Home বিপ্লবীদের কথা কার্ল মার্কস : জীবনসংগ্রাম ও শিক্ষা

কার্ল মার্কস : জীবনসংগ্রাম ও শিক্ষা

অধিকার ডেস্ক:: কার্ল মার্কসকে নিয়ে ভারতের SUCI (C) দলের ইংরেজী মুখপত্র সাপ্তাহিক ‘প্রলেতারিয়ান এরা’য় প্রকাশিত ‘Life struggles and Teachings of Karl Marx and Frederick Engels’-কে ভিত্তি করে বর্তমান রচনাটি তৈরি করা হয়েছে। লেখাটি অনুবাদ করেছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মুবিনুল হায়দার চৌধুরী। লেখাটি ১০ পর্বে অধিকারের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হবে। আজ ১ম পর্ব প্রকাশ করা হলো:

আমরা যারা মার্কসবাদী, নিজেদের মার্কসের অনুসারী বলে পরিচয় দেই — আমরা মার্কসের অনুসারী একারণে নই যে তিনি অসামান্য প্রতিভাধর ব্যক্তি ছিলেন। কারণ মানব ইতিহাসে আরও অনেক অসামান্য প্রতিভাধর ব্যক্তি আবির্ভূত হয়েছেন। আমরা মার্কসবাদী এজন্য যে, একমাত্র মার্কসই আমাদের সঠিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক পথ দেখিয়ে গেছেন। এই পথ যে শুধুমাত্র পৃথিবীকে বদলে দেবে তা নয়, একইসাথে আমাদেরকেও একটি উচ্চতর সাংস্কৃতিক ও নৈতিক স্তরে নিয়ে যাবে। মার্কস না হয়ে অন্য কেউ যদি এ কাজ করতেন, তবে আমরা তাঁরই অনুসারী হতাম।

মার্কসের যুগান্তকারী অবদানকে বুঝতে গেলে মনে রাখতে হবে যে, মার্কসের আগে অন্যান্য দর্শনগুলো ছিল সামাজিক সংগ্রামের সঙ্গে সংযোগবিহীন। এই সমস্ত দর্শন শুধুমাত্র পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করেছে। আর যেহেতু এ সমস্ত দর্শনই ছিলো ব্যক্তির নিজ নিজ উপলব্ধি এবং কল্পনা থেকে সৃষ্ট — তাই এগুলো সবই মূলত ভাববাদী। মানুষের ইতিহাসে কার্ল মার্কসই সর্বপ্রথম সমাজবিজ্ঞান ও প্রকৃতিবিজ্ঞানের নানান শাখা হতে বস্তুজগৎ এবং সমাজ-সম্পর্কিত যে বিশেষ জ্ঞানসমূহ অর্জিত হয়েছে তাদের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক স্থাপন করেন এবং জ্ঞানসমূহের একীভূতকরণ ও সাধারণীকরণের প্রক্রিয়ায় একটি বৈজ্ঞানিক দর্শন হিসেবে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকে প্রতিষ্ঠিত করেন। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত তত্ত্বের উপর দাঁড়িয়ে কার্ল মার্কসই প্রথম বস্তুজগৎ ও সমাজবিকাশের নিয়ম আবিষ্কারের মাধ্যমে বিজ্ঞানকে ভিত্তি করে একটি সামগ্রিক বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটান। এটি কেবল বস্তুজগৎ এবং ইতিহাসকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যাই করেনি, বরং প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানভিত্তিক, বস্তুবাদী এবং ঐতিহাসিক বিকাশের ধারায় পৃথিবীকে পরিবর্তনের রূপরেখা প্রদান করেছে। আর একারণেই মার্কসবাদ কোনো বন্ধ্যা মতবাদ নয় — বরং কর্মের পথনির্দেশ, সকল বিজ্ঞানের বিজ্ঞান। মার্কসবাদের যথার্থ উপলব্ধি একজনকে করে তোলে সামগ্রিক ও নিশ্চিতভাবে ভবিষ্যৎ অনুধাবনে সক্ষম ও মুক্ত, শঙ্কাহীন সত্যিকারের মানুষ।

সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পূর্ব ইউরোপের সমাজতন্ত্রের পতন, বর্তমান সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের দুর্বল দশা যে সকল প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে তার বিপরীতে মার্কসবাদের প্রাসঙ্গিকতা ও কার্যকারিতা বুঝতে হলে আমাদেরকে মার্কসের জীবন ও সংগ্রামকে উপলব্ধি করতে হবে, তাঁর অবদানের তাৎপর্য বুঝতে হবে। মার্কসের আবির্ভাব কোনো দুর্ঘটনা নয়, বা বিষয়টা এমনও নয় যে, দর্শনশাস্ত্রের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটানোর দায়িত্ব দিয়ে স্বয়ং ঈশ্বর তাঁকে পাঠিয়েছিলেন। মার্কসের গোটা জীবনকে ব্যাপ্ত করে পরিচালিত সংগ্রামের ফল এই মার্কসবাদী দর্শন। এই সংগ্রাম বুর্জোয়া অর্থে ব্যক্তিগত ও একক কোনো সংগ্রাম নয়। একে বরং বলা যায়, সমাজের মৌলিক প্রয়োজন এবং সামাজিক চাহিদাকে সুসংহত রূপ দেয়ার লক্ষ্যে পরিচালিত একটি সচেতন সংগ্রাম।

মার্কসবাদের বিকাশ তখনই সম্ভব হয়েছিলো যখন এর প্রয়োজনীয় সমস্ত পারিপার্শ্বিক সামাজিক শর্তগুলো পরিপক্ক হয়ে উঠেছিল। অর্থাৎ যখন বিজ্ঞানের প্রাসঙ্গিক অগ্রগতি, পুঁজিবাদের বিকাশ, সর্বহারাশ্রেণির উন্মেষ এবং সমাজে বুর্জোয়াদের সাথে সর্বহারাদের বিরোধ প্রধান সামাজিক দ্বন্দ্ব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলো। মার্কস যখন ‘ক্যাপিটাল’ লেখেন, সেটা কি শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির একক চিন্তার প্রকাশ ছিলো? বিষয়টি একেবারেই সেরকম নয়। এটি ছিলো একজন ব্যক্তির মধ্য দিয়ে সামাজিক চিন্তার সর্বোত্তম ব্যক্তিকৃত প্রকাশ। তৎকালীন সময় এবং সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে মার্কসের মধ্যে যে দ্বন্দ্বসমূহ ক্রিয়াশীল ছিল, তা একদিকে ছিল সমাজের পূর্ববর্তী সর্বোন্নত সামাজিক চিন্তাগুলোর সংকলন, তার ধারাবাহিকতা — আবার পাশাপাশি তার সঙ্গে একটি ছেদও। এই ছেদের মধ্য দিয়েই সর্বহারাশ্রেণি এবং জনগণের সচেতন সংগ্রামের পথনির্দেশক একটি সামগ্রিক একীভূত বিপ্লবী দর্শনের জন্ম হয়েছিলো। তাই সত্যিকার অর্থেই মার্কস ছিলেন নবযুগের অগ্রদূত।

মার্কস এবং তাঁর সহযোদ্ধা বন্ধু এঙ্গেলস মানব জ্ঞানভান্ডারে যে অবদান রেখেছিলেন তার উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে লেনিন মার্কসবাদকে আরও সুসংহত, বিস্তৃত এবং উন্নত করেন। তারও পরে স্ট্যালিনও একই কাজ করেন মার্কস, এঙ্গেলস ও লেনিনের কাজের উপর দাঁড়িয়ে এবং এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে। তবে সত্য এই যে, কার্ল মার্কস ছিলেন অনন্য বৈশিষ্ট্যম-িত একজন যুগস্রষ্টা।

মার্কসবাদের আবির্ভাব:
মানবজাতির জ্ঞানভান্ডারে মার্কসের অবদান সম্পর্কে এককথায় কী বলা যায়? লেনিনেন ভাষায়: “মার্কস হলেন সেই প্রতিভাধর ব্যক্তি যিনি উনিশ শতকের প্রধান তিনটি আদর্শিক ধারাকে বিকশিত এবং পরিপূর্ণ করেন। এই ধারা তিনটি মানব সভ্যতার তৎকালীন সবচেয়ে অগ্রসর তিনটি দেশের প্রতিনিধিত্বকারী ছিলো। এগুলো হলো: জার্মান চিরায়ত দর্শন, ইংল্যান্ডের চিরায়ত রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র এবং ফরাসি বিপ্লববাদী ধারাকেন্দ্রিক ফরাসি সমাজতন্ত্র।”১

দর্শনের জগতে সে সময় জার্মান দার্শনিক হেগেলের (গেয়র্গ ভিলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেল, ২৭ আগস্ট ১৭৭০ – ১৪ নভেম্বর ১৮৩১) চিন্তা একক আধিপত্য নিয়ে অবস্থান করছিলো। পুরাতন অপরাপর ভাববাদী দর্শনের সাথে হেগেলের চিন্তার একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছিলো। হেগেল দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি আবিষ্কার করে দেখালেন যে জগতের সকল পরিবর্তন এবং বিকাশ দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিতে ঘটে — অর্থাৎ বিপরীতের সমন্বয় কাজ করে। দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি আবিষ্কার করলেও হেগেল শেষ পর্যন্ত ভাববাদী দর্শনের কাঠামো থেকে বের হতে পারলেন না। তাঁর সমস্ত দ্বন্দ্বতত্ত্ব, প্রকৃতি এবং বিশ্বজগৎ হয়ে গেল ‘পরম সত্ত্বার’ প্রকাশ মাত্র!

