মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১

করোনা: দিন যায় দিন আসে…

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 21
    Shares

আবু নাসের অনীক::
করোনা সংক্রমণের ২১৩তম দিন পার করছে বাংলাদেশ। সংক্রমণ এখনও চলছে। মৃত্যুও ঘটছে। সরকার নির্বিকার, একইসাথে জনগণও নির্বিকার। মহামারির সময় যতোই লম্বা হবে মানুষ ক্রমেই সেটিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। এর শেষ নিয়ে যখন নিশ্চিত কোন ধারণা পাওয়া যায়না তখন এ বিষয়ে মানুষের বোধ নষ্ট হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মস্তিস্ক প্রতিদিনের আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। তখন এইসব তথ্য আর মানুষ সংবেদনশীলভাবে গ্রহণ করে না। তখন এটি তার কাছে শুধু মাত্র একটি প্রকাশিত সংখ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়।

কেনো মানুষ সাইকোলজিক্যালী নির্বিকার হয়ে পড়েছে সেটি উল্লেখ করলাম। আমি যেমন এই ব্যাখ্যা জানি যারা সরকার পরিচালনা করেন তারাও এর ব্যাখ্যা জানেন। জানেন বলেই যে মহামারির নিয়ন্ত্রণ ১২০ দিনে আনা সম্ভব ছিলো সেটি তারা অতিবাহিত করেছেন ২০০ দিনের বেশি। জীবিকা রক্ষার যুক্তিতে এই দিনের শেষ কবে হবে সেটি এখন আর বলা সম্ভব নয়। সরকার তার বর্তমান কৌশল পরিবর্তন না করলে সারা বিশ্ব থেকে সংক্রমণ বিদায় নিলেও এখান থেকে বিদায় কবে নিবে বা আদৌও নিবে কি না সেটা নিয়ে সংশয় থেকে যায়।

দেশে চীনের ভ্যাকসিন সিনোভ্যাকের ট্রায়াল পিছিয়ে গেছে। কারণ তারা এখনই ট্রায়াল শুরু করার জন্য সরকারের কাছে অর্থ বরাদ্দ চেয়েছে। কিন্তু কোন দেশে ট্রায়াল হলে সেই কোম্পানী তার খরচ বহন করে থাকে। সেক্ষেত্রে চীনের ভ্যাকসিন কোম্পানী জানিয়েছে, বাংলাদেশের জন্যেও তাদের অর্থ বরাদ্দ ছিলো। কিন্তু সরকার যথাসময়ে ট্রায়ালের বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত জানাতে না পারার কারণে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ অর্থ অন্য দেশের জন্য স্থানান্তর করে। সুতরাং এই সময়ে যদি দেশে ট্রায়াল শুরু করতে হয় তবে সরকারকে অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে নতুবা ট্রায়াল এর সময় পিছিয়ে নিতে হবে সেই সময় পর্যন্ত যখন ভ্যাকসিন কোম্পানী পুনরায় বাংলাদেশের জন্য অর্থ বরাদ্দ দিবে।

অথচ এই ভ্যাকসিন ট্রায়ালের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সবসময়ই বলা হয়েছে তারা যোগাযোগ রাখছে। চীনের ভ্যাকসিনের ট্রায়াল হবে। সরকারের দায়িত্বহীন আচারণের কারণেই এখন ট্রায়াল নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হলো। করোনা বিষয়ে যে সরকারের সিরিয়াসনেসের অভাব আছে এটি তার অন্যতম একটি দৃষ্টান্ত।

আজব এক দেশে বাস করছি আমরা। চলমান ‘বায়োলজিক্যাল ওয়ারে’ প্রথম সারির যোদ্ধা চিকিৎক ও অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মীরা। করোনা সংক্রমণে এ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছেন ৯৩ জন এবং আক্রন্ত হয়েছেন ২ হাজার ৮২৬ জন চিকিৎসক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে এই ফ্রন্টলাইন ফাইটারদের জন্য কী কী করতে হবে তার একটি গাইডলাইন দিয়ে দিয়েছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশই এটি মেনে চলছে। এর মধ্যে অন্যতম বিষয় সরকারী উদ্দ্যোগে তাদের আবাসন নিশ্চিত করা।

