বৃহস্পতিবার, মার্চ ৪
শীর্ষ সংবাদ

ডেঙ্গু প্রতিরোধে দরকার সততা ও উদ্ভাবন

এখানে শেয়ার বোতাম

ফিরোজ আহমেদ ::

এক. সমস্যার কার্যকর সমাধান, নাকি সমস্যাকে উপলক্ষ করে নতুন নতুন লাভজনক প্রকল্পের বন্দোবস্তকরণের মধ্য দিয়ে সমস্যার বিস্তার বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রগুলোতে সেটি একটি বড় আলোচ্য বিষয়। দুই দশকের কিছু বেশি সময় ধরে দৃশ্যমান ডেঙ্গুর মহামারীর বেলাতেও এ কথাটি খুবই কার্যকর। সমাধানের একটা বাস্তব উদাহরণ দিয়েই আলাপটা শুরু করা যাক।

কানাডা আর মেক্সিকোর একদল উদ্ভাবক ২০১৬ সালে দক্ষিণ আমেরিকার গুয়াতেমালা নামক দেশটিতে একটি অত্যন্ত কার্যকর পরীক্ষা চালায় ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া আর জিকা ভাইরাসের বাহক এডিস মশা দমনে। কোনো ধরনের বিষাক্ত পদার্থ ব্যবহার না করে তারা দ্রুততম সময়ে এই মশাটিকে প্রাকৃতিকভাবে দমন করার একটি ব্যবস্থা পরীক্ষা করে দেশটির সেয়াকসে (ঝধুধীপযব) ছোট্ট নামের শহরটিতে। এডিস মশার কিছু পরিচিত স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যকেই তারা ব্যবহার করে একে দমনের কার্যকর অস্ত্র হিসেবে।

বিশ্বব্যাপী এডিস মশার বিস্তারে অন্যতম ভূমিকা রেখেছে ব্যবহৃত রাবারের চাকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। রাবারের তৈরি চাকার ছোট ছোট কাটা টুকরোকেই এই গবেষক দল ব্যবহার করেছে এডিস মশার জন্য অত্যন্ত কার্যকর একটি ফাঁদ তৈরি করতে। এতে থাকে দুগ্ধজাত একটি নিরাপদ দ্রবণ, যেখানে মিশিয়ে দেওয়া হয় নারী মশার ফেরোমেন হরমোনটি। আর থাকে ছোট্ট একটি ভাসমান কাগজ বা কাঠের টুকরোর ফলে আশপাশের অন্য স্ত্রী এডিস মশারা জায়গাটিকে ডিম পাড়ার জন্য নিরাপদ মনে করে এবং আকৃষ্ট হয়। সপ্তাহে দুবার করে প্রতিটি ফাঁদ থেকে মশার ডিম সংগ্রহ করে মেরে ফেলা হয়। আর দ্রবণটিকে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে আবার ব্যবহার করা হয়। অন্য মশারা এখানে নিয়মিত ডিম পাড়ে বলেই ক্রমাগত দ্রবণটিতে মশার ফেরোমেনের পরিমাণ ঘনীভূত হতে থাকে। ফলে দ্রবণটির কার্যকারিতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বৃদ্ধি পায়। এই দ্রবণটি উদ্ভাবন করেছে কানাডার লরেনশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়। খুব সংক্ষেপে এই হলো পরীক্ষাটির বিবরণ। কিন্তু এর সাফল্যের হারটি বিপুল।

এই দশ মাসে পরীক্ষার আওতাভুক্ত এলাকায় একটিও নতুন ডেঙ্গুর ঘটনা ঘটেনি, অন্য সময় অন্তত ২৪ থেকে ৩৬টি সংক্রমণের ঘটনা ঘটত, অর্থাৎ মাত্র ২৫ হাজার বাসিন্দার এই শহরে এ সংক্রমণের হারটি ছিল যথেষ্টই বেশি। আরও বড় কথা, মশা মারতে যে কীটনাশক ব্যবহার করা হয়, সেটি মশার যারা প্রাকৃতিক শত্রু, তাদেরও খতম করে দেয়। যেমনÑ ব্যাঙ, ফড়িং, বাদুড়, মাকড়সাসহ বহু প্রাণী। কিন্তু নতুন এই প্রক্রিয়াতে প্রকৃতির আর কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেই মশা দমন সম্ভব হয়। অথচ প্রায় পুরো প্রক্রিয়ার খরচ নিতান্তই কম। পরীক্ষাকালীন প্রতিটি ফাঁদ থেকে গড়ে প্রতি মাসে ১৮ হাজারেরও বেশি মশার ডিম বিনষ্ট করা হয়।

