বুধবার ‚ ২৮শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ ‚ ১২ই আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ ‚ ভোর ৫:৫৯

Home মতামত করোনা: সময় বহিয়া যায়...

করোনা: সময় বহিয়া যায়…

আবু নাসের অনীক::

সংক্রমণের চার মাস পার করতে যাচ্ছি। এই সময়ে সংক্রমণ প্রতিরোধে আমাদের অর্জন কী ? এই প্রশ্ন যদি সরকারকে করা হয় তবে তারা সাফল্য লিখতে লিখতে পাতার পর পাতা ভরিয়ে ফেলতে পারলেও আমি একটি লাইনও খুঁজে পাচ্ছিনা যা প্রতিরোধে অর্জন হিসাবে লেখা যায়! সংক্রমণ পরিস্থিতি ও সংকট মোকাবেলায় গ্লোবাল কোভিড-১৯ ইনডেস্কে ১৮৪ টি দেশের মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩১ তম। অর্থাৎ সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারের যে কার্যত কোন পরিকল্পনা বা কর্মতৎপরতা নেই সেটি এই সূচকের মাধ্যমে তার পরিসংখ্যানগত দিক নির্দেশ করে। তারপরেও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

মাননীয় সেতুমন্ত্রী বলছেন,‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরলস শ্রম, মানবিক নেতৃত্ব ও দক্ষতার কারণে অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের সংক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে’। এবার দেখা যাক বিশ্বের ২১৩ টি দেশের করোনা পরিস্থিতির তুলানামুলক বিচারে বাংলাদেশের অবস্থানের পরিসংখ্যান। বিশ্বে আক্রান্তের তুলনায় অবস্থান ১৬তম, সক্রিয় রোগীর সংখ্যায় অবস্থান ৯ম, নতুন শনাক্তের তুলনায় অবস্থান ৫ম, নতুন মৃত্যুর সংখ্যায় অবস্থান ৯ম, পার মিলিয়ন টেস্টে অবস্থান ১৫৩তম (ওয়ার্ল্ডোমিটার)। এরুপ একটি পরিসংখ্যান বিদ্যমান থাকার পরেও অন্য দেশেগুলোর তুলনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বলে যিনি বা যারা আত্মশ্লাঘা অনুভব করেন এবং সেটি সগর্বে প্রচার করেন তাদের নির্বোধ বলা ছাড়া অন্য কোন ভাষা ব্যবহার করা যায় না!

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন,‘সরকারের যথাযথ উদ্যোগের কারণেই দেশের কোভিড হাসপাতালগুলোয় ৬০ ভাগ শয্যা খালি পড়ে আছে। কোভিড ডেডিকেটেড অর্ধেক আইসিইউ বেডে কোন রোগী নেই’। হাসপাতালের বেড খালি রয়েছে হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার কারণে এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। হাসপাতালের উপর নুন্যতম আস্থা অবশিষ্ট না থাকার কারণেই আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে আসছেন না। গুরতর অসুস্থ হলে অক্সিজেন সংগ্রহ করে নিজেদের বাসাকেই হাসপাতাল বানিয়ে নিচ্ছেন, যা ইতিমধ্যে গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। আইসিইউ বেড খালি থাকছে কারণ হাসপাতালের প্রতি এতোটাই অনাস্থা যে আক্রান্ত রোগী যারা মারা যাচ্ছেন তাদের মধ্যে ২০ শতাংশ বাড়ীতেই মারা যাচ্ছেন। আইসিইউ বেড খালি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। বর্তমান করোনাকালীন সময়ে পৃথিবীতে এমন একটি দেশ খুঁজে পাওয়া যাবেনা যেখানে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার প্রতি অনাস্থার কারণে রোগী হাসপাতাল বিমুখ হচ্ছে।

সরকার ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বলা হচ্ছে, জুন থেকে জুলাইয়ে সংক্রমণ কম, মৃত্যু কম। এবং স্থিতিবস্থা তৈরি হয়েছে। আসুন দেখি এক্ষেত্রে পরিসংখ্যান কি বলছে!

