বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ৩

গর্ত

এখানে শেয়ার বোতাম

রোমেল রহমান ::

নিরু পাগলা একটা গর্ত খোঁড়ে! কবরের আকৃতি না! পুরোপুরি গর্ত! তবে গভীর! আমরা জানতে পাই দুদিন আগে নিরু পাগলাকে পুলিশ পিটিয়েছে লগডাউনের মধ্যে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর অপরাধে! আমাদের খারাপ লাগে ব্যাপারটা! কিন্তু নিরু পাগলা গর্ত খোঁড়ে গোরেস্তানে! ফলে চলাচল বন্ধের আগে আগে দুপুরের দিকে আমরা গোরেস্তানে যাই! গোরখোদকদের জিজ্ঞেস করতেই তারা হাসি হাসি মুখে দেখিয়ে দেয়, ঐ যে দক্ষিণ দিকে পুকুরের কিনারে গর্ত খুড়ে পাগ্লায়! আমরা গিয়ে দেখি প্রায় এক মানুষ সমান গর্ত খুঁড়ে ফেলেছে নিরু পাগলা! পরিশ্রমের ছাপ তার সমস্ত শরীরে! আমরা জিজ্ঞাস করি, নিরু ভাই বিড়ি খাবা নিকি? নিরু মাথা উঁচিয়ে তাকিয়ে তার কালো দাঁত গুলোতে হাসি ফুটিয়ে বলে, এহন তো ব্যস্তের সুময়! এহন আসছেন? ঠিক করেন নাই! কিন্তু আসছেন যহন তহন তো আপনেরে ইজ্জৎ করা লাগে! নিরু ভাইকে বিড়ি এগিয়ে দিতে উনি বলে ওঠেন, টাইনা দেন! আমরা বলি, পুরাটা খান! খাটনি যাইতেছে আপনের! নিরু বলে, হ! উপায় নাই! সরকারের নির্দেশ বইলা কথা!! ঘোপে থাকতে হবে! চিন্তা করেন কেমুন চুদির ভাই, পাগল গো যে দুনিয়াডাই ঘর সেইটা এগোরে বুঝায় কেডা? চুতিয়ারা জানেই না ঘর সবার থাকে না! সবাই কি মুর্গি যে খোপে সাইন্দা থাকবো? কি বিবেচনা আপনেদের? আমরা মাথা নেড়ে বলি, ঠিক! মানুষ বিষয়ে এগোর জ্ঞান নাই! নিরু বলে, নাই! মানুষে লাগছে ভ্যাজাল!! একদল মিউমিউ মানুষ! আরেকদল হইতেছে পুলিশ! এগোর মাথার মইদ্দে সরকার! এরা বুঝেই না সরকাররে চালায় কারা! সরকারের বাপের বাপ হইতেছে পাগলেরা! আমরা টের পাই নিরু ভাই পুলিশের হাতে মার খাবার যন্ত্রণাটা ভুলতে পারে নাই! নিরু ভাই বলে, এই দেহেন আমার সোন্দর পোঙ্গাডারে কালা বানায় দিছে পুলিশে পিটায়া! কতো কইরা কইলাম, আমি পাগল! হেরা হাসে আর কয়, ঘরে যা! আরে চুদনা ঘরে তুই যা! ঘরে গিয়ে বউর লগে ডলাডলি কর গিয়া! আমি যাবো কোন দুঃখে? আমার ডিউটি আছে না? চুতিয়ারা এইকথা শুইনা আবার মাইর দিয়া কয়, ঘরে যা! আরে বালের ব্যাটা বাল, ঘরে যাবো কেম্নে, আমার ঘরে তো সরকার দখল নিয়া আছে! আমরা জিজ্ঞাস করলাম, সারা শহরে এতো যায়গা থাকতে গোরেস্তানে আস্লা ক্যা? নিরু পাগলা বলল, কেউ যায়গা দেয় না! মছ্‌ছিদে থাকা নিরাপদ না, পাগল মানুষ কহন হাইগা মুইতা মাখামাখি কইরা দিই! গোরেস্তান মচ্ছিদের এমাম সাব আমারে ভালো পায় হেয় কইসে যদ্দিন ইচ্ছা থাক, তয় খানা দিতে পারবেন না! খুবই উচ্চ মানুষ!

