনলে হবে না। বাম গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।’

প্রধান অতিথি বক্তৃতায় তিনে বলেন, ‘প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার বাস্তবায়নের জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। ভেবেছিলাম, এই দেশ হবে ফুলের বাগান। কিন্তু আমাদের স্বপ্ন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। দেশ ফুলের বাগান নয়, ক্যাসিনোর বাগানে পরিণত হয়েছে। চতুর্দিকে উন্নয়নের জয়ধ্বনি করা হচ্ছে, অথচ দুর্নীতি-অনাচারে দেশ ছেয়ে গেছে। বিদেশে পাচার করা হচ্ছে লাখো কোটি টাকা। তাই ইনসাফের জন্য আবার নতুন করে লড়াই করতে হবে। মদিনা সনদের ভিত্তিতে নয়, দেশ চলছে ধর্মনিরপেক্ষতা আর অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে।’

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘দেশে কোন বিচার হবে, কোন বিচার হবে না,সেটা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ছাড়া হয় না। দুর্বৃত্তরা সুবিধাবাদী। তারা কখনো আপা আবার কখনো ম্যাডামের সহায়তা নিয়ে স্বার্থ হাসিল করছে। ১ শতাংশ মানুষের স্বার্থের উন্নয়ন হচ্ছে। উন্নয়ন করতে হবে তৃণমূল থেকে ওপরের দিকে। কিন্তু করা হচ্ছে উল্টো। আওয়ামী লীগ এখন মোশতাকের নীতি অনুসরণ করছে, জিয়ার নীতি অনুসরণ করছে, এরশাদের নীতি অনুসরণ করছে। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা থেকে আওয়ামী লীগ সরে গেছে।’

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ক্ষমতাসীনরা এখন একত্রিত হয়েছে লুটপাটে। বঙ্গবন্ধুর নাম ভাঙ্গিয়ে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তির সাথে হাত মিলিয়ে দেশকে অন্ধকারের দিকে
নিয়ে যাচ্ছে। পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বুনছে। সরকারি দলের লোকজন সিন্ডিকেট করে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কেটে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে নিয়ে জুয়া খেলছে। এদের রুখতে হলে বাম কমিউনিস্টদের
একত্রিত হতে হবে। সবাইকে এক কাতারে আসতে হবে। একইসঙ্গে গ্রামে- গ্রামে, সারা দেশে স্থানীয় ও জাতীয় দাবিতে জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলার কর্মিসূচি গ্রহণ করতে হবে।

তিনি বলেন, ৫০ বছর যাবত আওয়ামী লীগ-বিএনপির অপশাসনের সাথে সাথে দেশের মানুষ সামরিক শাসনও দেখেছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপি দু’টোই বুর্জোয়া লুটেরা দল। এদের হাতে মুক্তিযুদ্ধের অর্জন নিরাপদ নয়। এদের দ্বারা গরিব-মেহনতি মানুষের মুক্তি আসবে না। তিনি বলেন, শোষণ ও বৈষম্যের যাতাকলে পিষ্ট হয়েও কঠোর পরিশ্রম করে দেশের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছে কামলা, কিষাণ, মুটে, মজুর, মেহনতি মানুষ ও মধ্যবিত্ত জনগণ। নানা সমস্যার মধ্যেও গ্রামের কৃষক-ক্ষেতমজুর কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রেখেছেন। এর ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ তাদের বঞ্চনার শেষ নেই। কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছে ফসলের ন্যায্য মূল্য থেকে। ক্ষেতমজুরদের সারা বছরের কাজের কোনো সংস্থান নেই। সরকারি আমলা-কর্মচারিদের বেতন বাড়লেও শ্রমিকের জন্য জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ হয়নি। শ্রমিকরা গার্মেন্টে কাজ করে দেশের
আয় বাড়াচ্ছে। অথচ মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার মতো মজুরি পাচ্ছে না তারা। শ্রমিক-কৃষক-ক্ষেতমজুরের সন্তানেরা দেশে কাজ না পেয়ে বিদেশে গিয়ে অমানবিক কাজে বাধ্য হচ্ছে। তাদের পাঠানো টাকায় সরকার উন্নয়নের গল্প ফেঁদে বাহবা নিচ্ছে।
কমরেড সেলিম আরো বলেন, ব্যাংকগুলো থেকে অবাধে টাকা লোপাট হচ্ছে। লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে জমা রাখছে, মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম বানাচ্ছে। বিদেশে সম্পদ পাচার বন্ধ করার জন্য একাত্তর সালে অস্ত্র হাতে নিয়ে মুক্তিসংগ্রাম করা যদি ন্যায়সঙ্গত হয়ে থাকে, বাংলার সম্পদ বাংলায় রাখার জন্য একইভাবে মুক্তিসংগ্রামের নতুন অধ্যায় রচনা করাসমস্ত জনগণের কাছে একটা আশু কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য শুধু গদির বদল হলেই চলবে না; গদি বদলের সাথে সাথে ব্যবস্থাবদলের লড়াইকেও জোরদার করতে হবে। বুর্জোয়া দ্বি-দলীয় মেরুকরণের বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ধারায় দেশকে পরিচালিত করতে বাম বিকল্প গড়ে তুলে শোষক শ্রেণির বিপরীতে শোষিত শ্রেণির শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে হবে। জনগণের অধিকার জনগণকেফিরিয়ে দিতে একটি সুখি সমৃদ্ধশালী বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সবাইকে একযোগে সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়তে হবে। জনগণকে সাথে নিয়ে গণজোয়ার সৃষ্টি করতে হবে। এছাড়া মুক্তির আর কোনো বিকল্প নেই।

‘গণতন্ত্রহীনতা ও লুটপাট রুখো, গদি-নীতি-ব্যবস্থা বদলাও, স্বদেশ বাঁচাও’ স্লোগান নিয়ে অনুষ্টিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বিভাগীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক আনোয়ার হোসেন।

সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাফি রতন ও অনিরুদ্ধ দাস অঞ্জন ও সম্পাদক জলি তালুকদার।

এ ছাড়া অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সিপিবি সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি কমরেড চিত্ত রঞ্জন তালুকদার, মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সভাপতি মকবুল হোসেন, হবিগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি হাবিবুর রহমান, সিলেট জেলা কমিটির সভাপতি হাবিবুল ইসলাম খোকা, সিপিবি ঢাকা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল হক রুবেল। সঞ্চালনা করেন সিপিবি মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কমরেড নিলিমেশ ঘোষ বলু ও ছাত্র ইউনিয়ন সিলেট জেলা সংসদের সাধারণ সম্পাদক নাবিল এইচ।

জনসভার শুরুতে উদীচী সিলেট ও সাংস্কৃতিক ইউনিয়ন, সিলেট এর শিল্পীরা গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন। জনসভা সমাপ্তির পর সিপিবির নেতা-কর্মিরা একটি বিশাল মিছিল বের করেন। মিছিলটি সুরমা পয়েন্ট, কোর্ট পয়েন্ট, জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা হয়ে আম্বরখানা পয়েন্টে ঘুরে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসে শেষ হয়।


এখানে শেয়ার বোতাম