সোমবার, নভেম্বর ৩০

করোনা: শত্রুর সাথে বসবাসের আট মাস

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 49
    Shares

আবু নাসের অনীক::

দিন যায় রাত যায়, বয়ে যায় সময়। এভাবেই করোনা সংক্রমণের আট মাস পার করে ফেলেছি আমরা। যে তিমিরে ছিলাম সেই তিমিরেই রয়ে গেছি। বরং আগামীতে পরিস্থিতি আরো খারাপের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তথ্য-উপাত্তকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলার ভ্রান্ত চেষ্টা করা হচ্ছে।
পরিসংখ্যানের দিকে খেয়াল করলে দেখবো, সপ্তম মাসে গড় টেস্ট হয়েছে ১২ হাজার ৭৪৯.৮০, গড় শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৫২৩.৬৪, শনাক্তের হার ১১.৯৫%, গড় মৃত্যু ৩০.৪১, মৃত্যুর হার ১.৯৯%। অষ্টম মাসে গড় টেস্ট হয়েছে ১৩ হাজার ০০৬.১২, গড় শনাক্ত ১ হাজার ৪৭২.৪৫, শনাক্তের হার ১১.৩২%, গড় মৃত্যু ১৯.৫৮, মৃত্যুর হার ১.৩২%। তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখবো সপ্তম মাসের তুলনায় অষ্টম মাসে গড় টেস্ট বেড়েছে মাত্র ২৫৬.৩২ টি, গড় শনাক্ত কমেছে ৫১.১৯, শনাক্তের হার কমেছে ০.৬৩, গড় মৃত্যু কমেছে ১০.৮৩, মৃত্যুর হার কমেছে ০.৬৭ (করোনা.গভ.ইনফো)।

এই তুলনামূলক চিত্র স্পষ্টতই উল্লেখ করে মৃত্যু ব্যতীত সপ্তম মাসের তুলনায় অষ্টম মাসে উল্লেখযোগ্য হারে কোন পরিবর্তন ঘটেনি। প্রকৃতপক্ষে টেস্ট যদি বৃদ্ধি করা না যায় তবে করোনা পরিস্থিতির স্পষ্ট কোন চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়। উল্লেখিত তথ্য করোনা নিয়ন্ত্রণের কোন ইঙ্গিত বহন করেনা। ইতিমধ্যে ইমপোজড ওয়েভের আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন,‘সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সরকার প্রস্তুত’। প্রায় ২

মাস পর আসুন দেখি প্রস্তুতির নমুনা-

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দেশে ৬২৯ টি প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন সেন্টার ছিলো। বর্তমানে অধিকাংশ সেন্টার বন্ধ আছে। পরিস্থিতির তথাকথিত উন্নতির কারণ উল্লেখ করে এসব সেন্টার বন্ধ করে দেয়া হয়। অথচ অনেক দেশের সাথে বিমান চলাচল শুরু হওয়াতে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার যাত্রী বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে ঢুকছে। সেন্টার বন্ধ থাকার কারণে তাদের অধিকাংশকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে রাখা যাচ্ছে না।

কিন্তু আমরা জানি, আমাদের দেশে করোনা সংক্রমণের উৎস ছিলো বিদেশ ফেরত যাত্রীদের মাধ্যমে। বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন যথাযথভাবে করতে না পারার কারণে এটা ঘটেছিলো। আমাদের ট্রাজেডি হলো আমরা কখনওই অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করিনা। অবশ্য আমাদের সরকার তো কখনো কোন ভুল করেছে এটাই স্বীকার করেনা! তারাতো করোনা নিয়ন্ত্রণে শতভাগ সফল মনে করে। ভুল স্বীকার করলে তখন না হয় শিক্ষা গ্রহণের প্রশ্ন আসে।

দেশে করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে পর্যাপ্ত টেস্ট, কোয়ারেন্টিন, কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং, আইসোলেশনের কথা গুরুত্ব দিয়ে বলা হলেও অদ্যাবধি আট মাস পার হবার পরেও সেটা গুরুত্ব পায়নি। বর্তমানে কোয়ারেন্টিন ও কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং এর অবস্থা একেবারেই নাজুক। এই বিষয়গুলোকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনতে পারলে সংক্রমণের অবস্থা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিলো।

