শনিবার, জানুয়ারি ২৩

খোলা চোখে নারীবাদ ও একটি ভাইরাল ঘটনা

এখানে শেয়ার বোতাম

আতিদ তূর্য ::

বর্তমানে ‘নারীবাদ’ বা ফেমিনিজম শব্দটা কারো কাছে গালি আবার কারো কাছে এটা সুবিধা আদায়ের অস্ত্র। নিজের জীবন থেকেই বলি, আমার এক শিক্ষিত বান্ধবীকে চিনি যে কিনা ‘নারীবাদের’ দোহায় দিয়ে নিজের অনেক সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিতে চায় যোগ্যতা ও পরিশ্রমকে একপ্রকার পাশ কাটিয়েই। সবসময় পুরুষ কর্তৃত্বের বিষদগার করে স্বামীর নাম জুড়িয়ে আইডিও খুলে থাকে। অর্থাৎ কিছুটা হাওয়া যে দিকে সে দিকে পাল তুলে দেওয়ার মতো ঘটনা। নারীবাদ বা ফেমিনিজমের হেটার্স পক্ষও এদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কম নয় সেটা বলাই বাহুল্য। অনেকে এটাকে তসলিমা নাসরিন হেটিং ইস্যু হিসেবেও বিবেচনা করেন। যেহেতু তসলিমা নারীবাদী সেহেতু নারীবাদী ব্যাপারটাই খারাপ এমন জায়গা থেকেও অনেকেই এটাকে অপছন্দ করে থাকেন। আবার, একটা অংশ ‘নারীবাদী’ হলে সংসারে স্ত্রী ওস্তাদী চাল চালবে, ডিভোর্স বাড়বে এই জায়গা থেকেও বিরোধীতা করে থাকেন। তবে দুঃখের বিষয় হলো খুব কম মানুষই এ দেশের একজন নারীবাদীকে তার কর্মের আলোকে যুক্তি-তর্ক বিশ্লেষণপূর্বক বিচার করে থাকেন। এখানে ধর্মান্ধতাও ‘নারীবাদ’ টার্মটির বিরোধীতার একটি বড়ো জায়গা।

তবে প্রশ্ন জাগে, নারীবাদ বস্তুটি কী? সেক্ষেত্রে একদম সরল আমজনতার মতো আমি বুঝি এভাবে, নারীকে যখন পণ্য হিসেবে দেখা হয়, নারীকে যখন একটা টাইপ ক্যারেক্টারে ফেলে তার মানব অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয় তখন সেটার বিরোধীতা করাকে নারীবাদ বলে। নারীর অধিকার নিয়ে সোচ্চার হওয়াকে নারীবাদ বলে। নারীবাদ কিন্তু নারীকে কখনোই অন্যায় সুবিধা দেওয়ার কথা বলে না। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে দেখলাম বেশিরভাগ নারী নির্যাতন মামলা ভুয়া। কমেন্ট বক্সে অনেকেই তখন নারীবাদী মানুষদের শাপ-শাপান্ত করছিলেন। এখানে কথা হলো নারীবাদ বস্তুটির ফায়দা যদি কেউ নিয়ে থাকে তবে সেটা তার ব্যক্তিগত শঠতার ব্যাপার এখানে ফেমিনিজমের কোনো ভূমিকা নেই। তারমানে নারীবাদ কী এই, যে একজন শিক্ষিত নারীকে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শুধু ‘নারী’ বলে অগ্রাধিকার দেওয়া? এখানেই হয়তো আমরা ভুল করি বা বুঝে থাকি। নারীবাদ সেই নারীকেই অগ্রাধিকার দিতে বলে যে অনগ্রসর বা পিছিয়ে আছে সমাজ থেকে, অন্য নারী-পুরুষ থেকে।