হেগেলের বামপন্থী ধারার এক তরুণ শিষ্য ফুয়েরবাখ (লুদভিগ আন্দ্রিয়েস ফুয়েরবাখ,২৮ জুলাই ১৮০৪ – ১৩ সেপ্টেম্বর ১৮৭২), হেগেলের দর্শনের ভাববাদী দিকটা উন্মোচন করে বস্তুবাদকে সামনে আনেন। কিন্তু তা করতে গিয়ে ফুয়েরবাখ আবার দ্বন্দ্বতত্ত্বকেই অস্বীকার করে বসলেন, যদিও হেগেলের দ্বন্দ্বতত্ত্ব নিশ্চিতভাবেই অপরাপর অন্য সব দর্শনের চেয়ে এক ধাপ অগ্রসর ছিলো। ফুয়েরবাখের বস্তুবাদ পূর্ববর্তী সকল যান্ত্রিক বস্তুবাদকে বাতিল করে দিলেও শেষ বিচারে এটিও আবার ভাববাদ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারলো না, কারণ ফুয়েরবাখ নীতি-নৈতিকতা-মূল্যবোধকে অপরিবর্তনীয় এবং শাশ্বত হিসাবে ধরে নিয়েছিলেন। স্ট্যালিনের ভাষায়, মার্কস এবং এঙ্গেলস হেগেলের দ্বন্দ্বতত্ত্ব থেকে এর ‘যৌক্তিক কাঠামো’ নিয়েছেন এবং ফুয়েরবাখের বস্তুবাদ থেকে এর ‘প্রাণসত্ত্বা’ নিয়েছেন যা দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
শিল্পায়নের দিক থেকে সে সময়ে ইংল্যান্ড ছিলো সবচেয়ে অগ্রসর পুঁজিবাদী দেশ। বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদ এডাম স্মিথ, পেটি, রিকার্ডো — এদের হাতেই চিরায়ত রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রের তত্ত্বের বিকাশ ঘটেছিল। তাদের অর্থনীতি সংক্রান্ত চিন্তা পুঁজিবাদী অর্থনীতির উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে ঠিকই, কিন্তু তা পুঁজিবাদকে অতিক্রম করে তার পরবর্তী পর্যায় পর্যন্ত দৃষ্টি প্রসারিত করতে পারেনি।

এদিকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার যে অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বৈপরীত্য, অবিচার আর অসাম্য — এসবই সমাজ অভ্যন্তরে নতুন ধরনের চেতনার জন্ম দিচ্ছিল — সমাজতান্ত্রিক চেতনা। সমাজতান্ত্রিক চিন্তার নানান ধারাও সেসময় দেখা যাচ্ছিলো, তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ফরাসি কাল্পনিক সমাজতন্ত্রীরা। তারা মনে করতো যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব, কিন্তু কীভাবে তা অর্জন করা সম্ভব এ সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই ছিলো না। সমস্তরকম আন্তরিকতা সত্ত্বেও, তাদের সমাজতন্ত্র ছিলো কল্পনার স্বর্গরাজ্য — বাস্তবে একটি অবৈজ্ঞানিক প্রস্তাবনা। মানুষের সামনে তখন শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে উপস্থিত ছিলো ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা — তার নাম ‘ফরাসী বিপ্লব’ । ফরাসি বিপ্লব দেখিয়েছিলো মানুষের যুক্তি, চিন্তা এবং সংঘবদ্ধ ও সচেতন কর্মপ্রয়াস কিভাবে বিরাজমান বাস্তবতার উপর ক্রিয়া করে সামাজিক কাঠামোকে বদলে দিতে পারে।

