মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৩
শীর্ষ সংবাদ

ডাঃ নিরঞ্জন দত্ত সেনাপতি স্মরণে

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 17
    Shares

অশেষ কান্তি দে::

এই তো সেদিন। মন বলে ঠিক তাই।অথচ দেখতে দেখতেই যেন পেরিয়ে গেছে দশটি বছর। কী অদ্ভুত! সেদিনও উঠেছিল রোদ।ঘামে শরীর গিয়েছিল ভিজে।আরেক হোমিও ব্যক্তিত্ব ডাঃ বীরেন্দ্র চন্দ্র দেব সহ আরো অনেকে এসেছিলেন তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে।শব মিছিলে হয়ে গেছি শামিল।হাঁটতে হাঁটতে কত কথা যে এসেছিল মনে।স্মৃতি সঙ্গ দেয়।আগের দিনে ও আমাদের কথা হয়েছে। আজ নিমিষেই সব হয়ে গেছে ছবি।বেঁচে থাকা মানুষটি আর নেই! কথা বলতে আসবেন না আর।সন্মুখে থেকে সাহস যোগাবেন না মনে।

যাকে কেন্দ্র করে হাঁটছি তিনি তো এখন মৃত নিস্প্রান এক মানুষ। অথচ এই বয়সে এসে ও তার মাঝে তারুণ্য খেলা করতো। এমনি করে ভাবতে ভাবতেই আপনমনে এগুতে থাকি।একসময়ে চালিবন্দর শশ্মানঘাটে পৌঁছে যায় প্রাণহীন এই দেহখানি।প্রস্ততি নিয়ে শুরু হয় দাহকার্য।চোখের সন্মুখে জ্বলছে দেহটি।অথচ তাকে দেখে কখনো মনে হয়নি তিনি মরতে পারেন।এতই প্রানবন্ত মনে হতো। সময় যত যেতে থাকে স্মৃতি বিষাদ হয়ে উঠে,পীড়া দেয়।

ভাবনা কাহারে বলে,যাতনা কাহারে বলে!

আজ বিশ্বকাপ ক্রিকেট সেমিফাইনালে ভারত পাকিস্তান মুখোমুখি। গতকাল ও পরিকল্পনায় ছিল খেলা দেখবো বেশ জমিয়ে ।পাক ভারত ক্রিকেট ম্যাচ বলে কথা।যেখানে আছে স্নায়ুচাপ আর টানটান উত্তেজনা।তা নিয়ে শিহরণ। শচীন টেন্ডুলকার বিশ্বকাপে ফর্মে আছেন সাংঘাতিক ।দুরন্ত ফর্মে থাকা শচীনের ব্যাটিং দেখতে পারাই বিশেষ কিছু।

অথচ এমন তো হওয়ার কথা ছিল না।যেতে তো হতোই। তাই বলে অমন হুট করে তার অর্থহীন চলে যাওয়া।বয়স ও তো তাকে কাবু করতে পারেনি ততোটা।তার চেয়ে সহধর্মিণী মায়া দত্ত সেনাপতি বরং ছিলেন ঢের অসুস্থ। চলে যাওয়ার কথা তো উনারই।অসুখের সাথে সংগ্রাম করে টিকে রইলেন চমৎকার। মাঝখান থেকে তিনি চলে গেলেন বিনা নোটিশে।

দাহকর্ম শেষে বিষন্নতাকে সঙ্গী করে বাসায় ফেরা।স্মৃতিরা ভীড় করে কেবলই।বলা না বলা কত কথা আরও কত কিছু।
ব্রিটিশ ভারতে পড়াশোনা করেছেন অবিভক্ত ভারতে।ছুটেছেন ভারতের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে।বলেছিলেন জওহরলাল নেহেরুকে দেখার স্মৃতি।