সেদিন চলে যাবার সময় আমাদের মন ভীষণ খারাপ হয়! কেন জানি এক ধরণের দুশ্চিন্তা ঘিরে রাখে! এই পাগল মানুষটা একেবারে নির্বিবাদ! খিদে লাগলেও কিছু বলে না! বাজারের হোটেল গুলোর সামনে দিয়ে হাঁটাহাঁটি করে! হোটেল থেকে খাবার দিলে খায়! তবে চা দোকান গুলোর ইয়াং পোলাপাইনেরা নিরু ভাইরে ভালো পায়! তারা যত্ন করে! বিড়ির ভাগ দেয়!

এর দিন তিনেক পরে নিরু ভাইকে দেখতে আমরা আবার আসি! কিন্তু এবার দেখা যায় গোরেস্তানের গেট লাগানো! গোরখোদকেরা জানায়, করোনা পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় শুধুমাত্র লাশ আসলেই গেট খোলার নিয়ম জারি হয়েছে! সাধারণ লোকদের ঢোকা একেবারেই নিষিদ্ধ, জিয়ারত বন্ধ ! পরিচিত হওয়ায় আমরা অল্প সময়ের জন্য ঢোকার সুযোগ পেয়ে যাই! গোরেস্তানে গিয়ে দেখি নিরুভাই জুবুথুবু হয়ে গর্তের পাশে বসে আছে। আমরা কাছে গিয়ে বিড়ি দিতেই নিরু ভাই বলে, বিস্কুট আছে নাকি? আমরা বিব্রত অবস্থায় পরে যাই! আমাদের একজন বলে, তুমি গর্তে থাকো না? নিরু ভাই বলে, থাকি তয় সব সময় না! তয় কিনারেই থাকি বেশি, পুলিশ আসলেই ঝুপ কইরা নাইমা যাবো! আমরা জিজ্ঞাস করি, গর্তের মধ্যে কেমন লাগে? নিরু ভাই বলে, ভাল্লাগে না! মানুষ না থাকলে সেই যায়গা ভাল্লাগে না! আর মাটি হইতেছে গিয়া বোবা! কথাবার্তা নাই তার! উপ্রে থাকলে যেমন গাছাপালা পোকামাকড় কাকপক্ষী আছে এগোর সাথে দুই চাইরটা বাতচিত করা যায়! আমরা সেদিন আরও বিমর্ষ মন নিয়ে চলে যাই এবং ঠিক করি, আগামী দিন আমরা খাবার নিয়ে আসবো নিরু পাগলার জন্য! কেননা ভাতের হোটেল, চায়ের দোকান সব বন্ধ! বাজার খোলা হয় সম্মান্য সময়ের জন্য! কিন্তু পরের দিন গুলোতে আমরা বের হতে পারি না! সেদিন রাতে আমাদের এলাকা লগডাউন ঘোষণা করা হয়! ফলে সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয় আমাদেরকে! চোদ্দদিন পর যখন লগডাউন উঠিয়ে নেয়া হয় তখন আমরা গোরেস্তানে আসি! কিন্তু আমাদের ঢুকতে দেয়া হয় না! গোরখোদকেরা বলে, নিরু নাই! আমরা অবাক হয়ে বলি, গেছে কই? গোরখোদকদের একজন বলে, লগডাউনের দুইদিন পর দেখি এক সকালে কোদাল নিয়া গর্তডা বুজায় দিলো! তারপর খাড়ায়া মোনাজাত করলো, যেমনে কবর জিয়ারত করে মাইন্সে! তারপর কোদাল দিতে আসলে জিজ্ঞাস করলাম, বুজায় দিলা ক্যা? নিরু কয়, কাম শ্যাষ! দাফন কইরা দিলাম সব ঝামেলা! আমরা জিজ্ঞাস করলাম, তারপর? লোকটা বলল, কোদাল দিয়া আবার ফিরা গিয়ে দুইটা খেজুরের ডাল ভাইঙ্গা গর্তডার মাটির উপ্রে পুত্তেছিল! আমরা দেইখা হাসতেছিলাম পাগলের কারবার! কিন্তু তারপর থিকা তারে আর দেখি নাই! আমরা অনেকক্ষণ ভ্রু কুঁচকে চুপ করে থেকে জিজ্ঞাস করি, গর্তটা কি খুইড়া দেখছেন? গোরখোদকেরা শঙ্কিত চোখে তাকিয়ে বলে, সরকারের হুকুম ছাড়া তো কবর খোলা যায় না!


এখানে শেয়ার বোতাম