Home বিপ্লবীদের কথা কার্ল মার্কস : জীবনসংগ্রাম ও শিক্ষা

কার্ল মার্কস : জীবনসংগ্রাম ও শিক্ষা

অধিকার ডেস্ক:: কার্ল মার্কসকে নিয়ে ভারতের SUCI (C) দলের ইংরেজী মুখপত্র সাপ্তাহিক ‘প্রলেতারিয়ান এরা’য় প্রকাশিত ‘Life struggles and Teachings of Karl Marx and Frederick Engels’-কে ভিত্তি করে বর্তমান রচনাটি তৈরি করা হয়েছে। লেখাটি অনুবাদ করেছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মুবিনুল হায়দার চৌধুরী। লেখাটি ধারাবাহিকভাবে অধিকারের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হবে। আজ ২য় পর্ব প্রকাশ করা হলো:

বেড়ে ওঠার কাল:
মার্কস-এর জন্ম ১৮১৮ সালের ৫ মে, প্রুশিয়ার (একীভূত রাষ্ট্র হিসেবে তখন পর্যন্ত জার্মানি গঠিত হয়নি, প্রুশিয়া তখন একটি আলাদা রাজ্য) রাইন প্রদেশের ট্রিয়ের শহরে। পশ্চিম ইউরোপে তখন বুর্জোয়া উন্মেষের সময়। যদিও ইংল্যান্ড বা ফ্রান্সের তুলনায় জার্মানিতে এই উন্নতি অনেক দেরিতে শুরু হয়েছিল।

পুঁজিবাদী সমাজে বুর্জোয়াশ্রেণির আবির্ভাবের সাথে সাথে সর্বহারাশ্রেণিও তাদের দৈন্য এবং দুর্দশা নিয়ে আবির্ভূত হয়। নানান ধারার পেটিবুর্জোয়া সমাজতন্ত্রী, কাল্পনিক সমাজতন্ত্রীরা সে সময় ক্রিয়াশীল ছিলো। এদের নেতৃত্বে ছিলেন সেইন্ট সাইমন, চার্লস ফুরিয়ের, রবার্ট ওয়েন প্রমুখ। ধর্মীয় অনুশাসন ও দর্শনসহ সমস্ত কিছুকেই প্রশ্ন করা ও যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করে দেখার একটি পরিবেশ তখন ছিলো। সেসময় ফুয়েরবাখ হেগেলীয় দর্শনের আধিভৌতিক রহস্যবাদিতার মুখোশ উন্মোচন করে এই মত প্রতিষ্ঠিত করেন যে, ঈশ্বর মানুষের সৃষ্ট, মানুষের কল্পনার ফসল মাত্র। তার ফলে এই চিন্তার ভিত্তি তৈরি হলো যে, মানুষ যদি ঈশ্বর সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে তাহলে সে নিজের ভালোর জন্য নিজস্ব অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থা পরিবর্তনেরও ক্ষমতা রাখে। ফলে, অনেক তরুণ হেগেলিয়ানই বিমূর্ত দর্শনচর্চা এড়িয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ শুরু করেন। [সে সময় যেসব ছাত্র-যুবক এবং তরুণ-বুদ্ধিজীবী হেগেলকে অনুসরণ করতেন তাদের বলা হত ইয়াং হেগেলিয়ান বা তরুণ হেগেলিয়ান।]

হেগেল দ্বারা প্রভাবিত একজন বিপ্লবী গণতন্ত্রী (Radical democrat) হিসেবে মার্কসের রাজনৈতিক জীবনের শুরু। ১৮৪২ সালে তিনি যুক্ত হন রাইন সংবাদ (Rheinische Zeitung) পত্রিকার সাথে। পরবর্তীতে এর সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মার্কস তাঁর লেখায় তৎকালীন সময়ের অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যা ও প্রশ্নসমূহকে তুলে ধরেন, বাস্তবতার কষ্টিপাথরে নিজের চিন্তা-ভাবনা ও যুক্তিগুলোকে যাচাই করেন, সেগুলোকে তীক্ষ্ন ও উন্নত করেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি লক্ষ করেন, হেগেলিয়ান দর্শন সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যার প্রশ্নে এবং বস্তুগত, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কোনোপ্রকার দিকনির্দেশনা দিতে পারছে না। ইউরোপে সেসময়ে পুঁজিপতিশ্রেণি এবং সর্বহারাদের মধ্যকার যে তীব্র বিরোধ ও সংগ্রাম ক্রমেই বিকশিত হচ্ছিলো, তার আলোকে তিনি আরও লক্ষ করেন যে, এক্ষেত্রে কোনদিকে অবস্থান নেয়া উচিত — এ ব্যাপারেও হেগেলিয়ান পদ্ধতির মধ্যে কোনও সুস্পষ্ট পথ নেই। তার উপর ফরাসি সমাজতন্ত্রীদের মতাদর্শকে সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করার মতো পড়াশোনা বা জানাবোঝা সে সময়ে তাঁর ছিল না। মার্কস বুঝতে পারলেন — সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাষ্টবিজ্ঞান এবং রাজনীতি নিয়ে তাঁর আরও গভীর পড়াশোনা দরকার।

