সোমবার, নভেম্বর ৩০

করোনা: সরকারের গোলকধাঁধা

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 37
    Shares

আবু নাসের অনীক::

‘গভীর অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর চ্ছল চ্ছল শব্দে জেগে উঠলাম আবার; তাকিয়ে দেখলাম পান্ডুর চাঁদ বৈতরনীর থেকে তার অর্ধেক ছায়া গুটিয়ে নিয়েছে যেন কীর্তিনাশার দিকে।’ করোনা সংক্রমণে আমাদের জীবন মিলে গেছে এই পংক্তিমালায়! অন্ধকার যেন আমাদের জীবনে স্থায়ীরুপে আবির্ভূত হয়েছে।

গত দুই দিনে করোনা সংক্রমণের সংখ্যা, হার ও মৃত্যু নতুনভাবে আরো বেশি শঙ্কা তৈরি করেছে। দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে সরকার বিচলিত। যদিও সাধারণ মানুষের মধ্যে এর প্রতিক্রিয়া উল্লেখযোগ্য নয়। গত ১৪ মে সরকারী দলের সাধারণ সম্পাদক মাননীয় সেতুমন্ত্রী বলেছিলেন,‘করোনার সাথে বসবাস রপ্ত করতে হবে’। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে জনগণ সেটি রপ্ত করেছে। এমন রপ্ত করেছে যে, নুন্যতম স্বাস্থ্যবিধি মানার তোয়াক্কা করছে না।
শেষ দুই সপ্তাহের করোনা সংক্রমণের পরিসংখ্যান বলছে, সংক্রমণ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যাকে সরকারের পক্ষ থেকে দ্বিতীয় ঢেউ এর ইঙ্গিত হিসাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। প্রকৃত অবস্থা কী? তথ্য বিশ্লেষণ করলেই সেটি আমাদের সামনে পরিষ্কার হবে।

তথ্য কী বলছে? গত এক সপ্তাহ পূর্বে (৬ নভে:-১২ নভে:) গড় টেস্টের সংখ্যা ১৩ হাজার ৮৪২.৫৭, গড় শনাক্ত ১ হাজার ৫৯৮.৮৫, শনাক্তের হার ১১.৫৫%, গড় মৃত্যু ১৭, মৃত্যুর হার ১.০৬%। গত সপ্তাহে (১৩ নভে:-১৯ নভে:) গড় টেস্ট হয়েছে ১৫ হাজার ২১.৭১, গড় শনাক্ত ১ হাজার ৯৯৪.৪২, শনাক্তের হার ১৩.২৭%, গড় মৃত্যু ২৩, মৃত্যুর হার ১.১৮%। উল্লেখিত সপ্তাহের শেষ ৩ দিনে গড় টেস্ট হয়েছে ১৬ হাজার ৬৬৩.৩৩, গড় শনাক্ত ২ হাজার ২২৯, শনাক্তের হার ১৩.৩৭%, গড় মৃত্যু ৩০, মৃত্যুর হার ১.৩৪% (করোনা.গভ.ইনফো)।

উপরোক্ত পরিসংখ্যানের তুলনামূলক বিশ্লেষণে আমরা দেখবো, পূর্বের সপ্তাহের তুলনায় গত সপ্তাহে টেস্ট গড় বৃদ্ধি পেয়েছে ১ হাজার ১৭৯.১৪, আর শেষ ৩ দিনে বৃদ্ধি পেয়েছে গড়ে ১ হাজার ৬৪১.৬২, পূর্বের সপ্তাহের তুলনায় গত সপ্তাহে গড় শনাক্ত বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৯৫.৫৭, শনাক্তের হার বৃদ্ধি পেয়েছে ১.৭২, আর শেষ ৩ দিনে গড় শনাক্ত বৃদ্ধি পেয়েছে ২৩৪.৫৮, হার ০.১%। পূর্বের সপ্তাহের তুলনায় গত সপ্তাহে গড় মৃত্যু বৃদ্ধি পেয়েছে ৬, মৃত্যুর হার ০.১২। শেষ ৩ দিনে গড় মৃত্যু বৃদ্ধি পেয়েছে ৭, মৃত্যুর হার ০.১৬।

