শুক্রবার, নভেম্বর ২৭

গণতন্ত্রের ছায়ায় নব্য স্বৈরতন্ত্র : সাম্প্রতিক নিরিখ

এখানে শেয়ার বোতাম

রাহুল বিশ্বাস ::

‘গণতন্ত্র’ যা ‘জনগণের শাসন’ নামে পরিচিত এবং প্রচলিত ধারণায় এটি দ্বারা ‘বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা’কে বুঝায়। সম্ভাবত এ কারনেই এটি বহুল ব্যবহৃত ও সর্বাধিক আকর্ষণীয় একটি শব্দ। যদিও অধিকসংখ্যক মানুষ যার মূল সম্পর্কে অজ্ঞ—যূথভ্রষ্ট। গণতন্ত্রের নাম নিয়ে আধুনিক বিশ্বে মোটামুটি তিন ধরণের শাসন বর্তমান। প্রথমত, যেটি বিশ্বপুঁজিবাদ তথা বিশ্বের বিভিন্ন দেশগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল হিসেবে কাজ করে। দ্বিতীয়ত, যেখানে খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য খাতে সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে কিছুটা সাম্যাবস্থা বিরাজ করছে। ইউরোপের দেশগুলো যার প্রথম উদাহরণ; যদিও ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ফারাক বেড়েই চলছে বুঝে তারা এখন গণতন্ত্রের দিকে বুড়ো আঙুল তুলতে শুরু করেছে। তৃতীয়ত, গণতন্ত্রের লেবাস পরে যে দেশগুলোতে ভয়ালগ্রাসী স্বৈরতন্ত্রের চর্চা চলছে। যারা স্বৈরতান্ত্রিক বলে নিজেকে কখনো স্বীকার করে না। যাইহোক, উদার রাজনৈতিক চর্চা হিসেবে অভিহিত গণতন্ত্রের দর্শন কিংবা তার প্রয়োগনীতিতে কি আদৌ কোন গলদ রয়েছে? কিংবা গণতন্ত্র যদি সত্যিকার অর্থে আদর্শিক কোন রাষ্ট্রকাঠামো হবে তবে সেইতো স্বপায়ে দাঁড়াতে পারে; মোড়ল কোন দেশকে তার পৃষ্ঠপোষকতা করার প্রয়োজন পড়ল কেনো? কিংবা সমাজতান্ত্রিক কোন রাষ্ট্রের উপর তার বিধিনিষেধ আরোপের কারণটাইবা কি? নাকি এটি বিশ্বপরিসরে মোড়ল মহোদয়ের পুঁজিবাদী শাসনকে টিকিয়ে রাখার বিশেষ কোন কৌশল? তাহলে প্রশ্ন তোলা সঙ্গত নয়কি সত্যিই গনতন্ত্র আদর্শ রাষ্ট্রের অধিকতর বিচ্যুতি কিনা।