রাইন সংবাদ-এর বিপ্লববাদী প্রবন্ধগুলো প্রুশিয়ান সরকারের জন্য অস¦স্তির কারণ হয়ে উঠলো। ১৮৪৩ সালে এই পত্রিকার বিরুদ্ধে দমনমূলক নির্দেশনা জারি করা হলো। মার্কসকে বলা হলো প্রবন্ধগুলোকে সরকারের জন্য সহনীয় করতে। কিন্তু তিনি তা অস্বীকার করলেন এবং সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করলেন। এরপর এক মাস ধরে তিনি নিজেকে কঠোর অধ্যয়নে নিয়োজিত রাখলেন। ফলাফল হিসেবে লিখলেন ‘অধিকার বিষয়ে হেগেলীয় দর্শনের পর্যালোচনা’ (Critique of the Hegelian philosophy of the Right)। এই অসমাপ্ত পান্ডুলিপিতে হেগেলিয়ান দর্শনের বিপরীতে গণতন্ত্র, শ্রেণি, রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের বিলোপের ব্যাপারে মার্কসের ভাবনা দানা বেঁধে উঠতে দেখা যায়। যদিও এ লেখা মার্কসের জীবদ্দশায় প্রকাশিত হতে পারেনি।

প্যারিসে
মার্কস একটি বিপ্লবী সাময়িকপত্র (Radical Journal) প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন যা দেশের বাইরে ছাপিয়ে গোপনে জার্মানিতে পাঠানো হবে। এই উদ্দেশ্যে ১৮৪৩ সালের অক্টোবরে তিনি প্যারিসে যান। সে সময়ে প্যারিস ছিলো গৌরবোজ্জ্বল বিপ্লবী ঐতিহ্যের ধারক এবং একই সাথে সমকালীন বিপ্লবী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বস্তুত ১৮৪০-এর দশকে প্যারিস ছিল ইউরোপের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। প্যারিসে সেসময়ে নানা ধরনের প্রগতিশীল ও বিপ্লবী শক্তি কাজ করতো। বিভিন্ন ধরনের শক্তিশালী গোপন সংগঠনের অস্তিত্ব ছিলো। গণপ্রজাতন্ত্রীদের (Republicanism) জঙ্গী ধারা তখন পর্যন্ত বিদ্যমান ছিলো। বিভিন্ন ধরনের সংঘ ও দল সক্রিয় ছিলো, যার মধ্যে ‘প্রবাসী জার্মান লীগ’ও ছিলো। ফলে বহু ধারার বিপ্লবী এবং সমাজতান্ত্রিক চিন্তায় প্যারিস ছিলো উত্তপ্ত। নানান ধারার সমাজতান্ত্রিক চিন্তার মধ্যে পিয়েরে জোসেফ প্রুধোঁ-র (Pierre-Joseph Proudhon, ১৫ জানুয়ারি ১৮০৯ – ১৯ জানুয়ারি ১৮৬৫) নেতৃত্বাধীন ধারাটিই ছিলো সবচেয়ে প্রভাবশালী।

