শুক্রবার, নভেম্বর ২৭

করোনা: মিথ্যার সাথে বসবাস…

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 93
    Shares

আবু নাসের অনীক::

বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতির তথ্য -উপাত্ত্ব নির্দেশ করছে দেশে সংক্রমণের হার উর্দ্ধমুখী। টেস্ট কমার কারণে শনাক্ত কম।। প্রতিদিনই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মৃত্যু হচ্ছে। যার মধ্যে বাসায় থেকে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। যেখানে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি করা প্রয়োজন সেই পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল কমানোর পরিকল্পনা করা আরো একটি আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত।

জনস্বাস্থ্যবিদ চিন্ময় দাস বলেন,‘কোভিড নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিন বন্ধ হয়ে গেছে। এখন যদি হাসপাতাল কমিয়ে আনা হয়, তাহলে মানুষের কাছে ভুল বার্তা যাবে, দেশে করোনা নেই। সেটা কতটা ভয়ঙ্কর হবে, কেমন করে হাসপাতাল কমিয়ে আনার মতো সিন্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে সেটাও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে বুঝে নেওয়া দরকার’।

সরকার করোনা নিয়ে আত্মতুষ্টির জোয়ারে ভাসছে। এমন ভাসা ভাসছে যে, অল্প কয়েক দিনের মধ্যে হাবুডাবু খাবে এটা নিশ্চিত। নিশ্চয় এটা জানা আছে হাবুডাবু খেলে ঠিকমত শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া যায় না। এতে মৃত্যুও ঘটে। সরকার কার দায়, কিসের দায় এড়াতে চাইছে একেবারেই স্পষ্ট নয়। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা: মুশতাক হোসেন বলেন,‘সংক্রমণ কমে যাচ্ছে এই আত্মতুষ্টিতে ভুগলে বিপদের আশঙ্কা আছে। কারণ, যেসব দেশ এই আত্মতুষ্টিতে ভুগেছে, তাদেরই সংক্রমণ এবং ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে। ঈদুল আজহার পর কোনদিন সংক্রমণ বাড়ছে, কোন দিন কমছে। এমন অবস্থা বহাল থাকলেও নিশ্চিত থাকা যায় না’। দেশে একজন জনস্বাস্থ্যবিদ খুঁজে পাওয়া যাবেনা যিনি সংক্রমণের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আত্মতুষ্টির অনুভূতি ব্যাক্ত করতে পারেন।

দেশে করোনাভাইরাসের কারণে পরোক্ষভাবে অনেক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। যে মৃত্যুগুলো পরিসংখ্যানের বাইরে থেকে যাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক আবু জাহের গত ১৪ আগষ্ট দিবাগত রাতে মারা যান। দ্বিতীয়বারের নমুনা পরীক্ষায় করোনা নেগেটিভ আসার পাঁচ দিন পর তিনি মারা যান। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বলেন,করোনা ভাইরাসের কারণে ফুসফুসে পানি জমে যাওয়ায় এবং শ্বাসকষ্টে তার মৃত্যু হয় (১৫ আগষ্ট, প্রথমআলো)। যেহেতু দ্বিতীয় পরীক্ষায় তার করোনা নেগেটিভ এসেছিলো সেকারণে করোনা সংক্রমণে তার মৃত্যু রেকর্ড হবে না। অথচ করোনাজনিত প্রভাবেই কিন্তু তার মৃত্যু ঘটলো। আমি এখানে মাত্র একটি উদাহরণ উল্লেখ করলাম। সারাদেশে প্রতিদিন এ ধরনের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মৃত্যু ঘটছে। সরকারের এ সমস্ত বিষয়ে নজর নেই। মৃত্যু কম এটা প্রচার করলেই মনে করছে মৃত্যু কমে যাবে। যাদের পরিবারে এটা ঘটছে তারাই বুঝতে পারছে তাদের জীবনে করোনা কী বিপর্যয় ডেকে আনছে। একটি পর্যায়ে যেয়ে জাতীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে বাধ্য!