দার্শনিক প্লেটো বলেছিলেন, স্বৈরতন্ত্র গণতন্ত্রেরই সন্তান; গণতন্ত্র থেকেই তার উদ্ভব। স্বৈরতন্ত্রকে আমরা জানি একটিমাত্র ব্যক্তির একচ্ছত্র শাসন। কিন্তু গণতন্ত্র নামে চালিত নব্য এই স্বৈরতন্ত্রে একটিমাত্র ব্যক্তির একচ্ছত্র শাসনের পরিবর্তে আসলে কতিপয় ব্যক্তির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। দার্শনিক প্লেটো নিশ্চয় এই অবস্থার সাথে বিশেষ পরিচিত ছিলেন না। যদিও এখানেও ঐ একটিমাত্র ব্যক্তির ছত্রছায়ায় এই কতিপয়ীরা পোষ্য কুকুরের ন্যায় লালিত-পালিত হয়। ঘটনাটি হিংস্র নেকড়ে থেকে গৃহপালিত কুকুর হয়ে ওঠার গল্পের মতো। যাদের লক্ষ্য হল অনৈতিক উপায়ে সম্পদের সংগ্রহ এবং অর্থের উপার্জন। ভোগ-বিলাসী জীবনের প্রতিভূ তারা। তাইতো অবশ্যম্ভাবীরূপে যাদের প্রকৃতি অপরের প্রতি ভয় এবং বিরামহীনভাবে সকল গুণী, সত্যবাদী, আদর্শবান ও শক্তিমানের নিধন। গোড়ার দিকে অবশ্য এরা মুখে মৃদু হাসির রেখা এঁকে প্রকাশ্য ও গোপনে মধুর প্রতিশ্রুতিতে জনগণকে মুগ্ধ করে পয়সায় নিজের পিঠটাকে উপরে রেখে জয়ী হতে চায়। কিন্তু সে মধুর ভাবটা খুবই ক্ষণস্থায়ী। সংকটাপন্ন মুহূর্তটি কেটে গেলেই শুরু হয়ে যায় তার আসল রূপের প্রকাশ। যে-জনতা তাকে সৃষ্টি করেছে সেই পিতাকে/সর্বংসহাকে সে প্রহার করে, প্রয়োজনবোধে তাকে হত্যা করতে শুরু করে। অন্ধের মতো নিজের প্রতি অনুগতদের সে একমাত্র নিজের সুহৃদ বলে মনে করে। উত্তমকে ছুরিকাঘাত করে সে অধমকে ধারণ করে। শাসক তার ভুঁইফোঁড় অনুসারী দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। তার সঙ্গী অন্ধ স্তাবকের দল দ্বারাই সে নিজেকে সর্বদা পরিবেষ্টিত রাখে। একলা একলা রাস্তায় হাঁটার সাহস পর্যন্ত এই স্বৈরশাসকের নেই। নিজের পাপের জন্য সে সদা-সর্বদা ভীতসন্ত্রস্ত থাকে। তাই সে পরাশ্রয়ী—দুর্বৃত্তদের উপর নির্ভরশীল। স্বৈরশাসকের আকাঙ্ক্ষা অনেক ক্ষেত্রে কতিপয়ীদের দ্বারা বাধাগ্রস্থ হয়। এই কতিপয়ীদের বলয়চক্র, শক্তি ও সম্পদ একসময় এতোই পাহাড়সম হয়ে উঠে যে স্বৈরশাসককেও তারা বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে তোয়াক্কা করে না—পূর্বের মতো প্রভুর পদতলে মাথা নত করে না। স্বৈরশাসক তখন সাধারণত নিজের আকাঙ্ক্ষাকে অপূরণ রেখে কতিপয়ীদের সিদ্ধান্ত মতো চলে। কারণ সে অবগত যে কতিপয়ীদের পায়ে ভর দিয়ে তার চলা কিংবা চেয়ার ছাড়লে তার মৃত্যু অনিবার্য। বিরূপ আবহাওয়া অর্থাৎ প্রতিকূল অবস্থায় কতিপয়ীদের একটি গোষ্ঠী সংঘবদ্ধ হয়ে কখনোবা স্বৈরশাসককে হত্যা পর্যন্ত করতে পারে। তারপর কতিপয় থেকে প্রতাপশালী একজন আবার পূর্বের স্বৈরশাসকের স্থান দখল করবে।

