শুক্রবার, ডিসেম্বর ৪

কয়েক হাজার করোনা রিপোর্ট ঝুলে থাকছে, আছে ভুল তথ্য!

এখানে শেয়ার বোতাম

অধিকার ডেস্ক:: দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরুতে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআরে নমুনা পরীক্ষা করা হলেও এখন বেড়েছে ল্যাবরেটরির সংখ্যা। সেই সঙ্গে বেড়েছে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যাও। বর্তমানে দেশে ৬১টি ল্যাবরেটরিতে করোনা পরীক্ষা হচ্ছে। এরমধ্যে রাজধানীতে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৩১টি এবং বাকি ৩০টি দেশের বিভিন্ন জায়গায়। তবে ল্যাব ও পরীক্ষার সংখ্যা বাড়লেও সংকট কমেনি। অসংখ্য মানুষের অভিযোগ ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকার পরও তারা পরীক্ষা করাতে পারছেন না। আবার নমুনা জমা দিলেও সঠিক সময়ে রিপোর্ট পাচ্ছেন না। ঝুলে থাকছে দিনের পর দিন। এছাড়া, রিপোর্টে ভুল তথ্য থাকারও অভিযোগ উঠেছে।

নাম প্রকাশ না করে একাধিক বিশেষজ্ঞ বলছেন, ৭২ ঘণ্টার বেশি এই ভাইরাস জীবিত থাকে না। সেখানে চার থেকে পাঁচ দিন পর সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা করায় মানুষের ভোগান্তি হচ্ছে, ল্যাবের সংশ্লিষ্টরাও কষ্ট করছেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এর চেয়ে বলে দেওয়া ভালো যে কোন প্রতিষ্ঠান কতগুলো স্যাম্পল নিতে পারবে। শুধু শুধু মানুষকে আশা দিয়ে ভোগান্তি বাড়ানোর কোনও মানে হয় না। এছাড়া পরীক্ষা করার কিটের দামও অনেক, এগুলো নষ্ট করা মানে সরকারি সম্পদের অপচয়।

সাংবাদিক সানাউল্লাহ লাবলু জানিয়েছেন, তার পরিবারের এক সদস্য না জেনে কোভিড-১৯ আক্রান্ত এক রোগীর সংস্পর্শে আসে। এরপর জাতীয় প্রেসক্লাবে স্থাপিত নমুনা বুথে গত ১০ জুন নমুনা দেওয়া হয়। ছয় দিন পর ১৬ জুন জানতে পারি রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে।

সানাউল্লাহ লাবলু বলেন, ‘ছয় দিন পর রিপোর্ট পাওয়ার চেয়েও নতুন দুশ্চিন্তা স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে আসা এসএমএস নিয়ে। তাতে বলা হয়, নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে চার জুন, আর পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে সাত জুন।’

তিনি বলেন, ‘কাজ হচ্ছে, তবে সেটা আরও বেটার কোঅর্ডিনেটেড হতে পারতো, আরও ভালো হতে পারতো। সামনে অবস্থা তো আরও খারাপ হবে। তখন যে কী হবে, সেটা ভাবনার বিষয়। সরকারের দিক থেকে কোনও ঘাটতি দেখছি না। কিন্তু নিচের দিকে যারা কাজগুলো করছেন, তাদের আরও গুছিয়ে কাজ করা উচিত।’

বেসরকারি চাকরিজীবী নাহিয়ান খান করোনা পজিটিভ শনাক্তের ১৪ দিন পর গত ৭ জুন দ্বিতীয় দফায় নমুনা দিয়েছেন। ১০ দিন পার হয়ে গেলেও তিনি রিপোর্ট পাননি। রিপোর্টের বিষয়ে জানতে যে নম্বরে যোগাযোগ করার কথা, সেই নম্বরে ফোনই ঢোকে না, জানিয়ে নাহিয়ান বলেন, ‘‘ওই প্রতিষ্ঠানের আরেকজনের সঙ্গে শনিবার (১৩ জুন) ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, নমুনার চাপ রয়েছে, রবি-সোমবারের ভেতরে পেয়ে যাবেন।’ তারপর ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, এভাবে কত ঘণ্টা যাবে, তারাই বলতে পারবেন।’’

বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলে কর্মরত ক্যামেরাপারসন আনোয়ার হোসেন পরীক্ষার জন্য নমুনা দিয়েছেন গত ১০ জুন। তার রিপোর্ট এসেছে ১২ জুন রাত সাড়ে ১১টায়। রিপোর্টে লেখা তিনি করোনা ‘পজিটিভ’।