দেশে এ পর্যন্ত মোট মৃত্যুর ৪০ শতাংশ হয়েছে জুলাই মাসে। প্রতিদিন গড়ে ৪২ জন মারা গেছেন যা জুন থেকে বেশি। জুন মাসে টেস্ট হয়েছে ৪ লাখ ৫৭ হাজার ৫৩০, শনাক্ত হয়েছে ৯৮ হাজার ৩৩০। শনাক্তের হার ২১ শতাংশ। জুলাই-এ টেস্ট হয়েছে ৪ লাখ ৯ হাজার ৯১৯, শনাক্ত হয়েছে ৯২ হাজার ১৭৮। শনাক্তের হার ২৩ শতাংশ(ওয়ার্ল্ডোমিটার)। জুন থেকে জুলাইয়ে টেস্ট কম হয়েছে ৪৭ হাজার ৬১১। আর রোগী শনাক্ত কম হয়েছে ৬ হাজার ১৫২। এই পরিসংখ্যানের উপর ভিত্তি করে কোনভাবেই বলা যায়না জুন থেকে জুলাইয়ে সংক্রমণ বা মৃত্যু কম হয়েছে। টেস্ট কম হয়েছে যার ফলশ্রুতিতে শনাক্ত কম হয়েছে। বরং বলা চলে যে সংখ্যক টেস্ট কমেছে সংক্রমণ সংখ্যা কমার পরিমান অনেক কম। সংক্রমণের হার তুলনায় যদি গত মাসের তুলনায় কম ৪৭ হাজার ৬১১ টি টেস্ট হতো তবে রোগী শনাক্ত হতো আরো ১০ হাজার ৯৫০ জন। তাহলে জুনের চেয়ে জুলাই মাসে আরো ৪ হাজার ৯৭৮ জন রোগী বেশি শনাক্ত হতো। সংক্রমণের হার নির্দেশ করে সংক্রমণ স্থিতিবস্থায় নয় বরং উর্দ্ধমূখী।

গত ২৫ মে ঈদুল ফিতর পালিত হয়। গণপরিবহন চলাচল নিয়ন্ত্রণে থাকার পরেও ব্যাপক সংখ্যক মানুষ ঢাকা থেকে ঈদ করতে গ্রামে যায়। এর প্রভাবে ২৭ মে-১৫ জুন এ ১৮ দিনের ব্যবধানে ঢাকার বাইরে সারাদেশে আগের চেয়ে ১২৪ শতাংশ আর ঢাকায় ৬১ শতাংশ আক্রান্ত বেড়ে ছিলো। এবার ঈদুল আজহায় গণপরিবহন এর উপর কোন নিয়ন্ত্রণ নেই, মানুষজন বাড়ী যাবে এবারে সংক্রমণ আরো বেশি বেড়ে যাবে। জাতীয় পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন,‘ গত ঈদের পর ঢাকার বাইরে রোগী বেশি বেড়েছে। ঈদ কেন্দ্রিক যাতায়াতের কারণে সংক্রমণ বেশি ছড়িয়েছে। এই কোরবানির ঈদের পর সংক্রমণ আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। সেটা কী পরিমান বাড়বে, তা এখনই হয়তো বলা যাচ্ছেনা। তবে ঈদের পর ১৫ দিনের মধ্যে তা প্রকাশ পেতে পারে’। অবশ্য সরকার টেস্ট কমিয়ে দেয়ার যে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে তাতে দেখা যাবে সংখ্যাগত দিকে আগষ্টে জুলাই থেকে সংক্রমণ আরো অনেক কম!!