এতক্ষণে যে শাসককে জনতার সৃষ্টি বললাম যার মূলে রয়েছে জনগণকে ধোঁকা দেবার বিশেষ সব কৌশলাদি, বিভিন্নরকম ফন্দি, ধড়িবাজি; যেমন—ধর্মের প্রলোভন, স্বাধীনতার প্রলোভন, সুখের প্রলোভন ইত্যাকার নানারকম বিষয়; তবে সবসময় যে জনগণ তার শাসক তথা প্রতিনিধিকে সৃষ্টি করে বিষয়টি এমন নয়। বলে রাখা ভালো স্থানবিশেষে মধ্যবর্তী একটা স্তরে এই দলটি ক্ষুদ্রপরিসরে তার চুরিবিদ্যার কৌশল কাজে লাগায়, সেই সাথে দ্রব্যাদি উপহার কিংবা অর্থের বিনিময়ে মূর্খ, লোভী ও অজ্ঞ জনগণের আঙুলের ছাপ কিনে নেবার বন্দোবস্ত করে। এখন বলি কোনোভাবেই জনগণ তার প্রতিনিধিকে সৃষ্টি করেনা বিষয়টি আসলে কি? বিষয়টি হল রাষ্ট্র যখন সর্বোচ্চ বিশৃঙ্খলা-অন্যায়ের দাবানলে পতিত হয় তখন সে শাসক আর জনগণের উপর নির্ভর করতে চায়না। জনগণ অর্থাৎ সংখ্যাধিক্যের উপর ভরসা হারিয়ে সে নির্ভর করে সীমিতসংখ্যক তার পোষ্য কতিপয়ী ও অলিখিত রক্ষীবাহিনির উপর। কিন্তু জনগণের তুলনায় এদের সংখ্যাটা যেহেতু বিশেষ পরিমাণে সীমিত এবং যাদের কোন রাষ্ট্রীয় আইনি ভিত্তি নেই, তখন প্রয়োজন হয় একে একে রাষ্ট্রের পুলিশ, প্রশাসন ও আমলাদের হাত করার। বিনিময়ে এই আমলা ও আইনের রক্ষকগণ বিশেষসব মূল্যবান পুরষ্কারে ভূষিত হন। এবং যেহেতু শাসক নিজের অন্যায়টিকে তাদের মাধ্যমে করায়ত্ত করে নেন, সেহেতু পরবর্তীতে তাদের জন্য আর অন্যায়কর্মের দায়ে শাস্তির বিধান কার্যকর হয় না, রাষ্ট্রে তাদের অন্যায়গুলো চলমান সাধারণ ঘটনার স্বীকৃতি পেয়ে যায়। সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিবেচনায় উচিত শর্তেও (যেমন, জনরোষানল) শাসক তাদের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণে বিশেষ উদ্যোগী হন না। কারণ সেটা ভাবতেই শাসকের চেয়ারের পায়াটা নড়ে উঠে। সে উদ্বিগ্ন ও ভীতসন্ত্রস্ত হয়। তবে এই স্বৈরশাসক একটা খেলা খেলে। যে কতিপয়ীদের নিয়ে স্বৈরশাসকের শাসনব্যবস্থা তাদের নিয়ে। যখন এই কতিপয়ীদের নিজেদের মধ্যে উপরে উঠার একটা প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়। এই প্রতিযোগিতাকে থামানো না গেলে তার নিজের মহলে চরম বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার সৃষ্টি হবে সেটা সুচতুর সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে স্বৈরশাসক অনুধাবন করতে পারেন। ফলে নিন্ম বা মধ্য স্তরের কিছু কতিপয়ী বা জনপ্রতিনিধিকে তিনি দুর্নীতি, অর্থপাচার, জুয়া, মাদকব্যবসা, নারীকেলেঙ্কারি প্রভৃতি দায়ে বিচারের আওতায় আনেন। বেখেয়ালবশত ও জ্ঞানের অজ্ঞতার কারণে সাধারণ মানুষ শাসকের এই খেলাটিকে রাষ্ট্রে আইনের শাসন ভেবে বসে। যেমন ধরুন, একজন জনপ্রতিনিধিকে দুর্নীতি, অর্থপাচার, মদ্যপান, জুয়াখেলা কিংবা ব্যাভচারের দায়ে বহিষ্কার কিংবা আইনি প্রক্রিয়ায় সাময়িক দণ্ডদান করা হল, যদিও যেখানে রাষ্ট্রের প্রায় শতভাগ জনপ্রতিনিধি এ কাজগুলোর সাথে কমবেশি জড়িত, তার মানে বিষয়টি এমন যে সাদা চুল তুলতে গেলে মাথার একটা চুলও শেষমেশ রবে না, যাইহোক আসল ব্যাপারটি হল এই প্রতিনিধির প্রতিস্পর্শী এমন একজন প্রতিনিধি রয়েছেন যার দ্বারা স্বৈরশাসক মুনাফা-আসলে কিংবা ক্ষমতার দৌরাত্ম্যে অধিক লাভবান হবেন। স্বৈরশাসক বা উচ্চতরশ্রেণির কতিপয়ীদের অসম্মানকারী, বিরুদ্ধাচারণকারী কিংবা বেপরোয়া কিছু ব্যক্তিও (কতিপয়ী) এমন অবস্থার স্বীকার হতে পারেন। ফলে উল্লেখিত ব্যক্তির শাস্তি বা দণ্ডদানের কারণে একদিকে যেমন দলের উঠতি আগাছা পরিষ্কার হল, তেমনি দেশের জনগণ ও ভিন্ন কিছু রাষ্ট্র যারা শাসকের শাসনব্যবস্থায় উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করে আসছিল এদেরকে বোঝানো গেল এই রাষ্ট্রে এখনও আইনের শাসন বিদ্যমান রয়েছে।