অথচ গত ২৯ জুলাই ২০২০ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক পরিপত্র জারিকরে তাদের আবাসন ব্যবস্থা বাতিল করে নিজ দায়িত্বে থাকার জন্য নির্দেশনা প্রদান করে কিছু দৈনিক ভাতার ভিত্তিতে। কোভিড রোগীদের চিকিৎসার দায়িত্ব পালন করে তারপর আবার কোয়ারেন্টাইনে নিজের আবাসন নিজে ব্যবস্থা করার দায়িত্ব যদি তাকে পালন করতে হয় তবে এর চেয়ে অমানবিক কিছু হতে পারেনা। সবকিছু মিলিয়ে এটা সংক্রমণ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত চিকিৎসকদের পরিবারকে কোভিড ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। সরকারের উচিত অবিলম্বে পূর্বের ন্যায় তাদের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের সুত্রপাত ঘটে প্রবাসী যাত্রীদের মাধ্যমে। অর্থাৎ বিমানবন্দরের সর্তকতামূলক ব্যবস্থাপনা ক্রুটির কারণে। সাত মাস পেরিয়ে এসে সেই একই দূর্বলতা নিয়ে চলছি আমরা। গতমাসে ৭ জন করোনা পজিটিভ রোগী বিদেশ থেকে দেশে আসেন। ৭ জনই ছিলেন উপসর্গহীন এবং তাদের পজিটিভ জানার পরেও বিমান কর্তৃপক্ষ অন্যসকল যাত্রীদের সাথে তাদের দেশে আসার সুযোগ প্রদান করে। দেশে ফেরার ক্ষেত্রে করোনার সনদ বাধ্যতামূলক না হবার কারণে এ ধরণের অনেক পজিটিভ রোগী ফিরছেন! এটা এতো বড় একটি ঝুঁকি হবার পরেও সরকারের নির্বিকতা প্রমাণ করে সংক্রমণ প্রতিরোধে নুন্যতম কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেই।

দেশে বর্তমানে সংক্রমণের পরিসংখ্যানের দিকে খেয়াল করা যাক। গত এক সপ্তাহের আগের সপ্তাহে (২৭-২১ সেপ্টেম্বর ২০২০) গড় টেস্ট হয়েছে ১২ হাজার ৬৭০(মোট টেস্ট ৮৮ হাজার ৬৯০), গড় শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৪৬১.৭১, শনাক্তের হার ছিলো ১১.৫৩%, গড় মৃত্যু ৩১.৭১ ও মৃত্যুর হার ২.১৬% ছিলো। গত সপ্তাহে (২৮ সেপ্টেম্বর-০৪ অক্টোবর ২০২০) গড় পরীক্ষা হয়েছে ১১ হাজার ৪৫৭.১১ (মোট টেস্ট ৮০ হাজার ২০৪), গড় শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৩৬৩.১৪, শনাক্তের হার ১১.৮৯%, গড় মৃত্যু ২৬.৭১ ও মৃত্যুর হার ১.৯৫%(ওয়ার্ল্ডোমিটার)।

উপোরক্ত ২ সপ্তাহের তুলনামূলক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় টেস্ট কম হয়েছে গত সপ্তাহে, ফলে শনাক্ত সংখ্যা কমেছে কিন্তু হার বৃদ্ধি পেয়েছে। মৃত্যুর ক্ষেত্রে হার কিছু কমেছে। অর্থাৎ টেস্টের সংখ্যা বাড়ালেই শনাক্ত ও মৃত্যু এগুলোর চিত্র সঠিকভাবে বোঝা যাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এই কথাই বলে থাকে। সরকার এই টেস্ট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই শনাক্তের একটি ফেক চিত্র জনগণের সামনে উপস্থাপন করে যাচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। প্রকৃতঅর্থে দেশে সংক্রমণ ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দেশিত পদ্ধতিতে মৃত্যুর হিসাব সংরক্ষণ না করার কারণে মৃত্যুর সংখ্যাও যথাযথাভাবে উপস্থাপিত হচ্ছেনা। শনাক্তের স্থিতিশীলতার বিষয়টিও নির্ভর করে টেস্টের উপর। আগামীকাল থেকে টেস্ট বাড়িয়ে দিলেই(২০-২৫০০০) শনাক্তের চেহারা বদলে যাবে। স্থিতিশীলতার লেশমাত্র থাকবে না!