এডিস মশার একটি বিরাট সীমাবদ্ধতা হলো এর জন্মের ২০০ মিটার বা ৬০০ ফুটের সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যেই এর উড্ডয়নক্ষেত্র। ফলে এর বিস্তার ঘটে খুব ধীরে ধীরে। উৎপত্তিস্থলে একে ধ্বংস করা গেলে আর নতুন উৎপত্তিস্থল তৈরি না হতে দিলে এর বিস্তার ঘটার কোনো সুযোগ মিলবে না। এডিস মশা পরিষ্কার স্থানে ডিম পাড়তে পছন্দ করে। ফেরোমেন তাকে বাড়তি নিরাপত্তা দিয়ে আকৃষ্ট করবে এই সাধারণ তথ্যের ওপর ফাঁদটি প্রতিষ্ঠিত। এ ক্ষেত্রে যে কাজটি গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং অংশগ্রহণ। কেননা, এই ৬০০ ফুটের মধ্যে কোনো দায়িত্বহীন ব্যক্তির জমানো পানির কারণে জায়গাটিতে এডিসের সংক্রমণ ঘটতেই থাকবে।

এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী মৃত্যুবরণ করেছেন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে। ছাত্রাবাসে খুব সহজেই কিন্তু গুয়াতেমালার এই পদ্ধতি ব্যবহার করে ডেঙ্গু নিরাময় সম্ভব। কিন্তু ফাঁদটি বানাতে স্ত্রী মশার ফেরোমেন কোথায় মিলবে? ফেরোমেন ছাড়াই ফাঁদটি বানানো সম্ভব। কার্যকারিতা সামান্য হ্রাস পাবে। কিন্তু মশার বৃহদাংশই এতে ধ্বংস হবে। বর্তমান লেখক নিজেও দুটি আলাদা পাত্র দিয়ে কোনো ফেরোমেন ছাড়াই এই পরীক্ষাটি গত বছর করে দেখেছেন, যথেষ্ট কার্যকর। একটিতে ছিল পুরো কয়েক শৌখিন লাল মাছ, অন্য ফাঁকা পাত্রটিতে মশারা ডিম পেড়ে রেখে যেত, সেগুলোর দৃশ্যমান নড়াচড়া দেখতে পাওয়া মাত্র পাশের মাছের পাত্রটিতে তাদের রেখে দেওয়া হতো। সপ্তাহে এভাবে অন্তত একবার বিনামূল্যে মাছের জন্য উৎকৃষ্ট আমিষের বন্দোবস্ত হয়ে যায়। ছোট ছোট মফস্বলেও এডিস মশা ও ডেঙ্গু রোগের বিস্তার দেখা যাচ্ছে। তাদের দমানো একই প্রক্রিয়ায় হতে পারে। সরকার খুব বড় আকারে পরিকল্পনা নিলে ঢাকাজুড়ে এমন তৎপরতা চালানো যেত নিশ্চয়ই। সে রকম একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথা সৈয়দ আবুল মকসুদ সম্প্রতি লিখেছেন, হাবিবুল্লাহ বাহার ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নিয়ে ঢাকা শহর থেকে বহু বছরের জন্য সমূলে মশক উচ্ছেদ করেছিলেন সেই পাকিস্তান আমলের শুরুর দিকে। আর এখনকার স্বাস্থ্যমন্ত্রীরা দেশবাসীকে এই বিপদে ফেলে রেখে বিদেশ সফরে মগ্ন থাকেন।

মশা, মশার ওষুধ, মশাবাহিত রোগের চিকিৎসা সব মিলে যদি থাকে এত বিপুল লেনদেনের সুযোগ, কেন লোভীরা তা ছাড়বে? ছাড়বে না সহজে। কিন্তু ছাত্র সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ নানা পাড়াতে সংগঠন যদি এই উদ্যোগ গ্রহণ করে, এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখা এবং ফাঁদ পেতে সপ্তাহে দুদিন মশার ডিম ধ্বংস করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।

