বুধবার, জানুয়ারি ২৭

করোনা: সময়ের কথোপকথন

এখানে শেয়ার বোতাম

আবু নাসের অনীক::

বর্তমানে কোভিড-১৯ মহামারি সারা বিশ্বে দারিদ্র পরিস্থিতির ব্যাপকভাবে বিস্তার ঘটিয়েছে। সামনে আরো সংকটজনক অবস্থা তৈরি হবে। মানুষের উর্পাজনের পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, জীবিকা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে। বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক সংকটের বাইরে নয়। ঢাকা থেকে হাজার হাজার কর্মহীন মানুষ গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু সেখানেও তার কাজের নিশ্চয়তা নেই।

ইউনিসেফ বলছে,‘বাংলাদেশের বহু পরিবার এখন তিন বেলা খেতে পায়না’। পরিসংখ্যান বলছে ৪৩ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করছে। এমন একটি পরিস্থিতিতে সরকার কর্তৃক করোনা পরীক্ষার ফি নির্ধারণ (সেন্টারে জনপ্রতি ২০০ ও বাসায় যেয়ে ৫০০ টাকা) একটি চরম অমানবিক একইসাথে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। সরকারের এই সিদ্ধান্তের কারণে নমুনা পরীক্ষা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ পরীক্ষার বাইরে থেকে যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন,‘মহামারি পরিস্থিতিতে ২০০ বা ৫০০ টাকা নিম্ন মধ্যবিত্ত বা দরিদ্র মানুষের কাছে অনেক বেশি টাকা। করোনার উপসর্গ থাকলেও অনেকে এই টাকা খরচ করে পরীক্ষা করাবেন না। পরীক্ষা না করিয়ে, চিকিৎসা না নিয়ে এরা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াবেন’।

করোনা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা পরীক্ষা বাড়ানো। তারা সবসময় বলছে, টেস্ট, টেস্ট আর টেস্ট। সরকারের পরীক্ষার জন্য ফি নির্ধারণ সরাসরি এই নির্দেশনার সাথে সাংঘর্ষিক। বিগত দিনগুলোতে সরকার যেমন একের পর এক সাংঘর্ষিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে তার ধারাবাহিকতায় এটা নতুন যুক্ত হল। মহামারি কালীন সময়ে রোগ প্রতিরোধ করার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু সরকার সাংবিধানিক সেই দায়িত্ব পালন করছে না।

সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন ২০১৮-এর অধিদপ্তরের দায়িত্ব ও কার্যাবলি অংশে ৫(ছ) ধারায় বলছে,‘সংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক ও ল্যাবরেটরি পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে, এন্টিবায়েটিক প্রতিষেধক টিকা বা ঔষধ প্রয়োগ’।

আইনের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা অংশে (১২)(১) ধারায় বলা হচ্ছে, ‘যদি ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মচারির এইরুপ বিশ্বাষ করিবার কারণ থাকে যে, কোন ব্যক্তি সংক্রমণ রোগে আক্রান্ত হইয়াছেন বা তাহার দেহে সংক্রামক জীবানুর উপস্থিতি রহিয়াছে , তাহা হইলে তিনি উক্ত ব্যক্তির নিকট হইতে নমুনা সংগ্রহ এবং পরীক্ষা করিতে পারিবেন’। অর্থাৎ আইনের এই ধারাগুলো অনুসারে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করার দায়িত্ব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। সেখানে পরীক্ষার জন্য ফি নির্ধারণ সংক্রমক রোগ প্রতিরোধ আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। যদিওবা সরকার পূর্বেও বহুবার এই আইনের লঙ্ঘন ঘটিয়েছে।

দেশে নমুনা সংগ্রহ এখনও ভিষনভাবে অপ্রতুল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইনে বলছে,‘ একজন রোগী শনাক্ত করতে যদি ১০ থেকে ৩০ জনের নমুনা পরীক্ষা করা যায় তাহলে পরীক্ষা পর্যাপ্ত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়’। বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত একজন রোগী শনাক্তে ৫.২৯ টি নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে (ওয়ার্ল্ডোমিটার)। বিশিষ্ট ভাইরোলজিষ্ট অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বলেন,‘অতীতে সরকারি হাসপাতালে ফি চালু করে সরকার সুফল পায়নি। এই মহাদুর্যোগের সময় রাষ্ট্রকে তার নাগরিকের পাশে দাঁড়াতে হবে, প্রান্তিক মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারের উচিত পরীক্ষার ফি নেওয়ার সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহার করা’।

সরকার নতুন একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দোকানপাট খোলা রাখা ও জনগণের বাইরে থাকার সময় ৩ ঘন্টা করে বাড়িয়ে দিয়েছে। নমুনা পরীক্ষার ফি নেওয়ার মতো এই সিদ্ধান্তও সংক্রমণ বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। দেশ যখন সংক্রমণের উচ্চ স্তরে রয়েছে সেই মুহুর্তে এই সিদ্ধান্তও আত্মঘাতী। গত ৭ দিনে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্তের তালিকায় বাংলদেশের অবস্থান এখন বিশ্বে ৮ম (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা)। পরীক্ষার বিপরিতে পজিটিভ শনাক্তের হারের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৪ নম্বরে (ওয়ার্ল্ডোমিটার)।