পাঠক, তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এটা খুবই স্পষ্ট যে, যেহেতু টেস্ট পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে সেই বিবেচনায় ক্রমান্বয়ে শনাক্তের সংখ্যা, হার ও মৃত্যু বৃদ্ধি পেয়েছে। তথ্যের দিকে একটু মনযোগ দিলেই বুঝবেন দেশের বর্তমান করোনা পরিস্থিতি গত ৪ মাস পূর্বের থেকে ভিন্ন কিছু নয়। গত জুলাই মাসে সর্বাধিক টেস্ট হয়েছে, সর্বাধিক শনাক্ত হয়েছে। তারপর টেস্ট কমিয়ে আনা হয়েছে (পরিকল্পিতভাবে) ক্রমান্বয়ে শনাক্তের সংখ্যা কমে এসেছে। গত ৪ মাসে গড় টেস্ট হয়েছে ১২-১৩ হাজার। গত ২ সপ্তাহের গড় টেস্ট ১৪ হাজার ৪৩২.১৪, আর শেষ ৩ দিনের গড় টেস্ট ১৬ হাজার ৬৬৩.৩৩। অর্থাৎ গত কয়েক মাসের তুলনায় এটা সর্বোচ্চ টেস্ট।

আমার পূর্বের একটি লেখাতেই উল্লেখ করেছিলাম সরকার অক্টোবরের শেষ নাগাদ টেস্ট বৃদ্ধি করবে। পূর্বের উল্লেখিত তথ্য- উপাত্ত বলছে দৃশ্যত ঘটেছেও তাই! কেন এই সময়ে টেস্ট বৃদ্ধি করবে তার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বলেছিলাম, যেহেতু সরকারের পক্ষ থেকে শীতকালে (নভেম্বরের মধ্য সপ্তাহ থেকে) দ্বিতীয় ঢেউ এর আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছে। টেস্ট বাড়িয়ে এখন শনাক্তের সংখ্যা, হার বৃদ্ধি দেখাবে। এই পরিস্থিতিকে ক্যাপিটালাইজ করে ‘সেকেন্ড ওয়েভ’ শরু হয়েছে এটা জাস্টিফাই করবে। গতকাল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে সংসদে বলেছেন, ‘করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কা আসতে শুরু করেছে।’

‘সেকেন্ড ওয়েভ’ কে জাস্টিফাই করে সরকার এটা পরিসংখ্যানগত জায়গা থেকে প্রমাণ করবে তারা ‘ফাষ্ট ওয়েভ’ সফলভাবে মোকাবিলা করতে পেরেছে। এটা সরকারের একটা রাজনৈতিক চাতুরতা! এই লেখায় পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে এটা কিন্তু সুস্পষ্ট হয়েছে প্রকৃতপক্ষে দেশে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ধারে কাছেও ছিলোনা এখনও নেই। সেই সুত্রে আবারো বলবো দেশে সেকেন্ড ওয়েভ আসার কিছু নেই! সংক্রমণের হার বৃদ্ধির যে প্রবনতা দেখা যাচ্ছে, তাতে বলা যায় বাংলাদেশে ‘ইমপোজড ওয়েভ’ আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় ‘ইমপোজড ওয়েভ’ কে শুধুমাত্র সরকারের পক্ষ থেকে নয় প্রথমসারির সকল গণমাধ্যম এমনকি জনস্বাস্থ্যবিদদের একাংশ বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে একে সেকেন্ড ওয়েভ হিসাবে চিহ্নিত করছেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা: লিয়াকত আলী বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেকেন্ড ওয়েভ প্রসঙ্গে বলেন,‘আমাদের দেশে সংক্রমণ প্রো লং হচ্ছে, ফ্লাকচুয়েশন হচ্ছে। এখানে ফাস্ট ওয়েভের পরে একটা সুপার ইমপোজড সুপার ওয়েভ আসবে’।

বিশ্বের অনেক দেশই সংক্রমণের ফাস্ট ওয়েভ নিয়ন্ত্রণে এনেছিল, লকডাউনসহ সকল বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করেছিলো। বর্তমানে ঐ সমস্ত দেশে আবার সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে, সেখানে অনেক দেশে পুনরায় লকডাউন, কারফিউসহ বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণের পর দ্বিতীয় পর্যায়ে আবারো সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়া একেই বিশ্বব্যাপী বলা হচ্ছে সেকেন্ড ওয়েভ। ফাস্ট ওয়েভ নিয়ন্ত্রণে না আসার পরেও চলমান সংক্রমণ যখন আরো বৃদ্ধি পায় সেই অবস্থাকে বলা হচ্ছে ইমপোজড ওয়েভ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিদের্শনা অনুসারে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ বোঝার জন্য যে চারটি নির্দেশকের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশে তার একটি নির্দেশক পূরণ হবারও ধারে কাছে যায়নি।

অর্থাৎ সরকার জেনেশুনে প্রকৃত পরিস্থিতিকে পরিকল্পিতভাবে আড়াল করছে। সরকারের যেহেতু কোথাও কোন জবাবদিহীতা নেই সেকারণে সে যা ইচ্ছা তাই করছে, তাই বলছে। আর ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোও করোনা প্রসঙ্গে অদ্ভুতভাবে নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে। তাদের আচরণেও মনে হচ্ছে দেশে করোনার কোন অস্তিত্ব নেই।