মশা দমন নিয়ে আজ দেশজুড়ে মানুষের মনে লুণ্ঠন আর প্রতারণা এবং জালিয়াতির বহু উৎকট সন্দেহ দানা বাঁধছে। এরই মধ্যে খবর আসছে, ভেজাল ওষুধে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতির, আরও আছে ওষুধ না ছিটিয়েই খরচটা মেরে দেওয়ার খবরও। এখন শোনা যাচ্ছে অনুর্বর মশা আমদানি করে তা প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়ার প্রকল্পের কথা। এটি কার্যকর পদ্ধতি হলেও গুয়াতেমালার এই পদ্ধতির চেয়ে অনেক ধীর গতির এবং ব্যয়বহুলও। আর এখানেই হলো সংকটটি।

আমাদের কর্তাদের কোন পদ্ধতি পছন্দ হবে, তা সর্বদা নির্ভর করে কত টাকা তাকে প্রকল্পব্যয় হিসাবে খরচা করা যাবে, তাতে কতটি নতুন গাড়ি কেনা যাবে, কত টাকা দুর্নীতি করা যাবে, কত টাকা অপব্যয় করা যাবে। ভয় হয়, এখনই একুশজনের একটা দল তিন ভাগে ভাগ হয় গুয়াতেমালা, মেক্সিকো আর কানাডার দিকে রওনা হয়ে যায় কি না প্রকল্পটি হাতে কলমে শিখতে!

দুই. মহামারী সর্বদাই একটা রাজনৈতিক প্রশ্ন। প্রাণঘাতী একটা পরিস্থিতিকে মহামারী হিসেবে গণ্য করা হবে কি না, বাংলাদেশে সেটাও দেখা যাচ্ছে উৎকট রকমের রাজনৈতিক প্রসঙ্গ। সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত একটি পরীক্ষার শেষে জনস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য দুগ্ধশিল্পকে ঢেলে সাজানো হবে, নাকি ব্যবসায়ীদের স্বার্থই শুধু রক্ষা করে সত্য উদ্ঘাটনকারী অধ্যাপকদেরই বিপদে ফেলা হবে, সেটাও মর্মান্তিক রকমের রাজনৈতিক।

ডেঙ্গু বিষয়ে এ বছর যেমন অনেকগুলো সংবাদ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। একটা হলো, সরকারের কাছে আগেই হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল, গত সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগনিয়ন্ত্রণ) সানিয়া তাহমিনা। এক প্রশ্নের জবাবে সেখানে সানিয়া বলেন, ‘এবার এডিস মশার বিস্তার ও ডেঙ্গু রোগী বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আগেই করেছিল এবং সে ব্যাপারে সতর্ক হতে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল।’

দ্বিতীয়ত, মশার ওষুধ কিনতে বিপুল অনিয়ম হয়েছে। একটি জাতীয় দৈনিকে বলা হয়েছে, দুই সিটি করপোরেশন স্বচ্ছতার সঙ্গে ওষুধ কেনার ব্যাপারে যেমন গুরুত্ব দেয়নি, তেমনি বিজ্ঞানীদের তথ্যের প্রতিও তারা চরম অবহেলা দেখিয়েছে। আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ডেঙ্গু ভাইরাস বাহক এডিস মশা প্রচলিত কীটনাশক ব্যবহারে মরছে না। ঢাকা শহরের এডিস মশা ওষুধপ্রতিরোধী।