তদুপরি এই শাসনটিকে টিকিয়ে রাখতে অভাব ও দারিদ্রতার বেড়াজালে মানুষকে আবদ্ধ করে রাখতে হয়—ধনী-গরিবের চরম বৈষম্য টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন হয়। ধনীরা আরো ধনী হতে থাকে, অন্যদিকে গরিবেরা চরম নিঃস্ব হতে থাকে। অভাবী মানুষেরা ক্ষুধার তাড়নায় ব্যস্ত থাকে। ফলে তারা নিজেদের জীবিকা অর্জনের তাগিদে দিনের প্রায় সবটা সময় ব্যয় করে ফেলে।

এই পরিস্থিতিতে কিছু চাকরির টোপ দিতে হয়, যাতে তরুণদের সকলে আমলা হবার পেছনে বইয়ের পৃষ্ঠা মুখস্ত করতে দিন-রাত ব্যয় করে। ধর্মের টোপ দিতে হয়, যাতে তরুণ-বয়স্ক সকলে অন্ধতার মধ্যে ডুবে থেকে অধিক সময় পার করতে পারে। যার ফলে শাসকের অন্যায় শাসন নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় ও সুযোগ সাধারণের যেন না থাকে। এভাবেই রাষ্ট্রে বিপ্লব দানা বাঁধার মঞ্চ প্রস্তুত হতে দেওয়া হয়না। একইভাবে ক্ষুদ্রঋণের টোপ দিতে হয়, যে ঋণ তারা দিয়েছিলো তার সুদ মারফত পুঁজির কয়েকগুন অধিক তারা আদায় করে নেয়, ফলে জনতাকে সে সুদ দিতে গিয়ে চরম নাজেহাল ও নিঃস্ব হতে হয়।

জনগণের সাথে এখানে শাসকের বিরোধ হবার সম্ভাবনা যথেষ্ট ক্ষীণ এই অর্থে যে জনগণের মধ্যে একটা শ্রেণির উদ্ভব ঘটে যারা লুটপাট, খুন, জখম ইত্যাকার কাজে লিপ্ত। শাসকদল জনগণের এই ক্ষুদ্রতম শ্রেণিটিকে নিজের দলে ভেড়ান। ফলে তার নিজের দলটা যেমন ভারী হয়, তেমনি সাধারণের উপর জুলুমটা টিকিয়ে রাখাও আরো সহজতর হয়।

যেহেতু গণতন্ত্রের নামধারী, সেহেতু এখানে কিছু স্বাধীনতা বর্তমান থাকে। যেমন, যে যার পছন্দমতো ব্যবসায়ী, শ্রমিক, কৃষক, চাকরিজীবী/বেকার (ক্ষেত্রবিশেষ), ভবঘুরে এমন যেকোনো শ্রেণিতে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে; তেমনি অর্থের বিনিময়ে সুরা, জুয়া এবং নারীসঙ্গীতে লিপ্ত হতে পারে, অন্ধ ধার্মিকগণ আবোল-তাবোল আলাপে মেতে থাকতে পারে, পুলিশ-আমলারা ইচ্ছেমতো ঘুষ খেতে পারে; তেমনি আবার অবাধ স্বাধীনতার কারণে শিক্ষক তার ছাত্রকে ভয় করে চলে, বয়স্করা যুবকদের ভয় করে চলে। জনগণ এখানে সেটুকুই স্বাধীনতা লাভ করতে পারে, যেটুকু শাসকের শাসনকে কোনভাবে আঘাতপ্রাপ্ত করেনা কিংবা তা নিয়ে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করে না।

যেহেতু শাসককে গণতন্ত্র নামটি নিয়ে চলতে হচ্ছে তাই সংবিধানসিদ্ধ জাতীয় রক্ষীবাহিনীর পরিবর্তে বখে যাওয়া একদল তরুণ-যুবকদের নিয়ে তাকে এক ধরণের বিশেষ রক্ষীবাহিনী গঠন করতে হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বত্র তাদের ব্যাপ্তি। যাদেরকে কুকর্মের বিনিময়ে পুষ্পমাল্যে ভূষিত করা হয়। অন্যদিকে অন্যায় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদেরকে শাসক তার নিজের কব্জায় নিয়ে আসে।

