মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৩
শীর্ষ সংবাদ

করোনা: নিয়ন্ত্রণে হ-য-ব-র-ল!

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 94
    Shares

আবু নাসের অনীক::

তথাকথিত লকডাউনের দ্বিতীয় দিন থেকেই এটা সম্পূর্ণই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবেই কার্যকর করা গেলো না। প্রথম দিনের প্রতিক্রিয়াতেই লিখেছিলাম, কার্যকর হওয়া সম্ভব না। আজকের তৃতীয় দিনে এসে এটা দিনের আলোর মতো পরিস্কার। ১৮ দফা বলি আর ১১ দফা নির্দেশনা তা শুধুই ঘোষণায়!

এক একটা দিন এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক দিনের ভুলের মাশুল সংক্রমণ আর মৃত্যু কয়েকগুণ বাড়িয়ে তোলা। নির্দেশনা উপেক্ষা করে বেসরকারী অফিসগুলো চলছে, গণপরিবহন খুলে দেওয়া হয়েছে, ব্যবসায়ীদের দাবির প্রতি একাত্ম হয়ে মার্কেটও হয়তো খুলে দেওয়া হবে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা: বে-নজির আহমেদ বলেন,‘তার মানে শহরের ভেতর ছড়ানোর যে ব্যবস্থা, সেটা বজায় থাকলো। যারা অফিস যাচ্ছে, তাদের মধ্যে কেউ আক্রান্ত, সে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ঘটাবেই নিশ্চিত। আবার বাস থেকে আক্রান্ত হয়ে ভাইরাস বাসায় নিয়ে গেল। বাসার লোক আক্রান্ত হবে। এভাবে একটা সংক্রমণ চক্র চলতেই থাকবে’। কী অদ্ভুত রকম নির্বিকার আমাদের সরকার এবং জনগণ। পরস্পর পস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত!! সবাই দিন দিন এতোটা অনুভূতিহীন হয়ে উঠেছে, ভাবতেই অবাক লাগছে। কেউই বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভাবছে না!!

করোনা সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জনপ্রশাসনমন্ত্রী বলেছেন,‘ঢাকা বারুদের উপর দাঁড়িয়ে আছে’। তিনি যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, এটা ভিষণ রকম ভায়াবহ একটা ব্যাপার। কিন্তু ট্রাজেডি সরকারের করোনা নিয়ন্ত্রণের ব্যবহারিক পদক্ষেপের সাথে এই প্রতিক্রিয়ার সামঞ্জস্যতা অনুপস্থিত!

এটাই সবচেয়ে বড় ক্রাইসিস যে, সরকার মুখে যে কথা বলছে, বাস্তবে তার শিথিল আচরণ সম্পূর্ণ বিপরিত পরিস্থিতি। তারা সবদিক রক্ষা করে সংক্রমণ পরিস্থিতি মোকাবেলার চেষ্টা করছে। কোনভাবেই বর্তমান সময়ে সবদিক রক্ষা করে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এখন একটাই লক্ষ্য হওয়া প্রয়োজন সেটি সংক্রমণের গতি নিয়ন্ত্রণে এনে মানুষের জীবন রক্ষা করা। আর তার জন্য যা যা করণীয় সেই পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
লকডাউনের মধ্যে বই মেলা খোলা রাখা, আর দোকান বন্ধ রাখাকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীরা আজ আন্দোলন করছে দোকান খোলা রাখার জন্য। সরকারের স্ববিরোধী সিদ্ধান্তের কারণেই এই বিতর্কিত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এই অবস্থা এড়ানোর জন্য বই মেলা বন্ধ করে দেওয়াই ছিলো ১৮ দফা নির্দেশনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু সরকার সে পথে অগ্রসর না হয়ে ব্যবসায়ীদের দাবির প্রেক্ষিতেই অগ্রসর হচ্ছে, যেটি ১৮ দফা এবং পরবর্তী ১১ দফার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এতো স্ববিরোধীতা নিয়ে কী স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন করানো যায়, যায় না!