সরকার বরাবরই বলে আসছে, সংক্রমণ কমে গেছে। এবং সেই জায়গা থেকে এবার ঈদ যাত্রায় কোন ধরনের নিয়ন্ত্রণ নেই। গতবারের মত এবারও সকল ধরনের স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছে জনগণ। বাসে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এক সিট ফাঁকা রেখে বসার ব্যবস্থার কথা বলা হলেও আজকে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বদৌলতে দেখা গেলো বাস গুলোতে ঠাসাঠাসি করে মানুষ ভ্রমণ করছে।

ইতিমধ্যে গ্রামে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। শহর থেকে একজন সংক্রমিত মানুষ (উপসর্গহীন) গ্রামে যেয়ে কত মানুষের মধ্যে তিনি ছড়িয়ে দিবেন এটা ধারনা করা সম্ভব নয়। একইরকমভাবে গ্রাম থেকে শহর থেকে আগত মানুষ ফিরে আসার সময় ভাইরাস বহন করে এনে শহরের কত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিবেন সেটিও অনুমান করা যাবেনা। অথচ সরকার চাইলেই এই সংক্রমণের গতি রোধ করতে পারতো ঈদ যাত্রা বন্ধ করে। এবং গত ঈদের সময় যেভাবে সংক্রমণ ছড়িয়েছে সে অভিজ্ঞতা তার সামনে থাকার পরেও কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করা এটাই প্রমাণ করে সরকার করোনা প্রতিরোধে যা সিন্ধান্ত গ্রহণ করছে তা বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

সরকারের এ ধরনের শিথিল আচারন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তরের কল্পজগতের আশার বাণীর কারণেই মানুষ সচেতন থাকছেনা। তারা নুন্যতম স্বাস্থ্যবিধি পালন করছেনা। তাদের মধ্যে বেপরোয়া মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে। সরকার যখন কোন একটি ঘোষণা দিয়ে সেটি বাস্তবায়নে নুন্যতম তদারকি করছেনা তখন জনগণ ধরেই নিয়েছে এটা সরকারে কথার কথা, পালন করলেও হয় না করলেও হয়! যদি সরকারের পক্ষ থেকে মনিটরিং এর ব্যবস্থা থাকতো তবে জনগণের মধ্যে অবজ্ঞা ও উদাসীনতাকে কাটিয়ে তোলা সম্ভব হতো। এ বিষয়ে সরকার একেবারেই নির্বিকার।

যে ঈদ আনন্দ বয়ে আনে, সেই ঈদ পালনের জন্য যারা ঢাকা ছেড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়লেন তাদের মধ্যে অনেকে নিজের অজান্তেই তাদের কত প্রিয় মানুষকে এই করোনা ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিলেন! একইভাবে তারা নিজেরাও এটা বহন করে এনে আরো কত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিবেন! ক্ষনিকের আনন্দ পরিণত হতে পারে স্থায়ী বিষাদে। আর আমাদের সরকার জনগণ যাতে এই ভুলটি করতে না পারে সেই ব্যবস্থা গ্রহণ না করে ভুল করার সহায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দিলো।

লেখক: সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ

শেষ পর্যন্ত কে হচ্ছেন আইসিসি চেয়ারম্যান?

অধিকার ডেস্ক:: ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক অভিভাবক সংস্থা আইসিসি এখন পুরোপুরি অভিভাবকহীন। চেয়ারম্যান শশাঙ্ক মনোহর পদত্যাগ করেছেন আরও বেশ কিছুদিন আগে। কিন্তু এরমধ্যে এখনও পর্যন্ত...

থানায় নিয়ে যুবলীগ নেতাকে মারধর, ওসি প্রত্যাহার

অধিকার ডেস্ক:: থানায় নিয়ে এক যুবলীগ নেতাকে বেধড়ক মারধরের ঘটনায় নেত্রকোনার দুর্গাপুর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত (ওসি) মিজানুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। মঙ্গলবার...

সিলেটে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান, জঙ্গি আটক, বোমা উদ্ধার

অধিকার ডেস্ক:: জঙ্গি আস্তানার খোঁজে সিলেটের টিলাগড়ের শাপলাবাগ ও জালালাবাদ আবাসিক এলাকার পৃথক দুটি বাসায় অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দুটি বাসায় অভিযান...

রাশিয়ার কাছে ভ্যাকসিন চেয়েছে ২০ দেশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের অনুমোদন দিয়েছে রাশিয়া। ১৯৫৭ সালে বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়েছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। সেটির নামের...
Shares