মঙ্গলবার, জানুয়ারি ১৯

‘করোনা-বামপন্থি রাজনীতি’

এখানে শেয়ার বোতাম

কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন ::

বিশ্ব আজ মহাসংকটে। ‘করোনার’ ভয়াল থাবায় মানব জীবন বিপর্যস্ত। প্রায় ৮ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন। কোটি কোটি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। মানুষের জীবনাচরণের পরিবর্তন হচ্ছে। সারা বিশ্বে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়বে বলে আশঙ্কা করছে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। বেকারত্ব বহু মাত্রায় বৃদ্ধি পাবে। দারিদ্র্যতা, সামাজিক বৈষম্য চরম মাত্রায় পৌঁছবে। পুঁজিবাদী বিশ্ব ব্যবস্থা যে মানুষের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা দিতে পারে না ‘করোনা’ এটাই প্রমাণ করে দিয়েছে। লুটেরা বুর্জোয়া শ্রেণির অস্তিত্বের উপর আঘাত হেনেছে।

আমাদের দেশও এই অবস্থার বাইরে যাবে না। এর প্রভাব ব্যাপকভাবে পড়বে। বিশ্লেষকরা বলছে প্রায় ৬ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে চলে যাবে এবং যাচ্ছে। প্রায় ১ কোটির উপর মধ্যবিত্ত পরিবার নিম্নবিত্তে পরিণত হয়েছে। বর্তমান সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি লুটপাট-ক্ষমতার দম্ভ দেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গিয়েছে। সরকার দেখানোর চেষ্টা করছে সব ঠিক আছে এবং সরকারে পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে প্রবৃদ্ধির হার, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স বাড়ছে। না খেয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে না। জীবনযাত্রা ক্রমান্বয়ে স্বাভাবিক হচ্ছে। এই সময়কালেও বর্তমান সরকার লুটেরা ধনিকশ্রেণির স্বার্থে ২৫টি রাষ্ট্রীয় পাটকল বন্ধ করে দিয়েছে। বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর সীমাহীন উদাসীনতায় ‘করোনা’
ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে নিয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশে বেকারত্ব বাড়ছে। ইতিমধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষ কাজ হারিয়েছে। তাদের বড় অংশই শ্রমজীবী মেহনতি মানুষ। এই করোনাকালীন সময়েও লুটেরা ধনিকগোষ্ঠীকে আর্থিক প্রণোদনা দিয়েছে। শ্রমজীবী মেহনতি মানুষকে কিছু আর্থিক প্রণোদনা দিলেও তা শ্রমজীবী, মেহনতি মানুষের কাছে পৌঁছেনি। বরং শাসক দলের পকেট ভারি হয়েছে।

দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছে। শুধু করোনা নয় অন্যান্য রোগের চিকিৎসাও হচ্ছে না। গত এপ্রিল-মে-জুন মাসে চিকিৎসার জন্য মানুষের হাহাকার দেশবাসী দেখেছে। বিনা চিকিৎসায় মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন। স্বাস্থ্যখাতে সীমাহীন দুর্নীতি চরম মাত্রায় পৌঁছেছে। শুরুতেই চিকিৎসা সুরক্ষা সামগ্রী নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। নিম্নমানের সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহের ফলে অনেক চিকিৎসকও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বা মৃত্যুবরণ করেছেন। প্রায় ৮০ জন চিকিৎসক এই সময়কালে মৃত্যুবরণ করেছেন। এটা মৃত্যু নয়, এটা হত্যাকা-।

সরকার তথাকথিত ‘বাজার অর্থনীতির’ আলোকে চিকিৎসা ব্যবস্থা বেসরকারিকরণ নীতির ফলে এই সংকট আরও গভীরতর হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলো চিকিৎসার নামে সীমাহীন মুনাফা লুটে নিয়েছে। চিকিৎসা না দিয়েও করোনার ভুয়া সনদ দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। সরকার কিছুই করতে পারে নাই বা করে নাই। বর্তমান সরকারের লুটপাট, দুর্নীতিসহ, অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ভ্রান্ত নীতির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও হতাশা বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনিতেই মানুষ আগে থেকেই এই সরকারের শাসনামল পছন্দ করছে না তার উপর ‘করোনা’ পরিস্থিতি এবং সরকারের ব্যর্থতায় এই ক্ষোভ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু মানুষের এই ক্ষোভ-বিক্ষোভ সংগঠিত করার মতো কোনো শক্তিই এই মুহূর্তে প্রতীয়মান হচ্ছে না। এ সময়কাল সরকারের দুর্নীতি লুটপাট স্বৈরাচারী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বামপন্থিরা তাদের যতটুকু শক্তি আছে তা নিয়ে রাজপথে ধারাবাহিকভাবে লড়াই-সংগ্রাম পরিচালনা করেছে। গণতন্ত্রহীনতা, গুম-খুন-হত্যা, পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে বামপন্থিরা প্রতিবাদ করেছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের পাশে ত্রাণ সহায়তা নিয়েও দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে বামপন্থিদের প্রতি এক ধরনের সহানুভূতি এবং প্রছন্ন সমর্থনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ ভরসা করতে পারছে না, এটাই বাস্তবতা।

সারা বিশ্বেই বামপন্থিদের ভাবমূর্তি বেড়েছে। সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদের পথ ছাড়া মানব মুক্তি সম্ভব নয় এটা পরিস্ফূটিত হয়েছে দেশে দেশে। পুঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থা মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিতে পারে নাই, এখনও পারছে না। তাই সারা বিশ্বের মত বাংলাদেশেও বামপন্থি রাজনীতি বিকাশের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এই সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে বামপন্থি ও কমিউনিস্টদেরই। আর এদেশে বামপন্থিদের আশা-ভরসার স্থল কমিউনিস্ট পার্টি। এই পার্টিকে গুণে-মানে শক্তিশালী করে গড়ে তোলা এই মুহূর্তে জরুরি কর্তব্য। শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে কমিউনিস্ট পার্টিকে। শ্রেণি সংগ্রামের ধারাকে যেমন অগ্রসর করতে হবে তেমনি জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রেও যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। দোদুল্যমানতা, বামসংকীর্ণতা ও বামপন্থি রাজনীতি সম্পর্কে নেতিকবাচক ধারণা পরিহার করতে হবে। পার্টির গৃহীত রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্তগুলোকে সঠিক ধারায় অগ্রসর করতে হবে। কমিউনিস্ট পার্টিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি বামপন্থিদেরও ইস্পাত ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। যারা বামপন্থি চিন্তাধারার, যারাই সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদে বিশ্বাস করেন তাদেরকেও এই সংগ্রামে সম্পৃক্ত করতে হবে। আজকে রাজনৈতিক কর্তব্য হিসেবে যেমন লুটেরা বুর্জোয়া রাজনীতির বিরুদ্ধে বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তি গড়া তেমনি কমিউনিস্ট ঐক্যও গড়ে তোলার উপর জোর দিতে হবে। ‘করোনা’ যেমন ভয়ংকর হয়ে মানবজীবনকে বিপর্যস্ত করেছে তেমনি পৃথিবীর শোষিত লাঞ্ছিত বঞ্চিত মানুষের মুক্তির সম্ভাবনার দ্বারও খুলে দিয়েছে। তাই আজকের দেশের বামপন্থি কমিউনিস্টদেরকে বিশ্বের সাথে সুর মিলিয়ে মানবমুক্তির সংগ্রামকে জয়যুক্ত করতে হবে। এটাই এ সময়ের দাবি।

লেখক: সহ-সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টি (সিপিবি)


এখানে শেয়ার বোতাম