বলা চলে, সরকার অত্যন্ত দক্ষতার সাথে অসত্যকে সত্যে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে। আর অন্য সবাই সেই কল্পিত সত্যকে মেনেও নিয়েছে। অন্তত এ বিষয়ে কোথাও কোন প্রতিবাদের অস্তিত্ব নেই। সরকার করোনা সংক্রমণের ও প্রতিরোধের সমস্ত দায় জনগণের উপর চাপিয়ে দিয়ে বসে আছে। সরকার যে এমন পরিস্থিতি তৈরি করবে সে সম্পর্কে গত ৬ মে লিখেছিলাম ‘করোনা: সংক্রমণের দায়ভার এবার জনগণের উপর..’। ৬ মাস পর এসে সেটিরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

জনগণের প্রতি প্রতিনিয়তো বলা হচ্ছে অর্থাৎ ঘোষণা প্রদান করা হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য, জনগণ সেই ঘোষণা উপেক্ষা করছে, কেন করছে গত কয়েকটি লেখাতে সেটি উল্লেখ করেছি। বাস্তবতা হচ্ছে জনগণের উপর দায় চাপিয়ে করোনার মত মহামারি কখনওই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা: বে-নজীর আহমেদ বলেন,‘স্বাস্থ্যবিধিটা হল জনগণের বিষয়, আর সরকারের বিষয় হল ট্রেসিং, টেস্টিং, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিন। এগুলো ঠিকমতো করলে স্বাস্থ্যবিধিতে বিচ্যুতি ঘটলেও সংক্রমণের আশঙ্কা কমে যাবে’।

অথচ এ সবের বিষয়ে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেই, শুধুমাত্র জনগণ স্বাস্থ্যবিধি মানছেনা এটা নিয়েই পড়ে আছে সরকার। অর্থাৎ দায় এড়ানোর সবচেয়ে সহজতম পদ্ধতি। গত ১৬ নভেম্বর জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন,‘বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি দেশের মতো বাংলাদেশ কোভিড-১৯ মহামারি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে বর্তমানে দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার কম হওয়ায় মানুষ কোভিড-১৯ পরীক্ষা করতে চাইছেনা’।
দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী যখন এ ধরনের স্টেটম্যান্ট (অসত্য) প্রদান করেন, সেই প্রেক্ষিতে সে দেশের জনগণের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোন যৌক্তিক কারণ থাকেনা। জনগণের এই স্বাস্থ্যবিধি না মানার দায় সরকারের। বিশ্বে ২২০ টি দেশের মধ্যে সংক্রমণে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ২৪তম, নতুন সংক্রমণে ১৫তম, সক্রিয় সংক্রমণে ১৯তম, নতুন মৃত্যুতে ২৩তম, মোট মৃত্যুতে ৩৩তম, টেস্টে অবস্থান শেষের দিক থেকে ১৬৪তম (ওয়ার্ল্ডোমিটার-২০.১১.২০২০)। বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের করোনা নিয়ন্ত্রণ রাখার নমুনা!!

এখনও পর্যন্ত এন্টিজেন র‌্যাপিড টেস্ট করা কার্যকর করেনি সরকার। পর্যাপ্ত টেস্ট ব্যাতীত প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা কোনভাবেই সম্ভব নয়। অবশ্য সরকারের নিজস্ব একটা হাইপোথিসিস আছে, সেটা দিয়েই তারা বোঝে! এবং সেটাকে ভিত্তি করে জুয়ার বোর্ডে তার দান চেলে বসে আছে। স্পষ্টত জনগণের জীবন নিয়ে জুয়া খেলা চলছে, জনগণও নিজেদেরকে সেই খেলায় সামিল করেছে। করোনায় স্বজন হারানোর কান্না, একটি পরিবারের শেষ হয়ে যাওয়ার নির্মমতা এই সবকিছুই সরকার আড়াল করতে সক্ষম হয়েছে তার চাতুরতা দিয়ে, রাজনৈতিক অসততা দিয়ে!

‘পপুলারিজম’ কে ভিত্তি করে সরকার তার কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ বা মোকাবিলা যেটাই বলিনা কেন সেটার ক্ষেত্রেও এর বাইরে কিছু ঘটছেনা। সরকার যেভাবে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনা সাজিয়েছে তাতে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় সারা বিশ্বে করোনা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে উঠলেও আমাদের দেশে তা সুদূর পরাহত ব্যাপার!

লেখক: সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 37
    Shares