শুক্রবার, নভেম্বর ২৭

কর্তৃত্ববাদী শাসনে চলছে দুর্নীতি-লুটপাটের মহোৎসব

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 245
    Shares

অনিরুদ্ধ দাশ অঞ্জন::

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড়। খিচুড়ি রান্না শিখতে নাকি ৫ কোটি টাকা খরচ করে ৫০০ কর্মকর্তা বিদেশ যাবেন! যদিও সমালোচনার মুখে পরিকল্পনা কমিশন ‘করোনার কারণে’ প্রকল্পটি পুনর্গঠন করার কথা বলছে।

দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের সপ্তাহে তিন দিন খিচুড়ি ও তিন দিন বিস্কুট (মিড ডে মিল) দেয়ার জন্য প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার। এই প্রকল্পের অধীনে মিড ডে মিল প্রশিক্ষণের নামে ৫০০ জন কর্মকর্তার বিদেশ সফরের ব্যয় ৫ কোটি টাকা এবং আরো ১০ হাজার জনের দেশে প্রশিক্ষণের ব্যয় ১০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়।

দেশের ১০৪ উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু আছে। এসব স্কুলে বিস্কুট দেয়া হয়। পরীক্ষামূলকভাবে তিনটি উপজেলায় খিচুড়িও দেয়া হচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা কাজে না লাগিয়ে এত লোকের বিদেশ সফর কেন?

খুলনার কমরেড রতন সেন কলেজিয়েট গার্লস স্কুলে মিড ডে মিল হিসেবে শিক্ষার্থীদের ভাত-তরকারি বা খিচুড়ি দেয়া হয়। এই সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার জন্য বিদেশ সফরের প্রয়োজন হয়নি। সরকার এই স্কুলকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।

সরকারি প্রকল্প মানেই অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর আর অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা।এর মূলে কাজ করছে লাগামহীন দুর্নীতি আর লুটপাটের প্রণোদনা। দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন জেঁকে বসায় দুর্নীতি-লুটপাট অবিশ্বাস্য পর্যায়ে পৌঁছেছে।

জাতীয় সম্পদ লুটপাট চলছেই। দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের আবিষ্কৃত ভোলা গ্যাসক্ষেত্রের তিনটি কূপ খননের কাজ দরপত্র ছাড়াই দ্বিগুণ দামে রাশিয়ার গাজপ্রমকে দেয়া হচ্ছে। প্রতিটি কূপ খননে গাজপ্রম পাবে ২১ দশমিক ১৯ মিলিয়ন ডলার (১৮০ কোটি টাকার বেশি)।বাপেক্স খনন করলে প্রতিটি কূপে খরচ হতো গড়ে ১০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৮০ কোটি টাকা)। বরাবরের মতোই জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দেয়া হচ্ছে লুটপাটের স্বার্থে।

সরকারি কর্মকর্তাদের লাগামহীন বিদেশ সফরের উপাখ্যান শুনলে রীতিমতো চমকে উঠতে হয়। কল্পনাকেও যেন হার মানায়। গত বছর পুকুর খনন শেখার জন্য একটি প্রকল্পের ১৬ কর্মকর্তা ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশ সফর করেন। একটি বিমান ডেলিভারি নিতে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন দুই দফায় ৪৫ জন। ১০তলা ভবন নির্মাণের জন্য ১৯ কোটি ৮২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা খরচ করে ৯৭৩ জন পরামর্শক নিয়োগ দেয়া হয় এবং ভবন নির্মাণের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য ৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকা খরচ করে ৩০ কর্মকর্তা ভবন দেখতে বিদেশ সফর করেন। আলুর চাষ দেখতে ৩ কোটি টাকা খরচ করে ইউরোপ সফর করেন বিএডিসির ৪০ জন কর্মকর্তা। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে একটি প্রকল্পে চট্টগ্রাম ওয়াসা তাদের ২৭ জন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের আরও ১৪ জন কর্মকর্তাকে নিরাপদ পানির ‘প্রশিক্ষণে’ উগান্ডার মতো অনুন্নত দেশে পাঠানো হয়, যে দেশের অধিকাংশ মানুষই নিরাপদ পানি পান না। একই প্রকল্পের অধীনে নেদারল্যান্ডসেও যান ১৫ জন কর্মকর্তা।সব খরচ বহন করার পাশাপাশি প্রায় দুই লাখ টাকা করে ‘পকেট মানি’ও দেয়া হয় তাঁদের।

বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাংকের ঋণের অর্থে ‘নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ’ প্রকল্পের (কেইস) মাধ্যমে গত ১০ বছরে পরিবেশ অধিদপ্তর দেশে ২২১ কোটি টাকা খরচ করেছে। প্রকল্পের অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ১২৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর, পরামর্শক ফি, গাড়ি কেনা ও ভবন নির্মাণে। প্রকল্পের অধীনে ১০ বছরে ২৯৬ জন কর্মকর্তা বিদেশে গেছেন। একজন কর্মকর্তা ১০ বারও বিদেশে গেছেন। এসবের পর পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদন বলছে, বায়ুদূষণ বেড়েছে।

একটি ক্যামেরা কিনতে তিনজনের বিদেশ সফর, নলকূপ খনন শিখতে একাধিক কর্মকর্তার বিদেশে সফর, লিফট দেখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আট শিক্ষক ও কর্মকর্তার সুইজারল্যান্ড ও স্পেন এবং ফ্ল্যাট দেখতে থাইল্যান্ড-সিঙ্গাপুর সফর, নদী-খাল খননের কৌশল শেখার নাম করে আমেরিকা-ইংল্যান্ড সফর, কারাগারে স্বজন-লিংক স্থাপনে অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা ও আর্জেন্টিনা সফর, মাত্র আড়াই কিলোমিটার সড়কের জন্য ‘প্রশিক্ষণ’ নিতে জনপ্রতি ১৫ লাখ টাকা খরচ করে ১৩ জন কর্মকর্তার আমেরিকা, কানাডা ও ইউরোপ সফর, শিক্ষা সফরের নামে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর—এ তালিকার শেষ নেই!

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি দল যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও মহাকাশ বিষয়ক সংস্থা ‘নাসা’র এক প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়। পুরস্কার গ্রহণ করতে ‘নাসা’র পক্ষ থেকে দলটিকে ফ্লোরিডায় আমন্ত্রণ জানানো হয় । বিজয়ী দলের সদস্যরা যেতে না পারলেও, সরকারি খরচে তথ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট আরেকটি প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তা ঠিকই ঘুরে আসেন।‘সত্যিই সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!’

সরকারি কর্মকর্তা, সচিব, এমপি, মন্ত্রীদের লাগামহীন বিদেশ সফরের সবটা আমরা জানতে পারি না। সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, একজন সচিব স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে রাষ্ট্রীয় খরচে ১৯ মাসে ১৩ বার বিদেশ সফর করেছেন।

বিদেশ সফরে বিশ্বরেকর্ড করেছেন সরকারের মন্ত্রী ডা. দীপু মনি।পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে ৫৪ মাস মেয়াদে তিনি ৬০০ দিন দেশের বাইরে ছিলেন। ২০০৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৩ সালের ১০ জুলাই পর্যন্ত তিনি ১৮৭টি দেশ সফর করেছেন।