তৃতীয় যে প্রশ্নটি গুরুত্ব দিয়ে বলা দরকার, সেটি হলো মশার উৎপত্তিস্থল কোথায়। প্রয়াত এক মেয়র নগরবাসীকে ধমকের সুরে বলেছিলেন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে মশা মেরে দিয়ে আসতে পারবেন না। বর্তমান আরেক মেয়র তো শুরুতে ডেঙ্গুকে গুজব বলে উড়িয়েই দিতে চেয়েছিলেন। এখন আবার দোষারোপ করছে নগরবাসীকেই। কিন্তু খুবই সম্ভাবনা আছে, এডিস মশার প্রধান উৎস সরকার ও নগর কর্র্তৃপক্ষ স্বয়ং। আমাদের একজন বন্ধু মিজানুর রহমান, যিনি কিছুদিন আগে ওয়াসার এমডির জন্য সুপেয় শরবত নিয়ে গিয়েছিলেন, তার তোলা অজস্র ছবি এর প্রমাণ ধারণ করে আছে। সামাজিক গণমাধ্যমেও বিপুলসংখ্যক মানুষ ছবি তুলে দেখিয়েছেন, মশার প্রধান উৎসগুলো নানা সরকারি প্রতিষ্ঠানেরই আওতায়, যেগুলো পরিচ্ছন্ন করার সুযোগ বা এখতিয়ার নগরবাসীর নেই।

এর মাঝে সবচেয়ে ভয়াবহটি হলো সরকারি নানা উন্নয়নযজ্ঞ। ঢাকার উন্নয়নকাজ মানে বিভীষিকা, কারণ মুনাফা সর্বোচ্চ করার জন্য সামান্য ধুলো পরিষ্কার করা, বালু-সিমেন্ট ঢেকে রাখার খরচটি তারা করেন না। একই সঙ্গে সেখানে বৃষ্টির পানি জমে থাকে, যা সরাবার বিন্দুমাত্র চেষ্টাও তাদের দিক থেকে নেই। আছে সিটি করপোরেশনের ময়লা ফেলার শৌখিন কিন্তু অকার্যকর ঝুড়ি, সেখানেও পানি জমে থাকে। আছে পদচারী সেতুর ওপর ঝোলানো বাগানবিলাস গাছের বিশাল পাত্র, সেখানেও পানি জমে থাকে। এভাবে জমা পানিতে জন্ম নেওয়া মশা ঢাকার বুকে স্থায়ী সরবরাহ ক্ষেত্র হয়ে আছে। এ ছাড়া আছে পুরনো গাছের কোটর ইত্যাদি। আজ থেকে বহু বছর আগে ডেঙ্গুর মহামারীর প্রথম বছরেই একটি জাতীয় দৈনিক ছবিসহ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাদের পানি সরবরাহের বন্দোবস্তটি কীভাবে এডিস মশার উৎকৃষ্ট জননভূমি ছিল, সেই পরিস্থিতি আজও বদলায়নি। অধিকাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাদ, গাড়ি রাখার জায়গা, কার্নিশে জমা পানি মশার জন্য আদর্শ প্রজনন ক্ষেত্র।

বাসাবাড়িতেও নিশ্চয়ই মশার জন্ম হয়। কিন্তু সেটা নিয়ন্ত্রণ করা হলেও এত বড় বড় সরকারি প্রজননক্ষেত্র জীবন্ত থাকলে খুব সহজ হবে না ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দূর করা। সেই জন্য তরুণদের বিশেষভাবে উদ্যোগী হতে হবে। স্বেচ্ছাসেবীর ভিত্তিতে পাড়া-মহল্লার মশা দূর করার পাশাপাশি শুরুতে বলা গবেষণাটির মতো মৌলিক উদ্ভাবন করতে হবে। জীববিজ্ঞান বা জৈবপ্রযুক্তির শিক্ষার্থী কি ওই ফেরোমেন বিশ্লিষ্ট করার কোনো সহজ পদ্ধতি আবিষ্কার করে আমাদের জন্য প্রেরণা হতে পারে না?

নিশ্চয়ই পারে। রাষ্ট্রের মোড়লরা আজকাল দেশের স্বার্থে গবেষণার একদম বিরুদ্ধে, যা তাদের বাণিজ্য নষ্ট করবে না, কোনো অস্বস্তিকর সত্য উদ্ঘাটন করবে না। কিন্তু এই ধরনের একটি গবেষণাই অধ্যাপক আ ব ম ফারুককে জাতির সামনে নায়কের আসনে বসিয়েছে। আমরা তরুণদের কাছে দাবি করবÑ এমনি অজস্র সংগঠক, উদ্ভাবক, চিন্তকÑ যারা সরষের ভেতর থেকেই ভূত তাড়াবে।

লেখক : রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট


এখানে শেয়ার বোতাম