আজকে যারা মার্কেট খোলা, দোকান খোলার জন্য বিক্ষোভ করছেন তাদের কাছে পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে স্পষ্ট ম্যাসেজ নেই। তারা এটা বুঝতেই ব্যর্থ হচ্ছেন, ভাইরাসটি মানুষ বাহিত, একজন সংক্রমিত ব্যক্তি (লক্ষণবিহীন) তার অজান্তেই অন্য একজনকে সংক্রমিত করে ফেলছেন, যার হার এখন প্রতি ২ জন সংক্রমিত করছেন ৩ জন কে। অন্য রোগের মতো এই রোগ থেকে আরোগ্য পাওয়ার সুনির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা নেই।

আক্রান্ত ৬০% রোগীর হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলেও ভর্তি হতে পারছে না সিটের অভাবে, তীর্থের কাকের মতো অক্সিজেন লাগিয়ে হাসপাতালের বারান্দায় অপেক্ষা করছে কখন একটা সিট খালি হবে, সিট খালি হচ্ছে যখন কেউ মারা যাচ্ছে! ২০% রোগীর পর্যাপ্ত অক্সিজেনের প্রয়োজন হলেও সেটিও পাচ্ছে না, ৫% রোগীর আইসিইউ প্রয়োজন তাও খালি নেই, এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতে এম্বুলেন্সেই মারা যাচ্ছে।

যারা আইসিইউ পাচ্ছেন তাদের একটা বড় অংশ সুস্থভাবে আর ফিরে আসছেন না। আইসিইউ এর বিল মেটাতে যেয়ে সর্বশান্ত হয়ে যেতে হচ্ছে তার পরিবারকে। সরকার এটা বোঝাতে ব্যর্থ হচ্ছে, দোকান খুলে আক্রান্ত হয়ে অক্সিজেন পেলেন না, আইসিইউ পেলেন না, ফেরায় হলোনা বা পেলেন সেটার ব্যায় মেটাতে যেয়ে দোকানটাই রক্ষা করতে পারলেন না!! সেটা আপনাদের জন্য ভালো, নাকি ১৪ দিন দোকান বন্ধ রেখে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রেখে নিজেকে রক্ষা, দেশের মানুষকে রক্ষা করতে সহায়তা করলেন। জীবন থাকলে ব্যবসা করার অফুরন্ত সময় পাওয়া যাবে।
আন্দোলনকারীরা প্লাকার্ডে লিখছেন,‘না খেয়ে মরার চেয়ে, করোনায় মরা ভালো’। এটা বুঝছে না একজন করোনা আক্রান্ত হয়ে আরো অনেক মানুষকে আক্রান্ত করে ফেলছে, অনেক মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠছে। নিজে মারা যাওয়া আর অনেক মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠা এক নয়!! এ কারণেই সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য আলাদা আইন আছে। সরকার তাদের দায়িত্বও নিচ্ছেনা, বাস্তবতা বোঝাতেও ব্যর্থ হচ্ছে।

গত ৯ দিনে করোনা সংক্রমণের রেকর্ড ভেঙেছে ৭ বার। আজো সংক্রমণের নতুন রেকর্ড হয়েছে, আক্রান্ত হয়েছে ৭ হাজার ৬২৬ আর মৃত্যু ৬৩! এমন পরিস্থিতির মধ্যেও সরকার গণপরিবহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলো। যুক্তি হিসাবে বলা হয়েছে, মানুষজনের যাতায়াত অসুবিধা দুর করার জন্য। প্রয়োজন ছিলো জনগণকে যাতে যাতায়াত করতে না হয় সেই ব্যবস্থা করার, সেটি না করে বরং উল্টো কাজ করলো। এতে আবারো জনগণের কাছে ভুল ম্যাসেজ গেলো, আরো বেশি উদাসীন হওয়ার জন্য উৎসাহিত হলো। আজকের পাটুরিয়া ফেরিঘাটের দৃশ্য সেটাই বলে! এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগণকে কোনভাবেই স্বাস্থ্যবিধি মানানো সম্ভব হবে না।