দুর্নীতি-লুটপাটের অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে গেছে। সরকারি কেনাকাটায় ‘সাগর চুরি’ এখন ‘মহাসাগর চুরি’তে গড়িয়েছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কেনাকাটায় অস্বাভাবিক ব্যয় ব্যাপক আলোচিত। বালিশ ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা, কভারসহ কমফোর্টার (লেপ বা কম্বলের বিকল্প) ১৬ হাজার ৮০০ টাকা, বিছানার চাদর ৫ হাজার ৯৩৬ টাকায় কেনা হয়। ৩০টি বালিশ ও ৩০টি কমফোর্টার আনার জন্য ৬০ হাজার টাকায় ট্রাক ভাড়া দেখানো হয়। খাট পর্যন্ত তুলতে প্রতিটি বালিশের জন্য ৭৬০ টাকা, প্রতিটি কমফোর্টারের জন্য ২ হাজার ১৪৭ টাকা, প্রতিটি চাদরের জন্য ৯৩১ টাকা মজুরি দেখানো হয়। ঠিকমতো খাট পর্যন্ত তোলা হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য তত্ত্বাবধানকারীর পারিশ্রমিকও দেখানো হয়। এভাবে ফ্রিজ, ইলেকট্রিক কেটলি, ওয়াশিং মেশিন, ডাইনিং টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাব ও পণ্য ক্রয়ে অস্বাভাবিক মূল্য দেখানো হয়। ১০০ কোটি টাকার ওপর কেনাকাটা হলে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার অনুমোদন প্রয়োজন হয়। মন্ত্রিসভা ও প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন এড়াতে রূপপুরের ১৪৬ কোটি টাকার কেনাকাটা একবারে না করে ছয়টি প্যাকেজে করা হয়।

পর্দা নিয়ে ব্যাপক হৈচৈ হয়েছিল। ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রতি সেট পর্দার দাম পড়েছিল ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা! শুধু পর্দা নয়, কলেজের বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনাকাটায় প্রায় ৪১ কোটি টাকার দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর সব তথ্য উঠে এসেছিল।

রূপপুরের ‘বালিশ কাণ্ড’কে ছাড়িয়ে গেছে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত ডিপিপি। প্রতিটি বালিশ ২৭ হাজার ৭২০ টাকা, বালিশের কভার ২৮ হাজার টাকা, সূতির তোয়ালে ৫ হাজার ৮৮০ টাকা, সাদা গাউন ৪৯ হাজার টাকা, হ্যান্ড গ্লাভস ৩৫ হাজার টাকা ও মালটি প্লাস ৬ হাজার ৩০০ টাকা মূল্য ধরা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর পাঁচ হাজার টাকার মেডিক্যাল টেক্সট বই ৮৫ হাজার ৫০০ টাকা দরে কেনে। ৪৭৯টি আইটেমের ৭ হাজার ৯৫০টি বই কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৫ গুণ বেশি দামে কেনা হয়।

একটি টিনের দাম এক লাখ টাকা! খাগড়াছড়ির ৬-আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন)-এর ঘর মেরামতের কাজে দুই বান টিনের দাম পড়েছে ১৪ লাখ টাকা। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের সন্দ্বীপ চ্যানেলে ভাঙনরোধে তীর সংরক্ষণ প্রকল্পে ৫টি সাইনবোর্ড বানাতে ২৭ লাখ টাকা, স্ট্যাম্প ও সিল বানাতে ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা খরচ দেখানো হয়েছে।চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) একটি প্রকল্পে সড়কের প্রতিটি এলইডি বাতির ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, একটি তালার দাম পাঁচ হাজার ৫৫০ টাকা! ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মালপত্র কেনার ক্ষেত্রে এমনই দাম দেখানো হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩৩ গুণ পর্যন্ত বেশি দামে কেনা হয়েছে। ৩০০ টাকার বালতি এক হাজার ৮৯০ টাকায়, ৫০ টাকার বাঁশি ৪১৫ টাকায় এবং ১৬০ টাকার ঝান্ডা এক হাজার ৪৪০ টাকায়, ৭৮০ টাকার পেডাল ডাস্টবিন আট হাজার ৯৯৫ টাকায়, এক হাজার ২০০ টাকার পর্দা ১৮ হাজার টাকায়, ফার্স্ট এইড বক্স ছয় হাজার ৪৯৬ টাকায় কেনা হয়েছে। ১১ গুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে লাগেজ ফিতাসহ ৭৫ হাজার ওয়াগন কার্ড। সব কেনাকাটায়ই ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে।

