মঙ্গলবার, মে ১৮
শীর্ষ সংবাদ

গণঐক্যে বেড়াজাল ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 112
    Shares

হাজরা আল-আমিন::

মানুষ একা বাঁচতে পারে না। মানুষকে চলতে হয় পারস্পরিক বোঝাপড়ায়। এই পারস্পরিক মেলবন্ধনে তৈরি হয় সমন্বিত সমন্বয়। সকলের সম্মিলিত সমন্বয়ের আছে প্রখর শক্তি। যুগে যুগে এই শক্তি যখনই মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, তখনই ইতিহাসের বাক বদলেছে। মূলত মানুষের ঐক্যতেই মানুষের পৃথিবী উর্বর হয়েছে। পাহাড়সম বিপত্তি, নিরেট অচলায়তন কোনো এক রহস্যময় ম্যাজিকে চুরচুর করে ভেঙে পড়েছে। সকল মত, পথ, বিপত্তির উর্ধ্বে গিয়ে তৈরি হয় এই ম্যাজিক্যাল পাওয়ার ‘ঐক্য’। রাষ্ট্রের মধ্যে ঐক্যের ঐশী শক্তি বিরাজমান থাকলে, শাসন শোষণ করে শুধু ক্ষমতাকেই স্থায়ী করা কঠিন হয়ে পড়ে।

যেসকল ক্ষমতাসীন দল নৈতিক ভিত্তি খুইয়ে ফেলে, তারাই ক্ষমতার হাতিয়ারকে অস্তিত্ব জ্ঞান করে। একমাত্র ক্ষমতাকে পুঁজি করেই তারা জনগোষ্ঠী, রাষ্ট্র তথা দেশকে করায়াত্ত করে চালিত করে। কখনই তারা মানুষের ঐক্যকে স্বীকার করতে পারে না। এমনকি মানতেও পারে না। ঔপনিবেশিত ভূখ-ের ইতিহাস লক্ষ্য করলে আমরা উপলব্ধি করতে পারি ক্ষমতার এমন প্রবণতাকে। মানুষের ঐক্যের শক্তি বিনষ্ট করতে ঔপনিবেশিক শক্তি হাতে নিয়েছিল বিভিন্ন কলা কৌশল ও নানা আইন-কানুন। তারা ভারতীয় ইতিহাসের নতুন রূপরেখা তৈরি করে। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি আধূনিকায়নের নামে তৈরি করে বিচ্ছিন্ন উপভোগী শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ধারা। সর্বোপরি আইন কানুন দিয়ে জীবন যাপনের স্বতঃস্ফূর্ত স্ফূরণকে ব্যহত করার চেষ্টা করে তারা। এই তৎপরতা মূলত গণচেতনার বিপরীতে ক্ষমতা দীর্ঘ করার একটি প্রাচীন রূপরেখা।

পাকিস্তান আমলেও এর ব্যাত্যয় ঘটেনি। মানুষের ঐক্যের জায়গা বিনষ্ট করার কারসাজি চলতে থাকে ‘৪৭ এর পর থেকেই। যার প্রথম আঘাতটি আসে বাংলা ভাষার উপর। ১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঘোষণার মাধ্যমে ঐক্য বিনষ্টের ভয়াবহ আঘাত জনসমমুখে আসে। ভাষা নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের পলিটিকসের পেছনে রয়েছিল, চেতনাশূন্য বিচ্ছিন্ন মানুষ তৈরি করার পরিকল্পনা। যাতে পূর্ববঙ্গের মানুষের সতেজ বাসনা কখনও প্রাণ না পেতে পারে। যাতে তীক্ষ্ম অনুভবগুলো প্রাণে প্রাণে বিস্ফোরিত না হতে পারে। এই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান সরকার নিষিদ্ধ করে রবীন্দ্রনাথকে। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীতে যখন সমগ্র বিশ্ব রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করছে পূর্ণ শ্রদ্ধাভরে, পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নাম নেওয়া তখন অপরাধ। অনেক বিপত্তির পরেও পূর্ববঙ্গের ঢাকা কেন্দ্র থেকে মাত্র ৪৫ মিনিটের অনুষ্ঠান ছাড়া রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে অন্য কিছু প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।

