বুধবার, ডিসেম্বর ২

ডাকসু ভবনে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ ও ছাত্রলীগের হামলায় ভিপি নুরসহ আহত ১৫

এখানে শেয়ার বোতাম

অধিকার ডেস্ক :: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবনে ভিপি নুরুল হক নুরের অফিসে হামলা চালিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

রোববার দুপুর পৌনে ১টার দিকের এ ঘটনায় ভিপি নুরুল হক নুরসহ বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন।

আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া হামলার সময় ভিপির কক্ষের কম্পিউটার, চেয়ারসহ আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুর ১২টার দিকে রাজু ভাষ্কর্যে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ তাদের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি শেষ করে ডাকসু ভবনের দিকে মিছিল নিয়ে যায়। একপর্যায়ে সেখানে ভিপি নুরসহ তার অনুসারীদের সঙ্গে মঞ্চের নেতাকর্মীদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। পরে মঞ্চের কিছু নেতাকর্মী নুরদের উদ্দেশে ডাকসু ভবনের দিকে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। মঞ্চের কিছু নেতাকর্মী ডাকসু ভবনের দ্বিতীয় তলায় ওপরে উঠতে থাকলে নুরের অনুসারীরা তাদের প্রতিহত করে ডাকসু ভবনের মূল ফটক বন্ধ করে দেন।

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস এবং সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর এজিএস সাদ্দাম হোসেন ডাকসু ভবনের মূল ফটক খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন। এ সময় তাদের সঙ্গে ছাত্রলীগের কিছু অনুসারীও ঢুকে পড়েন ডাকসুতে। সনজিত-সাদ্দাম ভিপি নুরের কক্ষে গিয়ে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিরাগতদের বের করে দেয়ার নির্দেশনা দেন। কিন্তু এতে ভিপি আপত্তি জানালে উভয়ের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়।

এ সময় ছাত্রলীগের অন্য নেতাকর্মীরা ভিপি নুরের কক্ষে থাকা তার সংগঠন ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের’ নেতাকর্মীদের এক এক করে কক্ষ থেকে বের করে দেন। কক্ষ থেকে বের করে সিঁড়িতে অবস্থান নেওয়া ছাত্রলীগ ও মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নেতাকর্মীরা তখন তাদের লাঠিপেটা করেন।

এক পর্যায়ে সনজিত ও সাদ্দাম ভিপির কক্ষ থেকে বের হয়ে মধুর ক্যান্টিনের দিকে চলে যান। তারা চলে যাওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা লাঠিসোঠা নিয়ে নুরের অফিস কক্ষে ঢুকে লাইট বন্ধ করে এলোপাতাড়ি মারধর করেন। এতে নুরসহ আহত হন পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন, যুগ্ম-আহ্বায়ক ফারুক হোসেন, রাশেদ খানসহ সংগঠনটির ১৫ নেতাকর্মী। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমের সহায়তায় তাদের বের করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

হামলার পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক রুশাদ ফরিদী। ঘটনার বিষয়ে নিজের ফেসবুক ওয়ালে পোস্ট করে তিনি লিখেছেন, ‘শিক্ষকতা ছেড়ে দেয়ার সময় হয়েছে। চোখের সামনে ডাকসু ভিপি নুর আর অন্যান্য ছাত্রদের মেরে শেষ করে ফেলা হল। কিছুই করতে পারলাম না। নিজেদের ছাত্রদের রক্ষা করতে পারি না এই শিক্ষকতার কি দাম আছে? এইটা একটা বিশ্ববিদ্যালয়? আর আমিও একজন শিক্ষক?’

তবে হামলায় মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আল মামুন। তিনি বলেন, ‘ভিপি নুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত ক্যাডারদের নিয়ে এসে ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছিল। তাই সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই খবর শুনে তা প্রতিহত করতে যায়। এখানে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের কোন সম্পৃক্ততা নেই।’

মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের কোন নেতাকর্মী উপস্থিত ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় তারা সাধারণ শিক্ষার্থী।’

ঘটনার পর সাদ্দাম হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা চাইনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের অনাকাঙিক্ষত ঘটনা ঘটুক। গত কয়েকদিন মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ ও নুরের সঙ্গে শিবির সংশ্লিষ্টদের ধারাবাহিক সংঘর্ষের ঘটনা দেখছি। আজকেও ঐতিহ্যবাহী মধুর ক্যান্টিন ও ডাকসু ভবনে দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান করেছিল। আমরা নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছি। আমরা দুই পক্ষকেই আহ্বান জানাই তারা যেন নিজেদের ভেতরের সমস্যা সমাধান করে নেয়।’ হামলায় ছাত্রলীগের সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করেন তিনি।

ঘটনার পর ছাত্রলীগের সনজিতকে ফোন করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।পরে নিজের ফেসবুক ওয়ালে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন তিনি। যেখানে তিনি কয়েকজনের ছবি দিয়ে লেখেন, ‘বহিরাগত শিবির ক্যাডারদের নিয়ে ক্যাম্পাসে হামলা ও অস্থিতিশীল করতে চেয়েছিলো পাগলা নূরা, সচেতন শিক্ষার্থী ও মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ স্বাধীনতা বিরোধীদের সমুচিত জবাব দিয়েছে, এই ক্যাম্পাসে কোন স্বাধীনতা বিরোধীদের জায়গা হবে না। নুরুর নাটক সবাই বুঝে গেছে।’

হামলার বিষয়ে নুরের প্যানেল থেকে নির্বাচিত ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন বলেন, ‘ছাত্রলীগের নেতৃত্বে প্রশাসনের প্রশ্রয়ে ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর, ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন, যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান, ফারুক হোসেন, মশিউর রহমানসহ অন্তত ৪০ জনের ওপর হামলা হয়েছে। কারও পা ভেঙ্গে গেছে, নাক মুখ দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে, বমি করছে, বুকের হাড় ভেঙ্গে গেছে। অনেকে আইসিইউতে রয়েছে। অনেকের অবস্থা সংকটাপন্ন। তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরা নিয়ে আমরা আশঙ্কা করছি।’

এদিকে ঘটনার পর ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানী সাংবাদিকদের বলেন, ‘নুর নিজের দুর্নীতি ঢাকতে বহিরাগতদের নিয়ে ডাকসুকে ব্যবহার করে অরাজকতা করছেন। সে সকাল থেকে বহিরাগতদের দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ডাকসুতে আশ্রয় দিয়ে রেখেছেন।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. একেএম গোলাম রব্বানী বলেন, ‘নুরসহ আহতদের ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সিতে পাঠিয়েছি। সেখানে সহকারী প্রক্টররা আছেন। আগে চিকিৎসা হোক, পরে সবার বক্তব্য শুনে তারপর ব্যবস্থা নিব।’

এদিকে নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদে বিকেলে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেছে প্রগতিশীল ছাত্রজোট, সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, ইশা ছাত্র আন্দোলন। হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে বিবৃতি দিয়েছে ছাত্র ফেডারেশন।


এখানে শেয়ার বোতাম