জনস্বাস্থ্যবিদদের নিয়ে গঠিত সরকারের টেকনিক্যাল কমিটির প্রধান ডাঃ শাহ মনির হোসেন বলেন, ‘দেশে বর্তমানে করোনার পিকটাইম চলছে। জুলাই মাস জুড়ে সংক্রমণের এই ধারা অব্যহত থাকবে। এই সময়ে আরো ১ লাখ ২৫ হাজার মতো মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন। এরপর আগস্টে গিয়ে সংক্রমণ নিম্নমুখী হতে পারে। এই পূর্বাভাষের বাস্তবতা কিংবা কার্যকারিতা নির্ভর করবে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রের ওপর। সেটা না হলে এই পূর্বাভাষ কাজে আসবেনা।তখন সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটিই আবার বাড়বে’। এই পূর্বাভাষ দেওয়ার পরেই সরকার উল্লেখিত দুটি আত্মঘাতী সিন্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এবং পাইপলাইনে রয়েছে লকডাউনের ডিজাইন পরিবর্তন, পশুর হাট বসানো, ঈদের সময় আবারো মানুষকে বাড়ি যেতে দেওয়া! অর্থাৎ এখনই বলা যায় প্রজেকশনটি যে তথ্য দিয়েছে সেটি এর আগের প্রজেকশন যেমন মেলেনি তেমনি এটাও মিলবেনা। যে আশংকা উনি ব্যক্ত করেছেন সেটিই ঘটবে বলেই ধরে নেওয়া যায়।

ইতিমধ্যে সরকার লকডাউন বিষয়ে পূণরায় নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রথমে তার বলেছিলো ঘোষিত রেড জোন এলাকায় লকডাউন করবে, সেখান থেকে সরে এসে বলেছিলো ওয়ার্ডভিত্তিক করবে, তারপর সেই অবস্থান পরিবর্তন করে একটি ওয়ার্ডের নির্দিষ্ট এলাকায় লকডাউন করার পরিকল্পনা করে। এখন তারা সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এসে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এলাকা নয়, এলাকার মধ্যে কয়েকটি বাড়ি লকডাউন করবে যেখানে আক্রান্ত রোগী আছে। একের পর এক এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে করতে এক মাস অতিক্রম করেছে। নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য নতুনভাবে আবার ম্যাপিং করবে। এভাবে সময় অতিবাহিত হবে এবং সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়তেই থাকবে।

ভাইরোলজিষ্ট অধ্যাপক ডাঃ নজরুল ইসলাম বলেন,‘দেশে করোনার সর্বোচ্চ সংক্রমণ চলছে। অন্যদিকে সবকিছু খুলে দেওয়া হয়েছে। দেশের কয়েকটি রেড জোনে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলেও সর্বোচ্চ সংক্রমিত রাজধানী ঢাকার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ও প্রতিরোধে এখনও কার্যকর পদক্ষেপ লক্ষ করা যাচ্ছেনা। পূর্ব রাজাবাজার ও ওয়ারী রেড জোন কার্যক্রম শুরু হলেও পুরো রাজধানী এখনও অরক্ষিত। এভাবে চললে আগস্টেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবেনা। করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ করতে চাইলে রেড জোন চিহ্নিত করে দ্রুত লকডাউন কার্যকর করতে হবে’। পরিতাপের বিষয় সরকার কারো কথায় কানে তুলছে না। সরকারের গণবিরোধী চরিত্র ক্রমশই উন্মেচিত হচ্ছে।

আমাদের মাননীয়, বরণীয়, পূজনীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী গতকাল মহান সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন,‘করোনা চিকিৎসায় ভেন্টিলেটরের প্রয়োজনই নেই। ভেন্টিলেটরে যারা গেছেন তাদের প্রায় সবাই মৃত্যুবরণ করেছেন। আমাদের চারশ ভেন্টিলেটর আছে। এর মধ্যে ৫০ টিও ব্যবহার হয়নি’। অথচ দেশে এ পর্যন্ত যে সমস্ত করোনা আক্রান্ত রোগী মৃত্যুবরণ করেছেন তারা অধিকাংশই শ্বাসকস্ট জনিত কারণে মারা গেছেন। তার এ ধরনের বালখিল্য টাইপের বক্তব্য শোনার পরেও প্রধানমন্ত্রীসহ সরকার দলীয় একজন সাংসদও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেননি। অর্থাৎ তারা সবাই স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রতি নীরব সমর্থন প্রমান করে সরকার কতোটা অমানবিক!

এ ধরনের একটি জনবিরোধী সরকার প্রকৃত অর্থেই জনগণের পক্ষে কোন ভুমিকা গ্রহণ করতে পারে না। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে একের পর এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত সেটিই নির্দেশ করে। যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছি এর প্রতিটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার, আর সামনে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে। এখনও সময় আছে মানবিক হয়ে উঠুন, মানুষের জীবন রক্ষা করুন। মাননীয় গণ এভাবে দিন যাবে না, এই দিনেরও একটা শেষ আছে-

‘তখন আমৃত্যু লিখে যাব প্রতিবাদ, উন্মত্ত হিংস্র ও ক্রুুব্ধ নিরবধি, এ যদি সমাজ হয়, তবে আমি সমাজবিরোধী’।

লেখক: সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী।


এখানে শেয়ার বোতাম