মার্কস সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে গেলেন, কিন্তু একই সাথে নিজেকে সার্বিকভাবে নিয়োজিত করলেন সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং অর্থনীতি বিষয়ক পড়াশোনায়। তিনি শ্রমিকদের জীবন প্রত্যক্ষভাবে দেখেছেন, ফরাসি এবং জার্মান গুপ্ত সংগঠনগুলোর সাথে যোগাযোগ তৈরি করেছেন, প্রুধোঁসহ অন্যান্য ফরাসি কাল্পনিক সমাজতান্ত্রিক নেতাদের সাথে পরিচিত হয়েছেন। সেসময় হেনরিখ হাইনের (Christian Johann Heinrich Heine, ১৩ ডিসেম্বর ১৭৯৭ – ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৫৬) সাথে তাঁর বন্ধুত্বের শুরু হয়। এছাড়া রুশ বিপ্লবী বাকুনিন ও বোটকিন-এর সাথে তিনি পরিচিত হন। এ সময় তিনি পাঠ করেন এডাম স্মিথ, ডেভিড রিকার্ডো এবং অন্যান্য অর্থনীতিবিদসহ ফুরিয়ের, সাইমন, ওয়েন প্রমুখ কাল্পনিক সমাজতন্ত্রীদের লেখা। পাশাপাশি ফরাসি বিপ্লব সম্পর্কেও বিস্তারিত পড়াশোনা করেন।

মার্কস এবং আর্নল্ড রুগে (Arnold Ruge, ১৩ সেপ্টেম্বর ১৮০২ – ৩১ ডিসেম্বর ১৮৮০)-র যৌথ সম্পাদনায় “জার্মান-ফরাসি বার্ষিকী” (Deutsch-Französische Jahrbücher) নামে একটি সাময়িকপত্র প্যারিস থেকে প্রকাশিত হয় এবং প্রথম সংখ্যার পরই এর প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। কারণ রুগে মার্কসের প্রগতিশীল বিপ্লবী চিন্তার সাথে সম্পূর্ণ ভিন্নমত পোষণ করতেন। মার্কসের দুটো রচনা ‘ইহুদি প্রশ্নে’ (On the Jewish Question) এবং ‘অধিকার সম্পর্কে হেগেলীয় দর্শন-এর পর্যালোচনার ভূমিকা’ (Introduction to a Critique of Hegel’s Philosophy of the Right) এই সাময়িকপত্রে প্রকাশিত হয়। লেখা দুটিতে আমরা হেগেলের আদর্শবাদের সাথে মার্কসের দর্শনের পার্থক্য পরিষ্কার দেখতে পাই। বিশেষত দ্বিতীয় লেখাতে প্রথমবারের মতো সর্বহারাদের বিপ্লবে নেতৃত্বদানকারী ঐতিহাসিক ভূমিকা চিহ্নিত করা এবং বিপ্লবকে একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফলাফল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। মার্কস দেখালেন, যে ধারাটি সে সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে শুধু ধর্মের সমালোচনা করতো তারা ছিলো উদ্দেশ্যহীন। তিনি বুঝতে পারেন যে, প্রগতিশীল দর্শনের সত্যিকারের কাজ হবে ধর্মের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে, ধর্মকে প্রতিপালন করে যে শর্তগুলো তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম দিয়ে প্রতিস্থাপন করা। তিনি ঘোষণা করেন : “স্বর্গের সমালোচনা পর্যবসিত হোক পৃথিবীর সমালোচনায়, ধর্মের সমালোচনা পর্যবসিত হোক আইনের সমালোচনায় এবং ঈশ্বরতত্ত্বের সমালোচনা পর্যবসিত হোক রাজনৈতিক সমালোচনায় …” ৪

এঙ্গেলসের সাথে ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার:
ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস এবং মার্কসের প্রথম দেখা হয়েছিল ১৮৪২ সালের নভেম্বরে, জার্মানির কোলনে। এঙ্গেলস রাইন সংবাদ অফিসে গিয়েছিলেন। সেবারের সাক্ষাতে পরস্পর পরস্পরকে জানা-বোঝার সুযোগ পাননি। এরপর ‘জার্মান-ফরাসি বার্ষিকী’র প্রকাশিত একমাত্র সংখ্যাতে এঙ্গেলস ‘রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র পর্যালোচনার রূপরেখা’ (Critical Sketcheson Political Economy) নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। ১৮৪৪ সালের আগস্টে এঙ্গেলস যখন প্যারিসে আসেন, সেখানেই মার্কসের সাথে তাঁর ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ হয়। এটা ছিলো মার্কস-এঙ্গেলসের দীর্ঘ বন্ধুত্ব এবং যৌথ সংগ্রামের সূচনা যা একদিন বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এর মাত্র অল্প কিছুদিন আগেই এঙ্গেলস সুগভীর অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ সর্বহারাদের জীবনযাত্রার অবস্থা তাঁর প্রবন্ধ ‘ইংল্যান্ডে শ্রমিকশ্রেণির অবস্থা’ (The Condition of the Working Class in England)-এ তুলে ধরেছেন।

