মঙ্গলবার, মে ১১
শীর্ষ সংবাদ

কেন আত্মহত্যা?

এখানে শেয়ার বোতাম

সিয়াম আহমেদ::

আপনি কি জানেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে দশ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও বাংলাদেশ মানসিক স্বাস্থ্য ইনিস্টিউটের প্রতিবেদন আমাদেরকে তেমনটি বলে।সুইসাইড শব্দটি এসেছে ল্যাটিন ভাষার শব্দ সুই সাইডেয়ার থেকে যার অর্থ নিজেকে হত্যা করা। সুইসাইড বলতে একজন ব্যক্তির নিজ প্রচেষ্টা নিজের জীবনকে হত্যা করাকে বুঝায়।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে আত্মহত্যা দুই ধরণের হতে পারে। একটি হলো পরিকল্পিত আত্মহত্যা অপরটি আবেগতাড়িতভাবে আত্মহত্যা।
পরিকল্পিত আত্মহত্যার ঘটনায় দেখা যায় রোগী দীর্ঘ দিন মানসিক আবসাদ না ডিপ্রেশনজনিত মানসিক রোগে ভোগে। একপর্যায়ে এসকল মানসিক রোগের গুরুতর উপসর্গ হিসেবে আত্মহত্যা করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এসব মানসিক রোগের মধ্যে ডিপ্রেশন, বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার, মাদকাসক্ত, উদ্বেগ আক্রান্ত ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

দ্বিতীয়টি হচ্ছে আবেগতাড়িতভাবে আত্মহত্যা করা। এক্ষেত্রে ভিকটিম হঠাৎ করে খুব বড় কোন মানসিক শক খায় (যেমন পরীক্ষায় ফেল করা, ব্রেকাপ বা ডিভোর্স হওয়া বা চাকরি চলে যাওয়া ইত্যাদি।) এবং কোন প্রকার পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই সম্পূর্ণ আবেগতাড়িত হয়ে নিজেকে তাৎক্ষণিকভাবে শেষ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

এধরণের আত্মহত্যার ঘটনা বাংলাদেশে তুলনামূলক ভাবে বেশি ঘটে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণী অর্থাৎ যাদের বয়স পঁয়ত্রিশের নিচে তাদের আত্মহত্যা করার প্রবণতা বেশি। যদিও বৈশ্বিক পর্যায়ে নারীর তুলনায় পুরুষের আত্মহত্যার পরিমাণ তিমগুন বেশি তবে বাংলাদেশে এ চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। বাংলাদেশে পুরুষ আত্মহত্যাকারীর তুলনায় নারী আত্মহত্যাকারীর সংখ্যা বেশি। এর পেছনে আমাদের দেশের আর্থসামাজিক অবস্থান, ইভটিজিং, যৌন নিপীড়ন, যৌতুক, সম্ভ্রমহানির মতো বিষয়গুলো ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িত।

বাংলাদেশে আত্মহত্যার উপর করা গবেষণাগুলোতে আত্মহত্যার করাণ হিসেবে ক্যারিয়ার নিয়ে হতাশা, সিজিপিএ খারাপ হওয়া, পারিবারিক কলহ, প্রেমে ব্যার্থ হওয়া, যৌন নিপীড়নের স্বীকার হওয়া, অর্থকষ্টে ভোগা ইত্যাদি বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে। মানুষ সাধারণত দড়ি দিয়ে ফাঁস দেয়া, বিষ পান করা, উঁচু দালান থেকে ঝাপ দেয়া, ঘুমের ট্যাবলেট খাওয়া ইত্যাদি প্রাণঘাতী কর্মের মাধ্যমে আত্মহত্যার প্রচেষ্টা চালায়।

গবেষণায় দেখা গেছে ৯০ শতাংশ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে মানসিক অবসাদগ্রস্তা বা ডিপ্রেশনকে কেন্দ্র করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ব্যাপক ভাবে লক্ষ্য করা যায়। তারা নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে চরম হতাশায় ভোগে। এছাড়া প্রেমের সম্পর্কে ব্যর্থ হওয়া, অনিরাপদ যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়া, অপ্রত্যাশিত গর্ভধারণকে কেন্দ্র করে মেয়েরা ব্যাপক ডিপ্রেশনে ভোগে। একপর্যায়ে তারা পুরো বিষয়টি থেকে চিরতরে মুক্তি পাওয়া জন্য আত্মহননের মত পথ বেছে নেয়।

বর্তমানে পৃথিবীর অধিকাংশ রাষ্ট্রেই আত্মহত্যাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়া প্রচলিত প্রায় সকল ধর্মই আত্মহত্যাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। আত্মহত্যার প্রবণতা ঠেকাতে সামাজিক সচেতনতার কোন বিকল্পনেই। পাশাপাশি ব্যাক্তিগত পর্যায়ে সঠিক মানসিক সহায়তা ও চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেয়া জরুরী। এপর্যায়ে বাংলাদেশ মানসিক স্বাস্থ্য ইনিস্টিউটের পাশাপাশি বেশকিছু সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও এনজিও কাজ করছে।
আমাদের সকলের উচিত চোখ-কান খোলা রেখে একজন সচেতন নাগরিকদের দায়িত্ব পালন করা। যখনই আমাদের পরিবারের কোন সদস্য, বন্ধুবান্ধব বা পরিচিত কেউ মানসিক ডিপ্রেশনে ভুগবে অথবা আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকবে তখন আমাদের দায়িত্ব হবে তার পাশে দাড়ানো। তার সঠিক মানসিক সহায়তা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবার ব্যাবস্থা করা। মনে রাখতে হবে সচেতনতার মাধ্যমে আত্মহত্যার প্রবণতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

লেখক: শিক্ষার্থী , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


এখানে শেয়ার বোতাম