শাসক তার চাতুর্য ও বুদ্ধির তীক্ষ্ণতার কারণে নিজের স্তুতিস্তাবকের জন্য ভাড়াটে কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, লেখকদের হাত করে—প্রলোভনে বশ করে, কখনোবা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে কিংবা নিজের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতাপশালী একটি ভাড়াটে বুদ্ধিজীবী মহল তৈরি করে। অপরদিকে শাসন ও শাসকের বিরুদ্ধে ভিন্নমত পোষণকারী এই একই মহলটিকে স্বহস্তে দমন-নিপীড়ন করা হয়। যেখানে অদ্ভুদ কোন এক আইন তৈরি হয়, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্ররোচনায় যেকোনো সময় যেকোনো ব্যক্তিকে যেকোনো অজুহাতে গ্রেফতার করা যায়। মানুষের জীবন ও রাষ্ট্রের জন্য স্থায়ী মঙ্গল কামনাকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। সত্য প্রকাশের জন্য সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষকে গ্রেফতার করা হয়, নিরাপত্তা হেফাজতে তাদেরকে ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়। একদল শিকারির চোখ নিয়ে তাকাতে থাকে দেশে কে এখনও সাহসী, কে এখনও সত্যবাদী, কে এখনও জ্ঞানী, কে এখনও অপরের মঙ্গলপ্রত্যাশী, কে উচ্চমনা? তাদের উপর চলে দমন, নিপীড়ন ও হত্যার মহাযজ্ঞ। এরপরও যদি কোন স্বাধীনচেতা নাগরিক অবশিষ্ট থাকে, তা হলে স্বৈরশাসক কোন না কোন অজুহাত সৃষ্টি করে তাদের প্রাণনাশের পরিকল্পনা আঁটে। প্রকাশ্য বিচারে দণ্ডিত করতে ব্যর্থ হলে সে গুপ্তহত্যা চালায়। সত্যান্বেষীরা এখানে গুম হয়ে যান, খুন হয়ে যান। যেমন ধরুন, রাতের আঁধারে একদল সাদা পোশাকধারী এসে নিজেদেরকে আইনের লোক পরিচয় দিয়ে সত্যান্বেষী ব্যক্তিটিকে তুলে নিয়ে যান, তারপর পুলিশ-সেনাবাহিনীর তরফ থেকে লোকটির গ্রেফতারের কথা কখনও স্বীকার করা হয় আবার কখনওবা অস্বীকার করা হয়, অতঃপর হয়তো কিছুদিন বাদে অমুক কারাগারে লোকটি আটক আছে বলে জানা যায় নয়তো লোকটির লাশ কোন পুকুর বা নর্দমায় ভাসতে দেখা যায়।