তাঁরা দুজন আবিষ্কার করলেন যে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এক এবং আলাদা আলাদাভাবে কাজ করেও তারা একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। এরপর তারা একত্রে লিখতে আরম্ভ করেন “পবিত্র পরিবার” (The Holy Family)। পরবর্তীতে এর বেশিরভাগ অংশ মার্কস লিখে লেখাটি সমাপ্ত করেন এবং এটি ১৮৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হয়।

এই সময় মার্কস চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। একই সাথে আবার প্রুশিয়ান সরকারের চাপের মুখে তাঁকে প্যারিসও ছাড়তে হয়। ১৮৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি প্যারিস থেকে ব্রাসেলস্-এ যান। প্রুশিয়ান সরকার তাকে বহিষ্কারের দাবি করতে পারে এই আশঙ্কায় তিনি প্রুশিয়ান নাগরিকত্বও ত্যাগ করেন।

মার্কসবাদের বিকাশ:
কাল্পনিক সমাজতন্ত্রী এবং তরুণ হেগেলিয়ান – এই দুইধারার সাথেই সাধারণ মূলনীতির ক্ষেত্রে নিজেদের পার্থক্য মার্কস-এঙ্গেলস তুলে ধরেন ‘পবিত্র পরিবার’ (The Holy Family) বইটিতে। কাল্পনিক সমাজতন্ত্রীরা মনে করতো যে সর্বহারারা হলো একটা অসহায় দুর্ভাগা জনগোষ্ঠী যাদের জন্য সমাজতন্ত্র একটি উপহারের মতো। এমনকি অনেক তরুণ হেগেলিয়ানও গণসংযোগ এবং গণআন্দোলন পছন্দ করতেন না। তারা মনে করতেন, কোনো এক বিশেষ ব্যক্তি বা অভিজাত সম্প্রদায়ই একমাত্র ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারে। মার্কস ও এঙ্গেলস দেখালেন যে এই দুই ভাবনার কোনোটিই সঠিক নয়। বরং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে একমাত্র তখনই যখন সমাজের ঐতিহাসিক বিবর্তনের ধারায় সর্বহারারা আত্মসচেতন শ্রেণি হিসেবে আবির্ভূত হবে এবং স্বাধীন সামাজিক শক্তি হিসেবে সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটাবে।এই লেখার নানান ছত্রে সুস্পষ্টভাবে আমরা ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সূচনা দেখতে পাই। যেমন: “প্রশ্ন এটা নয় যে, একজন সর্বহারা, এমনকি সমস্ত সর্বহারা শ্রেণি এই মুহূর্তে লক্ষ্য কী বলে মনে করে। প্রশ্ন হলো সর্বহারাশ্রেণি কী এবং এই কারণে ঐতিহাসিকভাবেই সে কী করতে বাধ্য। সমসাময়িক সামগ্রিক সমাজকাঠামো ও বাস্তব পরিস্থিতি দ্বারা এর লক্ষ্য এবং কার্যাবলী ঐতিহাসিকভাবে নির্ধারিত, চূড়ান্ত এবং সুস্পষ্ট।”৫

এর আগে, তাঁর প্যারিসের পান্ডুলিপিতে মার্কস সংক্ষিপ্ত আকারে, সুস্পষ্টভাবে বুর্জোয়া মানবতাবাদ এবং সাম্যবাদের মধ্যেকার পার্থক্য দেখান: “…কমিউনিজম হলো ব্যক্তিগত সম্পত্তি উচ্ছেদের মাধ্যমে গড়ে ওঠা মানবতাবাদ।”৬ কমিউনিজম হলো ব্যক্তিগত সম্পত্তি-বিবর্জিত মানবতাবাদ — এই চিন্তার মাধ্যমে মার্কসের সুস্পষ্টভাবে চিন্তা করার লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, যা পরিষ্কারভাবে মানবতাবাদ এবং কমিউনিজমের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করে। সুস্পষ্টভাবে দেখায় যে, তৎকালীন সময়ে যতই প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করুক না কেন, মানবতাবাদ পুঁজি এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকে। অপরদিকে কমিউনিজমের অর্থনৈতিক কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে পুঁজি, ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং মজুরি দাসত্বের অবসানের মাধ্যমে শ্রেণিহীন সমাজ নির্মাণের দিকে অগ্রসর হবার লক্ষ্য নিয়ে।