আনোয়ার হোসেন জানান, ১২ জুন রিপোর্ট পাওয়ার পর ১৭ জুন রাত সাড়ে ১১টায় তার কাছে দুটি এসএমএস আসে। এর একটিতে বলা হয় ‘পজিটিভ’, আরেকটিতে বলা হয় ‘নেগেটিভ’। এসএমএস দুটোতে নাম-ঠিকানা ঠিক থাকলেও তারিখ ঠিক নেই। শুধু তা-ই নয়, এসএমএসে বলা হয়েছে, ‘নমুনা নেওয়া হয়েছে ৪ জুন, আর পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে ৭ জুন।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা টেস্টের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আইসোলেশনে রেখে সংক্রমণ কমানো। অথচ রিপোর্ট পেতে দেরি হওয়ায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, ঢাকার বাইরে যে পরিমাণ নমুনা সংগ্রহ হয়, সে তুলনায় নুমনা পরীক্ষার সক্ষমতা কম। এ কারণে সেসব নমুনাও ঢাকায় আসে। ফলে সবার ওপরে চাপ তৈরি হয়।

ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারের প্রধান ডা. শামসুজ্জামান বলেন, ‘পঞ্চগড়ে নমুনা সংগ্রহের পর তা পরীক্ষা হওয়ার কথা রংপুর বা দিনাজপুরে। কিন্তু সেখানে তারা পাঁচ দিন ধরে রেখে পরীক্ষা করতে না পেরে আমাদের কাছে পাঠায়। সেসব নমুনা পরীক্ষা করতে আমাদেরও দেরি হয়। স্বাভাবিকভাবে এসব নমুনার রিপোর্ট রোগীরা হাতে পান ১০ থেকে ১২ দিন পর।’

তিনি বলেন, ‘তাদের প্রতিষ্ঠানে রাজশাহী, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের নুমনা এসেছে দুই বারে অন্তত পাঁচ হাজার। রংপুর বিভাগেরও সাড়ে চার হাজার নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। একইসঙ্গে গাজীপুর, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী, চাঁদপুর ছাড়াও ব্র্যাকের সব বুথ, জেকিজির বুথ এবং ঢাকার ১৩টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের নমুনা এবং আমাদের প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সংগ্রহ করা নমুনা- এসবই আমাদের পরীক্ষা করতে হচ্ছে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহরগুলোতে হয়তো সক্ষমতা রয়েছে ২০০ নমুনা পরীক্ষার, কিন্তু সংগ্রহ করা হয় কয়েকগুণ বেশি। এই অতিরিক্ত নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘স্যাম্পল নেওয়ার পর ঠিকমতো কোল্ডচেইন মেনটেইন না করলে টেস্টের রিপোর্ট ভুল আসতে পারে। নমুনা নেওয়ার ১০ থেকে ১৫ দিন পর যদি রিপোর্ট দেওয়া হয়, তাহলে সে রিপোর্টের মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।’

পরীক্ষার পর রেজাল্ট দিতে দেরি হওয়ার কোনও সুযোগ নেই মন্তব্য করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, ‘কালেকশন বুথ বেড়েছে, স্যাম্পল কালেকশন বেড়েছে, কিন্তু মেশিন তো বাড়েনি। এজন্য নমুনা জমে যাচ্ছে। অনেক দিন ধরে পরীক্ষা হচ্ছে এবং ফলাফল দিতে দেরি হচ্ছে।’

রিপোর্টে তথ্য ভুলের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যে প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করা হয় তাদের আরও দক্ষ এবং সতর্ক হতে হবে। তবে প্রধান সমস্যা হচ্ছে যে মিডিয়ামে নমুনা নেওয়া হয়, ভিটিএম (ভাইরাস ট্রান্সপোর্ট মিডিয়াম), দুই থেকে আট ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টা সংরক্ষণ করা যায়, এর বেশি হলে ভাইরাস জীবিত থাকে না।’

কিন্তু ৫ থেকে ৭ দিন ধরে যেসব টেস্ট হচ্ছে, সেগুলো কেবল ‘নামকাওয়াস্তে টেস্ট’ বলে মন্তব্য করে ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, ‘এসব পরীক্ষার রিপোর্ট কোনোভাবেই নির্ভুল হওয়ার কোনও সুযোগ নেই। কারণ, ৭২ ঘণ্টা পর ওই নমুনায় ভাইরাস জীবিত থাকে না। এ কারণে ৭২ ঘণ্টার বেশি নমুনা রাখা যাবে না।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা বলেন, ‘বর্তমানে নমুনা সংগ্রহ বেশি হওয়ায় ল্যাবরেটরিতে নমুনা জমে যাচ্ছে। তাই রোগীদের রিপোর্ট পেতে দেরি হচ্ছে।’ এসব সমস্যা সমাধানে তারা কাজ করছেন বলে জানান তিনি।
সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন


এখানে শেয়ার বোতাম