সরকার যে পরিকল্পনায় (পরিকল্পনাহীন) চলছে এতে দেশে করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী রুপ নিতে যাচ্ছে। মনে আছে নিশ্চয়ই, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক ডিজি করোনা পরিস্থিতির মেয়াদ সম্পর্কে এমন কথায় বলেছিলেন। তখন দেশব্যাপী তার এই বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়। কিন্তু আমি আমার লেখায় বলেছিলাম, তিনি মুখ ফসকে সরকারের পরিকল্পনা প্রকাশ করে ফেলেছেন। পাঠক, সেদিন আমার সেই কথার যথার্থতা শতভাগ নিশ্চিত করছে এখন।

করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ীর ফলে জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতি ভবিষ্যৎ এ আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে। সমাজের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। কারণ করোনা কোনভাবেই এমনি এমনি যাবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা: মোজাহেরুল হক বলেন,‘এখন যেভাবে চলছে, জনগণ স্বাস্থ্যবিধি মানছেনা, সরকার কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করে জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে বাধ্য করতে পারছেনা। এই পরিস্থিতি যদি চলতে থাকে, তাহলে করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হবে। মানুষের জীবন ও জীবিকা দুটোরই অনেকদিন ধরে ঝুঁকি থাকবে। পাশাপাশি ভয় নিয়ে চলা স্থবিরতা থাকবে’।

এরমধ্যে আবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী বাণী প্রদান করেছেন,‘ভ্যাকসিন আসুক বা না আসুক করোনাভাইরাস বাংলাদেশ থেকে এমনিতেই চলে যাবে। আক্রান্ত বিবেচনায় করোনার মৃত্যুহার আমাদের দেশে অনেক কম। বলা চলে, ভ্যাকসিন ছাড়াই দেশ এখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার পথে’। দেখুন পরিসংখ্যান কী বলে.. ২১৫ টি দেশের মধ্যে মোট সংক্রমণের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৬তম, সক্রিয় সংক্রমণে অবস্থান ৭ম, নতুন সংক্রমণে গত এক সপ্তাহ ধরে অবস্থান ৫ম, নতুন মৃত্যুতে অবস্থান ৬ষ্ঠ, পার মিলিয়ন টেস্টে অবস্থান ১৫৬ তম (ওয়ার্ল্ডোমিটার)। গত এক সপ্তাহে সংক্রমণের হার ২০.৪৭ শতাংশ, গত এক সপ্তাহে গড় মৃত্যুর সংখ্যা ৩৮, মৃত্যুর হার ১.৪৪ শতাংশ (করোনা.গভ.ইনফো)। উল্লেখিত তথ্যের আলোকে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য মানষিকভাবে অসুস্থ মানুষের সংলাপের সাথে তুলনীয়!! একই সাথে গুজব ছড়ানোর অভিযোগেও তাকে অভিযুক্ত করা যায়!!

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা: বে-নজির আহমেদ বলেন,‘মন্ত্রী যদি করোনার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ হতেন, উনি যদি কোন গবেষণা বা সার্ভেকে গুরুত্ব দিতেন, তা হলে ওনার মুখ দিয়ে এ ধরনের কথা বের হতোনা। আমাদের দেশের ক্ষতি হতো না। এ ধরনের বক্তব্যে আমাদের দেশের আসলে ক্ষতি হচ্ছে’। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের বক্তব্য কী শুধুমাত্র স্বাস্থ্যমন্ত্রী দিচ্ছেন?? গোটা সরকারই আসলে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য আপহোল্ড করছে। নইলে করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে এ পর্যন্ত তিনি যে সমস্ত বক্তব্য দিয়েছেন তাতে বহু পূর্বেই মন্ত্রীসভা থেকে তার অপসারন ঘটতো। কিন্তু সেটা ঘটেনি। অর্থাৎ সরকার তার বক্তব্য সমর্থন করছে!!

