রবিবার, মে ১৬
শীর্ষ সংবাদ

ঘোড়ার দৌড়,ক্যাসিনো এবং জুয়া

এখানে শেয়ার বোতাম

মোহাম্মদ মনির উদ্দিন ::

শিশু ও কৈশোর পুরো সময় পার করেছি গ্রামে।নাড়ি পোতা প্রিয় গ্রাম আমবাড়ী।প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী গ্রাম।সবুজঘেরা অপরুপ!নয়নাভিরাম মনোরম এক গ্রাম।গ্রামের নামেই আমবাড়ী বাজার,উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়।দীর্ঘতম নদী সুরমার তীরেই এই গ্রাম।নদী তীর থেকে থাকালে মেঘালয় পাহাড় দেখা যায়।আকাশ পরিস্কার হলে স্পষ্ট মেঘালয় পাহাড় কাছেই বোঝা যায়।হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রায় সমান সংখ্যক মানুষের বসবাস একসময় ছিলো।নিকট অতীতেও দেখে ছিলাম।হিন্দু-মুসলিমদের একসময় দারুণ সম্প্রীতি ছিলো।এখন আর আগের মতো নেই।দিনদিন হিন্দুরা কমে যাচ্ছে।অনেকে ভারত কিংবা শহরে চলে গেছেন।

একসময় উভয় সম্প্রদায়ের লোকজন মিলে উৎসব-বিনোদনের আয়োজন করতেন।যদিও বিনোদনের সুযোগ কম ছিলো।তবুও ঘটা করে আয়োজন করা হতো।
গ্রামে বিনোদন বলতে বিভিন্ন ধরনের খেলা অর্থাৎ ফুটবল,হাডুডু,গোল্লাছুট,দাড়িয়াবন্দা,নৌকাবাইচ ইত্যাদি হতো।এসব খেলাধুলার পাশাপাশি যাত্রাপালা, পুঁথিপাঠ, কিচ্ছাগান, ফকিরমেলা, হিন্দু ধর্মালম্বীদের কৃর্তন, পুজার সময় হরেকরকমের গান। শীতকালে আশপাশ গ্রামে বিরাট ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন বেশ জমে উঠতো।আকর্ষন করতো।আশির দশকে সুনামগঞ্জের আমবাড়ি এলাকায় শীত মৌসুমে প্রায় গ্রামে ঘোড়ার দৌড়ের প্রতিযোগিতার স্মৃতি, আজোও মনে বেশ দাগ কাটে।এইসব ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার আড়ালে আয়োজকদের মুল ব্যবসা ছিলো জুয়া খেলা।তাস খেলার আসর বসতো।আয়োজকদের মুল আয় হতো জুয়ার আসর থেকে।বায়ান্ন তাসের তিপান্ন খেলা থাকলেও কয়েক ধরনের খেলা মেলায় চলতো।

এর মধ্যে তিন তাসের খেলাকে বলা হতো ফ্লাস,নাইন কার্ডের খেলাকে বলা হতো ব্যাংক এবং অকশন ব্রিজ নামে তাসের এক ধরনের বেশ জ্ঞানবুদ্ধি খাটানোর কার্ড খেলা জমে উঠতো।চরকা ঘোরানো নামক একধরনের প্রতিক সম্বলিত খেলা ছিলো।তিন ঘুঁটি,ছয় ঘুঁটির খেলা হতো।এছাড়া কড়ি দিয়েও জুয়াখেলা হতো।বড়ছোট ভেদাভেদ তেমন ছিলো না।একাকার হয়ে যেতো।দিনে বিরাট ঘোড়দৌড় এবং শিশু-কিশোর ও মহিলাদের রকমারি আইটেম বেচাবিক্রি চলতো।সন্ধ্যা নামার সাথেই জুয়ার আসর।যেনো সাঝসাঝ এক অনন্যসাধারণ উৎসব।এমন উৎসব আজ নেই।হারিয়ে গেছে।ধরন পাল্টেছে।গ্রামে যাত্রাপালা,পুঁথিপাঠ,ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা এখন আর হয় না।ফলে জুয়ার আসরও আগের মতো বসে না।মানুষ সম্মিলিতভাবে আর এই উৎসব আয়োজন করে না।দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে।জুয়ার ধরণ বোধ হয় পাল্টেছে।শিলং তীর নামক এক ধরনের জুয়া নাকি হয়।নতুন আর কোনো জুয়ার পদ্ধতি বের হয়েছে কি-না জানিনা।খোঁজ নিলে হয়তো জানা যাবে।দিনদিন মানুষজন একা হয়ে যাচ্ছে।স্বার্থপর আত্বকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে।করে খাওয়ার চেয়ে কেড়ে খাওয়ার লোক বেড়ে গেছে।অথচ কয়েক দশক আগে তো গ্রামে এমন ছিলো না।

শহরে গ্রামের চেয়ে নাগরিক সুবিধা বেশি।দুর্বৃত্তপনা,লুটপাঠ,ছিনতাই ও রাহাজানিও বেশি।সম্প্রতি দেখা গেল জুয়াখেলাও ব্যাপকভাবে বেড়েছে।রাজধানী ঢাকায় শতাধিক ক্যাসিনোর সন্ধান পাওয়া গেল।দীর্ঘদিন থেকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় চলছে।এখন হঠাৎ করে জনসমক্ষে চলে আসলো।ক্যাসিনোতে কী কী চলে জানা ছিলোনা।শুনতাম বিদেশে জুয়াখেলা মানে ক্যাসিনোতে যাওয়া।চেনা জানা অনেকেই ক্যাসিনোতে গিয়ে জুয়া খেলার কারণে বাড়ীতে টাকা পাঠাতে পারে না।যা কামায় তা শেষ করে দেয়।দেশে ক্যাসিনো ছিলো তা জানা ছিলো না।ক্যাসিনোতে যারা অভ্যস্থ তারা জেতার চেয়ে হারেন বেশিই।মুলত লাভবান হয়ে থাকেন জুয়ার আয়োজকরাই।অবৈধভাবে রাজধানীতে ক্যাসিনো চলছে।ক্রমান্বয়ে অন্যান্য শহরেও চলবে,হয়তো গোপনে চলছেও।একসময় হয়তো গ্রামেও চলে যাবে।রাজধানীতে এই শতাধিক ক্যাসিনোতে জুয়া ও অন্যান্য কাজকারবারের সংবাদ গণমাধ্যমে দেখে শিশু-কৈশোর সময়ের ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার আড়ালে হারিয়ে যাওয়া জুয়ার কথা মনে হলো।

এইসব জুয়া বন্ধ করতে হলে রাজনীতিকে শুদ্ধ করতে হবে।প্রশাসনকে সঠিকভাবে চালাতে হবে।একটি প্রজন্মকে নীতি-নৈতিকতার শিক্ষায় শিক্ষিত করার অঙ্গীকার নিতে হবে।সফল হতে হলে রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।অন্যথায় জুয়ার আসর ক্যাসিনো বা অন্যরুপে বিস্তার লাভ করবে।

লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, সিলেট


এখানে শেয়ার বোতাম