দ্বন্দ্বমূলক এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে একটি পরিপূর্ণ বিজ্ঞান হিসেবে বিকশিত করার কাজ দ্রুত এগোতে থাকে। খুব অল্পসময়ের মধ্যেই লেখা হয় ‘ফুয়েরবাখ বিষয়ক থিসিস’ (The Theses on Feuerbach; 1845), ‘দর্শনের দারিদ্র্য’ (The Poverty of Philosophy; 1847) এবং ‘জার্মান ভাবাদর্শ’ (The German Ideology; 1846)। প্রথম দুটি মার্কসের একক রচনা, আর শেষোক্তটি মার্কস-এঙ্গেলসের যৌথ রচনা।

এই লেখাগুলোতে দ্বন্দ্বমূলক এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদ তত্ত্বায়িত করতে গিয়ে মার্কস ফুয়েরবাখের সীমাবদ্ধতার সমালোচনা করেন। বিশেষত তিনি ফুয়েরবাখের বস্তুবাদ সম্পর্কিত যান্ত্রিক এবং আধিভৌতিক ধারণাকে তুলে ধরেন। দার্শনিকদের ভবিষ্যৎ দায়িত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে বলেন যে, “… দার্শনিকরা শুধুমাত্র নানানভাবে পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করে গেছেন, যদিও আসল কাজ হলো একে বদলানো।”৭

‘জার্মান ভাবাদর্শ’-তে প্রথমবারের মতো আমরা ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সুনির্দিষ্ট কাঠামো পাই। সমাজের ঐতিহাসিক বিবর্তনের আলোকে তাঁরা দেখালেন যে, “…সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি যারা একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় উৎপাদনে সক্রিয়, তারা একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক এবং রাজনৈতিক সম্পর্কে প্রবেশ করে। সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিদের জীবনপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই সামাজিক কাঠামো এবং রাষ্ট্র ক্রমাগত পরিবর্তিত হতে থাকে। কিন্তু এসব ব্যক্তি নিজেরা অথবা অন্যরা যেভাবে কল্পনা করে সেভাবে তা পরিবর্তিত হয় না। বরং পরিবর্তন ঘটে তারা যা সেই হিসেবেই অর্থাৎ তারা যে কাজ করে, বস্তুগতভাবে যা উৎপাদন করে, যে সুনির্দিষ্ট বাস্তব সীমাবদ্ধতার মধ্যে ক্রিয়া করে, যা তাদের বিশ্বাস এবং চিন্তানিরপেক্ষভাবে বিরাজ করে, সেভাবেই …” তিনি বলেন, “রাষ্ট্রের অভ্যন্তরের সকল সংগ্রাম — গণতন্ত্র বনাম অভিজাততন্ত্র এবং সামন্ততন্ত্রের সংগ্রাম, অধিকারের জন্য সংগ্রাম ইত্যাদি আর কিছুই নয়, বিভিন্ন শ্রেণিগুলোর মধ্যকার সংগ্রামের একটা নকল প্রতিরূপমাত্র।” দেখান যে, “… সর্বহারাদের আয়ত্বে আসবার পরই উৎপাদনের যন্ত্র ব্যক্তির প্রতি অনুগত হয় এবং সবার সম্পদে পরিণত হয়। ব্যক্তির পক্ষে আধুনিক সার্বজনীন পারস্পরিক বিনিময়কে নিয়ন্ত্রণ করবার একমাত্র উপায় হলো একে সবার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। …সাম্যবাদ আমাদের কাছে শুধুমাত্র রাষ্ট্র-সম্পর্কিত কোনো বিষয় নয় যা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, সাম্যবাদ এমন কোনো আদর্শ নয় যার সাথে বাস্তবতা নিজেকে মিলিয়ে চলবে। আমরা সাম্যবাদ কেবলি সত্যিকারের আন্দোলন যা বর্তমান অবস্থাকে অবলুপ্ত করবে। এই আন্দোলনের ফলাফল প্রস্তাবনা থেকে এখন বাস্তবতায় চলে এসেছে।”৮

