শুক্রবার, এপ্রিল ১৬
শীর্ষ সংবাদ

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে

এখানে শেয়ার বোতাম

মো: শাহিন রেজা ::

সেপ্টেম্বরের প্রথমে সিলেট গিয়েছিলাম! প্রচন্ড গরম তখন।অনেক দিন পর সফি ভাইয়ের সাথে দেখা। ২০১৭ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে একসাথে আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের উপর ট্রেনিং করেছিলাম।কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন সেপ্টেম্বর মাসে সিলেট এত তাপমাত্রা তিনি কখনও দেখেননি। বৃষ্টিপাতের পরিমানও কমে গেছে।বেশ কয়েক বছর আগেও বর্ষার সময়ে অনেক বৃষ্টি হত কিন্তু কয়েক বছর ধরে বৃষ্টির দেখা নেই বললেই চলে! নিজের ও মনে পড়লো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিকের বৃষ্টির দিন গুলার কথা।

আমাদের বাড়ির পিছনে ভৈরব নদী। আগে বর্ষার মৌসুমে নদীতে পানি কানাই কানাই ভোরে থাকতো যা এখন সবই স্মৃতি!অনার্সে জলবায়ু পরিবর্তনের উপর গবেষনামূলক একটি কাজ করেছিলাম।তখন জলবায়ুর বিভিন্ন ডাটা এনালাইসিস করে দেখেছিলাম বৃষিটপাতের ধরন পরিবর্তন হচ্ছে, গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এরই সাথে সাথে সাম্প্রতিক সময়ে ঝড়, বন্যা, খরার পরিমান ও বৃদ্ধি পেয়েছে ।ফলে বিভিন্ন করনেই জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচনার বিষয় এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের তেমন কোন ভূমিকা নেই কিন্তু পরিবর্তনের প্রভাবে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে বাংলাদেশ। বর্তমান সময়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দ্রুত হারে বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে হিমালয়ের বরফ গলে যাচ্ছে যা সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি করবে এবং এর ফলে উপকূলীয় জেলাগুলো সব থেকে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

আশার কথা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ যে সব থেকে বেশি ঝুকিতে রয়েছে এ কথাটি সারা বিশ্বকেবোঝাতে বাংলাদেশ সরকার অনেকটা সফল হয়েছে।জলবায়ু পরিবর্তনে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ইতিবাচক যার ফলে ২০০৯ সালে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুকি মোকাবেলাই বিভিন্ন নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং প্রতি বছর বাজেট নির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় সরকার নিজস্ব তহবিল (৭৫%) ও
বৈদেশিক সাহায্যের (২৫%) উপর নির্ভরশীল (সিপিআইআর- CPEIR, ২০১২)।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দল গুলোও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন সেজন্যই গত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের ইশতেহারে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলাই বিভিন্ন কৌশলের কথা বলেছিল । রাজনৈতিক দলগুলো যে অঙ্গীকার করেছিল তার মধ্যে অন্যতম জলবায়ু পরিবর্তন ও সুরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলাই টেকসই কৌশল গ্রহণ, উপকূল এলাকাসহ সারাদেশ নিবিড়
বনায়ন ও সুন্দরবন সহ অন্যান্য বনের প্রাকৃতিক পরিবেশের ও জীব বৈচিত্র রক্ষায় যথোপযুক্ত ব্যাবস্থা গ্রহণের কথা ।

জলবায়ুর পরিবর্তনের জন্য মূলত উন্নত দেশ ও মানুষের কর্মকান্ড দায়ি। আইপিসিসি (IPCC), ২০০৭ ও ২০১২ সালের রিপোর্ট বলছে ২০৩০ এবং ২০৭০  সালের মধ্যে যথাক্রমে ১.৩০  এবং ২.৬০ সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে। এভাবে দীর্ঘদিন তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশ আরও ক্ষতির সম্মুখিন হবে, বিশেষ করে কৃষি, স্বাস্থ্য, উপকূলীয় এলাকা, পানি সম্পদ,  জীববৈচিত্র্য, বনায়ন, য্গোযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি ঝুঁকির মুখে
পড়বে।

