বুধবার, জানুয়ারি ২৭

চলচ্চিত্রে নজরুল

এখানে শেয়ার বোতাম

বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী, প্রেম, দ্রোহ, মানবতার কবি কাজী নজরুলের গল্প উপন্যাস নিয়ে হয়েছে অনেক সিনেমা। অনেক সিনেমায় ব্যবহৃত হয়েছে নজরুলের সৃষ্টি কালজয়ী গান। তিনি নিজেও অভিনয়ও করেছেন চলচ্চিত্রে।
নজরুলের জন্ম উপমহাদেশে চলচ্চিত্রের সময়ে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি হয়েছিলেন চলচ্চিত্রের মানুষ। চলচ্চিত্রে অবদান রেখেছেন সুরভাণ্ডারী, পরিচালক, সঙ্গীতকার, সুরকার, গীতিকার, অভিনেতা, গায়ক, কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার, সংলাপকার, পৃষ্ঠপোষক ও সংগঠক হিসেবে। কোলকাতার চিত্রজগতে নজরুল সরাসরি জড়িত ছিলেন প্রায় ২০টি চলচ্চিত্রের সঙ্গে।

ত্রিশের দশকে নজরুল চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান “ম্যাডান থিয়েটার্স”র ‘সুর ভাণ্ডারী’ পদে নিযুক্ত হন। ১৯৩১ সালে প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্র ‘জামাই ষষ্ঠী’তে সুর ভাণ্ডারীর কাজ করেন নজরুল। ম্যাডান থিয়েটার্স কোম্পানির আরো যেসব চলচ্চিত্রের সঙ্গে নজরুল সম্পৃক্ত ছিলেন। সেগুলো হলো: ‘জ্যোৎস্নার রাত’, ‘প্রহ্লাদ’, ‘ঋষির প্রেম’, ‘বিষ্ণুমায়া’, ‘চিরকুমারী’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘কলঙ্ক ভঞ্জন’, ‘রাধাকৃষ্ণ’ এবং ‘জয়দেব’।

১৯৩৪ সালে সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে যৌথভাবে ‘ধ্রুব’ পরিচালনা করেন নজরুল। এতে তিনি নারদের চরিত্রে অভিনয় করেন। ওই ছবির গীতিকার ও সংগীত পরিচালক ছিলেন তিনি। সিনেমার ১৮টি গানের মধ্যে ১৭টি গান ছিল নজরুলের লেখা। ৩টি গানে কণ্ঠও দিয়েছিলেন তিনি।

১৯৩৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পাতালপুরী’ চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেন নজরুল। পাতালপুরী’ সিনেমাটি কয়লাখনির শ্রমিক ও সেই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম নিয়ে নির্মিত হয়েছিলো। এ ছবির জন্য গান রচনা করেন নজরুল।

১৯৩৭ সালে মুক্তি পায় রহস্য কাহিনীভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘গ্রহেরফের’। এ ছবির সংগীত পরিচালক ও সুরকার ছিলেন নজরুল। একই বছর ‘বিদ্যাপতি’ সিনেমার গল্প সংলাপ ও চিত্রনাট্য যৌথভাবে নজরুল ও দেবকী বসু রচনা করেন। তবে মূল গল্প ভাবনা নজরুলের ছিলো বলে জাানা যায়। ‘বিদ্যাপতি’ লাহোর-মুম্বাই-কোলকাতা হয়ে সিলেট-ঢাকা-বরিশাল এবং রেঙ্গুনের সিনেমা হল পর্যন্ত প্রদর্শিত হয়েছিলো। এই সিনেমার সুরকারও ছিলেন তিনি।

বেদে জীবন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য নজরুল কিছুদিন বেদে দলের সঙ্গে ছিলেন। তারপর ‘সাপুড়ে’ সিনেমার কাহিনী রচনা করেন। ১৯৩৯ সালে মুক্তি পেয়ে ‘সাপুড়ে’ ছবিটি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো।

‘চৌরঙ্গী’ ছবিতে নিজের লেখা ৮টি গানে সুর ও সংগীত পরিচালনা করেন নজরুল। অসুস্থ হয়ে পড়ায় নতুন আর কোন সিনেমায় তিনি সশরীরে যুক্ত না হতে পারলেও তার সৃষ্ট কর্ম ব্যবহৃত হতে থাকে নানা সময়ের চলচ্চিত্রে। জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ থেকে শুরু করে হুমায়ুন আহমেদের ‘চন্দ্রকথা’সহ বাংলাদেশি অনেক চলচ্চিত্রে নজরুলের গান ব্যবহৃত হয়েছে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ এক ব্যতিক্রমী সংযোজন। পাকিস্তানি আমলে বিরাজমান রাজনৈতিক ঘটনাবলী জহির রায়হান পারিবারিক ঘটনার রূপকে তুলে ধরেন এই চিত্রে। এটি গণআন্দোলন ভিত্তিক চলচ্চিত্র। এ ছবিতে নজরুলের লেখা একটি বিপ্লবী গান ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ ব্যবহৃত হয় রাজবন্দীদের ঠোঁটে সমবেত কণ্ঠে। গানটির ব্যবহার ও চিত্রায়ন ছবির সিচুয়েশন অনুযায়ী দারুণভাবে ফুটে উঠেছিলো।

‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ সিনেমায় ‘পথহারা পাখি কেঁদে ফেরে একা’ গান থেকে শুরু করে আধুনিক দারুচিনি দ্বীপ সিনেমার দূর দ্বীপবাসিনী গান দর্শক হৃদয়ে আলোড়ন তুলেছে। সিনেমায় প্রচুর গান ব্যবহার করা হলেও সে তুলনায় নজরুল সাহিত্য নিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে কাজ হয়নি তেমন।

‘মেহের নেগার’ ‘রাক্ষুসী’ ‘মৃত্যুক্ষুধা’ এবং গল্প ‘ব্যথার দান’ ও ‘পদ্মগোখরা’ অবলম্বনেও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। তবে নজরুলের গল্প নিয়ে ছোট পর্দায় প্রচুর নাটক টেলিছবি তৈরি হয়েছে।


এখানে শেয়ার বোতাম