এই মুহুর্তের বাস্তবতায় টেস্ট বাড়ানো প্রয়োজন ব্যাপক হারে। দিনে অন্ততো ২০ হাজার। মুখে মুখে জনগণকে টেস্ট করার আহ্বান জানানোর পরিবর্তে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। টেস্ট ফি কমিয়ে নয় পুরোটা প্রত্যাহারসহ জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে টেস্ট বাড়াতে হবে। একটি সমন্বিত কার্যপদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। যাতে কেউ টেস্টের বাইরে থাকতে না পারে।

এটি করার জন্য অবিসম্ভাবীভাবে র‌্যাপিড টেস্টের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। যতো দ্রুত আক্রান্ত মানুষকে শনাক্ত করে আইসোলেশনে নেওয়া যাবে ততোই আমরা করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে সাফল্য অর্জন করবো। ইতিমধ্যে গত ৩ জুন কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি করোনা শনাক্তে র‌্যাপিড টেস্টের সুপারিশ করলেও অদ্যাবধি সেটা নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা: সানিয়া তাহমিনা বলেন,‘বাংলাদেশের সব জায়গায় এখন করোনা শনাক্ত করা খুব প্রয়োজন। যদিও সব জায়গাতে পিসিআর ল্যাবরেটরি স্থাপন করা বাংলাদেশের মতো দেশে কঠিন বিষয় । তাই অ্যান্টিজেন এবং অ্যান্টিবডি কম্বাইন্ড করে যদি উপজেলা পর্যন্ত পরীক্ষা সুবিধাকে সম্প্রসারণ করা যায়, তাহলে ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে এর আওতায় নিয়ে আসা যাবে। কোভিড রোগীকে দ্রুত শনাক্ত করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে’। কিন্তু পরিতাপের বিষয় সরকারের নীতিনির্ধারকগণ এটা ফিল করেন না এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না। যদি করতেন তবে দেশে করোনা পরিস্থিতি তিন মাসেই নিয়ন্ত্রণ করার যথেষ্ঠ সুযোগ বিদ্যমান ছিলো।

দেশে ৩০ শতাংশ মানুষও মাস্কসহ অন্য কোন স্বাস্থ্যবিধি মানছেনা। গণপরিবহন থেকে শুরু করে কোথাও স্বাস্থ্যবিধি মানার বালায় নেই। এ বিষয়ে সরকারের কার্যকর কোন মনিটরিং এর ব্যবস্থাও নেই। দেশ করোনা মহামারিতে আক্রান্ত সেটি এখন শুধু পরিসংখ্যান এবং ভুক্তভোগী পরিবারের মাঝেই সীমাবদ্ধ। সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যতীত বিনোদন কেন্দ্রসহ সকল কিছু উন্মুক্ত করে দিয়েছে। সমস্ত দায়-দায়িত্ব নাগরিকের উপর এককভাবে চাপিয়ে দিয়েছে। নাগরিককে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করা সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়লেও এখানে বরং এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে যে, নাগরিক ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণকেই সঠিক মনে করছে। কারণ সরকারের ভূমিকা এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাবক হিসাবে কাজ করছে।

মহামারি পরিস্থিতিতে যে দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী অবলীলাক্রমে বলতে পারে, দেশে করোনা নেই, সে দেশের জনগণ তার বক্তব্য গ্রহণ করে স্বাস্থ্যবিধি মানবেনা এটাই তো স্বাভাবিক!! বরং স্বাস্থ্যবিধি মানাটাই তো অস্বাভাবিক। দেশের মানুষ তো আর অস্বাভাবিক আচরন করেতে পারে না, না কি বলেন!! সরকারের এহেন গণবিরোধী তৎপরতার ফলাফল নিশ্চয় নাগরিক জীবনে প্রভাব ফেলবে। সেদিন তারা চিৎকার করে বলবে…

‘জাগবার দিন আজ, দুর্দিন চুপি চুপি আসছে; যাদের চোখেতে আজো স্বপ্নের ছায়া ছবি ভাসছে- তাদেরই যে দুর্দিন পরিণামে আরো বেশি জানবে, মৃত্যুর সঙ্গীন তাদেরই বুকেতে শেল হানবে।’

লেখক: সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 93
    Shares