গবেষকরা তাদের আবিষ্কার ও সত্য প্রকাশের দায়ে হেনস্তার স্বীকার হন—কখনোবা জীবননাশের হুমকি পর্যন্ত পান। কারণ, তাতে শাসকশ্রেণির ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতকৃত দ্রব্যাদির ভেতর ক্ষতিকর উপাদানের কথা জনসম্মুখে প্রচার পাবে কিংবা কোন নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর সঠিক তথ্য প্রকাশ পেলে রাষ্ট্রের প্রস্তুতকৃত ভুল রিপোর্টটি তখন মিথ্যা বলে প্রতীয়মান হবে। উদাহরণস্বরূপ, একজন গবেষককে খাবারে ক্ষতিকর রাসায়নিক আছে সত্যটা বলার জন্য কিংবা কোন মহামারী বা দুর্যোগের প্রকৃত ক্ষতির সম্ভাবনা অনুমান (হাইপোথিসিস) করার জন্য শৃঙ্খলা বা প্রক্রিয়া ভঙ্গের দায়ে তাকে আইনি নোটিশ পেতে হয়, সেই সাথে বিভিন্নভাবে তাকে হেয়প্রতিপন্ন করা হয়। আমলারা এখানে যতখুশি জনগণকে ঠকাতে পারে, কিন্তু জনগণের জন্য ভালো কিছু চাইলে কিংবা জনগণের জন্য বরাদ্দকৃত রাষ্ট্রীয় সেবার মানের বা পরিধির সামান্যতম ত্রুটির কথা বললে স্বয়ং আমলাদের উপর বদলির আদেশ বা সাময়িক বহিষ্কারনামা জারি হয়। যেমন ধরুন, কোন একজন সরকারি আমলা মিডিয়াতে বললেন দেশে স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের জন্য পর্যাপ্ত সুবিধা নেই, সেকারণে ঐ আমলার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার দায়ে বদলির আদেশ জারি হয়। স্বৈরশাসকের বসবাস মূলত তার পোষ্য কতিপয়ীদেরকে নিয়ে। যাদেরকে অবৈধ ঋণসুবিধা দেওয়া হয়, তারাই আবার রাষ্ট্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান লুট করে, বিদেশে অর্থপাচার করে বস্তুত রাষ্ট্রকে নিঃস্ব করে ফেলে। যাদের এক পা দেশে অন্য পা বিদেশে থাকে। শিক্ষা ও চিকিৎসাব্যবস্থায় এই কতিপয়ীদের মাধ্যমেই বাণিজ্যকরণ শুরু হয়। কারণ তারা তাদের সন্তানদের বিদেশে শিক্ষা নেওয়ান এবং সামান্য সর্দিজ্বর হলেও এই কতিপয়ীরা চিকিৎসা নিতে বিদেশে ছুটে যান। দেশের শিক্ষা ও চিকিৎসাব্যবস্থায় তাদের বিন্দুমাত্র আস্থা নেই—আস্থা আছে একমাত্র তাদের দেশের লুটপাটব্যবস্থায়। শাসক তার ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে অন্য দেশের হাতে নিজের দেশের বন, নদী, বায়ু, প্রাণ, প্রকৃতি ধ্বংস করতেও বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করে না। উদাহরণস্বরূপ, অন্য দেশের বাঁধের কারণে একটি দেশের নদীর স্বাভাবিক গতিপথ যখন বন্ধ হয়—নদীগুলো জলতৃষ্ণায় কাঁদতে কাঁদতে একসময় যখন তার চোখ বুজে ফেলে, তখনও ক্ষমতার মোহে শাসকদল পররাষ্ট্রনীতি কিংবা আন্তর্জাতিক নদীবিষয়ক নীতিমালা অনুসরণের মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহায় আসার কোনরকম সাহস পান না। এভাবেই নদী কাঁদে, বন কাঁদে, বায়ু কাঁদে; সমস্ত প্রকৃতি কাঁদে। উল্লেখ্য, কৃষকেরা যেখানে তাদের ফসলের সামান্যতম মূল্যও পান না, শ্রমিকরা বকেয়া মজুরি চাইতে গেলে লাঠিপেটার স্বীকার হন। কিংবা সমবেত হলে তাদের উপর টিয়ারগ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করা হয়। দেশে মহামারী শুরু হলেও শ্রমিকরা যে শাসকের কাছে পশু কিংবা যন্ত্র ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়। যেমন ধরুন, যেখানে কৃষক ফসলের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে তার মর্মন্তুদ ক্ষোপের আগুন নিজের ক্ষেতের ফসলের গায়ে লাগিয়ে ম্রিয়মান সংবিদে ক্রন্দনরত হন, আবার বন্দুকের বুলেট এসে বকেয়ার দাবিতে জড়ো হওয়া নিরীহ শ্রমিকদের শরীর ক্ষতবিক্ষত করে। এমন শাসনব্যবস্থা কি আমাদের চোখে পড়ে?

এই অন্যায় শাসনের মুখে জনতা কি একেবারেই অসহায়? জনতা কি চিরদিনই এই অন্যায় শাসনকে সহ্য করবে? প্রবল উত্তেজনায় কণ্ঠে সুতীব্র স্লোগান নিয়ে জনতা একদিন ঠিকই ফেটে পড়বে।

তারপর জনতা কি ভুলবশত কোন গণতন্ত্রের নামধারী স্বৈরশাসকের হাতে পুনরায় নিজেকে সমার্পন করবে নাকি সে বিদ্রোহ বিপ্লবের রূপ নিয়ে তাকে ক্ষমতায় নির্মোহ কোন দার্শনিককে চিনবার উপায় বাতলে দিবে?

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গল্পকার


এখানে শেয়ার বোতাম