একবার নেহেরু এসেছিলেন আসামে।পরে গেলেন গুয়াহাটির বিখ্যাত কামাখ্যা মন্দিরে।নেহেরুর সে কী ছুটে চলা।তার দ্রুত চলার গতি তাকে ভাবিয়েছিল।অপ্রতিরোধ্য প্রানবন্ত নেহেরুকে দেখেছিলেন তিনি অপার মুগ্ধতায়।
নেতাজি সুভাস বসু সম্পর্কে ও তিনি ছিলেন রীতিমতো উচ্ছ্বসিত।ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতাজির ত্যাগ তিনি স্মরণ করেছেন শ্রদ্ধার সাথেই।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ছিলেন আসামে।সেখানেও হোমিওপ্যাথি ডাক্তার হিসেবে সুনাম অর্জন করে ফেলেছিলেন বেশ ।নাম তার হয়েছিল জয় বাংলার ডাক্তার।তখন অনেকেই তাকে সেখানে থেকে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন।অবস্থান তৈরি করে ফেলেছিলেন ততদিনে।তবু থাকলেন না।চারিদিকে শুধু জয়বাংলা ধ্বনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে।আর তর সইছে না।

ফিরে এলেন অবশেষে জয় বাংলায়, সিলেটে।
স্বদেশে ফিরেই দেখলেন জীবনের আরেক রুপ।জায়গা জমি বেদখল হয়ে গেছে।

যুদ্ধ বিধবস্ত দেশ,নতুন সরকার।পাকিস্তান সোনার দেশটিকে ধ্বংসস্তপে পরিণত করে গেছে।কী আর করা।অনেককিছু হারিয়ে প্রায় ধ্বংসস্তপের ওপরে দাঁড়াতে চাইলেন।এভাবেই চললো অনিশ্চয়তায় কিছুকাল।হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় যেহেতু দীক্ষা ছিল আগেই শুরু করে দিলেন তা কাজে লাগানোর।এ যাত্রায় এসেও হলেন দুর্দান্ত সফল। ধীরে ধীরে গড়ে তুললেন প্রতিষ্ঠান।মায়া হোমিও ফার্মেসী নামের প্রতিষ্ঠানটিকে শেষ পর্যন্ত তিনি নিয়ে গেছেন সাফল্য ও জনপ্রিয়তায়। মৃত্যুর আগে ও রোগী দেখে গেছেন ক্লান্তিহীন।

ধুতি আর পাঞ্জাবী পরিহিত অবস্থায় তাকে মানাতো দারুণ।রীতিমতো ফুটে উঠতো তার ব্যক্তিত্ব।অবশ্য চারিত্রিক দৃঢতা তার এমনিতেই ছিল।স্বপ্ন ও সাহসের কথা বলতেন। লড়াকু আর বুক চিতিয়ে চলতে চাইতেন।মাথা নোয়াবার পাত্র ছিলেন না একেবারেই।

স্বপ্ন জেগে ছিল তবু।বলেছিলেন আমার জীবন নিয়ে একটি বড় আত্মজীবনী লেখা যেতে পারে অনায়াসেই।সেই সময় তো আমার হয়ে উঠেলো না।তুমিও এখন ব্যস্ত।

কথা হয়েছিল দু’জনের। তবু বাকি থেকে গিয়েছিল আরও ঢের।শোনা হবে তিনি শোনাবেন এই আশায়। জীবনের আনন্দময় কিংবা বিষাদময় কাহিনি।

কিন্ত আশার ওপর পিঠে হতাশা ও থাকে।

স্বপ্ন বুকে নিয়ে গল্প আর না বাড়িয়ে তিনি পৃথিবীকে বিদায় বলে ফেললেন আকস্মিক!

আজ তার প্রয়াণ দিবস। দশম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে স্মরণ করছি অন্তহীন ভালাবাসায়, শ্রদ্ধাভরে।

লেখক: প্রভাষক, জগন্নাথপুর সরকারি কলেজ, সুনামগঞ্জ।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 17
    Shares