ডাক বিভাগের ৫৪০.৯৪ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের ১৬০ কোটি টাকার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। যতটুকু হিসাব পাওয়া গেছে, তার মধ্যে ভয়াবহ অসংগতি পাওয়া গেছে। জিনিস না কিনেও ভাউচার দেখানো, কয়েকগুণ বেশি দামে জিনিস কেনা হয়েছে, কাল্পনিক খরচ দেখানো হয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি প্রকল্পে ক্লিনারের মাসিক বেতন ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা, অফিস সহায়কের মাসিক বেতন ৮৩ হাজার ৯৫০ টাকা এবং ক্যাড অপারেটরের মাসিক বেতন ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। বিদেশি পরামর্শকের মাসিক বেতন ধরা হয়েছে ২৫ লাখ টাকা। এসব কল্পনা নয়, সত্যি!

করনোকালে মানুষের বিপন্নতার মধ্যে স্বাস্থ্যখাতসহ বিভিন্ন প্রকল্পে দুর্নীতির ভয়াবহতা তীব্র হয়ছে। বিশ্বব্যাংক ও এডিবির ঋণে ‘করোনাভাইরাস মোকাবেলায় জরুরি সহায়তা’ প্রকল্পে পিপিই, সেফটি গগলস, বুটশুসহ চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে খরচ ধরেছে, তা বর্তমান বাজারমূল্যের চেয়ে চার-পাঁচ গুণ বেশি। চিকিৎসা সরঞ্জামে যত টাকা খরচ করা হচ্ছে, তার চেয়ে তুলনামূলক বেশি টাকা খরচ হচ্ছে সফটওয়্যার, ওয়েবসাইট, অডিও-ভিডিও ফিল্ম তৈরি, সেমিনার, কনফারেন্স ও পরামর্শক খাতে। ভ্রমণ, গাড়িভাড়া, অনাবাসিক ভবন নির্মাণ বাবদ অস্বাভাবিক খরচ ধরা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ঋণে এলডিডি প্রকল্পের অধীনে গরু-ছাগল পালন বিষয়ে প্রশিক্ষণের জন্য ১ হাজার ৫০ জন কর্মকর্তাকে বিদেশে পাঠানো হবে। এ জন্য ব্যয় হবে ৫৫ কোটি ৬ লাখ ৬৫ হাজার টাকা অর্থাৎ জনপ্রতি ব্যয় হবে ৫ লাখ ২৪ হাজার টাকা। এ প্রকল্পের ৭৫ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও বিদেশ সফর করবেন। ব্যয় হবে ৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। জনপ্রতি ব্যয় ৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।

এই প্রকল্পের জন্য কিছু কেনাকাটাও হবে। অতিথির বসার একটি চেয়ারের দাম ছয় লাখ টাকা, প্রকল্প পরিচালক ও পরামর্শকের চেয়ার-টেবিলের দাম ২০ লাখ টাকা, দুধে পানির পরিমাপ-যন্ত্র প্রতিটি ৩ লাখ ৩২ হাজার টাকা, বর্জ্য রাখার একটি পাত্রের দাম আড়াই লাখ টাকা ধরা হয়েছে। গাভি গর্ভবতী কি না, তা হাত দিয়ে পরীক্ষা করা হয় আমাদের দেশে। অথচ এই পরীক্ষার জন্য ১৫ কোটি ৭০ লাখ টাকায় ৬৫ ইউনিট কিট কেনা হচ্ছে।

দুর্নীতি আর লুটপাটের গল্পের যেন শেষ নেই! এমন কোনো সেক্টর, মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, অফিস পাওয়া যাবে না, যেখানে লাগামহীন দুর্নীতি নেই। নিয়ন্ত্রণহীন দুর্নীতি-লুটপাটের অনেক কাহিনি আমরা জানতেও পারি না।

দেশে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে দ্রুতগতিতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, করোনা মহামারির মধ্যে এপ্রিল থেকে জুন এই তিন মাসে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বেড়েছে তিন হাজার ৪১২ জন। আর গত এক বছরে বেড়েছে প্রায় পাঁচ হাজার ৬০০ জন। দেশে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ৮৬ হাজার ছাড়িয়েছে। ২০০৯ সালে দেশে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ৪৯২। গত ১১ বছরে কোটিপতি বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৬৪ হাজার। এ হিসাব কেবল আমানতকারীর ব্যাংক হিসাব থেকে করা হয়েছে। কোটিপতির প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হবে।