১৯৬১ থেকে ৭১ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিষিদ্ধ করার মূলে ছিল জনঐক্যের ভীতি। জনঐক্যের অন্যতম নেয়ামক হলো বাক বা কথা। কথা বলা বা মতামত প্রকাশের মাধ্যমেই সমাজ, রাষ্ট্র তথা দেশের সঙ্কটগুলো সামনে আসে। গণতান্ত্রিক বিকাশ ও চর্চা সাধিত হয়। রাষ্ট্রের যে অংশ শিল্পী, লেখক বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, তাদের কর্ম মূলত জনঐক্যের চর্চাকে শাণিত করা। জনঐক্যের ধারাগুলোকে উসকে দিয়ে বিকশিত করা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে দেশের শিল্পী, লেখক, বুদ্ধিজীবী সাংবাদিকেরা এই কাজটি করেছিলেন পূর্ণ সক্রিয়তায় যে কারণে গ্রাম থেকে গ্রামে, শহর থেকে বন্দরে, দেশ থেকে দেশান্তরে মুক্তি চেতনার আকাক্সক্ষা একসূত্রে গ্রোথিত হয়েছিল প্রতিটি হৃদয়ে। উল্লেখ্য পটুয়া কামরুল হাসানের সেই বিখ্যাত ছবিটি যা ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ প্রচার করা হয়। ইয়াহিয়া খানের বিকৃত মুখের নিচে প্রথম লেখা হয় ‘এই জানোয়ারটি আবার আক্রমণ করতে পারে। ২৫ মার্চের ভয়াবহ নির্মম আক্রমণের পর ইয়াহিয়া খানের বিকৃত মুখের ছবির নিচের লেখাটি পরিবর্তন হয়ে যায়, সেখানে লেখা হয় ‘এই জানোয়ারকে হত্যা করতে হবে’। পটুয়া কামরুল হাসানের শিল্পকর্মটি সকল নির্যাতিত হৃদয়ের ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল সেদিন।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের জনগণের নানা অসন্তোষ যখন প্রকাশিত হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের সমালোচনামূলক ফিরিস্তি যখন প্রকশিত হয়েছে, সেই প্রেক্ষিতকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ব্যক্তি বিশেষ করে শিল্পী সাংবাদিকদের উপর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ধরপাকড়ের অভিযোগের শেষ নেই। যদিও সরকারী বাহিনী একটি আইনি প্রক্রিয়ার নামে ধরপাকড় করে থাকে। সেই আইনি প্রক্রিয়ার যথাযথ প্রয়োগবিধি নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন আছে। তবে আলাপের বিষয় হলো বর্তমান সরকারের কোনো কার্যক্রম বা সরকারি ব্যবস্থাপনার সমালোচনা করলে, সরকার সমালোচনা দমনে তীব্র পদক্ষেপ নেয়। বর্তমান সরকারের ভোট ব্যবস্থা থেকে শুরু করে সামগ্রীক দূর্নীতির যে অভিযোগ তা অস্বীকার করার উপায় আছে কি?. বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা দিয়ে শুদ্ধি অভিযান শিরোণামে নিজেদের দুর্র্নীতির যে ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে, তা মূলত পুরো সরকারব্যবস্থার চেহারা প্রকাশ করে। দুর্নীতি চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে নেওয়া কার্যক্রমটি যদি অব্যাহত থাকতো, হয়তো এতদিনে তার কার্যকরী সুফল রাষ্ট্র পেত। ভোট ব্যাবস্থা নিয়ে স্বয়ং নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ২০২১ সালের ২ মার্চ জাতীয় ভোটার দিবসে মাহবুব তালুকদার ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ভোটার উপস্থিতির হার তুলে ধরে নির্বাচর ব্যাবস্থার একটি হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন বাংলাদেশের নির্বাচনের এমন অবস্থা চলতে থাকলে, নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব তেমন থাকবে না। ভোট ব্যবস্থার এমন অবস্থা চলতে থাকলে নির্বাচন কমিশনের আর প্রয়োজনীয়তা থাকবে কিনা, সে বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন মাহবুব তালুকদার। ফলে, ভোট ব্যবস্থাসহ সীমাহীন দুর্নীতি নিয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে বুদ্ধিজীবী এবং শিল্পীরা, লিখলে বা আঁকলে বা মত প্রকাশ করলে কেন তাঁদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়?

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে বিতর্ক আছে। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে হওয়া এ আইনে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক, লেখক, বুদ্ধিজীবীগণ। বিগত কয়েক বছরে কটুক্তিমূলক পোস্ট দেওয়া, ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করা সহ মত প্রকাশ করে শত শত মানুষের নামে মামলা হয়েছে। গতবছরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয় ৭৩২টি। যার অধিকাংশ মামলা মত প্রকাশকে কেন্দ্র করে করা হয়েছে। রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘটিত নানা ঘটনা বিশেষ করে দুর্নীতি ভোটব্যাবস্থা সহ সরকারের নানা কর্মকা-ে প্রশ্ন রেখে মতামত প্রকাশ, সংবাদ প্রকাশ বা শিল্পকর্ম উপস্থাপনার কারণে এসব মামলা করা। আর এসব মামলার অধিকাংশের বাদি থাকে পুলিশ। ডিজিটাল দেশে একটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থাকা প্রয়োজন বলে যে কথাটি উঠেছে, সে কথাটির ভিত্তি কতটুকু থাকে? যখন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অধিকাংশ মামলা হয় মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে। অধিকাংশ মামলার আসামি হয় সাংবাদিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক কর্মীরা। যখন ‘কটুক্তি করা’ বা ‘খাটো করা’ বা ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার অভিযোগ এনে আইন সিদ্ধভাবে গেফতার করা হয় সাংবাদিক, লেখক, বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক কর্মীদের।