টেস্টের অবস্থা আরো বেশি নাজুক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে একজন রোগী শনাক্তের বিপরিতে যদি ১০-৩০ জনের টেস্ট করা হয়, তাহলে পর্যাপ্ত টেস্ট করা হচ্ছে বলে ধরা হয়। দেশে একজন রোগী শনাক্তের বিপরিতে টেস্ট হচ্ছে ৬ জনের। অর্থাৎ পর্যাপ্ত টেস্ট থেকে অনেক দুরে। বিশ্বে ২১৫ টি দেশের মধ্যে টেস্টে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৩তম (ওয়ার্ল্ডোমিটার)। টেস্ট বাড়ালেই শনাক্তের সংখ্যা বাড়বে আর এতে সরকারের ইমেজ সংকটে পড়বে বলে মনে করে সরকার।

গত জুন মাস থেকে এন্টিজেন র‌্যাপিড টেস্ট করার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। যদিওবা জনস্বাস্থ্য বিদগণ এই টেস্টের কথা বলছেন আরো আগে থেকে। গত ৫ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সুপারিশ পাঠায় মন্ত্রণালয়ে। অবশেষে গত ১৭ সেপ্টম্বর সরকার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেয়ার পরেও প্রায় ২ মাস পার হলেও এখনো এটা শুরু করা যায়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনা প্রতিরোধে অন্যতম একটি পদক্ষেপ এন্টিজেন ভিত্তিক র‌্যাপিড টেস্ট। টেস্ট বাড়ানো ছাড়া করোনা সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র বোঝা কোনভাবেই সম্ভব নয়। সেটি না বুঝলে করণীয় নির্ধারণ বরাবরের মতো ভুল হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, ১০ জুন প্রথম ১৫ হাজার ৯৬৫ টি নমুনা টেস্ট করা হয়। এরপরে ১৫-১৮ হাজারের মধ্যে টেস্ট করা হয়। ২৬ জুন একদিনে সবোর্চ্চ ১৮ হাজার ৪৯৮ টি নমুনা টেস্ট করা হয়। এই সময়ে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৪ হাজারের ঘর ছাড়িয়ে যায়। এমন অবস্থায় সরকার পরিকল্পিতভাবে (টেস্ট ফি আরোপসহ অন্য শর্তাবলী আরোপ) টেস্ট কমিয়ে আনে। টেস্ট কমিয়ে আনার লক্ষ ছিলো শনাক্তের সংখ্যা কম দেখানো। তাতে তারা সফলও হয়। কিন্তু দেশে করোনা সংক্রমণ একটা দীর্ঘস্থায়ী রুপ নেয় যা বর্তমানেও চলমান।

জনগণের মধ্যে সংক্রমণ সম্পর্কিত বিষয়ে নুন্যতম সচেতনতা কাজ করছেনা। পূর্বের অনেক লেখাতেই উল্লেখ করেছি সরকারের দায়িত্বশীলদের বিভিন্ন সময়ে করোনা বিষয়ে রিল্যাক্টটেন্ট বক্তব্য এই অবস্থা সৃষ্টি করেছে। জনগণ করোনাকে খুবই সাধারণ একটা রোগ মনে করেছে। যেমন- গত ৯ মার্চ স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন,‘করোনাভাইরাস মারাত্বক নয়, ছোঁয়াচে’। ১২ মার্চ পরারাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন,‘করোনা মারাত্বক রোগ নয়; এটা সর্দি জ্বরের মতো। মিডিয়ার কারণে এই ইস্যুটা খুব প্যানিক তৈরি করেছে। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে মহামারি ঘোষণার কারণে হইচই হচ্ছে’।

