বুধবার, ডিসেম্বর ২

চেতনাটা গুণ্ডামি দিয়ে তৈরি হয় না

এখানে শেয়ার বোতাম

ইমতিয়াজ মাহমুদ ::

চেতনাটা গুণ্ডামি দিয়ে তৈরি হয় না। রাজনীতিও গুণ্ডামি করে প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। গুণ্ডামি করে যদি মানুষের চেতনা দখল করা যেত তাইলে আইয়ুব খান অমর হয়ে যেতেন। উন্নয়ন ও গুণ্ডামি তথা লোভ ও ভয়ের সংমিশ্রণ দিয়ে যে মানুষের মন দখল করা যায় না, মানুষের চেতনা দখল করা যায় না তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান। আর মানুষের রাজনৈতিক চেতনা (e.g. বাঙালী জাতীয়তাবাদী চেতনা) ব্যাবহার করে যে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা যায় তার উদাহরণ হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু। কি হয়েছিল, ষাটের দশ বছর সেই ইতিহাস দেখেন, শিক্ষা গ্রহণ করুন।

আইয়ুব খান ‘পাকিস্তান একটি মুসলিম রাষ্ট্র’ এই বৈশিষ্ট্য সামনে রেখে অগ্রসর হচ্ছিল। সাথে ছিল উন্নয়ন আর গুণ্ডামি। আইয়ুব খানের উন্নয়নের জোয়ার সম্পর্কে এখনো অনেক বয়স্ক মানুষই সাক্ষী দিবে। বাংলাদেশের যে সড়ক নেটওয়ার্ক দেখেন আর যতোসব ইমারত ইত্যাদি দেখেন প্রায় সবই হয়েছে আইয়ুবের সময়। সংসদ ভবন সচিবালয় আদালত এগুলি সব আইয়ুবের প্রকল্প। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির বেশিরভাগই হয়েছে আইয়ুবের আমলে। লিস্টি আরও বাড়াতে পারি।

আর গুণ্ডামি? এনএসএফ নামে আইয়ুবের ছাত্র সংগঠন ছিল। দেশের প্রতিটা শিক্ষাঙ্গনে প্রতিটা পাড়ায় মহল্লায় ওরা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। আইয়ুবের বিরুদ্ধে কেউ টু শব্দ করলেই ওরা এসে মারধোর করতো। ওদের যুক্তি ছিল চমৎকার- গঠনমূলক সমালোচনা করেন অসুবিধা নাই, কিন্তু উন্নয়নের বিরুদ্ধে কিছু সহ্য করা হবে না। রাজনৈতিকভাবে যারাই ভিন্নমত পোষণ করতো তারা সংগঠন বা কর্মসূচী করতে গেলে ওরা বলতো ‘নাশকতার ষড়যন্ত্র’। এইসব কথা বলে ওরা প্রকাশ্যেই সবাইকে হামলা করতো- ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগ ছাত্র ইউনিয়ন কেউই রেহায় পায়নি ওদের হাত থেকে। এনএসএফ ছাড়া পুলিশ আর অন্যান্য বাহিনীও ছিল।

হামলার পাশাপাশি ছিল মামলা। কি পরিমাণ মামলা যে আইয়ুবের সময় হয়েছে। বিশেষ একটা আইন ছিল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নামে। ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেমেয়েরা সেসময় ‘পাকিস্তানঃ দেশ ও কৃষ্টি’ নামের একটা বইয়ের বিরোধিতা করে কর্মসূচী করতো। নিয়মতান্ত্রিক স্বাভাবিক কর্মসূচী সেসব। তার জন্যে দেশের সর্বত্র ছাত্র ইউনিয়নের নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল কয়েক হাজার। বঙ্গবন্ধুর নামে মামলা হয়েছিল প্রায় প্রতিটা জেলায় মহুকুমায়। বঙ্গবন্ধু যেখানেই যায় তাঁর নামে মামলা হয়। ফ্রিভুলাস সব অভিযোগ- ষড়যন্ত্র নাশকতা ইত্যাদি।

কিন্তু এর মধ্যেই দেখা গেল মানুষ ধর্মীয় পরিচয়ে নিজদের জাতীয় চরিত্র মানছে না। দেখ গেল মানুষ ঐসব ‘মুসলিম রাষ্ট্র’ ‘উন্নয়ন’ এইসব কথাকে গুল্লি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে শ্লোগান দিচ্ছে ‘তুমি কে আমি কে, বাঙালী বাঙালী’ ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা।’ ইত্যাদি। অসাম্প্রদায়িক বাঙালী জাতীয়তাবাদের বিকাশ হয়েছে, বঙ্গবন্ধু সেটা নিয়ে গেছেন মানুষের মধ্যে, মানুষ সেটা নিজেদের প্রাণে গ্রহণ করেছে। সেই ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালী চেতনার ভিত্তিতেই গঠিত হয়েছে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ।

এইটাই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা- ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালী জাতীয়তাবাদ আর তার ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক শোষণমুক্ত রাষ্ট্র। দেশের আদর্শগত এই চরিত্রটা যদি ধরে না রাখেন তাইলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তো আর থাকলো না। আপনি যদি দেশের চরিত্রই আমাদের মৌলিক চেতনার বিপরীত দিকে নিয়ে যান তাইলে মুখে মুখে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে কি লাভ? এইটা তো জিয়াউর রহমানের লাইন হয়ে গেল। সরকারি উৎসাহেই বাংলাদেশের একটা ‘মুসলিম প্রজাতন্ত্র’ ধরনের ভাবমূর্তি দাড় করানো হচ্ছে। ‘শতকরা নব্বই ভাগ মুসলমানের দেশ’ এই কথা বলে পাঠ্য বই পরিবর্তন থেকে শুরু করে কতরকম কাজ কাণ্ড আপনারা করেছেন সেটা খেয়াল রেখেছেন?

না, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান এই কথা তো কেউ অস্বীকার করেনা। বঙ্গবন্ধুও করেননি। কিন্তু এইটা কেবল মুসলমানের দেশ সেই কথার বিপরীতে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন এইটা বাঙালীর দেশ- বাঙলার হিন্দু বাঙলা বৌদ্ধ বাঙলার খৃস্টান আমরা সবাই বাঙালী।

রাষ্ট্র ও ধর্মকে আলাদা রাখাটা জরুরী ছিল। সেই জরুরী কাজটা করা হচ্ছে না। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার কথা, সেটাও করা হয়নি। রাষ্ট্র ধর্ম সম্পর্কিত অনুচ্ছেদটা সংবিধানে এখনো রয়ে গেছে- এটার বিপক্ষেও আপনারা কিছু বলেন না। জামাতের লোকজনকে দলে ঢুকিয়ে দল ভারি করা হচ্ছে। রামু নাসিরনগর আর অতি সম্প্রতি ভোলাতেও দেখা যাচ্ছে আপনাদের লোকজন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ইত্যাদিতে অংশ নিচ্ছে। তাইলে বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক চেতনা কোথায় থাকলো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোথায় থাকলো? সংগ্রামের উপর আচমকা ক্রোধ দেখালেন, ভাল কথা।

কিন্তু নিজেরই তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপক্ষে সাম্প্রদায়িক অবস্থান নিয়ে বসে আছেন তার কি হবে? থাক। কিছু বললাম না। বললেই তো বলবেন বলছি- হামলা করবেন মামলা করবেন আরও কত কি!

লেখক : এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
( ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)


এখানে শেয়ার বোতাম