তাই জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়গুলো জানাতে ও মোকাবেলা করতে সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের মনিটরিং কেন্দ্র স্থাপন করে সুনির্দিষ্ট সংগ্রহ করতে পারে, অভিযোজন সম্পর্কে বিভিন্ন প্রগ্রাম বাস্তবায়ন করে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে, কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমান হ্রাস ও সবুজ কৃষি প্রযুক্তি উপর জোর দিতে পারে।এছাড়াও পরিবেশ সংরক্ষণ, টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা উপর গুরুত্ব দিতে হবে আর জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এখনতো সময়ের দাবিতে পরিনত হয়েছে।

তাছারাও জলবায়ু বর্তমানের প্রভাব প্রশমন করতে এবং টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে নিন্মোক্ত কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়:

১। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা, সম্প্রদায় ও মানুষ চিহ্নিতকরণ। জলবায়ু পরিবর্তনেরর ফলে
বাংলাদেশ কি ধরনের ঝুকিতে আছে তা বিভিন্ন সংস্থা ও দেশকে নিয়মিত জানানো।

২। জলবায়ু পরির্তনের প্রভাব মোকাবেলায় অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থা করা।
মানুষের মেীলিক অধিকার তথা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও জীবিকার সুরক্ষায় সংগ্রহকৃত অর্থ খরচ করা ।

৩। জলবায়ু অভিযোজন ও পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে সমাজের সব শ্রেনীর মানুষ
যথা : নারী, শিশু, যুবক ও দারিদ্র জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা। জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাব এবং লক্ষ বস্তু সম্পর্কে
তথ্যসমৃদ্ধ পুস্তিকা, ভিডিও ক্লিপস প্রকাশনা ও বিনামূল্যে বিতরণ  করা ।

৪। জলবায়ু পরিবর্তনের তথ্য প্রচারে এবং সচেতনাতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যম, নাগরিকসমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,
এনজিও, মসজিদের ইমাম ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা। 

৫। জলবায়ুর সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা, স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য
পুস্তকে  জলবায়ুর পরিবর্তন অন্তরভুক্তকরণ ও বিস্তারিত আলোচনা করা, বিশ্ববিদ্যালয় গুলতে জলবায়ুর
পরিবর্তন সম্পর্কিত নতুন বিভাগ খোলা এবং শিক্ষকদের জলবায়ু পরিবর্তনের উপর প্রশিক্ষণ প্রদান করা।

৬। জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কোমাতে আন্তর্জাতিক ফোরামে আলোচনা করে একটি অত্যাধুনিক
ডাটা বেজ তৈরি করা যার মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ, সম্প্রদায় এবং এলাকা চিহ্নিত করে যথাযথ
ব্যবস্থা গ্রহন করা যাবে।

৭। বনায়ন সৃষ্টির মাধ্যমে কার্বন সংকোচনের ব্যবস্থা করা কারন গাছ সালোক সংশ্লেষণের জন্য কার্বনডাই
অক্সাইড গ্রহণ করে। তাই গাছ-পালা রোপনের পরিমান বৃদ্ধি করতে হবে এবং গাছ কাটার পরিমান হ্রাস করতে
হবে । দখল হওয়া নদী উদ্ধার করা, নদী খনন করা। পরিবেশ বান্ধব আর্থ-সামাজিক ও অবকাঠামোর
উন্নয়ন।

৮। উপকূল অঞ্চলে অধিক পরিমাণ আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে, উপকূলীয় বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ, দুর্যোগ
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে দুর্যোগের ক্ষয়-ক্ষতির পরিমান হ্রাস করার ব্যবস্থা করা।

৯। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রত্যাহারের ঘোষনা দিয়েছে এবং ব্রাজিল ও ট্রাম্প প্রশাসনকে
অনুসরনের হুমকি দিয়েছেন ফলে হুমকির মুখে পড়ছে চুক্তিটি। তাই প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বাস্তবায়নে উদ্যোগ
নিতে হবে।

লেখক : মো: শাহিন রেজা
শিক্ষাথী, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়


এখানে শেয়ার বোতাম