এখন আসা যাক সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসা একজন নারীর একটি পোস্ট নিয়ে। যেখানে তিনি একটি ছবিতে তার অন্তর্বাসগুলো কোনো রাখঢাক ছাড়াই রোদে শুকাতে দেন এবং আহ্বান করেন যে নারীর অন্তর্বাস ঢেকে রাখার ট্যাবু থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসার জন্য। যথারীতি এটা নিয়েই নেটিজেনদের মধ্যে পক্ষ-বিপক্ষ এবং তর্ক বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। তবে সংখ্যায় একটি বড় অংশই এর বিরোধীতা করেছেন। তাদের বক্তব্যের সার এটা ছিলো যে এই ব্যক্তিগত বিষয়গুলো শো অফ করার জিনিস নয় এবং এগুলো সমাজে অশালীনতার চর্চাকে প্রমোট করতে পারে। ব্রা, পেন্টি, মাসিকের কাপড় বাইরে না শুকিয়ে অনেকেই ঘরে ফ্যানের নিচে শুকাতে বলেছেন। এতো সব আলাপের ভেতরে একটা কথা উঁচু গলায় এসেছে সেটা হলো সারাজীবন মায়েরা কাপড়ের তলে রেখে শুকাতে পারলে আজ এমন কী হলো যেটা ফেসবুকে দেখিয়ে বেড়ানো লাগবে? এতো সব প্রশ্নবাণে স্বাভাবিকভাবে কিছু প্রশ্নের উদয় হয়েছে। যেসব পুরুষ প্রশ্নগুলো করছেন তারা কী কখনো তাদের স্যান্ডোগেঞ্জি, জাঙিয়া শার্টের তলে রেখে শুকিয়েছেন? যদি না শুকিয়ে থাকেন তবে সেই অন্তর্বাসগুলো খোলা ময়দানে রেখে আজ এই বিরোধীতা করতে আসা কেনো? জাস্টিফাই তখনই হতে পারে যখন সেটা কাওকে আঘাত না করে, সমাজের ক্ষতি না করে নিজ উদ্দেশ্য নিয়ে সম্পন্ন হয় । অন্তর্বাস সেটা নারী বা পুরুষ যারই হোক না কেনো স্বাভাবিক ছাড়া অস্বাভাবিক কিছু তো নয়। নিষিদ্ধ কোনো ড্রাগসও নয় যেটা লুকিয়ে সেবন করতে হয়। ওগুলো সারাদিন শরীরে লেপ্টে থেকে ঘাম ও জার্মের সৃষ্টি করে যার দরুন প্রকৃতির আলো-হাওয়ায় শুকোতে দেওয়ায় তো স্বাস্থ্যসম্মত ব্যাপার। আমার নানী ফেসবুক ব্যবহার করেননি কিন্তু মা করেন তার মানে এই নয় যে যেটা আগের কালের করেনি বলে এখনকার মেয়েরা করতে পারবে না। সবচেয়ে বড় ব্যাপার সামাজিক লুকোছাপা ও একটা ডার্ক ফ্যান্টাসিকে একপাশে রেখে কোনো নারী যদি অন্তর্বাস খোলা আঙিনায় নাড়েন তো দেশের জিডিপির কোথায় ক্ষতি হয়? আমার এক চাচিকে একবার দেখেছিলাম ছাদে জামা-কাপড় তুলে ফেরার সময় অসাবধানে ব্রা জামার নিচ থেকে মাটিতে পড়ে গিয়েছিলো বলে কী ভয়ানক লজ্জাটাই না পেয়েছিলেন সবার সামনে। অথচ ব্রা জনিসটা মানুষ কাচবে, শুকোতে দেবে, পরবে এটাই তো স্বাভাবিক। এমনতো নয় যে ওটা সালোয়ার পরার ঠিক আগে আগে উড়ে চলে আসবে কোথাও থেকে।

স্বাভাবিক জিনিসকে অস্বাভাবিক করতে করতে আমরা হয়তো স্বাভাবিকত্বকেই খানিকটা নষ্ট করছি, হয়তো কখনো প্রচ্ছন্নভাবে বিকৃতিকেও প্রশ্রয় দিচ্ছি নানা কিছুর দোহায় দিয়ে। এই আলাপের পর কিছু কমন প্রশ্ন আসবে তাহলে মেয়েরা ছেলেদের মতো হাফপ্যান্ট পরে খালি গায়ে ঘুরুক অথবা ছেলেদের মতো রাস্তায় দাঁড়িয়ে এখন থেকে মূত্রবিসর্জন করুক। প্রথম কথা পুরুষের যে দুটো কাজের কথা বলা হলো দুটো কাজই কুরুচিকর এবং কিছুটা অশালীনও বটে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার আলোকে।এই আপাত কিছু বাজে উদাহরণ দিয়ে নারী শক্তিমত্তাকে যাচাই করাটা স্রেফ হাস্যকর ও নিম্নবুদ্ধির পরিচয় বহন করে। সেটি আমরা এখনো লালন করে চলেছি যেটা দুঃখজনক। কিছু নারী আবার নিজেদের ‘নারীবাদী’ আখ্যা দিয়ে পুরুষ যেহেতু ধূমপান করে সেহেতু নারীরা করতে পারবে না কেনো এমন কুতর্কও হাজির করে ফেলেন। ধূমপান জিনিসটাইতো ক্ষতিকর সেটাকে উদাহরণ হিসেবে এনে জাস্টিফাই করাটাই তো একধরনের অন্যায়। তবে যেটাই হোক, নেটিজেনদের ভিন্নমত থাকাটাই স্বাভাবিক। যে ইস্যুই হোক না কেনো বাহাস সেটা যেন যেকোনো পক্ষপাতদুষ্টতা থেকে দূরে সরে যুক্তির আলোকে হোক এবং শুধু তর্কের খাতিরে তর্ক না হলেই শ্রেয়।

নিজের মগজ কারো কাছে বর্গা দেওয়াটা মরে যাওয়ার সমান, এটা যেন আমরা মনে রাখি সবসময়। শুভবুদ্ধির উদয় হোক, পশ্চাদপদ ট্যাবু দূর হোক।

লেখক : সভ্য, শিল্পধাম, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়


এখানে শেয়ার বোতাম