কার্ল মার্কস এই আদর্শিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই আবার এর সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতাসমূহ উন্মোচিত করেন, সেগুলোকে অতিক্রম করেন এবং এর সাথে ছেদ ঘটিয়ে এগিয়ে যান এক নতুন ক্ষেত্রে। জীবনভর সংগ্রামের মাধ্যমে তিনি প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, দর্শন, অর্থনীতি, রাজনীতি প্রভৃতি সকল ক্ষেত্রকে আয়ত্ত্ব করেন। শোষিতের হয়ে শোষণের শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে লড়ে লড়ে যুগের প্রয়োজনেই তিনি একটি সামগ্রিক বিজ্ঞান ও কর্মের পথনির্দেশক হিসেবে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ বা মার্কসবাদের কাঠামো গড়ে তোলেন।

মার্কসের ঐতিহাসিক অবদান :
দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকে একটি বিজ্ঞান হিসেবে দাঁড় করাতে গিয়ে মার্কস হেগেলের দ্বন্দ্বতত্ত্বকে তার ভাববাদী খোলস থেকে মুক্ত করেন। একই সাথে তিনি অতিক্রম করেন ফুয়েরবাখের সীমাবদ্ধতা ও ঘাটতিগুলোও। মার্কসের ভাষায়, “আমার দ্বন্দ্বতত্ত্ব হেগেলের দ্বন্দ্বতত্ত্ব থেকে যে শুধু আলাদাই তা নয়, বরং সোজা বিপরীত। হেগেলের মতে, মানুষের মস্তিষ্কের কর্মপদ্ধতি, বিশেষত চিন্তাপদ্ধতি, যাকে তিনি ‘ভাবনা’ নামক একটি স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে হাজির করেন — সেটাই হলো বাস্তব দুনিয়ার স্রষ্টা। আর বাস্তব দুনিয়া হলো এই ভাবনার বিস্ময়কর বাহ্যিক কাঠামোমাত্র। অন্যদিকে আমার মতে, ভাবনা মানবমস্তিষ্কে বাস্তব দুনিয়ার প্রতিফলন ছাড়া আর কিছুই নয়, যা চিন্তার আকারে প্রকাশিত হয়।”২

দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের মূলকথা হলো — প্রকৃতির কোনো কিছুই বা কোনো ঘটনাই স্থিতিশীল নয়, বরং দুটো বিপরীত বৈশিষ্ট্যের সংঘাতপূর্ণ সহাবস্থান হিসেবে এরা বিরাজ করে। এটি হলো দুই বিপরীতের দ্বন্দ্ব, থিসিস এবং এন্টিথিসিস, যা বিকাশ এবং পরিবর্তনের উৎস। কোনো কিছুর অভ্যন্তরে বিপরীতের এই দ্বন্দ্ব বাড়তে বাড়তে যখন চরম অবস্থায় পৌঁছায় তখন দুই বিপরীত আর একসাথে থাকতে পারে না। এর ফলে একটা নতুন জিনিস সৃষ্টি হয় — যাকে বলে সিনথিসিস, যা পুরনোকে নিঃশেষ করে আসে। কিন্তু পুরনোকে নিঃশেষ করে নতুন যা আসে তার মধ্যেও বৈশিষ্ট্য হিসেবে থাকে নিজেকে ধ্বংস করবার বীজ। কারণ সে বহন করে আনে নতুন দ্বন্দ্ব অর্থাৎ নতুন থিসিস ও নতুন এন্টিথিসিস, যা পরবর্তী সময়ে সৃষ্টি করবে নতুন সিনথিসিস, অর্থাৎ নিজের অবলুপ্তি। এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকে। বিষয়টি কোনো একজন দার্শনিক ভেবে ভেবে বের করেছেন এমন নয় বরং মহাবিশ্বের যে কোনও কিছু এবং সবকিছুর পরিবর্তনের নিয়ম এটাই। এই সাধারণ সত্য কোনো ব্যক্তির মনমতো এবং মনগড়া বিশ্লেষণ থেকে বেরিয়ে আসেনি। মার্কস সমকালীন বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ, সমন্বয় এবং সংযুক্তি সাধনের মাধ্যমেই এটি আবিষ্কার করেছেন।