মার্কস ভাববাদী এবং কাল্পনিক আদর্শবাদীদের বিরুদ্ধে বিরামহীন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকে সর্বহারাশ্রেণির বৈজ্ঞানিক এবং সমন্বিত বিশ্বদর্শন হিসেবে বিকশিত করেছেন। ১৮৪৭ সালে প্রকাশিত হল প্রুঁধোর ‘দারিদ্রের দর্শন’ (Philosophy of Poverty)। মার্কস তখন কলম তুলে নিলেন, প্রুঁধোর বিভ্রান্ত আদর্শবাদ ও সংকীর্ণ সংস্কারবাদী দৃষ্টিভঙ্গির জাল ছিন্ন করলেন এবং এই প্রক্রিয়ায় সঠিক বৈপ্লবিক ভাবাদর্শ প্রতিষ্ঠা করলেন।

রাশিয়ান সাংবাদিক আন্নেনকোভকে লেখা এক চিঠিতে মার্কস প্রুঁধোর কিছু সমালোচনা করেন এবং সঠিক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছিলেন। এর এক শিক্ষণীয় ছত্রে লেখা: “ মানুষ কি স্বাধীনভাবে নিজের ইচ্ছামতো সামাজিক কাঠামো বেছে নিতে পারে? কোনোভাবেই না। উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের একটি নির্দিষ্ট স্তরে আমরা ভোগ এবং আদান-প্রদানের একটি নির্দিষ্ট রূপ পাই। উৎপাদন, আদান-প্রদান এবং ভোগের বিকাশের যে কোনো একটা স্তর ধরে নিলে, এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ সামাজিক কাঠামো, সঙ্গতিপূর্ণ পারিবারিক, সামাজিক স্তর বা শ্রেণীগুলোর সংগঠন পাওয়া যাবে, এক কথায় বলতে গেলে সঙ্গতিপূর্ণ সুশীল সমাজ পাওয়া যাবে।”৯ পরবর্তীতে একই সালে (১৮৪৭) প্রুঁধোর লেখার জবাবে লিখিত তাঁর বই ‘দর্শনের দারিদ্র্য’ (The Poverty of Philosophy)-তে নিজস্ব এই ভাবনাগুলো আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরেন। বিস্তারিত বিশ্লেষণের পর তিনি এই সিদ্ধান্তে আসেন : “একজন ব্যক্তি বস্তুগত উৎপাদনের সাথে প্রথা অনুযায়ী যে সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করে, সে একই সঙ্গে সামাজিক সম্পর্কগুলোর বিন্যাস অনুযায়ী মানানসই নিয়মনীতি, আদর্শ তৈরি করে। ফলে এই চিন্তা, এই বিন্যাস — যে সম্পর্কগুলো সে প্রকাশ করে তার চেয়ে বেশিস্থায়ী নয়। এগুলো সবই ঐতিহাসিক এবং ক্ষণস্থায়ী ফলাফল মাত্র।”

লেখাটি ধারাবাহিকভাবে চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ

করোনা আক্রান্ত দ্রুত বাড়ছে বাংলাদেশে, ঘরে থাকার বিকল্প নেই

অধিকার ডেস্ক:: দেশে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েকদিন ধরে আক্রান্তের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এ নিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।...

করোনা আতঙ্কে এগিয়ে আসেনি কেউ, বাবার লাশ কাঁধে নিল চার কন্যা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: করোনা ঠেকাতে ভারতজুড়ে চলছে লকডাউন। প্রতি মুহূর্তে বলা হচ্ছে, বাঁচতে হলে একমাত্র অস্ত্র সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন। আর সেই সামাজিক...

মৌলভীবাজারে মৃত ব্যক্তির করোনা শনাক্ত, গ্রাম লকডাউ

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি :: মৌলভীবাজারের রাজনগরে জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তির নমুনা পরীক্ষায় করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন এই তথ্যের...

করোনার সময়ে একদিনে ব্যাংকে এলেন আড়াই হাজার গ্রাহক

অধিকার ডেস্ক:: টাঙ্গাইলের ব্যাংকগুলোতেও ব্যাপক জনসমাগম। সামাজিক দূরত্বের ধার ধারছে না তারা। রোববার সকাল থেকে এমন চিত্র দেখা গেছে সোনালী ব্যাংক টাঙ্গাইল...