বিদেশে অর্থ পাচার বাড়ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য বলছে, কেবল ২০১৫ সালেই বাংলাদেশ থেকে ৫.৯ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। গত সাত বছরে বাংলাদেশ থেকে পাঁচ হাজার ২৭০ কোটি ডলার বা সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে গড়ে পাচার হয়ে যাচ্ছে প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা। প্রকৃত পরিমাণ আরও বেশি হবে। ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নিশান মাহামুদ শামীম একাই দুই হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন বলে সম্প্রতি তথ্য মিলেছে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট পাচার করেছেন ১৯৫ কোটি টাকা। ডাক বিভাগের ডিজির বিরুদ্ধে বিদেশে শত কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ উঠেছে।

সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা করা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। ২০০৮ সালের তুলনায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫ গুণের বেশি। ব্যাংক মালিকদের ঋণ পৌনে ২ লাখ কোটি টাকা।

মানবপাচার আর মুদ্রাপাচারের অভিযোগে কুয়েতে বাংলাদেশের একজন এমপি গ্রেপ্তার হয়েছেন। সরকারি ব্যবস্থাপনায় কয়েকজন লুটেরা বিদেশে পালিয়েও গেছেন। ক্যাসিনা, সম্রাট থেকে পাপিয়া, ট্রাংক আর সিন্ধুকে থরে থরে সাজানো টাকা, এসব বিষয় মানুষ ভোলেনি। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার অবৈধ আয় এতটাই বেশি যে, তিন বছরে ব্যাংকে জমা হওয়া বেতন-ভাতার টাকা তিনিএকবারও তোলেননি।

যাঁরা দুর্নীতি করেন আর যাঁরা দুর্নীতি ধরেন, তাঁদের মধ্যে যোগসাজস চলছে। ডিআইজি মিজান ও দুদকের পরিচালক এনামুল বাছিরের সংযোগ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দুর্নীতি আর লুটপাটের রসায়নটা বুঝিয়ে দিয়েছে। দেশে দুর্নীতির বিচার হয় না, হবে না। স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতি নিয়ে যখন দেশ তোলপাড়, তখন প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সরকারের অনুমতি ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার করার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আছে। এ অবস্থায় দুর্নীতিবাজরা তো লাগামহীন দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামবেনই।

‘গণতন্ত্র : যেসব লক্ষণ দেখে বুঝবেন একটি দেশ গণতান্ত্রিক নয়’ শিরোনামে প্রকাশিত বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে গণতন্ত্রহীনতার ১০ টি লক্ষণ উল্লেখ করা হয়েছিল। লক্ষণগুলো হচ্ছে : ১. প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন, ২. একনায়করাও নির্বাচন করে, ৩. জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করা, ৪. ভোটার অংশগ্রহণ কমে যাবে, ৫. সংসদ হবে একদলীয়, ৬. নিরাপত্তা বাহিনীর প্রভাব, ৭. দুর্বল প্রতিষ্ঠান (নির্বাচন কমিশন, সংসদ, বিচার বিভাগ ইত্যাদি), ৮. মতপ্রকাশে ভয় পাওয়া, ৯. দুর্নীতি বেড়ে যাওয়া, ১০. ক্ষমতা হারানোর ভয়। লক্ষণগুলোর সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশকে খুব সহজে মেলানো যায়।

যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) প্রতিবেদনে ‘গণতান্ত্রিক’ কিংবা ‘ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক’ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ নেই। অনেক আগেই বাংলাদেশ কার্যত একদলীয় শাসনব্যবস্থা তথা কর্তৃত্ববাদে প্রবেশ করেছে। দুর্নীতি-লুটপাট কর্তৃত্ববাদী শাসনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।কর্তৃত্ববাদী শাসনে চলছে দুর্নীতি-লুটপাটের মহোৎসব।

লেখক : প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 245
    Shares