বর্তমানে জনগণ ঠিক মাননীয় মন্ত্রীদের মতো করেই ভাবছে। সরকারের দায়িত্বশীলরা এভাবেই ভাবতে শিখিয়েছেন। উপরন্ত তার সামনে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র নেই। সে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে অন্ধকারে থাকছে। প্রকৃত অবস্থা বা চিত্র তুলে না ধরে শুধুমাত্র ঘোষণা দিয়ে সংক্রমণের এই পর্যায়ে এসে জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করা খুবই দুরহ ব্যাপার, একরকম অসম্ভব ব্যাপার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন,‘মানুষের প্যানিক চলে যাওয়াতে একদিক থেকে ক্ষতিকর হয়েছে। প্যানিক থাকাটাও ভালো ছিলোনা ডেফিনেটলি, তখন অনেক ধরনের স্টিগমা ছিলো যেগুলো ঠিক নয়, কিন্তু এখন একেবারেই করোনা নিয়ে মানুষ ভয় পাচ্ছেনা বা গুরুত্ব দিচ্ছেনা। এটা একটু চ্যালেঞ্জিং হয়ে গেছে’। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর,‘ভ্যাকসিন আসুক বা না আসুক কোভিড-১৯ বাংলাদেশ থেকে এমনিতেই চলে যাবে’ এই টাইপের বালখিল্য মার্কা বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত থাকার ব্যাবস্থা করতে হবে। আমার মনে প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, এ ধরনের গুজব মার্কা বক্তব্যের জন্য এইসব মাননীয়দের নামে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয় না কেন!! তাদের এ ধরনের বক্তব্য তো জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। অবশ্য মাননীয় বলে কথা!

সরকার করোনা প্রতিরোধে যে সমস্ত উদ্যোগ গ্রহণ করছে তা মূলত ঘোষণা ও কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ। এর নুন্যতম ব্যবহারিক প্রয়োগ অনুপস্থিত। গত ৩০ মে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা স্বাক্ষরিত পরিপত্র জারি করা হয়। গত ২১ জুলাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব ডা: মো: শিব্বির আহমেদ ওসমানী স্বাক্ষরিত এক পরিপত্রে সবার মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করে আদেশ জারি করে সরকার। গত ১০ আগষ্ট বাড়ির বাইরে সবার মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে মাঠ প্রশাসনকে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার নির্দেশ দেয় সরকার। সর্বশেষ গত ২ নভেম্বর মন্ত্রীসভার বৈঠক থেকে ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ ঘোষণা দেওয়া হয়।

কিন্তু এতসব ঘোষণা ও পরিপত্রের পরেও ফলাফল শুন্য। এর অন্যতম একটি কারণ সরকারের সিদ্ধান্তে স্ব-বিরোধিতা রয়ে গেছে। যা আগের কয়েকটি লেখাতেও উল্লেখ করেছি। বর্তমানে দেশের সকল পরিবহণে সরকারী সিদ্ধান্তেই শারীরিক দুরত্ব রক্ষা করা হচ্ছে না। শারীরিক দুরত্ব মানছেনা আবার মাস্ক পরার পরিপত্র জনগণ সঠিকভাবে গ্রহণ করছেনা, বিশেষ করে রাজধানীতে।

জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা: বে-নজীর আহমেদ বলেন,‘যথাযথ নিয়ম ও নজরদারি না থাকার কারণে এই শিথিলতা দেখা যাচ্ছে এবং এসব ক্ষেত্রে জনস্পৃক্ততার বিষয়টি এড়িয়ে শধু নির্দেশনা জারি করে কোন লাভ নেই। এই নির্দেশনা বাংলাদেশে মাস্ক ব্যবহারে বড় কোন পরিবর্তন আনবে না। কারণ আগেও এ ধরনের প্রজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল। কোন লাভ হয়নি।’ বাংলাদেশে করোনা প্রতিরোধে আট মাসের এটাই বাস্তব চিত্র। তারপরেও সরকারের দাবি তারা সকল ক্ষেত্রে সফল!

আগামী সময়ে ইমপোজড ওয়েভের যে আশঙ্কা করা হচ্ছে তা বর্তমানের বিপর্যয়কে আরো কয়েক গুন বাড়িয়ে তুলতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র তুলে আনার বিকল্প কিছু নেই। সকল আমলাতান্ত্রিক প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে করোনা সংক্রমণের প্রকৃত অবস্থা বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিচার-বিশ্লেষণ পূর্বক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরমার্শ গ্রহণের মাধ্যমেই করোনা সংক্রমণ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

লেখক: সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 49
    Shares