শনিবার, মে ৮
শীর্ষ সংবাদ

চামড়ার দাম : অন্তরালে কী ?

এখানে শেয়ার বোতাম

রাজেকুজ্জামান রতন :

অস্বাভাবিক কম দামে কুরবানির পর চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হলেন যারা কুরবানি করেছেন তাঁরা। কুরবানির পর চামড়া নিয়ে কি করবেন ? প্রচণ্ড গরমে চামড়া নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশংকা, এই টাকা তো এতিম কিংবা মাদ্রাসা মসজিদের জন্য এই ভাবনা থেকে যা দাম পাওয়া যায় তাই নিয়ে বিক্রি করে দেয়ার মানসিকতা প্রায় সবার থাকে। কিন্তু ৭০ হাজার টাকার গরুর চামড়া ৩০০ টাকাতেও বিক্রি করা যাবেনা, খাসির চামড়া ১০ টাকা, এটা মানতে পারছেন না তাঁরা। ৩১ বছর আগে ১৯৮৯ সালে ৭০০ টাকায় যে চামড়া বিক্রি হয়েছে এবার তার দাম ৩০০ টাকা।

ঈদের আগে সরকার চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল । চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় বর্গফুট হিসেবে। গরুর চামড়া ঢাকায় – ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, ঢাকার বাইরে – ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। খাসির চামড়া – ১৮ থেকে ২০ টাকা, বকরীর চামড়া- ১৩ থেকে ১৫ টাকা প্রতি বর্গফুট। এই দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনা করেই। কিন্তু এর তিন ভাগের এক ভাগ দামেও চামড়া বিক্রি করতে পারেন নি অনেকেই।

একটি পূর্ণবয়স্ক বড় গরুতে ২৫ থেকে ৩৫ বর্গফুট, মাঝারি গরুতে ১৫ থেকে ২৫ বর্গফুট, ছোট গরুতে ৯ থেকে ১৫ বর্গফুট এবং ছাগলে ৫ থেকে ৮ বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়।

ধারনা করা হচ্ছে এবারের ঈদে ১ কোটি ২৫ লাখ কুরবানি হয়েছে। এর মধ্যে ৫৫ লাখ গরু এবং ৭০ লাখের মত ছাগল । উট, দুম্বা, ভেড়া কিছু কুরবানি হয়েছে তবে তার পরিমান উল্লেখ করার মত নয়। টানারস এসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী দেশে বছরে ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া উৎপাদন হয়। এর মধ্যে প্রায় ১০ কোটি বর্গফুটের বেশি চামড়া সংগৃহীত হয় কুরবানি ঈদের সময়। দেশে সংগৃহীত চামড়ার ৬৫ শতাংশ গরুর, ৩২ শতাংশ ছাগল , ২ শতাংশ মহিষ, ১ শতাংশ ভেড়ার চামড়া। কুরবানির ঈদে সংগৃহীত ১০ কোটি বর্গফুট চামড়ায় সাধারণ মানুষ সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা কম পেল।

চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে প্রায় ১০ টি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। প্রথম ধাপেই লবন দিয়ে সংরক্ষন করা হয়। একটি গরুর চামড়ায় ৮ থেকে ১০ কেজি লবন লাগে। লবন, জনবল ও অন্যান্য খরচ সহ সংরক্ষন করা প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম দাড়ায় ৭৫ থেকে ৮০ টাকা। চামড়ার প্রধানত দুটি গ্রেড হয়। এ গ্রেড এর চামড়া ১২০ টাকা থেকে ১৩০ টাকায় বিদেশে রপ্তানি হয়। বাংলাদেশের চামড়া ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স, রাশিয়া, জাপান, তাইওয়ান সহ অনেক দেশে রপ্তানি হয়। বিশ্ববিখ্যাত পুম, হুগোবস, গুচ্চি, পিভলিনস সহ অনেক কোম্পানি তাদের কাঁচামাল সংগ্রহ করে বাংলাদেশ থেকে।

চামড়ার দাম কমলেও জুতার দাম কিন্তু বাড়ছেই। এক জোড়া জুতা তৈরিতে সাড়ে তিন বর্গফুট চামড়া লাগে, এর বাইরে আরও দেড় বর্গফুট লাগে জুতার লাইনিং এর জন্য। সর্বমোট ৫ বর্গফুট চামড়া লাগে এক জোড়া জুতায়। বাংলাদেশে ১ হাজার টাকার নিচে কি জুতা পাওয়া যায়? মাঝারি মানের জুতা কিনতে গেলে ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা লাগে। কিন্তু চামড়ার দাম কত? চামড়া এবং জুতা শ্রমিকদের মজুরী বাংলাদেশে সবচেয়ে কম কিন্তু জুতার দাম কম নয়।

শুনছি যে, সারা বিশ্বে নাকি চামড়ার দাম কম আবার চামড়া যেন ভারতে পাচার না হয় সে কারনে বর্ডার গার্ড সতর্ক আছে ? বুঝতে পারছি না ব্যাপারটা।
ভালই চলছে সব কিছু ! কৃষক সরকারের বেধে দেয়া দামে ধান বিক্রি করতে পারে না। কম দামে ধান বেচতে বাধ্য হয়। কুরবানির চামড়া মধ্যবিত্তরা সরকারের নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে পারে না। কুরবানির ত্যাগের সুযোগে তিন- চার’শ কোটি টাকা চামড়া ব্যবসায়ী কিছু ফড়িয়ার হাতে চলে গেল । অনেক কিছু সহ্য করতে করতে আমাদের চামড়ার সহ্য ক্ষমতা এখন অনেক । নির্বাচন বা ভোটের অন্তরালে কিংবা কুরবানির ত্যাগের অন্তরালে যাই হোক না কেন কি আসে যায় ?

লেখক-রাজনীতিক ও শ্রমিক আন্দোলনের নেতা


এখানে শেয়ার বোতাম