সোমবার, নভেম্বর ৩০

তোমাদের ভুলবো না …

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 84
    Shares

আবেদ আলী এডভোকেট::

১৯ নভেম্বর ছিল কমরেড শ্রীকান্ত দাশ ও কমরেড ভবতোষ চৌধুরীর প্রয়াণ দিবস। উভয়েই ছিলেন আমার খুবই আপনজন, পার্টির কমরেড ও পারিবারিক বন্ধু। আশির দশকের গোড়া থেকে তাদের সাথে আমার অনেক স্মৃতি জড়িত রয়েছে। তারাও উভয়েই ছিলেন পরস্পর বন্ধু এবং অবিশ্বাস্যভাবে অনেক বিষয়ে তাদের অভিন্ন চারিত্রিক মিল ছিল। যেমন তারা উভয়েই শোষণহীন সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা কায়েমে বিশ্বাসী কমিউনিস্ট ছিলেন এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আপোষহীনভাবে লড়াই করে গেছেন। দুজনই কৃষক-শ্রমিক মেহনতি জনতাকে নিজেদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে জাগ্রত করার জন্য গনসংস্কৃতিকে হাতিয়ার হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন। সেজন্য কৃষক খেতমজুরদের সাথে মাঠে গিয়ে কাজ করেছেন, গেয়েছেন বিপ্লবী গণসংগীত এবং অভিনয় করেছেন জাগরণী নাটকে। উভয়ের মাঝেই ছিল অফুরন্ত জীবনীশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও সাহসী যৌবন। উভয়েরই ছিল চমৎকার সৃজনী শক্তি – লিখেছেন জাগরণী গান ও গল্প। উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী ও কৃষক-খেতমজুর সমিতি ছিল তাদের বিপ্লবী কাজের প্লাটফরম। তবে কমিউনিস্ট পার্টির সকল কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকতেন। উভয়ে ছিলেন বাউল প্রকৃতির, জীবন সংগ্রাম গদ্যময় হলেও তারা ছিলেন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, স্ত্রী-সন্তানদের প্রতি ছিলেন মমত্বশীল ও দায়িত্বশীল।

উভয়ের সাথে আমার এত স্মৃতি যে, লিখিয়ে হলে একটা হাজার পৃষ্টার বই লিখে ফেলতাম। তবে লিখিয়ে না হলেও এখানে একটা মধুর স্মৃতি বলার লোভ সামলাতে পারছি না।

১৯৮৩ বা ‘৮৪ সালের কথা। সামরিক স্বৈরাচারের বুটের তলায় পৃষ্ট স্বদেশ। প্রকাশ্য রাজনীতি নিষিদ্ধ। তখন আমরা সিলেট উদীচীতে খুবই সক্রিয়। উদীচী বিভিন্ন দিবস পালনে রাজপথকে বেছে নেয়। এসময় এনায়েত হাসান মানিক ও ভবতোষ চৌধুরীর নেত্রিত্বে উদীচী সিলেটের কোর্ট পয়েন্ট, লাক্কাতুরা চা-শ্রমিক অঞ্চলসহ বিভিন্ন পয়েন্টে পয়েন্টে গণসংগীত ও নাটক করেছে, ট্রাকে ট্রাকে গণসংগীত করে সারা শহর চষে বেড়িয়েছে। লক্ষ্য শ্রমিক-কৃষকদের জাগিয়ে তোলা ও সামরিক শাসন বিরোধী গন-আন্দোলন সৃষ্টিতে সহায়তা করা। এসময় শাল্লা উদীচী সিলেট উদীচীকে দিয়ে সেখানে একটি গনসংগীতের অনুষ্ঠান আয়োজন করার আগ্রহ প্রকাশ করে। উদীচীর সাধারন সম্পাদক সম্প্রতি প্রয়াত আমার বন্ধু পুরঞ্জয় চক্রবর্তী বাবলা জানালো যে, শাল্লা উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শ্রীকান্ত দা অনুষ্ঠানের আয়োজক। আমরা আমন্ত্রণ গ্রহন করলাম। বাবলা দা [পুরঞ্জয় চক্রবর্তী] আমাদের টিম লিডার হলেও ইভেন্ট লিডার হলো ভবতোষ দা।

টিমের সদস্য হলাম শ্রীপদ ভট্টাচার্য, অঞ্জন চক্রবর্তী, রঞ্জিত সরকার, অমিতাভ চক্রবর্তী, বাবলা দা, ভবদা, আমি এবং অন্যদের নাম ভুলে গেছি। শাল্লায় পৌঁছে জানতে পারলাম রাতে আমাদের এমন একটি হিন্দু পরিবারে খেতে হবে যেখানে কোন মুসলিমকে একসাথে খেতে দিবেন না। অথচ আমি মুসলিম, আমাকে আলাদা রেখে কমরেডরা খাবে কীভাবে? তখন বাবলা দা’ আমাকে হিন্দু রীতি অনুযায়ী খাবার প্রশিক্ষন দিল যেখানে খাবারের প্রক্রিয়ায় অন্যান্য বিষয়ের সাথে কোনক্রমেই বাম হাতের ব্যবহার চলবে না। সাথে সাথে আমাকে একটি হিন্দু নামও দিল, নামটি মনে নেই। শ্রীকান্তদা বিষয়টি জানতো। তাই খাবারের পুরো সময় তার নজরধারি চোখ ছিল আমার প্রতি। একটা টেনশন থাকলেও অবশ্য আমি সফলভাবেই খেয়েছি। যদিও মাছের কাঁটা বাছতে বাম হাতটি উশখুশ করছিলো। আপ্যায়নকারী পরিবার আমার ধর্মীয় পরিচয় না জানায় পরিবারের গৃহিণী খুব যত্নের সাথে নিজ হাতে আমাদের খাবার পরিবেশন করেছেন।

ভবতোষদা’র নেত্রিত্বে আমাদের গনসংগীতের অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সফল হয়েছে। স্টেজ থেকে নামার পরই শ্রীকান্তদা ও ভবদার তৃপ্তির আলিঙ্গন এখনও স্মৃতিতে ভাসছে।

কাকতালীয়ভাবে আজ আমার উভয় বন্ধুই একই দিনে প্রয়াত হয়েছেন। আমি তাদের স্মৃতির প্রতি গভির শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

তবে আমার খুবই ভাল লাগছে এই ভেবে যে, তাদের নিজ নিজ সন্তানরা তাদের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এজন্য কানাডা প্রবাসি ভবদার মেয়ে বর্না ও তার স্বামী দেবাশীষ এবং যুক্তরাজ্য প্রবাসি শ্রীকান্তদার ছেলে প্রশান্তকে আমি ধন্যবাদ জানাই।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 84
    Shares