আইইডিসিআর এর উপদেষ্টা জনস্বাস্থ্যবিদ ডাঃ মুস্তাক হোসেন সরকারের প্রচার করা শনাক্তের হার নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন,‘বিদেশগামীদের যে টেস্ট করা হচ্ছে এটা সার্ভিলেন্সের মধ্যে পড়ে না। এটা স্বাস্থ্য সার্ভিলেন্সের মধ্যে পড়ে। সার্ভিলেন্স হচ্ছে যাদের লক্ষণ আছে তাদের টেস্ট করতে হবে এবং যাদের পজিটিভ পাওয়া যাবে, তাদের সংস্পর্শে যারা আছে তাদের টেস্ট করতে হবে। যারা বিদেশগামী তাদের টেস্ট করা হচ্ছে তারা করোনামুক্ত কিনা, সেটা দেখার জন্য। এ বিদেশগামীদের টেস্ট যদি লক্ষণযুক্তদের টেস্টের সঙ্গে মিলিয়ে পরিসংখ্যান দেওয়া হয়, তাহলে সেটা করোনা পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র না। এখন হাসপাতালে যারা চিকিৎসা নিতে যায়, তারা কোভিড কি না সেটা জানতে তাদেরও টেস্ট করা হয়। এটা স্ক্রিনিং টেস্ট। স্ক্রিনিং টেস্ট যদি মোট সার্ভিলেন্সের ৫ শতাংশের বেশি হয়, তাহলে সেটা আলাদাভাবে দেখানো উচিত। কারণ এতে মনে হবে কমে যাচ্ছে, কিন্তু আসলে তো কমছে না। সার্ভিলেন্সের তথ্যটা আসল’।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিদিন টেস্টের যে তথ্য পাঠায় তা স্বাস্থ্য সার্ভিলেন্স, স্ক্রিনিং টেস্ট সবকিছু একসাথে করেই পাঠায়, বাদ দিয়ে নয়। আর এই তথ্যের উপর ভিত্তি করে প্রধানমন্ত্রী-স্বাস্থ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের আপদমস্তক বলে যাচ্ছে সংক্রমণ কমে গেছে, নিয়ন্ত্রণে এসে গেছে, দ্বিতীয় ওয়েভ আসতে পারে আরো কতো কী!! সেই ভুল তথ্য দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দেশের জনগণ করোনাকে চরমভাবে অবহেলা করছে।

জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যপক ডাঃ নজরুল ইসলাম বলেন,‘বর্তমানে দেশে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যেসব উদ্দ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা আমরা দেখছি, তা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক। কিন্তু ভাইরাস পপুলেশনের মধ্যে যদি কোন পরিবর্তন আসে তাহলে হয়তো সংক্রমণ কমতে পারে। সেখানে আমাদের কোন কৃতিত্ব নেই’। অন্যদিকে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলছেন,‘তারা সেভাবে কাজ করেছে বলেই আমরা এই করোনাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছি’। জ্বী জনাব, আপনি যেহেতু বলেছেন সেক্ষেত্রে সকল বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত্ব, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে অত্যন্ত আনন্দ চিত্তে আমাদের বলতেই হবে দেশে করোনা সম্পূর্ন নিয়ন্ত্রণে। সব কৃতিত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তা সে যতোই দুর্নীতি করুক আর রাস্তায় ঘুরে ঘুরে হাসপাতালে ভর্তি হতে না পেরে মানুষ মারা যাক!!

যা করছেন আগামী দিনের ইতিহাস তার শোধ তুলবেই। ইতিহাস সেটাই বলে! গত ছয় দিন পূর্বে পোস্ট-কোভিডে হারিয়েছি এক প্রিয় বড় ভাইকে। জানি তার মৃত্যুর সংখ্যা যুক্ত হবে না মোট করোনায় আক্রান্ত মৃত্যুর সংখ্যায়। এমন হাজার হাজার মৃত্যু থেকে যাচ্ছে হিসাবের আড়ালে! ক্লাস সিক্সে পড়া যে মেয়েটি হায়িয়ে ফেলেছে তার প্রিয় পিতাকে এটা তার কাছে, তার পরিবারের কাছে আর আমাদের কাছে এক অবর্ননীয় শোক। সরকারের কাছে একটি সংখ্যা হিসাবে স্বীকৃতি দিতেও তার কার্পন্য। কারণ এই একটি একটি সংখ্যা যুক্ত হয়ে যদি উন্মোচিত করে তোলে তার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি!

‘একবার মাটির দিকে তাকাও একবার মানুষের দিকে। এখনো রাত শেষ হয়নি; অন্ধকার এখনও তোমার বুকের ওপর কঠিন পাথরের মতো, তুমি নিঃশ্বাস নিতে পারছো না। মাথার ওপর একটা ভয়ঙ্কর কালো আকাশ এখনো বাঘের মতো থাবা উঁচিয়ে বসে আছে। তুমি যেভাবে পারো এই পাথরটাকে সরিয়ে দাও আর আকাশের ভয়ঙ্করকে শান্ত গলায় এইকথাটি জানিয়ে দাও-তুমি ভয় পাওনি।’

লেখক: সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী।
(প্রিয় মানুষ করোনায় মৃত্যুবরণকারী পপলু ভাইয়ের প্রতি উৎসর্গ)


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 21
    Shares