যুগের গতি অনুযায়ী ডিজিটাল মাধ্যমেই অধিকাংশ যোগাযোগ বা পারস্পরিক সংযোগ তৈরি হয়। কিন্তু ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করার সুপরিকল্পিত নীতিমালা প্রণয়ণ না করে, ডিজিটাল আইন প্রয়োগ করে, ডিজিটাল অপরাধ থামানো সম্ভব নয়। ডিজিটাল অপরাধের পূর্নাঙ্গ রূপরেখা না করে, ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করার ব্যবহারিক নির্দেশনা না দিয়ে যদি আইন করা হয় তবে সেই আইনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকে। তখনই আইনটি অপব্যবহার হওয়ার সুযোগ থাকে।
ডিজিটাল মাধ্যমে মত প্রকাশ করার স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে, ডিজিটাল যুগে শিল্পকর্মসহ সাংবাদিক, লেখক বুদ্ধিজীবীদের মৌলিককর্ম কিভাবে গণচেতনা চর্চাকে অব্যাহত রাখবে। কিভাবে দেশের আত্মা-ত’ল্য শ্রেণি ঐতিহাসিক দায় নিয়ে কাজ করবে। সমাজের মধ্যে বিশেষ করে শিল্পী, সাংবাদিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক কর্মীর মধ্যে সেল্ফ সেন্সরশিপ তৈরি করে, গণচেতনা বা গণঐক্যের ভিত্তিগুলোকে বিনষ্ট করার জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন তৈরি হয়েছে কিনা ভেবে দেখা দরকার। শুধু ডিজিটাল মাধ্যম নয় অন্য যে কোনো ক্ষেত্র বা মাধ্যমে মত প্রকাশককে কেন্দ্র করে হয়রাণির ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। এ একরোখা দমন কিসের বার্তা দেয়?। দেশের করোনাপরিস্থিতিতে দুর্নীতিসহ অন্যান্য অব্যবস্থাপনা নিয়ে কার্টুন এঁকেছিল কিশোর। তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন কার্টুন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়। তার শরীরে, কানে এখনও নির্যাতনের ক্ষত আছে। কোন ব্যাখ্যা দিয়ে কিশোরের ক্ষতের দায় এড়ানো যাবে?

লেখক ও উদ্যোক্তা মুশতাক আহমেদ হাজতে মারা যাওয়ার পর দেশের সকল মানুষের টনক নড়েছে। বারবার জামিন নামঞ্জুর করে তাকে আটকে রাখা হয়। এদেশে ধর্ষণ মামলার আসামির জামিন মঞ্জুর হয়, হত্যা মামলার আসামির জামিন মঞ্জুর হয়। মুশতাক আহমেদ কেনো জেলে মরলো? স্বাধীনচেতা এই উদ্যোক্তার দ্বারা রাষ্ট্রের কোন তীব্র ক্ষতিটি সাধিত হয়েছে? নাকি মুশতাকই লেখালেখি তথ্য শেয়ারের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদেও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় দায়-দায়িত্ব পালন করেছিল? যে দায়িত্ব পালন করে গেছে তার পূর্বসূরি লেখক, শিল্পীরা। মুশতাকের এহেন মৃত্যুর পরে জনমনে যে তীব্র অসন্তোষ ও সচেতনতা তৈরি হয়েছে, তা হয়তো সরকারের মধ্যে তৈরি হলে, রাষ্ট্র অনেক উপকৃত হতো। কিন্তু মুশতাকের মৃত্যুর পরপরই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করা হয়েছে অনেককেই। গ্রেফতার করা হয় ছাত্র-জনতা ঐক্যের সংগঠক রুহুল আমিনকে। রুহুল আমিনকে গ্রেফতার করা হয় যেসকল মতামত ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশ করার কারণে তার একটি ছিল এমন : ‘দলাদলি পরে হবে, সবার আগে লড়াই হবে’। দুইদিন রিমান্ডে নিয়ে রুহুল আমিনের কাছে জানতে চাওয়া হয় কেন সে এমন আহ্বান করেছে, যা দেশকে অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্যে ফেলে দেবে। সবার আগে লড়াইয়ের আহ্বান জানানো কিভাবে অস্থিতিমূলক কর্মকান্ডের কারণ হতে পারে? খ- খ- বিভক্তি কখনও মুক্তি আনতে পারে না। বিগত দশকের এই বিভক্তি ও আত্ম-বিচ্ছিন্নতার ভয়ানক খেসারত দিচ্ছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র। সেখানে রুহুল আমিনের এই বক্তব্য গণঐক্যের ভীতকে মজবুত করে। রাষ্ট্রের সঙ্কট দূর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে সেখানে কেন রুহুল আমিনকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করা হয়? ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ডিজিটাল নিরাপত্তার মুখোশে জন ঐক্যের ভীতকে বিনষ্ট করেছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এমন ক্ষতি করে, ক্ষমতাসীনরা আসলে কি ইতিহাস রেখে যাচ্ছে?

লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 112
    Shares