মার্কস দেখালেন যে প্রকৃতির মতোই সমাজ এবং ইতিহাসও দ্বন্দ্বের নিয়মে পরিচালিত। এ পর্যন্ত অবস্থিত সকল সমাজের ইতিহাসই শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস, যা সমাজ অভ্যন্তরের সংঘাতের প্রতিফলন। অভ্যন্তরে বিপরীতের এই সংঘাতের মীমাংসার মধ্য দিয়েই সমাজ এগিয়ে চলে, পুরোন সমাজ ভেঙে গিয়ে একটি নতুন আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকে। মার্কস প্রথম দিকের বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদদের একপাশে রেখে, বুর্জোয়া অর্থনীতি ও এর বৈশিষ্ট্যগুলো যুক্তির আলোকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করে ও নিরন্তর অনুসন্ধান চালিয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে দেখালেন যে, বুর্জোয়া আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে যে দ্বন্দ্ব বিদ্যমান তা অমীমাংসেয়। একারণেই ধনতন্ত্রকে নিঃশেষ করে এর ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি নতুন সমাজব্যবস্থা, অর্থাৎ সমাজতন্ত্র গড়ে উঠবে। ধনতন্ত্র বা পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা ঐতিহাসিকভাবেই ধ্বংসপ্রাপ্ত। এই ব্যবস্থার পুঁজি এবং শ্রমের দ্বন্দ্ব অমীমাংসেয় দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখা যায়। এটিই বাস্তবে ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার মূল দ্বন্দ্ব। এ থেকে সমাজ অগ্রসর হতে পারে শুধু এই দ্বন্দ্বের নিরসনের মাধ্যমে, যা ধনতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে কেবল সর্বহারার নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমেই হতে পারে। সমাজতন্ত্র হলো ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে শ্রেণিহীন সমাজে যাবার একটি মধ্যবর্তী অবস্থা। এই মধ্যবর্তী অবস্থায় রাষ্ট্র হলো সর্বহারার একনায়কত্ব মাত্র।

মার্কস এই ক্ষেত্রে তাঁর শিক্ষাকে সন্নিবেশিত করে বলেন, “আধুনিক সমাজে শ্রেণি আবিষ্কার বা এদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব আবিষ্কার — এ দুটোর কোনোটারই কৃতিত্ব আমার নয়। আমার অনেক আগেই বুর্জোয়া ইতিহাসবিদেরা শ্রেণিগুলোর সংঘর্ষের ঐতিহাসিক বিকাশ বর্ণনা করেছেন এবং বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদেরা এদের অর্থনৈতিক কাঠামো সম্পর্কে বলেছেন। আমি নতুন যা করেছি তা হলো, প্রমাণ করেছি যে: (১) উৎপাদনব্যবস্থার বিকাশের একটি সুর্নিদিষ্ট ঐতিহাসিক পর্বের সাথেই কেবলশ্রেণিগুলোর অস্তিত্ব জড়িত, (২) শ্রেণিসংগ্রাম অপরিহার্যভাবে সর্বহারার একনায়কত্বের দিকে পরিচালিত হয়, এবং (৩) কেবল এই একনায়কত্বই সকল শ্রেণির অবসান ঘটিয়ে একটি শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করে।”৩

কার্ল মার্কস সমগ্র জীবনভর তিলে তিলে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের কাঠামো নির্মাণ করেছেন। মানবজাতির সামনে রেখে গেছেন একটি সামগ্রিক বিশ্বদর্শন যা প্রতিটি ক্ষেত্রে কর্মের দিকনির্দেশনা দেয়। কেউ যদি তাঁর এই বিশাল অবদানের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে চায় তবে তাকে অবশ্যই মার্কসের জীবনসংগ্রামটা বুঝতে হবে।

লেখাটি ১০ পর্বে  ধারাবাহিকভাবে চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ

পরিবারে বিদেশফেরত কেউ নেই, তবুও করোনায় মারা গেলেন বৃদ্ধ

অধিকার ডেস্ক:: পরিবারে কেউ বিদেশফেরত নেই। গত এক মাসের মধ্যে বিদেশফেরত কেউ তাদের বাড়িতেও আসেনি। এমনকি আত্মীয়-স্বজনদের কেউও না। এরপরও করোনায় আক্রান্ত...

কোয়ারেন্টিনে বিরক্ত ভক্তদের নিজের ফোন নম্বর দিলেন শারাপোভা

অধিকার ডেস্ক:: কত দিন আর ঘরবন্দী হয়ে থাকতে ভালো লাগে! ঘরে বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে গেছেন যে ভক্তরা, তাঁদের জন্য এগিয়ে...

চট্টগ্রামে সুপারশপ বন্ধ, ১৪ কর্মী হোম কোয়ারেন্টাইনে

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর ছেলে কর্মরত থাকায় চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:: চট্টগ্রামে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর ছেলে কর্মরত থাকা একটি সুপার শপ বন্ধ...

এবার রাজধানীমুখী মানুষ ঠেকাতে পুলিশকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ

অধিকার ডেস্ক:: রাজধানীমুখী মানুষের ঢল থামাতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। শনিবার রাত ১০টার দিকে মন্ত্রী এ তথ্য জানান।