যখন বিরোধী দল কোন কর্মসূচি দেয়, তখন সেটা মোকাবেলা করার জন্য রাষ্ট্রীয় ও দলীয় পর্যায়ে যে তৎপরতা আপনারা শুরু করেন, তার কিয়দংশ তৎপরতাও তো করোনা মোকাবেলায় অনুপস্থিত। সারাদিন ধরে রাস্তায় রাস্তায় টহল দেন, এখন দেন না কেনো? জনগণকে করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে বোঝান না কেনো?? বঙ্গবন্ধু, বঙ্গমাতার মৃত্যুবার্ষিকী আর জন্মবার্ষিকীতে তো মহল্লায় মহল্লায় বড় বড় ডেক চড়ান, এখন চড়াচ্ছেন না কেনো?? এলাকায় এলাকায় শ্রমজীবী মানুষের কয়েক দিনের খাবারের দায়িত্ব নেন না কেনো!! যদি রাষ্ট্রের ত্রাণ বিতরণের ব্যাপার হতো তখন দেখা যেতো দলীয় নেতা-কর্মীদের অভাব হচ্ছে না। অথচ এই সময়ে বর্তমান সংক্রমণ পরিস্থিতিতে সচেতনতায় উদ্যোগ অনুপস্থিত। শ্রমজীবী মানুষের জন্য কোন উদ্যোগ নেই। এসব অনুপস্থিতিই সংক্রমণ কে নাগালের বাইরে নিয়ে যেতে সহায়ক হচ্ছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী গতকাল বলেছেন,‘নির্দেশনা না মানলে সংক্রমণ ও মৃত্যু নিয়ন্ত্রণহীন হতে পারে’, আজকে বলেছেন,‘করোনাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছি না’। প্রথমতো, আপনারা নির্দেশনা দিন যাচ্ছে আর রিল্যাক্স করছেন, যেটুকু অবশিষ্ট আছে সেটা প্রতিপালন করার জন্য কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন? শ্রমজীবী মানুষের জন্য, ক্ষুদ্র-মাঝারী ব্যবসায়ীদের জন্য কী করেছেন, যে সমস্ত বেসরকারী অফিস নিয়ম না মেনে খোলা রেখেছে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছেন?? উত্তর =০০! এসমস্ত বিষয়ে পদক্ষেপ যেমন গ্রহণ করছেন না, একই সাথে একটার পর একটা স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন।

ইমপালস হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন,‘অনেক রোগী আসছে। আমাদের কোন বেড ফাঁকা নেই; কেবিন, আইসিইউ কোনটাই ফাঁকা নাই। প্রচন্ড রোগীর চাপের মধ্যে আছি আমরা। একটা আইসিইউয়ের জন্য ৫টা রোগীর চাহিদা থাকে’। তাঁর এই কথার মধ্যে দিয়েই বোঝা যায় আমরা কতোটা বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছি। তথাপি রিল্যাক্টট্যান্ট হয়ে আছি। যতো দুঃশ্চিন্তা সব মুখে মুখে!! এখনো পর্যন্ত ‘জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি’ ঘোষণা করছিনা।

বিশ্বে বর্তমান সংক্রমণ পরিস্থিতিতে ২১৩ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের এই মুহুর্তের অবস্থান মোট সংক্রমণে ৩৩তম, নতুন সংক্রমণে ৮ম, মৃত্যুতে ১৭তম (ওয়ার্ল্ডো মিটার-৭/৪/২১)। রাজধানীতে সরকারী-বেসরকারী মিলিয়ে ৩০৫ টি আইসিইউ বেডের মধ্যে এখন খালি আছে ২০, প্রকৃত সংখ্যা ৩/৪। কারণ এর মধ্যে যেগুলো কাজ করেনা তার সংখ্যাও অন্তর্ভূক্ত।

মহামারি নিয়ন্ত্রণে এই মুহুর্তে সর্বাত্বক লকডাউনের বিকল্প নেই, অন্তত ঝুঁকিপ্রবণ এলাকায়। ‘জরুরি স্থাস্থ্য অবস্থা’ ঘোষণা করুন। সর্বদলীয়ভাবে জনস্বাস্থ্যবিদদের অংশগ্রহণে ‘সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ,নিয়ন্ত্রণ,নির্মূল) আইন,২০১৮’এর আলোকে টাস্কফোর্স কমিটিকে সক্রিয় করে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প কিছু নেই। বর্তমানে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের এই হ-য-ব-র-ল অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসুন। মাননীয়গণ, আপনারও নিরাপদ থাকতে পারবেন এটাও হলফ করে বলার অবস্থা কিন্তু নেই!

লেখক : সাবেক সভাপতি বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় যুব পরিষদ


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 94
    Shares